বন্ধু

বন্ধু

(১)
এসির বাতাসটা ঠিক ভালো লাগেনা সাদেকের। বদ্ধ জায়গায় ও জিনিসটা কেমন যেন মাথা গুলিয়ে দেয় তার। জানালা খুলে রেখেই সে সবসময় গাড়ি চালায়। কিন্তু কতক্ষন জ্যামে পড়ে সে একেবারে ঘেমে অস্থির। এত গরম পড়েছে এবার! এদিকে বোধহয় গরম আরো বেশি। আর এই বিশ্রী ট্রাফিক জ্যাম! ধুর! একটা মিটিং আছে এদিককার বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী আজমল সাহেবের সাথে। ভালোয় ভালোয় হয়ে গেলে নতুন কিছু কন্টাক্ট পাওয়া যাবে।
পাটজাত দ্রব্যের ব্যাবসা সাদিকের। পাটের তৈরি টুপি, ব্যাগ, পোষাক, জুতা-স্যান্ডেল, আরো নানারকম জিনিসপত্র তারা তৈরি করে। মাস্টার্স পাশ করে বছর তিনেক একটা গার্মেন্টসে চাকুরী করে অভিজ্ঞতা নিয়ে একটু ভিন্নধরনের পরিকল্পনা নিয়ে সে শুরু করেছিল তার নিজস্ব ব্যাবসা। মাত্র বছর দশেকের মাথায় বিশাল এক কারখানার মালিক সে। দেশের মধ্যে তার বাজার তো জমজমাটই, এর সাথে চীন, কোরিয়া আর কয়েকটা ইউরোপীয় দেশেও তার জিনিসের ভালো চাহিদা আছে।

ছোট এই শহরটায় নতুন এসেছে সাদেক। মাত্র মাসখানেক। এখানে তার দ্বিতীয় কারখানার কাজ মাত্র দুমাস আগে শুরু হয়েছে। গতমাসেই সে এখানে চলে এসেছে। আপাতত বছর দুই থেকে কারখানাটা ভালো করে চলমান করাই তার উদ্দেশ্য। কারখানার পাশেই ছিমছাম সুন্দর একট বাড়িও কিনে নিয়েছে সে।

সাদেকের ড্রাইভার বিরক্ত হয় মনে মনে। আহারে! এত ভালোমানের একটা গাড়ি চালায় সে, অথচ এসির অভাবে ঘামতে হয়। অবশ্য যখন স্যার থাকেননা, গাড়ির মধ্যে এসি ছেড়ে মাঝে মাঝে সে বেশ আরামসে ঘুম দেয়। তার স্যারের অনেক কিছুই বুঝতে পারেনা। কেমন যেন অদ্ভুত! তবে অনেক ভালো লোক। তার সাথে কিংবা অন্যকোন কর্মচারীর সাথে কখনো স্যারকে কেউ খারাপ আচরন করতে দেখেনি। এত বড় কারখানার মালিক অথচ কি সাধারন তার চলাফেরা। বিশেষ মিটিং ছাড়া স্যার স্যুট পড়েননা, রাস্তার পাশের ছোট চায়ের দোকানে বসে স্যার চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেন, আরো এমন সব কাজকর্ম স্যার করেন যা টাকাওালাদের মধ্যে খুব বেশি মানুষকে করতে দেখা যায়না।

জ্যাম ছুটেছে। কিছুদুর চলার পরে হঠাত ড্রাইভার চমকে ওঠে। তার কাঁধে স্যারের হাত।
“রতন ভাই, একটু থামান তো।”
রতন একটু এগিয়ে রাস্তার পাশে এসে ব্রেক কষে। গাড়ির দড়জা খুলে স্যার উদ্ভ্রান্তের মত উলটা দিকে ছোটেন।
সাদেক ছুটতে ছুটতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের সামনে এসে দাড়ায়। শামীম না! হ্যা, ঠিক তাই। পরনে কমদামী শার্ট আর প্যান্ট, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। হাতে একটা কালো ব্যাগ। পরিপাটি করে বিন্যস্ত চুল আর কালো ফ্রেমের আড়ালে ঐ সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। চলন্ত গাড়ি থেকে দেখেও সাদেকের ভুল হয়নি। দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাঁধে হাত রাখে সে।
“শামীম”
সে ঘুরে তাকায়। তার চোখে আনন্দ নেচে ওঠে।
“সাদেক! বন্ধু, তুই? কেমন আছিস? এখানে কোথায়?”
দুই বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে।
“কত বছর পরে, বলতো? ১০-১২, নাকি আরো বেশি?”
“১৩ বছর”
“বলিস কি? ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেড়িয়েছি ১৩ বছর হয়ে গেল!”
“কিন্তু বললি না, তুই এখানে কোথা থেকে!”
“বলছি, আয় গাড়িতে ওঠ”
রতন গাড়ি পেছনে নিয়ে এসেছে।
গাড়িতে উঠে সাদেকের দিকে তাকায় শামীম।
“এবার বল, তুই এই শহরে কোথা থেকে, কিভাবে?”
“দাড়া আগে দুটো ফোন সেরে নেই”। রতনকে বাসার দিকে গাড়ি ঘোড়াতে বলে আজমল সাহেবকে ফোন দেয়। ইনিয়েবিনিয়ে দুঃখিত বলে সে আজকের মিটিংটা আরেকদিন করার অনুরোধ জানায়। আজ সে অতি জরুরী কাজে ফেঁসে গেছে। তারপর ফোন দেয় মিতুকে। মিতু তার স্ত্রী।
অসময়ে তার ফোন মিতুকে বিস্মিত করে।
“হঠাত এই অবেলায়!”
“হ্যা শোনো, আমি এখনই আসছি। ২০-৩০ মিনিটের মধ্যেই। শামীমকে পেয়েছি। ওকে নিয়ে আসছি।” এটুকু বলেই কেটে দেয়।
মিতু শামীমকে চেনে। কখনো দেখেনি। কিন্তু এই মানুষটা সম্পর্কে সে প্রায় সবকিছুই জানে। অন্তত ১৩ বছর আগেকার শামীমকে তো অবশ্যই।

এবার শামীমের দিকে নজর দেয় সাদেক।
‘স্যরি দোস্ত, তোকে কিছু না জিজ্ঞাসা করেই ধরে নিয়ে এলাম। তুই ব্যাস্ত নাতো?”
“না। আমি এখানে একটা স্কুলে পড়াই। আজকের মত শেষ। বাসায় ফিরছিলাম। ব্যাস্ত না। কিন্তু কি ব্যাপার, বলতো? তুই এখানে?”
“আমি? আমি এখন এখানেই থাকব, বুঝলি। ছোট একটা কারখানা বানিয়েছি, বাড়িও নিয়েছি। মাসখানেক হল এসেছি। আপাতত বছর দুই থাকার ইচ্ছে আছে। চল, গেলেই দেখতে পাবি।”
“বাহ!” শামীম খুশি হয়। যাক পুরনো বন্ধুকে আবার তাহলে কাছে পাওয়া গেল।
“এবার তোর কথা বল। তুই এখানে কবে থেকে? আর স্কুলে পড়াস মানে? তুই আমাদের বন্ধু মহলে সবচেয়ে মেধাবী ছিলি। আমরা ভেবেছিলাম তুই হয়ত ইউনিভার্সিটির টিচার হবি না হলে সরকারী কর্মকর্তা হয়ে দাবিয়ে বেড়াবি, আর না হলে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ গিয়ে বড় পন্ডিত হবি! রেজাল্ট বেরুবার পর কোথায় হারিয়ে গেলি, তোর দেখাও আর পেলাম না! বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে খোজ নিয়ে দেখেছিলাম, তুই কোথাও জয়েন করিসনি। আমাদের পরিচিত কেউ খোজই দিতে পারলনা তোরা কোথায়! আমরা ভেবেছি তুই দেশ ছেড়ে চলে গেছিস!”

শামীম হাসে।
“মানুষের সবকিছুই কি ইচ্ছেমত হয় রে? মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরুবার ঠিক তিন দিন আগে বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ল। একেবারে শেষ স্টেজে। সামর্থ অনুসারে চিকিৎসা করিয়েছি। আমাদের অনেক খরচও হয়েছে, বুঝলি, কিন্তু খোদাতায়ালা যাকে ডাক দিয়েছেন, তাকে কি আর ধরে রাখা যায়! মাস ছয়েক দুনিয়া ভুলেছিলাম। আবার যখন ফিরে এলাম, দেখলাম অনেকটা সময় চলে গিয়েছে। কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তারা যা চান তা আমার নেই। অথবা হয়ত এমন, আমি যেমন তাতে আমাকে তাদের দরকারও নেই। বিসিএস পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। দু’বার। লিখিত পরীক্ষায়ও খুব ভালো করেছিলাম। কিন্তু একই অভিজ্ঞতা। হয়ত যে যোগ্যতার ভিত্তিতে তারা নিয়োগ করেন, সেই যোগ্যতা আমার ছিলনা। ঢাকা শহরের আনাচেকানাচে দু বছর টিউশনি করে চালিয়েছি। মা, দুটো বোন, আমি চারটা- পেট চালাতে একটু সমস্যা হয়ে যেত। এখানে একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকুরী পেয়েছিলাম। চলে এলাম। এগারো বছর হয়ে গেল। আছি। একটা কলেজে পার্টটাইম ক্লাসও নেই। আর কিছু টিউশনি। আস্তে আস্তে গুছিয়ে নিয়েছি। বাবার চিকিতসার জন্য কিছু ধার হয়েছিল, ওগুলো শোধ করেছি। বড় বোনটা বিএ পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। ছোটটা এখন মাস্টার্সে পড়ে, ঢাকায় থাকে। তবে, মা আর নেই রে! বছর তিনেক আগে আমাদের ছেড়ে সেও চলে গেছে বাবার কাছে।”
ধীরেধীরে বলে যায় শামীম। সাদেক ভেতরে ভেতরে কি কি অনুভব করে, তা শুধু সে’ই জানে আর জানেন সবার মাথার উপরে যিনি থাকেন।
“বিয়ে করেছিস?”
“না, সে পথ মাড়ানোর সুযোগ হয়নি।“
শামীমের একটা হাত বন্ধুত্বভরে নিজের হাতে টেনে নেয়। দুই বন্ধুই চুপ হয়ে যায়।

(২)
শামীম! সেই শামীম! সাদেক চোখ বন্ধ করে।
গ্রামের একেবারে দরিদ্র পরিবারের ছেলে সাদেক। তার বাবা সামান্য ক্ষেতমজুর। বড়ভাই ভ্যানলাচক। উচ্চশিক্ষার আশা সে করেনি। কিন্তু এসএসসি আর এইচএসসিতে খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ করার পরে গ্রামের সবাই উতসাহ দিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার। মোটামুটি রকমের চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির খরচ যুগিয়েছিল এলাকার কিছু মানুষজন। সাহস দিয়েছিল তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের টিউশনির অভাব হবেনা। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েতো খরচ খুবই কম।

কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার পরে সাদেক বুঝেছিল জীবন কি কঠিন। ভ্যানচালক বাবা প্রতিমাসে তাকে খুব সামান্য টাকা দিতে পারতেন। ভালো মানের একটা টিউশনী পাওয়া এত সহজ নয়। টিউশন মিডিয়ার অনেকে তাকে বলেছে ছাত্র/ছাত্রীদের অভিভাবকদের সামনে নিজেকে বুয়েট বা মেডিক্যালের কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমসারির কোন সাবজেক্টের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে। সাদেক পারেনি। বিবেক বাধা দিয়েছে। কমদামী দুটো টিউশনী আর বাবার পাঠানো কিছু টাকা, ওদিয়ে চলে যাচ্ছিল কোনরকমে। এরি মধ্যে ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারে সে ফার্স্ট ক্লাস পায়। মনে আশা ছিল, এভাবে পড়াশুনা চালাতে পারলে, কোন একদিন অভাব হয়ত ঘুচবে।

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় বন্যা তাদের সর্বনাশ করে। ক্ষেতের ফসল সব যায়। উপার্জনতো দুরের কথা। খোরাকির চালটুকু অবশিষ্ট থাকেনা। উপায় না দেখে সাদেক টিউশনির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। এমনকি দুইশত টাকার বিনিময়েও সে ছাত্র পড়িয়েছে তখন। পুরো সংসার যে তার উপরেই। বন্যার কারনে ভ্যানচালক ভাইও প্রায় কর্মহীন।
সাদেকের মনে পড়ে, কতদিন সে ক্লাস করতনা! টিউশনি নিয়েই ব্যাস্ত থাকত। বিভিন্ন অফিসে পিয়নের চাকরীর জন্যও সে ঘোরাঘুরি করেছে। পড়াশুনা মনে হত বিলাসিতা।
এমনি একদিন শামীম তাকে ধরে। সে তাদের সহপাঠীদের মধ্যে অন্যতম ভালো ছাত্র। ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
“কিরে সাদেক, তোর কি হয়েছে? ইদানিং তুই ঠিকমত ক্লাস করিসনা, কোথায় কোথায় থাকিস, টিউটোরিয়াল পরীক্ষায়ও দেখলাম খারাপ করেছিস! আর চেহারার একি হাল বলতো?”
সাদেক ভালো বোধ করে। অন্তত তার একজন বন্ধু তার এই অবস্থার কথা খেয়াল করেছে। বন্ধুর প্রতি আস্থা রেখে মোটামুটি সবকিছুই খুলে বলে সে। এও অনুরোধ করে, অন্য কাউকে যাতে না বলে। তাদের সহপাঠীদের অনেকেই উন্নাসিক স্বভাবের। তারা হয়ত এই চরম সময় নিয়ে বরং ঠাট্টা করবে!
কাল একটা টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। গত একমাসে এই সাব্জেক্টের কোন ক্লাসই সাদেক করেনি। এই পরীক্ষা দেয়া না দেয়া সমান। তা হঠাত একদিন এর জন্য প্রস্তুতি নিতে যেয়ে টিউশনি কামাই করার মানে হয়না। সে বেড়িয়ে যায়। রাতে ফিরে দেখে শামীম বসে আছে তার জন্য।
“কিরে কখন?”
“এইতো বেশ অনেকক্ষন। খেয়ছিস?”
“নারে! ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গেছে”
“তা এই রাত ১১ টায় ক্যান্টিন খোলা থাকবে কেন? এত দেরী করলি কেন?”
“ট্রাফিক জ্যাম”
“তা আজকে না গেলে হতনা! কাল টিউটোরিয়াল পরীক্ষা”
“সবই তো জানিস। এ সময়ে টিউশনি চলে গেলে বিপদে পড়ে যাবো। না গিয়ে উপায় নেই। আর এই পরীক্ষা দিয়ে কি হবে! কিছুই পড়িনি। সিলেবাস কি তাওতো জানিনা।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসছি। তুই একটু চা বানা।”
সাদেক ভালো লিকার চা বানাতে পারে।
চা বানানো শেষ হতে না হতেই শামীম ঢুকে। হাতে বড়বড় দুটো পাউরুটি আর কলা। আর কিছু নোটপত্র।
“চা নিয়ে আয়। এ দিয়ে আপাতত ডিনার সারি। এই রাতে এর বেশি আর কিছু পেলামনা”
সাদেক খুশি হয়।
খাওয়ার পর্ব শেষে শামীম নোটপত্র খুলে বসে।
“শোন, এখন রাত সাড়ে এগারোটা। এগুলো শেষ করতে বড়জোর চার-পাচ ঘন্টা লাগবে। দুই বন্ধু পড়ে শেষ করে ফজরের নামাযের পরে ঘুমাতে যাবো। ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়ে দশটায় পরীক্ষা।”
সাদেকের চোখ ছলছল করে ওঠে।
শামীম ওর কাধে হাত রাখে।
“যত সমস্যাই আসুক। পড়াশুনা বাদ দেয়া যাবেনা। মনোবল হারাসনা। আর আমরা তো আছি।”

তারপর থেকে যেদিন যেদিন সাদেকের ক্লাস মিস হয়ে যেত, ক্লাস লেকচারের একটা ফটোকপি কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে নোটের একটা কপি সে পেয়ে যেত তার টেবিলে।
মাস দুই পরে, একদিন শামীম তাকে বলে ছোটখাটো টিউশনিগুলো ছেড়ে দিতে। শুধু একটু ভালো বেতনের যে টিউশনিটা আছে, সেটা রাখতে।
“তাহলে আমার চলবে কিভাবে?”
“চিন্তা করিসনা, একটা কোচিং সেন্টারে তোর জন্য কাজ পেয়েছি। তাছাড়া আমিও করব। চল দুজনে একসাথে কোচিং মাস্টার হয়ে যাই”
“তা বেশ। কিন্তু তুই কেন কোচিংএ ক্লাস নিবি? তোর লেখাপড়ায় ক্ষতি হবে। তাছাড়া তোর আব্বা শুনলে রাগ করবেন।”
“আব্বাকে বলবনা”
“তা হঠাত তোর এই শখ জাগল কেন?”
“টাকার দরকার”
“সে কি রে? তোরও টান পড়েছে? কিসের দরকার শুনি? প্রেমে পড়িসনি তো?”
শামীম হাসে। “ওরকমই”
“ওহ, তাহলে ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে! এই, কে বলতো? কার সাথে জল খাচ্ছিস?”
“এখন বলবনা। পরে বলব”
অনেক জোরাজুরি করেও শামীমের মুখ থেকে সাদেক কথা বের করতে পারেনা।
তারপর, কোচিং সেন্টার থেকে যেদিন প্রথম তারা বেতন পায়, ফেরার পথে দুবন্ধু মিলে অনেকদিন পরে একটু ভালো খাওয়াদাওয়া করে। রাতে শামীম আসে সাদেকের রুমে। হাতে একটা খাম।
“ধর”
“কি এটা?”
“তোর জন্য। খুলে দেখ”
সাদেক দেখে অনেকগুলো টাকা। কোচিং সেন্টার থেকে পাওয়া টাকার সবটাই এখানে।
“আমার জন্য মানে?
“তোর জন্য মানে, তোর জন্য।”
“কিন্তু তুই আমাকে এই টাকা কেন দিবি? তুই কোচিং এ টিউশনি করা শুরু করেছিস কারন তোর টাকার দরকার। এখন সে টাকা আমাকে দিবি কেন?”
“আমার টাকার দরকার নেই রে। আমি এখানে টিউশনি করা শুরু করেছি তোর জন্য। তুই দিনরাত পরিশ্রম করে যাবি একা একা, আর আমি তোর বন্ধু হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যাবো! ধিক এমন বন্ধুত্বে!”
“তুই তোর নিজের পড়াশুনার ক্ষতি করে টিউশনি করবি আমাকে সাহায্যের জন্য?!” সাদেক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা!
“দু’ঘন্টা টিউশনি করলে আমার পড়ায় তেমন ক্ষতি হবেনা। বরং এইচএসসি’র পড়াগুলো ঝালিয়ে নিলে ‘কনসেপ্ট ক্লিয়ার’ থাকে। তুই আপত্তি করিসনা দোস্ত। বন্ধুর পাশে বন্ধু না দাড়ালে কে দাঁড়াবে বল?”
ঘটনার আকস্মিকতায় এবং অভাবনীয়তায় সাদেক কেঁদে ফেলে। শামীম তাকে জড়িয়ে ধরে।
“কাঁদিস কেন রে? মানুষের চিরকাল সমান যায়না। আজকে তোর বিপদের দিনে কেউ তোর পাশে এসে দাড়াচ্ছে। কাল বিপদ কেটে যাবে। অন্য কারো হয়ত বিপদ থাকবে। তুই তখন পাশে দাঁড়াবি।”

মাস্টার্সে উঠে সাদেক একটা পার্টটাইম চাকুরী পায়। সে পর্যন্ত প্রায় দু বছর শামীম টিউশনি করে টাকা দিয়ে গেছে তাকে। এ জগতে ক’জন বন্ধু করে এটা বন্ধুর জন্য!
সেই শামীম এখন এই শামীম। সাদেক চোখের জল আটকাতে পারেনা। জানালার দিকে তাকিয়ে লুকিয়ে মুছে ফেলে।
(৩)
বাসার সামনে গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয় শামীম।
“এই কারখানা তোর! বলিস কি? আমি শুনেছিলাম একজন নামকরা পাটের ব্যাবসায়ী এই কারখানা বানাচ্ছে। সেটা যে তুই, চিন্তাও করতে পারিনি”
“খুশি হসনি?”
“কি বলিস দোস্ত! খুশি হবনা মানে? এত অল্প বয়সে এত উন্নতি তুই করেছিস, ভাবতেই কি ভালো লাগছে!”
মিতু অবাক হয়। শামীমকে সে যেভাবে দেখবে বলে আশা করেছিল, সে রকম নয়। অতি সাধারন বেশে।
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া, আসেন। মামনি, তোমার আংকেলকে সালাম দাও”।
ছোট্ট মিনু সালাম দিয়ে আংকেলের হাত ধরে। সাদেক পরিচয় করিয়ে দেয়
“তোর ভাবী, মিতু। আর এ হল আমাদের ছোট্ট মা, মিনু”
তারা ভেতরে ঢুকে। শামীম অসম্ভব ভালো বোধ করে। “জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে বন্ধু আমার এখন সফল এবং সুখী মানুষ।” এতবড় ব্যাবসা, কারখানা, সুন্দর বাড়ি। মিতু ভাবীকে দেখেও ভালো লাগল। স্নিগ্ধ, মিষ্টি এমন মেয়ে, যাকে অনায়াসে বোন বানিয়ে ফেলা যায়। আর রাজকন্যার মত রূপ নিয়ে বছর পাচেকের মিষ্টি মেয়ে মিনু।

শামীমকে ঠান্ডা লেবুর শরবত আর কিছু হালকা নাস্তা দিয়ে মিতু বলে
“ভাইয়া আমাকে একঘন্টার জন্য ছুটি দেন। আপনার বন্ধু আর মিনুর সাথে গল্প করেন।”
সে রান্নাঘরে যায়। এই মানুষটাকে না দেখেই সে তার নিজের আপন বড়ভাইয়ের চেয়েও উচু আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তার বিয়ের পরে এমন কোন দিন যায়নি, সাদেক তার সম্পর্কে গল্প করেনি। সে জানে, এই শামীম ভাইয়া না থাকলে সাদেক আজকের সাদেক হতনা। তারও সাদেককে পাওয়া হতনা। কিন্তু সে খুব অবাক হয়ে ভাবে, শামীম ভাইয়ের এই অতি সাধারন বেশ কেন? তারা ভেবেছিল, উনি হয়ত বিদেশে কোথাও উন্নত জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তার জীবনের ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। কোথায় ছিলেন এতদিন? আর এতদিন পরে এই শহরে সাদেক তাকে কোথা থেকে ধরে আনল! সে সাদেকের মোবাইল ফোনে একটা মিসকল দেয়। এটা সিগন্যাল। এর মানে হল, এদিকে এসো, জরুরী কথা আছে।
সাদেক তাকে সবিস্তারে বলে যায় শামীমের কথা। জীবনসংগ্রামের কথা। মিতুর কান্না পায়। এই এত ভালো মানুষটির আল্লাহ এত কঠিন পরীক্ষা নিলেন!

ঘন্টাখানেকের মধ্যে মিতু নিজের মমতা ভরা হাতে অনেকগুলো খাবার বানিয়ে ফেলে।
খাবার টেবিলে বসে শামীমের চোখ ছানাবড়া!
“এত অল্প সময়ে এতরকমের খাবার কিভাবে বানিয়ে ফেললেন ভাবী!”
মিতু হাসে। শামীমকে খুশি হতে দেখে সেও খুশি হয়।
খাবার পরে তারা আবার আড্ডায় বসে। সাদেক অফিসে জানিয়ে দেয়, আজ আর যাবেনা। শামীমকে বলে,
“তোর আজ আর গিয়ে কাজ নেই। রাতে এখানে থাক। দু বন্ধু মিলে বেশ চুটিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে”
শামীম রাজি হয়। বিকেল সন্ধ্যা গড়িয়ে কখন রাত গভীর হয়ে যায়। মাঝে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া হয়। মিতুও যোগ দেয়। তবে সে শুধু শোনে। দু বন্ধুর কত কথা জমে ছিল! মিনু খুব ভক্ত হয়ে গেছে শামীমের ইতিমধ্যে। ওর কোলেই ঘুমিয়ে গেছে।
মিতু ওকে শুইয়ে দিয়ে আসে।
সাদেক একসময় বলে ওঠে
“দোস্ত তুই একা একা এত কঠিন সময় পাড়ি দিলি, আমাদের কাউকে জানালি না কেন? তুই না হয় আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিলি, কিন্তু চাইলেই তো আমাদের খুজে বের করতে পারতি। আমাদের মোটামুটি সবাই ভাল চাকরীবাকরী করছে কিংবা ব্যাবসা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তুই কেন একবারও কারো সাথে যোগাযোগ করলিনা!”
“কি হত যোগাযোগ করে? শুধুশুধু বিরক্ত করা হত। আর আমিতো খারাপ ছিলাম না রে! বরং একধরনের আত্মতৃপ্তির মধ্যে আছি। যে সিস্টেমের নিয়মকানুনগুলো মানতে পারিনি, সে সিস্টেমের কাছে মাথা নত করিনি।”
সাদেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শামীমটা বড্ড অভিমানী।

“শোন, তোকে নিয়ে আমার প্লান আছে। আমি অনেক আশা নিয়ে এই ফ্যাক্টরিটা এখানে করেছি। এটা আমার দ্বিতীয় ফ্যাক্টরি। এটা দাড়া করাবার জন্যই আমার এখানে আসা। তোকে যখন পেয়েই গেলাম এখানে, তুই এটার দায়িত্ব নে।”
“কেন? কোন যোগ্যতায় আমি এর দায়িত্ব নেবো? আমি না বুঝি ব্যাবসা, না বুঝি পাট।”
“তোর কিছু বোঝা লাগবেনা। এই ফ্যাক্টরী তোর দায়িত্বে, তুই দায়িত্ব নিবি, ব্যাস”
“কেন? করুনা করছিস আমার দারিদ্রতা দেখে?”
“সেকি, তোকে আমি করুনা করতে যাবো কোন সাহসে? আমি সেরকম নরাধম নই। আমার জন্য তুই কি করেছিস, তার বিন্দু বিসর্গ আমি ভুলিনি”
“তাহলে প্রতিদান দিচ্ছিস, বল!”
“না, শোন…।”
“অনেক রাত হল, ঘুমাতে যা। পরে ভাবা যাবে।”

(৪)
রাতে শুয়ে শুয়ে সাদেক মিতুর সাথে আলোচনা করে
“তোমার কি মনে হয়, শামীম কি মাইন্ড করল?”
“বুঝতে পারছিনা। আত্মসম্মানবোধটা তার সম্ভবত অনেক বেশি”
তারা অনেক ভাবে, অনেক আলোচনা করে। প্রায় নির্ঘুম রাত কাটায়।
“শোনো, আমার মাথায় একটা প্লান এসেছে।“
“আমারও”
“বলো”
“আগে তোমারটা বলো”
“ও হয়ত আমার কারখানায় কাজ করাকে অসম্মান মনে করছে। আচ্ছা আমরা যদি এই কারখানাটা আর বাড়িটা…” এটুকু বলে সাদেক মিতুর দিকে তাকায়।
মিতুর চোখ হাসে।
“হা, আমিও তাই ভাবছিলাম”
সাদেকের মন থেকে বিশাল এক ভার নেমে যায়। মিতু তার জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গী নিশ্চয়ই। তার পরম বন্ধু। কিভাবে তার মনের কথা পড়ে ফেলল। কত মানব-মানবী বছরের পর বছর ধরে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, সহস্রাব্দী ধরে, এবং তারও বেশি সময় ধরে সংসারধর্ম পালন করে এসেছে। হায়, এদের ক’জনা একে অন্যের বন্ধু হতে পারে! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্বই যদি না থাকে, একে অপরকে যদি বুঝতেই না পারে, তবে সংসার জীবনের মর্মই থাকেনা।

পরের দুই সপ্তাহের মধ্যে তারা কারখানা আর বাড়ির দানপত্রের কাগজ তৈরি করে ফেলে। এ’কদিন সাদেক চেয়েছে শামীম প্রতিদিন তার বাড়িতে আসুক, অন্তত সন্ধ্যার খাবারটা সে বন্ধুর সাথে খেতে চেয়েছে। কিন্তু শামীম ব্যাস্ততার অজুহাত দিয়েছে। তবে উইকেন্ডের দিন দুটো সে এসেছে। শহরের আনাচেকানাচে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে সাদেকদের। মিনু খুব ভক্ত হয়েছে তার। শামীমকে সে মামা ডাকা শুরু করেছে। সাদেক অবাক হবার ভান করে জিজ্ঞাসা করেঃ
“সে কিরে, ও আমার বন্ধু; তুই ওকে চাচা না ডেকে মামা ডাকছিস কেন?”
“মামনি যে ভাইয়া ডাকে! মামনির ভাইয়া তো আমার মামাই হয়!”
সবাই হেসে ওঠে।
মিতু বলে
“হ্যা, ভাইয়া, আপনি আর আমাকে ভাবী বলে ডাকবেননা। মেয়েই ঠিক করে দিল। আপনি আমার ভাইয়া, আমি আপনার ছোট বোন। নাম ধরে ডাকবেন”
“তাহলে তুই আমার শালা হলি” সাদেক বলে ওঠে শামীমের দিকে তাকিয়ে।
মিতু চোখ পাকিয়ে ওঠে “শালা কিভাবে? সম্বন্ধী বলো। তোমার সম্মানীয়”
আহ! কতদিন কতবছর পরে এমন একটা হাসিখুশির পরিবেশের ছোঁয়া পায় শামীম! জীবন বড় আনন্দময় মনে হয়।

(৫)
রবিবারের এক দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে সাদেক শামীমের হাতে দুটো খাম ধরিয়ে দেয়।
“কি এটা?”
“খুলে দেখ”
শামীম খুলে। দুটো দলিল তার নামে। কারখানার আর এই বাড়িখানার। মিনিট দুয়েক একান্ত মনে দেখে শান্ত মুখে কাগজ দুটো ভাজ করে আবার খামের মধ্যে ঢুকিয়ে পাশে রেখে দেয়। তার মধ্যে তেমন কোন ভাবান্তর লক্ষ করেনা সাদেক বা মিতু।
শামীম মিনুকে ডেকে বলে, “চলতো মা’মনি, আমরা একটু খেলি।”
উঠতে গিয়ে খাম দুটো হাতে নেয় সে। সাদেককে বলে
“যা একটু রেস্ট নে। আমি একটু মিনুকে নিয়ে খেলি।”
সাদেক আর মিতু ভেবেছিল শামীম হয়ত খুব খুশি হবে অথবা রেগে গিয়ে চেঁচামেচি করবে। কিন্তু তার নিস্পৃহ ভাব তাদের অবাক করল। তারা এ নিয়ে বেশ কিছুক্ষন নিচু স্বরে আলোচনা করল। তারপর বিকেলের নাস্তা বানানোর জন্য মিতু রান্নাঘরে গেল আর সাদেক তার বাড়ির মধ্যকার অফিসরুমে ঢুকল।
বেশ কিছুক্ষন পরে মিনু চেঁচাতে চেঁচাতে ড্রয়িং রুমে এলো
“বাবা, বাবা, মামনি ও মামনি, মামা চলে গেছে”
“সে কি! কখন?”
“ঐ যে দেখো যাচ্ছে। এগুলো তোমাদের দিতে বলেছে”
তার হাতে দুটো বাদামী বড় খাম, যে দুটো দুপুরের পরে শামীমের হাতে দিয়েছিল। আর মিনুর রঙিন খাতা থেকে ছেড়া একটা পাতায় একটা চিঠি।

“সাদেক,
অনেক দিন পরে তোর সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল। কতদিন পরে কি চমৎকার কিছু সময় কাটালাম, বলতো! মিতু, মিনু কত আপন হয়ে গেছে এই ক’দিনে!
কি জানিস, তুই একটু পাগলাটে হয়ে গেছিস। একটু না, অনেকখানি। তোর বউটাও পেয়েছিস পাগল। ভালোই হলো, পাগলে পাগলে মিলেছে বেশ!
সেই কবে কতদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুত্বের খাতিরে তোর সামান্য একটু কাজে লেগেছিলাম, তাই বলে তুই আমাকে তোর কারখানা আর বাড়ি লিখে দিবি?! পাগলামীটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছেনা বন্ধু!
যাহোক। আপাতত কিছুদিন এমুখো হচ্ছিনা। আবেগটা কমে গেলে ফোন দিস, বা আমার স্কুলে চলে আসিস। আবার এসে আড্ডা দেবো আর মিতুর মজার মজার রান্না খাবো।
মিনুকে আমার আদর দিস।
– শামীম”

মিনু বলে “বাবা, মামা এখনি চলে গেল কেন? ও বাবা, ডাকোনা মামাকে”
মিতু সাদেকের হাত থেকে চিঠি নিয়ে পড়তে আরম্ভ করল।
সাদেক মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বলে
“মা’মনি, তোমার শামীম মামা মহৎ মানুষ। মহৎ মানুষরা একটু অভিমানী আর আত্মমর্যাদাশীল হয়। তোমার মামা অভিমান করে চলে গেছে”
মিনু এত কঠিন কঠিন কথা না বুঝে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

(৬)
দিন সাতেক পরে এক সন্ধায় শামীমের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। খুলে দেখে মিতু আর মিনু দাঁড়িয়ে।
মিনু লাফ দিয়ে কোলে ওঠে।
মিতু কাতর কন্ঠে বলে “ভাইয়া, বোনের আবদার নিয়ে এসেছি। আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।”
“সাদেক কোথায়?”
“আপরাধবোধে ভুগছে। আপনার সামনে আসতে ভয় পাচ্ছে। তাই ওকে রেখে এসেছি”
শামীম হাসে। গাড়িতে শামীম আর মিতু পেছনের সীটে পাশাপাশি বসে। মিনু শামীমের কোলে।
“ভাইয়া, যদি রাগ না করে অভয় দেন, কিছু কথা বলতাম”
“বলো”
“আমার বিয়ে হয়েছে আজ সাত বছর। সেই বিয়ের রাতে আপনার বন্ধু আমাকে তার জীবনকাহিনী শুনায়। তারপর এই সাত বছরে এমন কোন দিন যায়নি যে আপনার বন্ধু আপনার কথা না বলেছে। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগত। ধীরেধীরে যখন আপনার বন্ধুর সাথে আমারও বন্ধুত্ব হয়ে গেল, তাকে বুঝতে শুরু করলাম, তার মত করে আমিও আপনাকে আমাদের মাঝে অনুভব করলাম। আজকে আমাদের যা কিছু আছে, সবই আপনার জন্য। আপনি সেদিন এগিয়ে না আসলে ও কোথায় হারিয়ে যেত। আমারও ওকে পাওয়া হতনা। এত সুন্দর শান্তিময় সংসার আমার হতনা। আপনার কথা আমরা এমনভাবে আলোচনা করতাম যেন আমাদের মাঝে না থেকেও আপনি সবসময় আমাদের মাঝে ছিলেন। ব্যাবসায়ীক কাজে ও যেকোনো সমস্যায় পড়লে ভাবত আর বলত আপনি এখানে থাকলে কি পরামর্শ দিতেন। যদিও ও ধীরেধীরে পরিশ্রম দ্বারা আজকের এই ব্যাবসা দাড় করিয়েছে, এর পেছনে সবসময় আপনিই ছিলেন। ওর গাইড হয়ে, ফিলোসফার হয়ে, অভিভাবক হয়ে। আজকে আপনি আমাদের ফিরিয়ে দিবেননা, তাহলে যে ছায়ার নিচে আনন্দ নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকা চলছিল, সেই ছায়াটুকু সরে গেল আমরা বড় অসহায় হয়ে যাবো। মিনু জানে ঐ বাড়ি, তার পাশের কারখানা তার মামার। আমরা কিছুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছি মাত্র। মাঝে মাঝে আসব। আপনি কি আমাদের ফিরিয়ে দিবেন, ভাইয়া?”

শামীমের কান্না পায়। কিন্তু কাঁদা চলে না তার। মিনুর ললাটে চুম্বন করে সে বলে
“না, তোমাদের ফেরাতে পারবনা। আমি সেরকম পাষণ্ড নই। “
গাড়ি তীব্র ব্রেক কষে হঠাত বন্ধ হয়ে গেল। সীটের উপর থেকে ড্রাইভার পেছন দিকে মাথা বাড়িয়ে দুহাতে শামীমের মাথা ধরে একটু টেনে নিয়ে পরম আবেগের সাথে বলল
“অনেক ধন্যবাদ, বন্ধু। তোর প্রত্যাখ্যান আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। তুই আমাকে বাচালি”
সাদেক!
“একি তুই? এতক্ষন ড্রাইভার সেজে বসে ছিলি!”
“আরে আমি তো গত সাত বছর ধরেই মিতুর ড্রাইভার, পাচ বছর ধরে মিনুর। হা হা হা”।
পরিবেশ হালকা হয়।
সাদেক বলে “তুই ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই রে। তুই ফিরিয়ে দিলে আমি আবার সেই শুন্য হয়ে যেতাম। পাটকে নিয়েছিলাম একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে। তুই আমার মাথার উপরে থাকলে দেশের এই সোনালী সম্পদকে পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে প্রতিষ্ঠিত করব”
দুই বন্ধু পরম মমতায় একে অপরের হাত ধরে থাকে। তার বাবা আর মামার মধ্যে আবার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে বলে মিনুর ভালো লাগে।

পেছনের সীটে মাথা এলিয়ে দেয় মিতু। কোথাও শুনেছিল সে “খোদাতা’লা মানুষকে অনেকগুলো সুন্দর ভাবনা বা অভিব্যাক্তি দিয়েছেন। যেমন স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া, মমতা। কিন্তু আরো একরকম ভাবনা আছে, যা এসব ভাবনা বা অভিব্যাক্তির চেয়েও বড়। তা হল কৃতজ্ঞতাবোধ।” কি চমৎকার কথা!
আমাদের জীবনে অনেকরকম কঠিন কঠিন সময় আসে, আমাদের অনেক চড়াই-উতরাই পেড়োতে হয়। এই সময়গুলোতে আমাদের পাশে এসে দাড়ান কিছু মহান মানুষ। আমাদের অধিকাংশ মানুষদেরই চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য হল, যিনি বা যারা আমাদের দুঃসময়ে পাশে এসে দাড়ান, সুসময়ে তাদের অস্বীকার করা। ‘কৃতজ্ঞতাবোধে’র মত মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য আমাদের যাদের মধ্যে বিদ্যমান নেই, তারা বড়ই অভাগা। যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করে, নিজেদের অন্দরে তারা নিতান্তই ক্ষুদ্র হয়ে যায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারলে নিজের ভার লাঘব হয়, এ এক অদ্ভুত এক আনন্দের বিষয়।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত