সবাই স্বার্থপর না

সবাই স্বার্থপর না

:-নীলু?
:-হু
:-আমি আজ রাতে বাসায় যাবো।
নীলু আমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।আসলে ও বোঝার চেষ্টা করছে আমি যা বলছি তা সত্যি নাকি ফান।
:-তুমি ভেবে বলছোতো?(নীলু)
:-হ্যাঁ।(আমি)
:-ফিরবে কবে?
:-কাল শরশু কিংবা তরশু?
আমার কথা শুনে নিলু মুখ বাকিয়ে বললো
:-তরশু কী?
:-তরশুটা হলো —জানিনা।
নীলু আবার আমার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো।এই চাহনির মাঝে অভিমানের পরিমাণটাই বেশি।
:-নীলু তোমায় একবার জরিয়ে ধরি?
নীলু মুখ বাকিয়ে বললো
:-আজ হঠাৎ এত রোমান্টিক মুড কোথা থেকে আসলো শুনি?
:-তোমার সাথে দেখা করতে আসার পথে একটা চায়ের দোকানে বসেছিলাম।তখন সেখানকার টিভিতে দেখে শিখে নিয়েছি।ভেবেছি আজ আমিও তোমায় একবার জরিয়ে ধরবো।
আমার কথা শুনে নীলু খিলখিল করে হাসতে শুরু করলো।অদ্ভুদ এক হাসি।আমি এই হাসি দেখেই নীলুর প্রেমে পড়েছিলাম।ভবিষ্যতেও পড়তে হবে।
:-আজ তুমি কিছু খেয়ে আসোনিতো?(নীলু)
:-এটা কেনো মনে হলো তোমার?(আমি)
:-যেই ছেলে ২ বছরের রিলেশনে একটাবার আমার হাত ধরার সাহস পেলোনা সে বলছে কীনা আমায় জরিয়ে ধরবে?এটা পাগলেও বিশ্বাস করবেনা।
আমি নীলুকে অবাক করে দিয়ে বসে থাকা অবস্থাই ওকে জরিয়ে ধরলাম।ও অনেক বেশি অবাক হলো আমার এই কান্ড দেখে।অবশ্য আমি নিজেও অনেক অবাক হয়েছি।কারণ এর আগে কখনো নীলুর হাত পর্যন্ত স্পর্শ করিনি আমি।
:-সবাই তাকিয়ে আছে ছাড়ো।
আমি নীলুর কথাতে ওকে ছেড়ে দিলাম।
:-অনেকক্ষণ এসেছি এখন বাসায় ফিরতে হবে।(নীলু)
:-আরেকটু সময় থাকি?(আমি)
:-আজ আর না।
:-হুম।
:-রাগ করোনা প্লিজ। তুমিতো জানোই পরিবার থেকে আমাকে কতটা চাপে রাখে।
:-হুম।
:-প্লিজ চলো।
:-হুম।
নীলু আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার গালে একটা আদর দিয়ে দিলো।
:-এবার হলো?(নীলু)
:-হয়েছে।(আমি)
:-এখন মেসে ফিরে সবকিছু ঠিকঠাক মত ব্যাগে ভরবে।তারপর আমাকে মিস দিবে।এখন আমাকে রিক্সায় তুলে দাও।আর তুমি নাকি বাসায় যাবে তোমার ট্রেনের টাইম হয়ে যাচ্ছে।
:-হুম চলো।
আমি আর নীলু পার্কের ভেতর থেকে ওঠে চলে আসলাম।রাস্তায় এসে নীলুকে একটা রিক্সায় তুলে দিলাম।আমার মেস উল্টো দিকে তাই চাইলেও নীলুর সাথে এক রিক্সায় যাওয়া হয়না কখনো।আমি উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।সন্ধা হতে এখনো অনেকটাই দেরী।

আমি হুসাইন।পেশায় একজন শিক্ষিত বেকার।মেয়েটির নাম নীলিমা।আমি ছোট করে নীলু ডাকি।মাএ অনার্স ফাষ্ট ইয়ারে পড়ে।আমার কেনো জানি মনে হয় নীলু নামটার মধ্যে অনেক ভালোবাসা জরিয়ে আছে। এই কথাটা নীলুকে একবার বলেছিলাম,ও শুনে হাসতে হাসতে শেষ।
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তাতে চোখ বুলালাম।২শত টাকা ৪টা নোট পড়ে আছে।সপ্তাহ খানেক আগে নীলু টাকাগুলো দিয়েছিলো।মেয়েটার কাছে অনেক ঋনী হয়ে গেছি আমি।এই ২বছরে কতগুলো টাকা নিয়েছি আমি তার হিসেব নেই।শুধু আমি নিয়েছি বললে ভুল হবে নীলু জোর করে দেয়।মেয়েটার অদ্ভুত একটা গুণ আছে,কেমন করে জানি বুঝে যায় আমার পকেটে টাকা নেই।এরপর নানারকম বাহানা বানিয়ে আমার মানিব্যাগে টাকা ঢুকিয়ে দিবে।
আমি বলতে গেলে এতিম।আবার এতিম না।যাদের ছোটবেলা থেকে বাবা মা কেউ থাকেনা তাদের মানুষ এতিম বলে।আর যাদের বাবা মা জন্নের পর মারা যায় তাদের কী বলে সেটা আমার ঠিল জানা নেই।আম্মু আমাকে ছেড়ে গেছে ছোটবেলায়।বছর ছয়েক হলো আব্বুও চলে গেছে।এখন আপন বলতে একটা বড় ভাই আছে।তার নিজের সংসারও আছে।আমার আব্বু তেমন একটা ধনী ছিলেন না।বড় ভাই পড়ালেখা করেনি।মাঠে কাজ করে যতটুকু রোজগার করে ততটুকু দিয়ে তার সংসারই ঠিকমত চলেনা,সেখানে যদি আমি বসে বসে খাই সেটা খুব খারাপ দেখাই।তাই অনার্স লাইফ থেকেই বাইরে থাকা।কয়েকটা টিনশনি করাই।যা টাকা পাই নিজের ভালোভাবে চলে যায়।অবশ্য এখন চলেনা।কারণ প্রতিদিন চাকরীর ফরম তুলতে তুলতে টাকা শেষ হয়ে যায় তবুও চাকরী হয়না।

মেসে এসে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম।সবকিছু বলতে ১টা বই আর কিছু জামাকাপড়। বাসায় গিয়ে শুধুমাএ একটারাত থাকার ইচ্ছে আছে।বেশিদিন থাকলে বড় ভাইয়ের সংসারে টানাপোড়া লেগে যেতে পারে।আমার ভাবি মানুষটা খুব ভালো।বাসায় গেলে খুব আদর করে।মাঝে মাঝে তার আদর দেখে মনে হয় আমার আম্মা ভাবির রুপে ফিরে এসেছে।ইচ্ছা করে তাদের সাথে থাকতে কিন্তু সম্ভব হয়ে ওঠেনা।ফোনের শব্দে সব ধ্যান ধারণা ভেঙ্গে গেলো।ফোনে স্কিনে নীলু নামটা ভেসে আছে।তাড়াতাড়ি ফোন রিচিভ করলাম
:-ওই কোথায়য় তুমি?তোমাকে বললাম মেসে গিয়ে ফোন দিবে দাওনি কেনো?(নীলু)
:-তুমি বলেছিলে মেসে গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে তারপর ফোন দিতে।আমিতো তাই করছিলাম।(আমি)
:-ওই তুমি এত বেশি বুঝো কেনো হু।
:-তুমি বুঝাও তাই।
:-হয়েছে আর যুক্তি দেওয়া লাগবেনা।সবকিছু ঠিকঠাক মত গুছিয়েছো?
:-হ্যাঁ।
:-গুড বয়।এখন সাবধানে স্টেশন এ যাবে।তারপর ট্রেনে ওঠার আগে আমাকে একবার ফোন দিবে।এরপর বাসসয় পৌছে একবার ফোন দিবে।মনে থাকবে?
:-থাকবে।
:-দেখা যাবে কত মনে থাকে।
:-ওই আমার স্মৃতি এত নড়বড়ে না।সবকিছু ভালোই মনে থাকে।
:-সেটাতো আজ ২বছর ধরে দেখতেই পাচ্ছি।
:-কী দেখছো?
:-থাক এখন আর এত কথা বলে সময় নষ্ট করতে হবেনা। রেডি হয়ে স্টেশনে যাও।
:-হুম।
:-আবার হুম?
:-হুম।
:-আবার?
:-হুম।
:-ওই আরেকবার হুম বললে খুন করে ফেলবো।
:-হুম।
:-ধ্যাত আর কথাই বলবোনা কোনদিন তোমার সাথে।
:-এই শুনো?
:-হুম।
:-শুনোনা।
:-হুম।
:-ভালোবাসি।
:-আমিও।
:-কী?
:-হুম।
:-আমাকে বেরোতে হবে।
:-সাবধানে যেও।লাভিউ।
:-লাভিউ টু।
আমি ফোন রেখে আবার ব্যাগ চেক করে নিলাম সবকিছু ঠিকঠাক মত নিয়েছি কিনা।না সবকিছু ঠিকঠাক মতই নিয়েছি।রুমমেটদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম ট্রেশনের পথে।
স্টেশনে গিয়ে দেখি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে।ইশ আরেকটু দেরী করলেই ট্রেনটা মিস করলাম।তাড়াতাড়ি ট্রেনে ওঠে পড়লাম।ট্রেনে ওঠে নীলুকে ফোন দিলাম।ওর ফোন বন্ধ।আবারো ফোন দিলাম।এবারে বন্ধ।হয়তো ফোন চার্জ নেই।ট্রেনে আজ অনেক ভিড় তাই বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছি।যতজন বসে আছে তার থেকে বেশিলোক দাঁড়িয়েই আছে।আমার বাসা বেশি দুরে নয়।মাএ ২ ঘন্টার পথ।আমার কেনো জানি বাসের চড়লে খুব বিরক্ত লাগে তাই ট্রেনে যাওয়া আসা করি।

২ঘন্টা জার্নির পর বাসায় এসে পৌঁছালাম।বড় ভাইয়ের ছেলে দৌঁড়ে এসে আমার কোলে ওঠলো।বয়স বেশি না,মাএ ৫ বছর।আমি বাসায় আসালে চাচু চাচু করে পাগল করে দেয়।ভাবিও এগিয়ে আসলো আমাকে দেখে।ভাইয়াকে দেখছিনা সম্ভবত বাজারে গিয়েছে।
:-কেমন আছো ভাবি?(আমি)
:-আল্লাহ ভালোই রাখছে।তোমার কী অবস্থা?(ভাবি)
:-আর অবস্থা।সেই কবে থেকে চাকরির চেষ্টা করছি, চাকরির কোনো নাম গন্ধই নেই।
:-এত ভেঙ্গে পড়লে চলবেনা।আল্লাহর উপর ভরসা রাখো হবে।
:-ভাইয়া কোথায়?
:-বাজারে গিয়েছে।
:-ভাবি খাওয়ার মত কিছু ঘরে আছে?খুব ক্ষিদে পেয়েছে।
:-হাতমুখ ধুরে রুমে বসো আমি মুড়ি আর নাড়ু দিচ্ছি।
ভাবি একসময় আমার ক্লাসমেট ছিলো তাই আমাকে তুমি করে বলে।আমি ভাতিজাকে কোলে নিয়ে আমার রুমে ঢুকলাম।আমার রুমটা আগে থেকেই গুছানো।আমি প্রতিবার বাসা থেকে যাওয়ার পর ভাবি গুছিয়ে রাখে।ভাতিজাকে বিছানায় বসিয়ে রেখে আমি ফ্রেশ হয়ে নিলাম।

রাতে নীলুকে আবার ফোন দিলাম।এবারো ওর ফোন অফ।আগেরবার ফোন অফ পেয়ে কোনো টেনশন হয়নি তবে এবার হচ্ছে।কারণ নীলুর ফোন কখনো এত সময় অফ থাকেনা।রাতে আরো কয়েকবার চেষ্টা করলাম প্রতিবারই ফলাফল শুন্য।রাতে তেমন একটা ঘুম হলোনা।
সকাল ৮টার দিকে নীলুর ফোন অন পেলাম।কয়েকবার ফোন দিলাম কিন্তু ওোশ থেকে রিচিভ হলোনা।কেনো জানি খুব টেনশন হচ্ছে।নিলুর কোনো সমস্যা হয়নিতো?
না আমাকে আজই মেসো ফিরতে হবে।ভাবিকে বললাম আমি চলে যাবো। ভাবি বললো রাতে সন্ধায় যেতে তাই সন্ধায়ই যেতে রাজি হলাম।

রাত ৮:৫০
আমি এখন নীলুদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।নীলুদের বাসা অনেক সুন্দর করে সাঁজানো।মনে হয়ে কারো বিয়ে।গেটের একদম কাছাকাছি যেতেই দেখলাম হ্যাঁ আমি ঠিকই ধরেছি বিয়ে বাড়ি।নীলুকে ফোন দিলাম কিন্তু ধরছেনা।সেই সকাল থেকে সারাদিনে কম করে নীলুকে ২০০ বার ফোন দিয়েছি কিন্তু একবারো ধরেনি।শুধু রিং বেজেই যাচ্ছে বেজেই যাচ্ছে।তবে নীলুদের বাসায় এসে আরেকটা জিনিস মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।কার বিয়ে হচ্ছে?
পেছন থেকে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকালাম।শাড়ি পরিহিত একটা মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।চোখে কাজল দেওয়া,কপালে ছোট্র একটা টিপ,খোলা চুল।আমার মুখ দিয়ে আমার অজান্তেই বের হয়ে গেলো অপুর্ব।
:-ওই এখানে কেনো এসেছো তুমি?(নীলু)
:-আগে বলো তুমি ফোন ধরছোনা কেনো?(আমি)
:-একটু বিজি ছিলাম তাই।আলেয়া আপুর বিয়ে।কনে সাঁজানো এটা ওটা সবকিছু আমাকেই করতে হচ্ছে।
:-তাই বলে একটাবার কথা বলার সময় পাওনি আমার সাথে?
:-দু চারদিন কথা না বললে কোনো সমস্যা হয়না।
আমি নীলুর কথা শুনে খুব অবাক হলাম।আজ নীলুর কথা বলার ধরণ পাল্টে গেছে।আমি একটু দেরীতে ফোন ধরলে যেই মেয়ে অভিমান করে বসে থাকতো আর আজ সেই মেয়েই বলছে দু চারদিন কথা না বললে সমস্যা নেই।খুব অবাক করা ব্যাপার।
:-তুমি এখান থেকে চলে যাও।কেউ দেখে ফেললে সমস্যা হতে পারে।আমি সময় পেলে পরে ফোন দিবো(নীলু)
:-তুমি অনেক পাল্টে গেছো এই ২দিনে।(আমি)
:-আমি মোটেও পাল্টে যায়নি।এখন যাও পরে ফোন কথা হবে।
নীলু এক প্রকার জোর করে আমাকে মেসে পাঠিয়ে দিলো।নীলুর ব্যবহারে খুব বেশি অবাক হয়েছি।এর আগে যতবার বাসায় গিয়েছি প্রতিবারই বাসা থেকে আসার পর আমাকে নীলুর অভিমান ভাঙ্গাতে হতো আর আজ অভিমানতো করেইনি উল্টো আমাকে তাঁড়িয়ে দিলো।

সারারাত অপেক্ষা করলাম নীলুর ফোনের আশায় কিন্তু নীলু ফোন করেনি।আমিও ফোন দেয়নি।কারণ যেই মানুষটা নিজে থেকেই ফোন দিতে চেয়েছে তাকে উল্টো আমি ফোন দিলে বিষয়টা একটু খারাপ দেখায়।সকাল হতেই নীলুকে আবার ফোন দিলাম।দুবার রিং হবার পর ধরলো
:-এত সকালে ফোন দিয়েছো কেনো?(নীলু)
:-তুমিতো রাতে ফোন দিলেনা?(আমি)
:-সময় পায়নি।
:-এত বিজি থাকো তুমি?আচ্ছা আমায় বলবে তোমার এত ব্যস্ততা কিসে?
:-দেখো হুসাইন সারারাত ঘুম হয়নি এখন একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও।
:-সরি বিরক্ত করার জন্য।আপনি বিরক্ত হবেনা জানলে ফোন দিতাম না।
ফোন রেখে দিলাম।কেনো জানি খুব কষ্ট হচ্ছে।আসলে প্রিয় মানুষটার অবহেলা কেউই সহ্য করতে পারেনা।আমি বুঝে গেছি নীলু কেমন আমাকে অবহেলা করছে।ও আমাকে চাইনা।এর আগেও এমন একটা কাহিনী আমার জীবনে ঘটে গেছে তাই কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি নীলুর অবহেলার কারণ।তবে নীলু আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমার বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে যাবে।একটা মানুষ একবারই বড় ধরণের আঘাত সহ্য করতে পারে দ্বিতীয়বার পারেনা।
এসব ভাবছি এমন সময় নীলুর ফোন
:-বিকেলে পার্কে এসো জরুরী কিছু কথা আছে।(নীলু)
:-থাক পার্কে দেখা করার প্রয়োজন নেই।যা বলার ফোনেই সরাসরি বলো।(আমি)
:-আসলে আমি কথাগুলো কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা।
:-বলো সমস্যা নেই।
:-আমি আর এই রিলেশনে আগাতে চাইনা।
:-জানতাম এটাই বলবে।একটা কথা জিঙ্গেস করবো?
:-হ্যা।
:-আমাকে ছেড়ে যাচ্ছো কেনো?
:-আমার ফ্যামিলি এই সম্পর্ক মানবেনা।আমি তোমাকে কষ্ট দিতো চাইনা তাই আগে থেকেই সম্পর্কটা শেষ করে দিতে চাই।
:-থাক আর মিথ্যা অভিনয় করোনা।আমাকে আর তোমার ভালো লাগেনা বললেই হয়।
:-তুমি যা ভাবছো আসলে তা না।
:-তোমার সাথে সম্পর্ক শুরুর আগেই বলেছিলাম আমাকে প্লিজ ঠকিও না।সেটাই করলে।কী ক্ষতি করেছিলাম আমি তোমার?
:-দেখো বাজে কথা বলবেনা।তুমি অনেক ভালো ছেলে।আমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে পাবে।এসব ভেবে সময় নষ্ট না করে ভালো করে পড়াশুনা করো।
:-ভালো থেকো।আর কখনো বিরক্ত করবোনা তোমায়।
ফোন রেখে দিলাম।আর কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা।নীলু আমার সাথে এমন করবে ভাবিনি।অনেকটা বেশি বিশ্বাস করেছিলাম নীলুকে।আমি নীলুর জীবনে আসিনি, নীলুই আমার জীবনে এসেছিলো।
আজ সাথীর কথা খুব মনে পড়ছে।আপনারা ভাবছেন আবার সাথী কে?সাথী আমার প্রথম ভালোবাসা ছিলো।সাথীও ঠিক নীলুর মত যাওয়ার আগে বলেছিলো আমি ওর থেকে ভালো পেয়ে পাবো।হ্যা পেয়েছিলাম।খুব ভালো মেয়েই পেয়েছিলাম।যেই মেয়েও আমাকে ঠিক সাথীর মতই কষ্ট দিলো।আসলে বেশিরভাগ মেয়েরাই যে স্বার্থপর হয় সেটা সাথী আর নীলুর থেকেই বুঝতে পারলাম।

সাথীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল কলেজ থেকে।সেদিন ছিলো রবিবার। আমি ক্লাস রুমের দরজার সামনে আসতেই কয়েকটা মেয়ে পথ আটকালো।দেখে মনে হচ্ছে লেডি গুন্ডা।জিন্স আর টিশার্ট পরেছে সবাই।
:-আপনি আমার পথ আটকালেন কেনো?(আমি)
:-নাম কী তোমার?(মেয়েটি)
:-আমার নাম আপনাকে বলতে যাবো কেনো?
পাশ থেকে আরেকটা মেয়ে বললো
:-পোলাডার সাহস আছে বলতে হবে।
:-শুধু সাহস না দেখতে হ্যান্ডসামও বটে।
আমি কিছু না বলে আরেকটা দরজা দিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকলাম।সবগুলো বেন্চই পরিপুর্ণ পিছনের ৩ টা ছাড়া।আমি পিছন দিকের একটা বেন্চে বসে পড়লাম।মেয়েগুলো আমার সোজাসুজি মেয়েদের সারিতে বসলো।মেয়েগুলোকে সুবিধের লাগছেনা।এই কলেজে তেমন কাউকে চিনিও না।
ক্লাস শেষে রুম থেকে বের হতেই মেয়েগুলো আবার আমার পথ আটকে দাঁড়ালো।
:-তুই তখন ভাব নিয়ে ক্লাসে চলে গেলি কেন?(মেয়েটি)
:-আপনার প্রশ্নের উওর দিতে আমি বাধ্য না।আমার পথ ছাড়ুন।(আমি)
:-পোলার ভাব দেখে বাঁচিনা।শোন আমরা হলাম এই কলেজের লিডার।আমাদের সম্মান করে চলবি নয়তো হাত পা ভেঙ্গে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিবো।কথাগুলো মাথায় ঢুকিয়ে রাখিস।
মেয়েগুলো চলে গেলো।কী মেয়েরে বাবা দিনে দুপুরে একটা ছেলেকে ভয় দেখালো।নিশ্চয় মাথায় কোনো গন্ডগোল আছে।

এরপর থেকে প্রায়ই মেয়েগুলো আমাকে বিরক্ত করতো।রিতিমত ইভটিজিং।এতদিন সবাই শুধু জানতো ছেলেরা মেয়েদের বিরক্ত করে কিন্তু এখন দেখছি মেয়েরাও ছেলেদের বিরক্ত করে।
সেদিন ছিলো কলেজের বড় ভাইদের বিদায় অনুষ্ঠান।আমি স্টেজের সামনে বসে অনুষ্ঠান দেখছি এমন সময় শাড়ি পরিহিত একটা মেয়ে আমার পাশের চেয়ারে এসে বসলো।হ্যাঁ মেয়েটাকে আমি চিনি।সেই গুন্ডী দলের সর্দার।আজ শাড়ি পড়াতে গুন্ডীটাকে দেখতে ভালোই লাগছে।
:-আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে আজ।(আমি)
:-কী?(মেয়েটি)
মেয়েটির তাকানো দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।মেয়েটির দিক থেকে চোক নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।জানিনা আজ কপালে কী আছে।
:-হি হি হি।তুমিতো দেখছি খুব বোকা।(মেয়েটি)
আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।আসলে কী এই সেই মেয়ে যে আমাকে ভয় দেখাতো?এই মেয়েই কী গুন্ডী দলের সর্দার।তার পরে আবার আমাকে তুমি করে বলছে।সবকিছু কেমন জানি রহস্যজনক লাগছে।
:-এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?(মেয়েটি)
:-আসলে বুঝার চেষ্টা করছি আপনি ঠিক আছেন কিনা।(আমি)
:-আমি ঠিকই আছি।ভাবলাম তোমার সাথে এতদিন যা করেছি অন্যয় করেছি।আমরা কী ভালো ফ্রেন্ড হতে পারি?
:-সত্যিই বলছেন নাকি অন্যকোনো মতলব আছে?
:-মোটেও না।আমি সিরিয়াসলি বলছি।
:-ভাবতে হবে।
:-ঠিক আছে ভেবে জানিও।তোমার ফোন নংটা দাও আমি রাতে ফোন দিবো।
:-০১৮৭৬৫৭—-
:-এখন আসি।ফ্রেন্ডরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
:-ওকে।
:-ও তোমার নামটাইতো জানা হয়নি?
:-হুসাইন।আপনার নাম?
:-সাথী।এখন আসছি তাহলে।
সাথী চলে গেলো।

এরপর থেকে সাথীর সাথে প্রতদিন রাতে ফোনে কথা হতো।আর কলেজ টাইমে ক্লাস শেষে আড্ডা।ভালোই চলছিলো আমাদের দিনগুলি।আমাদের ফ্রেন্ডশিপের ৩ মাসের মাথায় সাথী আমাকে প্রপোজ করে বসে।আমিও ৩মাসে সাথীকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম তাই না করতে পারিনি।
সাথীর সাথে রিলেশন ভালোই চলছিলো।মাঝে মাঝে ক্লাস ফাকি দিয়ে ঘুরতে যাওয়া।ফোনে কথা বলা।একসাথে হাতে হাত রাখে হাঁটা।সাথীর আসল চেহারা ধরা পরে ৬মাস পর।
আমি সেদিন টিউশনি থেকে ফিরলাম।সাথীকে একটা ছেলের সাথে খুব ঘনিষ্ট ভাবে যেতে দেখি।আমি এই বিষয়টা রাতে ফোন কথা বলার সময় সাথীর কাছে জিঙ্গেস করি ও বলে ওটা নাকি ওর মামাতো ভাই।আমি সেদিন কিছু বলিনি।
এরপর একদিন আরেকটা ছেলের সাথে রিক্সাতে দেখি।সেদিন তখনি ফোন দিই।
প্রথমবার ফোন কেটে দেয়।পরেরবার আবার ফোন দিলাম এবার রিচিভ করলো
:-কোথায় তুমি?(আমি)
:-এইতো আম্মুর সাথে মার্কেটে আসছি।কেনো?(সাথী)
:-না এমনি।
:-আচ্ছা তাহলে পরে কথা বলবো।
:-আচ্ছা
আমার কিছু বুঝতে বাকি নেই সাথী কেমন ধরছেন মেয়ে।আমি আরেকটা রিক্সা নিয়ে সাথীর পিছু নিলাম।
রিক্সা একটা পার্কের সামনে এসে থামলো।সাথী আর ছেলেটা পার্কের ভেতরে ঢুকলো।আমিও পিছু নিলাম ওদের।ভেরতে গিয়ে সাথী আর ছেলেটা একটা বেন্চে বসলো।আমিও গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ালাম।
সাথী আমাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে ওঠলো
:-এই তুমি মার্কেটে?(আমি)
:-না মানে
আমি সাথীর গালে কসে একটা থাপ্পর মারলাম।এরপর অনেক কথা শুনিয়ে চলে আসলাম।
কয়েকদিন মনে খারাপ থাকতো কিন্তু আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।কয়েকদিন পর সাথী ফিরে আসতে চায় কিন্তু অনেক অপমান করে তাড়িয়ে দিই ওকে।

পিছন থেকে কারো হাতের স্পর্শে চমকে ওঠলাম।একটু বেশিই চমকে গিয়েছি।পিছনে ঘুরে দেখি নীলু দাঁড়িয়ে আছে।আমার যখনি মন খারাপ থাকে তখন এই পার্কে এসে বসে থাকি।কিন্তু নীলু কিভাবে জানলো আমি এখানে?মনে হয় আমি কোন একদিন বলেছিলাম।
:-তুমি এখানে কিভাবে আসলে?(আমি)
:-কেনো আমি কী আসতে পারিনা?(নীলু)
:-আমিতো তোমাকে কখনো বলিনি আমি এখানে আছি।
:-এতদিন তোমার সাথে চললাম আর এটা বুঝবোনা তোমার মন খারাপ থাকলে তুমি কোথায় যাও?
:-তো আমার কাছে আসার কারণটা কী?
:-কিছু বলার ছিলো এই জন্য।
:-ও তাড়াতারি বলুন।আমার কাজ আছে।
:-তোমার সাথে রিলেশন হবার আগে আমার আরেকটা রিলেশন ছিলো।আমাদের রিলেশনটা মাএ ৩ মাসের ছিলো।কিন্তু তিন মাসেই অনেকটা কাছে চলে এসেছিলাম আমরা।এরপর হঠাৎ করে একদিন ছেলেটা ওধাও হয়ে যায়।আমি অনেক খুজেছিলাম ওকে কিন্তু পায়নি।অনেকগুলো মাস ওর জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু ও আর ফিরে আসেনি। এরপর তোমার সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয়।আস্তে আস্তে আগের রিলেশনের কথা ভুলে যায়।একসময় তোমার সাথে রিলশন গড়ে ওঠে।৩দিন আগে ও আবার ফিরে এসেছে।আমার কিছু পিক আছে ওর কাছে যেগুলো দুজন একসাথে ওঠা।সেগুলো দিয়েই ও আমাকে ব্লাকমেল করছে ওর কাছে ফিরে যাবার জন্য।আমি কী করবো বুঝতে পারছিনা।ও যদি পিকগুলো আমার বাবার কাছে দিয়ে দেয় তাহলে আমার লাইফটা থেমে যাবে।তাই ভাবলাম—
:-বুঝেছি আর বলতে হবেনা।ওকে আপনি ওকেই ভালোবাসেন।আমি চাইনা আমার জন্য কারো জীবন নষ্টহোক।
:-ওই একদম বেশি কথা বলবানা বলে দিলাম।আমার পুরো কথা আগে শুনবে তারপর কথা বলবে।
:-বলো।
:-কাল সারারাত ভাবলাম আমি যদি ওই ছেলের জীবনে ফিরে যায় তাহলে জীবনের সবথেকে বড় ভুলটা আমি করবো।কারণ যেই ছেলে অন্যের সুখের জন্য নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করতে পারে সে এই পৃথিবীর মহান মানুষদের একজন।আমি কী করে তাকে ছেড়ে যায় বলো।(চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছে)
:-তো আমি এখন কী করতে পারি?
:-ওই গাধা তুমি কী করবে যানোনা।
:-না।
নিশী আর কিছু না বলে আমার হাত ধরে টেনে পার্ক থেকে বাইরে নিয়ে আসলো।এরপর একটা রিক্সা ঠিক করে সোজা কাজি অফিস।

আমি আর নীলু আগের পার্কটাতেই আবার এসেছি।কিছুক্ষণ আগে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে।শাক্ষি হিসেবে নীলু ওর কয়েকজন ফ্রেন্ডকে ডেকেছিলো।
:-নীলু?(আমি)
:-হু।(নীলু)
:-তোমার বাবা যদি জেনে যায় আমাদের বিয়ে হয়েছে ডখন কী করবে?
:-তুমি এখনো গাধাই রয়ে গেলে।আমরা যদি না বলি তাহলে জানবে কি করে?আর আমিতো এখনি বাসায় জানাচ্ছিনা।তোমার পড়ালেখা শেষ।তুমি একটা চাকরী পেলেই বাবাকে জানাবো।
:-যদি তোমার বাবা মেনে না নেয়?
:-তাহলে তোমার কাছে চলে আসবো।
:-এত ভালোবাসো আমাকে?
:-তোমার কী মনে হয়?
:-আমিতো ভেবেছিলাম তুমিও সাথির মত আমাকে ঠকালে।
:-আমি ওর মত না বুঝেছো?আর কখনো যদি সাথীর কথা মুখেও আনো তোমাকে মেরে ফেলবো।
:-আচ্ছা আনবোনা।
:-কী করবে এখন?
:-তোমায় আদর করবো।
:-ওই না।একদম দুষ্টুমি করবানা বলে দিলাম।
:-করলে কী হবে?
:-অনেককিছু।চারদিকে অনেক মানুষ।
:-আমি তবুও করবো দুষ্টুমি।
:-তাহলে ব্রেকআপ তোমার সাথে।
:-লাভ নাই।এখন আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে।
:-তাতে কী হয়েছে ব্রেকআপ করতে কোন কিছুতে বাঁধেনা।
:-তোমার কোলে মাথা রাখবো?
:-মানা করেছে কে।
আমি নীলুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে রইলাম।আর নীলু আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।অদ্ভুত একা ভালোলাগা কাজ করছে আমার মাঝে।নীলু প্রমান করে দিলো সব মেয়ে স্বার্থপর না।

………………………………………….সমাপ্ত……………………………………

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত