গরিবের বৃদ্ধাশ্রম

গরিবের বৃদ্ধাশ্রম

“আমি বিশ্বাস করি, আমার ছেলেরা একদিন আমাকে খুঁজে বের করবেই। তাদের ভুলের জন্য, আমার পা ধরে হাউমাউ করে কাঁদবে। সবশেষে, আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার স্বামীর ভিটেতে”- কথাগুলো বলছিলেন সালেহা বেগম।
বয়সের-ভারে শরীরের চামড়াগুলো সব কুঁচকে গেছে; সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেছে।ওনার পরনে বেগুনি রঙের একটা ছেঁড়া শাড়ি।সালেহা বেগমের নীল রঙের এই শাড়িটা ধুলো-ময়লা লেগে নতুন এক রঙের সৃষ্টি করেছে। চিত্রকলার ভাষায়, লাল ও নীলের রঙের সংমিশ্রণে বেগুনি রঙের জন্ম।তাহলে এখন প্রশ্ন, চিত্রকলায় বেগুনি আর ধুলো- ময়লা রঙের মিশ্রণকে কী বলে? সম্ভবত, ফ্যাকাসে বেগুনি বলে।
.

সে যা হোক গে- এখন গল্পে ফেরা যাক, “সূর্যের হাসি” নামের একটি সংস্থার সাথে আমি দীর্ঘদিন যাবৎ জড়িত। সেই সংস্থাটি থেকে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্যই, উত্তরের রাজধানী হিসেবে খ্যাত দিনাজপুরের পার্বতীপুরে এসেছি। সংস্থা কতৃপক্ষ আমাকে বলেছিল, এই এলাকার দুঃস্থ মানুষদের কাছে ১৫০ কম্বল বিতরণ করতে। তা না করে, আমি রেলওয়ে স্টেশনে রাত কাটানো মানুষদের কাছে কম্বল বিতরণ করতে এসেছি। গ্রামের মানুষদেরকে কম্বল দিয়ে কী হবে? তারা তো প্রতিবছরই চেয়ারম্যান- মেম্বারদের কাছ থেকে কম্বল পায়ই। কিন্তু এই স্টেশনে রাত কাটানো মানুষগুলোর খোঁজখবর ক’ জনে নেয়!?

কম্বল বিতরণ করা হবে শুনে, মুহূর্তের মধ্যেই অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে গেল। তাই, আমরাও সব আনুষ্ঠানিকতা সেড়ে কম্বল বিতরণ করা শুরু করে দিলাম। কিন্তু, শেষ পর্যায়ে হয়ে গেল বিপত্তি। ১৫০ কম্বল নিমেষের মধ্যেই বিতরণ করা শেষ। কিন্তু, লাইনে এখনও দশ-পনের জনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরকে কম্বল শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও, তারা লাইন ভেঙে চলে যাচ্ছে না। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছে, তারা বলতে চাচ্ছে, “লাইনে ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে ছিলাম। এখন কম্বল শেষ বললে হবে? দরকার হলে, কম্বল কিনে নেবো তোমাদের কাছ থেকে!”
কিন্তু, হঠাৎ করেই এক মহিলাকে গালভরা হাসি নিয়ে লাইন থেকে বের হয়ে যেতে দেখলাম। তার চোখমুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, উনি কোনো কারণে খুব আনন্দিত। সবাই যখন রাগান্বিত চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন এই বৃদ্ধা মহিলার হাসির কারণটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তাই, কৌতূহলী হয়ে উনার পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি।উনার মুখে এখনও সেই হাসিটা লেগে আছে। তাই, উনাকে দেখে আমার পাগল পাগল মনে হচ্ছে। কিন্তু উনি আমার এই ভ্রম ভাঙিয়ে- বলে উঠলেন, “বাবা, কিছু বলবে?”
“না। তেমন কিছু বলব না। শুধু একটা প্রশ্ন করার ছিল আপনাকে।” হাসিমাখা মুখে কথাটা বললাম- আমি।
“কী প্রশ্ন করবে, বাবা?”
“কম্বল না পেয়ে, সবাই যখন আমাদের উপর অসন্তোষ। তখন আপনি লাইন থেকে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসলেন কেন?”
“ওহ। এই কথা।আসলে জানো তো বাবা, আমি কম্বল পাইনি, তাতে আমার কোনো দুঃখ নাই। তোমরা সবার প্রথমে যেই ছেলেটাকে কম্বল দিলে, ও কম্বল পেয়েছে- তাতেই আমি খুব খুশি। গতরাতে প্রচন্ড কুয়াশা পরেছিল। ওই ছেলেটা, শুধুমাত্র একটা পাতলা গেঞ্জি পরে জংশনের উপর শুয়ে ছিল। ঠান্ডায় ওর কাঁপুনি দেখে, আমি আমার বস্তা দিয়ে বানানো কাঁথাটা ওকে পরিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের নাহয় বয়স হয়েছে, আমরা গরম-ঠান্ডা সহ্য করতে পারি কিন্তু ও তো নিষ্পাপ।” (মহিলার বোধ শক্তি দেখে অবাক হয়ে গেলাম) কিছুক্ষণ চুপ থেকে, বললাম- “কতদিন থেকে এখানে আছেন?”
“৩ বছর ৬ মাস ১৮ দিন”মহিলাকে যতই দেখছি, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। ইনি যদি ষাঠার্ধ বয়সী না হয়ে, ১৬ বছর বয়সী কোনো বালিকা হতেন, তাহলে এক্ষুনি প্রেম নিবেদন করে ফেলতাম। মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ভাব রেখে জিজ্ঞাসা করলাম, “সময় জ্ঞানটা তো ভালোই রেখেছেন। কারো ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন বুঝি?”
“হ্যাঁ বাবা , আমি আমার রহিম-করিমের জন্য অপেক্ষা করছি।” “কারা এরা?” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম।প্রশ্নটা শুনে মহিলার মুখ কিছুটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সেই ফ্যাকাসে মুখেই তিনি উত্তর দিলেন, “এরা আমার সন্তান।”
“তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেন; কই গেছে ওরা?”
“কোথায়ও যায়নি। তবে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”
“তারা কেনো বাসা থেকে বের করে দেবে আপনাকে; তারা কি আপনার নিজের পেটের সন্তান ছিল না?”
“হ্যাঁ, পেটের সন্তানই ছিল। তারপরও বের করে দিলো। আমার ছেলেরা যদি একটু বড়লোক হতো, তাহলে তারা আমাকে বের করে দিতো না। বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতো।মাসে মাসে বৃদ্ধাশ্রমের বিল দিতে একবার হলেও, এখানে আসতো। অন্তত একবার হলেও তাদের মুখগুলো দেখতে পারতাম। কিন্তু কী করবে বলো, আমার যে সে ভাগ্য নেই। বড়লোক বৃদ্ধা মায়েদের জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে আর গরিব বৃদ্ধা মায়েদের জায়গা হয়, রাস্তাঘাটে কিংবা রেলওয়ে স্টেশনে। আমার মতো গরিব মায়েদের খোঁজ খবর নেয়ার মতো কেউ নাই” কথাগুলো সালেহা বেগম প্রায় এক নিশ্বাসে বললেন।

আসলেই তো তাই। প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল’ মা দিবস’ এ সাংবাদিকরা ছুটে যান দেশের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানে তুলে ধরেন বিভিন্ন মায়ের গল্প। কই, দেশের কোনো চ্যানেলে স্টেশনে রাত কাটানো, কোনো মায়ের এই দুঃখ প্রচার করতে দেখলাম না তো? আসলে মনে হয়, দেশের সাংবাদিকরা জানেন না, গরিব মায়েদের জায়গা বৃদ্ধাশ্রমে হয় না। তাদের জায়গা বিভিন্ন জনবহুল জায়গায় হয়। এটাও তো হতে পারে, এসব নিম্নবিত্ত মানুষদের news পাবলিক খায় না। তাই তারা প্রচার করেন না।
.
সে যাহোক, পরবর্তীতে সালেহা বেগমের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম-উনার বাড়ি সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়ানঘাটের পশ্চিম জাফলং ইউপির পান্তাই নামের একটি গ্রামে (যেখানে কিছুদিন আগেই আমি একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম)। উনার স্বামীর নাম মৃত মকবুল মিঞা। তিনি ৪ বছর ২ মাস ২৬ দিন আগে এই পৃথিবী থেকে গত হয়েছেন। মকবুল মিঞা পেশায় ছিলেন স্কুল মাস্টার। তাই, সালেহা বেগম স্বামীর আদর্শে নিজেকে স্বশিক্ষিত করে তুলেছেন। সালেহা বেগমের দুই সন্তান রহিম-করিম। রহিম একটি সংস্থার দারোয়ান আর করিম পাথর শ্রমিক। মকবুল মিঞা তার জীবনের সকল আয় দুই সন্তানকে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়ে গিয়েছিলেন। বাকি শুধু যে ভিটেমাটি ছিল, সেটা তিনি করিমকে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। এটাই ছিল বিপত্তির কারণ। পরবর্তীতে রহিম তার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে নতুন করে সংসার পাতে। এদিকে অসুস্থ মকবুল মিঞা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরে। অবশেষে ১৪২১ বঙ্গাব্দের ২৫ শে বৈশাখ তিনি মারা যান। এরপর সালেহা বেগমের খাওয়া নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া লাগতে থাকে করিম আর স্ত্রীর। একদিন করিম তার স্ত্রীর কথামতো সালেহা বেগমকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেন। বের করে দেয়ার পরও একটা পুরো রাত সালেহা বেগম তার ছোট ছেলের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অবশেষে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে, ফজরের আজান হতে হতেই কাঁদতে কাঁদতেই উদ্দেশ্যহীনভাবে নিজের ঠাঁই খোঁজার জন্য বেরিয়ে পরেন। কীভাবে তিনি রেলের শহর পার্বতীপুরে এসে পৌঁছালেন সেটা, ওনার কাছে অজানা। (কথাগুলো শুনে খুব খারাপ লাগতে শুরু করছিল। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে শুরু করে দিয়েছিল। অবশেষে নিজেকে সামলে নিলাম। আসলে, আমাদের সমাজব্যবস্থাটা হলো- নিজের মাকে, যখন ভাইয়ের বউ নির্যাতন করে তখন তথাকথিত মেয়েরা কোমরে আঁচল বেঁধে ঝগড়া করতে যান, ভাইয়ের বউয়ের সাথে। অথচ তিনি নিজেই তার শ্বাশুরি (কারো না, কারো মা) কে নির্যাতন করছেন।)
.
যাহোক, এতক্ষণ অতীতে ডুব দিয়ে ছিলাম। এখন বর্তমানে ফেরা যাক,সালেহা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিলেটের পান্তাই গ্রামের এক পূর্বপরিচিত মাঝিকে ফোন দিলাম- “কী অবস্থা, কাদের ভাই; চিনতে পেরেছেন আমাকে? আমি সাব্বির।”
“আরে ভাইজান যে, এতদিন পর যে হঠাৎ করে ফোন দিলেন; খবরশবর সব ভালা তো?”
“হ্যাঁ, ভালো। একটা বিষয় জানতে চাচ্ছিলাম তোমার কাছে। তুমি কি মকবুল মাস্টারকে চেনো। ওনার ছেলের নাম রহিম- করিম?”
“হ, চিনি তো। করিম তো আমার লগেই আগে কাম করতো। কয়েকবছর আগে নিজের মাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাইর কইরা দিছে। আল্লার কী কাম দ্যাহেন, এর কিছুদিন পরই জলদশ্যুরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে, তার হাত কেটে দিছে। শুনছি, রহিমেরও কী জানি এক বড় অসুখ ধরা পরছে। এরপর থেইক্যা, দুই ভাইই পাগলের মতো তাদের মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোথায় পাচ্ছে না।”
“কাদের ভাই, আমি করিমের মায়ের খোঁজ জানি। তুমি কী আমার সাথে ওদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারবে?”
“হ, ভাইজান। পারুম। দাঁড়ান, এহুনি অগোর বাসায় রওনা দিচ্ছি।”
.
এরপর সালেহা বেগমের দুই কুলাঙ্গার ছেলে আমার সাথে যোগাযোগ করে। আমি তাদের মায়ের ঠিকানা, তাদেরকে দিয়ে দিয়েছি। আজ তারা, তাদের জনম দুখিনী মায়ের সাথে দেখা করতে আসতেছে। অনেক করে তারা আমাকে অনুরোধ জানিয়েছে, আমি যেন তাদের সাথে থাকি। কিন্তু, আমি মুখের উপর না করে দিয়েছি।রহিম- করিম দুইজনই মায়ের কাছে, তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। আর আমি দূর থেকে তাদের এই আনন্দঘন মুহূর্ত্যটা দেখে দেখে চোখের পানি ফেলছি। মাঝেমাঝে বেশ ভালোই লাগে, এরকম আনন্দঘন মুহূর্ত্যগুলো লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে। এ সময় আমার কেন জানি, চিৎকার করে খুব বলতে ইচ্ছা করছে- ভালো থাকুক, ভালো থাকুক- পৃথিবীর সব মা।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত