অনন্ত আঁধারে

অনন্ত আঁধারে

আমি কখনও চাইনি রং তুলিতে তোমাকে ফুটিয়ে তুলতে। তুমি ছিলে আমার কল্পনায়, আমার! একান্ত আমার হয়ে। দেখেনি কখনও কেউ তোমার নীরব হাসি, ভেজা এলো চুল,

পায়নি তোমার স্পর্শ।

আমি! শুধু আমার ছিল তোমাকে ছুঁয়ে দেখার অধিকার। অপলক, অনন্ত সময় তোমার চোখের পানে তাকিয়ে থাকার।

একটু একটু করে কল্পনা, আমি বাস্তবে রুপ দিয়েছি তোমায়, আমার তুলির আঁচড়ে, কখনও হেসেছ তুমি, কখনও অভিমানে চোখ জলে ভিজেছে। তোমার চোখের ভাষা পড়ে

কতবার আমার হৃদয়ে অজানা আশংকা দানা বেঁধেছে। ভয় হত যদি তুমি চলে যাও স্বাধীনতা পেলে।

তাই আমি বন্দী করে রেখেছিলাম তোমায় আমার কল্পনার ক্যানভাসে। যতবারই তোমায় বাস্তব চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছি, আমি বিস্মিত হয়ে দেখেছি তোমার অস্থিরতা। যেন হতে চাও

তুমি কারো রমণী! চাই কারো সত্যিকারের স্পর্শ, ভালবাসা।

আমি ভয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি ক্যানভাস। আবার তোমায় সৃষ্টি করেছি।
সেই তোমাকে। সেই তুমি, অস্থির চাহনী, অনুনয় মুক্তির।

আমি তোমায় কি করে মুক্ত করি? তোমাকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছি এক নির্জন দুপুরে, যেদিন আমি ছিলাম বড় একা! না পাওয়ার বেদনা, হতাশা, ঘৃণা, অসচ্ছলতা, অসফলতার

ভয় আঁকড়ে ধরেছিল আমায়।

মুক্তি দিয়েছিলে তুমি। যেই মুহুর্তে তোমাকে প্রথম ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলাম এক আলো আঁধারির মায়ায়, আমার সমস্ত কষ্ট যেন তুমি শুষে নিয়েছিলে। আমি পরম নির্ভরতায়

মাথা রেখেছিলাম তোমার শাড়ির আচলে। আমার একলা বর্ষার, জোছনার রাতগুলো কাটত তোমার সাথে কথা বলে। ফজর হয়ে যেত, বর্ষা থেমে যেত, শীত পেরিয়ে বসন্ত আসত,

থামতনা আমাদের ভালবাসার টুকটুক কথা। তোমার কথা শুনে কখনও আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠতাম, কখনও নীরবে চোখের জল গড়িয়ে পড়ত। কখনও আমার কথা শুনে

তোমার।

প্রতিবার তোমাকে ধ্বংস করার সময়, আমার হৃদয় ভেঙে যেত তোমার ছলছল চোখ দেখে।

আমি শুধু জানতে চাইতাম, নিশ্চিত হতে চাইতাম, আমার হয়েই থাকবে তো?
শুধু আমার?

বল, অন্য কেউ তোমার ছোঁয়া, দেখা কখনও পাবে না!
তুমি নীরব হয়ে যেতে, আনমনে ভেবে কিছু বলতে যেয়েও থেমে যেতে।

কিন্তু সেদিন বললেঃ আমি তোমার বাস্তব কল্পনা, চিত্রকর! তুমি আমাকে কখনো সৃষ্টি করোনি। তোমার এই ক্যানভাস সাদা, আমি কখনোই তোমার ছিলাম না, হতে পারি না।

আমার এত জেদ হচ্ছিল! এত যে, আমি রংতুলির শেষ আঁচড় দিয়ে তোমায় মুক্ত করে দিলাম।

তুমি ক্যানভাস ছেড়ে এই বাস্তবতায় এলে। যেন কিছুক্ষণ বিশ্বাস করতে পারছিলেনা আমি মুক্ত করে দিয়েছি তোমায়। তুমি স্পর্শ করে দেখছিলে তোমার হাত, কালো চুল, নীল

শাড়ি। বিশ্বাস করতে পারছিলেনা একজন চিত্রশিল্পী তার ভালবাসা, তার সমস্ত অনুপ্রেরণা, তার কল্পনাকে এভাবে মুক্ত করে দিবে।

আমি দিয়েছি, দিয়ে প্রমাণ করেছি তুমি শুধুই আমার কল্পনা নও।

আমি তোমার সাথে একই ছাদের নীচে বসবাস শুরু করলাম। তোমাকে পেয়ে ভুলে গেলাম, নিজের অস্তিত্ব। আমার সবকিছু তোমাতে বিসর্জন করে দিয়েছিলাম।

তবুও ভর দুপুরে, গভীর রাতে তুমি আনমনা হয়ে কি যেন ভাবতে।

একদিন বললে, পারবে শেখাতে আমাকে কিভাবে রাতের হাহাকারকে রং তুলিতে ফুটিয়ে তোলা যায়?

তোমার বলাতে এমন কিছু ছিল, আমি অগ্রাহ্য করতে পারিনি। শিখিয়েছি কিভাবে হাহাকার, ভালবাসা, মায়াকে তুলি দিয়ে অনুদিত করতে হয়।

তুমি আঁকতে এক অন্য ভুবনের ছবি। যেটা আমার অপরিচিত, অচেনা, অজানা। আমি অবাক বিস্ময়ে তোমার আঁকা কল্পনার জগত দেখতাম। চমৎকার! আমি বাকরুদ্ধ!

এক দুপুরে ঘরে ফিরে তোমার অস্থিরতা প্রথম চোখে পড়ল। সেইদিন কি এঁকেছ জানতে চাওয়া মাত্র তুমি চমকে উঠলে!

ব্যস্ত হয়ে মলিন হেসে বললে, কই নাতো?
যেন কিছু লুকোচ্ছ।
মনের মাঝে সেই পুরানো,

তোমায় হারানোর ভয় দুরুদুরু করে উঠল, আমি পাত্তা দিলাম না! আমি ছাড়া আর কে আছে তোমার?

তবুও সমস্ত ক্যানভাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। আবছা কারো অবয়ব কি ফুটে উঠছে?

নাহ! এ তো শুধু ভিন্ন এক জীবন ও জীবিকার গল্প।

এর পরের কিছুদিন আমি রাতে ঘুমিয়ে পড়লে, তুমি একাএকা চুপিচুপি ছবি আঁকার ঘরে যেতে।

আমি আড়াল থেকে দেখেতাম, তুমি হাতে একটা তুলি নিয়ে চুপচাপ বসে আছ। ভাবছ, ইতঃস্তত কি যেন! কিসের এত হাহাকার তোমার?

জানা হলনা।

একরাতে ছবি আকার ঘর হতে তোমার ফিরতে বেশ দেরী হচ্ছিল বলে, আমি আলতো করে দরজা ফাঁক করলাম। একী!

তুমি নেই! শূন্য সবকিছু।

একটা ক্যানভাসে দুই একটা তুলির আঁচড় ছাড়া, কিছুই নেই। তোমার আঁকা সবগুলো চিত্রের ক্যানভাস সাদা!

ওহ না!

এটা হতে পারে না। তুমি এভাবে আমাকে একা করে চলে যেতে পার না!

বলতেই হবে, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কার ছবি আঁকতে? কিসের ছবি আঁকতে?

সে কি আমার চেয়েও তোমায় ভালবাসে? ভালবেসে হাত ধরে, চুলে মুখ গুঁজে জোছনা, বরষা, আর অনন্ত হাহাকারের গান শোনায়?

এটুকু বলে যাও তুমি কি ফিরে গিয়েছ তোমার জগতে, নাকি এই পৃথিবীর কোন নগরে অথবা মফস্বলে বেঁধেছ নীড়? এমন কোথাও, যেখানে আমি পাবনা খুঁজে?

======
চিত্রকর কাঁধে ক্যানভাস ঝুলিয়ে, অজানার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে, যেখানে মিলবে কল্পনার দেখা।

সময় ফুরিয়ে চলে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, কখনও চোখের, কখনও বর্ষার জলে।

এই পৃথিবীর সব মানবীর মাঝেই যেন তাকে খুঁজে পায় পথিক, তবুও শেষ একবার দেখার বাসনায় হেটে চলে অনন্ত আঁধারের পথ ধরে।

শুধু একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিল।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত