ভালোবাসার পরী

ভালোবাসার পরী

আকাশঃ মেঘা এই মেঘা
মেঘাঃ হুম বল
আকাশঃ বৃষ্টিতে ভিজো না প্লিজ।
মেঘাঃ বৃষ্টিতে ভিজছি না তো , হাত দিয়ে বৃষ্টি ধরার চেষ্টা করছি।
আকাশঃ এত বৃষ্টি পাগল কেন তুমি বল তো ?
মেঘাঃ মা-বাবার দেওয়া নামটা সার্থক করতে। তুমিও এসো না।
আকাশঃ না তুমি এসো । এই অবস্থাই আর ভিজতে হবে না।
মেঘাঃ এই অবস্থা মানে? আমি কি অসুস্থ নাকি?
আকাশঃ না অসুস্থ না তবে বেবির কথা তো চিন্তা করতে হবে।
মেঘাঃ শুধু বেবির চিন্তা হুম?
আকাশঃ না বেবির আম্মুর চিন্তাও। এইবার এসো তো , ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
মেঘাঃ ঠাণ্ডা লাগবে না, একটু ভিজি না প্লিজ ?
আকাশঃ হুম কিন্তু বেবির ঠাণ্ডা লাগলে বেবির আম্মুকে বকা দেওয়া হবে।
মেঘাঃ বেবির আম্মুকে বকা দিলে বেবিও কষ্ট পাবে কিন্তু হি হি হি।
কথায় কথায় অনেক ভিজেছ এইবার এসো তো বলে আকাশ মেঘার হাতটা ধরে ঘরে নিয়ে আসে। তাওয়েল দিয়ে বৃষ্টির পানি মুছিয়ে দেয় আকাশ।
মেঘা আকাশের স্বপ্ন পরী । আরেকটা ছোট্ট পরীর জন্য অপেক্ষা করছে তারা। সেই ছোট্ট পরীকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাদের ।
প্রতিরাতে আকাশের কাছে ছোট্ট পরীর গল্প না শুনলে মেঘার ঘুম আসে না। আকাশও তার স্বপ্নের পরীকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ছোট্ট পরীর গল্প বলে যায়, পরীর ছুলগুলো আমরা কাটব না। যখন এক বছর হবে পরীর ছুলগুলো বড় বড় হবে। দুইটা বেনি করে তাতে লাল ফিতা বেঁধে দিবে তুমি। পরী বাবার হাত ধরে দুইটা বেনি দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটবে । আর পরী জানবে এই দুইটা বেনি দুলিয়ে হাঁটা পরীর বাবার খুব পছন্দ। পরীর গল্প শুনতে শুনতে মেঘা ঘুমিয়ে যায়…..

আকাশ আর মেঘার পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়। মেঘাকে প্রথম দেখেই প্রেমে পড়ে যায় আকাশ। আকাশের ইচ্ছা ছিল বিয়ের আগে প্রেম করবে কিন্তু সে সুযোগটা আর পায় না। খুব তাড়াতাড়িই ওদের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে যায় আর পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়ে যায়। তবে বিয়ের পর আকাশ আর মেঘা চুটিয়ে প্রেম করেছে। বিয়ের দিন থেকেই তাদের সেই প্রেম যাত্রা শুরু। বউ সাজে মেঘাকে যখন আকাশের পাশে বসানো হল আকাশ মেঘার দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিলো অনেক সুন্দর লাগছে তোমায়। আর মেঘাও মিষ্টি হেসে বুঝিয়ে দিলো তোমার চোখের ভাষা আমি বুঝতে পেরেছি।
বিয়ের পরের দিনের সকালটার কথা না বললেই নয়। সকালে এম ডি স্যার ফোন করে বললেন জরুরী মিটিং , অফিসে আসতে হবে। আকাশও অফিসে হাজির হল তবে বউ ওরফে প্রেমিকাকে সাথে নিয়ে। বন্ধু কলিগ হাসান বলল কিরে এভাবে ভাবীকে নিয়ে? আকাশ তখন বলল, কি করব বউকে তো ছেড়ে আসতে মন চাইল না। আর এম ডি স্যার যদি বিয়ের পরের দিন আমাকে অফিসে আনতে পারেন তাহলে আমি বউকে সাথে আনতে পারি না? সেইদিন খুব অদ্ভুত আর আশ্চর্য শোনালেও কনফারেন্স রুমে আকাশের পাশে বসে ছিল মেঘা। আর মিটিং ? সবাই মিটিং ফেলে ওদের অভ্যর্থনা জানাতেই ব্যস্ত ছিল সেদিন।
গুটি গুটি পায়ে ওদের প্রেমের মানে বিয়ের বয়স যখন প্রায় এক বছর তখন মেঘা আকাশকে দিল তাদের কাঙ্খিত খুশির খবরটা । মেঘার মাঝে বড় হতে থাকে তাদের কাঙ্খিত স্বপ্ন । ছয় মাস পর যখন জানতে পারে তাদের ঘর আলো করে ছোট্ট একটা পরি আসছে আকাশের বাবা হওয়ার আনন্দ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সেইদিন থেকেই আকাশের দায়িত্ব পড়ে প্রতি রাতে ছোট্ট পরির গল্প বলার…….

প্রতিটা দিন মেঘার ছোট্ট পরীর প্রতীক্ষায় পার হচ্ছে। সকাল হলেই আকাশ অফিসে চলে যায়। অফিস থেকে যে সারাদিনে কতবার ফোন দিয়ে মেঘার খোঁজ নেয় তার হিসাব নেই। আর মেঘার সারাদিন কাটে গান শুনে , গল্পের বই পরে আর ছোট্ট পরীর সাথে কথা বলে। আর হ্যাঁ আকাশের ছবি দেখে। মেঘা চাই তার পরীটা যেন আকাশের মতই হয়। মা বলেছেন, বাবার ছবি দেখলে সন্তান বাবার মত হয়। আর তাইতো বেডের সামনের ওয়ালে আকাশের বড় একটা ছবি টাঙিয়েছে মেঘা। আকাশ মেঘার এইসব কাণ্ড দেখে আর হাসে । আকাশ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে দেখে মেঘার ভারী শরীরটা নিয়ে হেঁটে বেড়ান । অফিস ছাড়া আকাশের বাকি সময়টা মেঘা আর ছোট্ট পরীর জন্য। বাসায় ফিরে রাত্রে বেলা আকাশ নিজের হাতে মেঘাকে খাওয়ায় দেয়। ছোট্ট পরীর সাথে অনেক গল্প করে আর কান পেতে পরীর হৃদ স্পন্দন শুনে…..

যতই দিন যাচ্ছে মেঘা অস্থির হয়ে যাচ্ছে কবে সে তার পরীকে দু হাতে জড়িয়ে বুকে নিতে পারবে। মেঘা কয়েকদিন থেকেই আকাশের কাছে বায়না ধরেছে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিন্তু কাজের ব্যস্ততাই আকাশ সময়ই করে উঠতে পারছে না। মেঘা বিছানায় হেলান দিয়ে একটা বই পরছিল নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল । মেঘা আস্তে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে আকাশ। আকাশঃ আজ তোমাকে নিয়ে বাইরে যাব চল ।
মেঘাঃ সময় হল তোমার ?
আকাশঃ হুম আজ অফিসে কাজের চাপ কম।
মেঘাঃ কাজের চাপ কম তাই তাড়াতাড়ি এসেছ বুঝি?
আকাশঃ না না আমার লক্ষ্মী বউটার আব্দার রাখতে এসেছি।
মেঘাঃ তাহলে বললে যে কাজের চাপ কম।
আকাশঃ ভুল হয়েছে এই কান ধরছি।
মেঘাঃ না কান ধরলে হবে না। শাস্তি হবে।
আকাশঃ তা কি শাস্তি ?
মেঘাঃ আমাকে তুমি নিজের হাতে সাজিয়ে দিবে।
আকাশঃ এটা তো আমার জন্য শাস্তি না উপহার। (হেসে বলল আকাশ)
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে মেঘাকে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিল আকাশ ।
মেঘা বলল, ভাবছি এখন থেকে এই শাস্তি টা তোমার জন্য বরাদ্দ করে দিব । আকাশ হাসতে হাসতে বলল, যখনি তুমি আমাকে এই শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নিব। দুই জন হাসতে হাসতে বাইরে বেরিয়ে পড়ে । আজ ওরা লং ড্রাইভ এ যাবে। পথে আকাশ আর মেঘার খুনসুটি চলতে থাকে ছোট্ট পরী কাকে বেশী ভালবাসবে এই নিয়ে। আকাশ বলে, পরী বাবাকে বেশী ভালবাসবে। বাবার বুক হবে পরীর খেলার জায়গা। বাবা পরীকে সবসময় বুকে আগলিয়ে রাখবে। মেঘা বলে, না পরী মাকে বেশী ভালবাসবে। মায়ের আঁচলে মুখ না ঢাকলে পরীর ঘুমই আসবে না। আচ্ছা দেখা যাবে বলে সামনে তাকাতেই আর কিছুই দেখার সুযোগ পায় না …..

মেঘার দুই চোখ ভেঙ্গে ঘুম আসছে। তন্দ্রার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘা। মেঘা প্রান পণ চেষ্টা করছে চোখ দুটি মেলে রাখার, সে যে তার পরীর প্রথম আওয়াজ শুনতে চায়। কিন্তু মেঘা পারল না। অন্ধকারে তলিয়ে জেতে জেতে সে এসে পৌঁছাল একটা সবুজ বিস্তৃত মাঠে । একটা ডানা কাটা সাদা জামা পরা মেয়ে ঠিক যেন ছোট্ট পরী দৌড়ে মেঘার কাছে আসল । মেঘা বলল, কে তুমি? কোথায় থেকে এসেছ? মেয়েটি মেঘাকে দেখিয়ে বলল এইখান থেকে এসেছি আর আকাশের দিকে দেখিয়ে বলল ওইখানে চলে যাব ।
মেঘা গভীর রাতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশে ভেসে বেড়ায় কয়েক খণ্ড মেঘ আর উজ্জ্বল হয়ে থাকে কিছু তারা । মেঘা বলে উঠে , পরী তুই মাকে একলা ফেলে বাবার বুকে তারা হয়ে বেশ আছিস তাই না? মেঘা অঝরে কাঁদতে থাকে হঠাৎ যেন পরী এসে কানে বলে যায়, মা তোমাকে ছাড়া কি আমরা ভাল থাকতে পারি? ওই দেখ না মা মেঘের আঁচল হয়ে তুমি আমাদের কেমন করে ঢেকে রেখেছ…..

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত