আলো ‘র সন্ধানে

আলো ‘র সন্ধানে

নীলসাগর ট্রেনে ঢাকা যাচ্ছি…
আমি নওগাঁতে থাকি…এখানকারই একটা কলেজে পড়াশুনা করি।
ঢাকা শহরে যাওয়া হয়ে ওঠে নি কখনো।এবারই প্রথম ঢাকা যাচ্ছি।শুনেছি,ঢাকা শহর এক মহান শহর।অনেকেই যায় সেখানে ভাগ্যের সন্ধানে।আর পছন্দের মানুষকে ঢাকা শহর সবকিছু দেয় ও উজাড় করে।কিন্তু আমি সেরকম ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যাচ্ছি না।
তবে যাচ্ছি,
বিশেষ এক কারণে,বিশেষ এক মানুষের সন্ধানে।
‘আলো’…’আলো’-র জন্য।
আমার আলো।
এই যে, ট্রেন এসে গেছে,
“চ” নং বগিতে আমার সিট।
ব্যাগপত্র নিয়ে ট্রেনে উঠে পরলাম।
সিট খুঁজে নিয়ে বসে পরলাম।
কিছুদিন আগে “ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা ২০১৮” তে সেচ্ছাসেবক হিসেবে গিয়েছিলাম PTI প্রাঙ্গণে। ৩ দিন ব্যাপী মেলা।
আমাদের কলেজের স্টল ও ছিল।
তেমন কোন কাজ নেই,শুধু দাঁড়িয়ে থাকা,এদিক-সেদিক দেখা,এই আর কি!
উদ্ভোদিনের দিন প্রধান অতিথি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন।অামি স্টেজের বাম পাশে, দর্শকদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।কথা শুনতে ভালই লাগছিল।তবে বিরক্ত ও লাগছিল।
সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি।
হঠাৎ পিছনে তাকাতেই দেখি,আমার পিছনে এই ১০-১৫ হাত দূরেই একজন মেয়ে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।অল্প বয়স,
অপরূপ সুন্দরী।
এত সুন্দর মেয়ে পুলিশে কেন! এত মডেলিং জগতের স্টার হওয়ার কথা ছিল।
চুলে ব্যান্ড পড়ে,ছেড়ে দিয়েছে।
বেশ লম্বা লম্বা চুল।
নিঃস্তব্ধ দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
মনে হচ্ছে কোন এক ভাবনার সাগরে ডুবে আছে,আর সেই ভাবনাযুক্ত চেহারা নিয়েই মাঝেমাঝে হালকা হাসতিছে,কি যেন ভেবে…
হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে আমার দুচোখ চেপে ধরলো।হাতের গন্ধটা বেশ চেনা চেনা। কিন্তু বলতে পারলাম না।
-সরি,বুঝতে পারছি না। কে আপনি?(আমি)
(চোখ ছেড়ে দিতেই দেখি,
সাদমান।আমার বন্ধু, ঢাকাতে থাকে,পলিটেকনিকে পড়ে।প্রায় ১বছর পরে দেখা।
বেশ পরিবর্তন হয়েছে।আগে অনেক চিকন আর খাটো ছিল।
বেশ লম্বা আর মোটা হয়েছে।
ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে,আমরা সমবয়সী।)
– দোস্ত, তুই?কেমন আছিশ?(আমি)
-ভাল।তুই…?(সাদমান)
-আমিও ভাল। তো হঠাৎ নওগাঁতে কি মনে করে?(আমি)
-দাদি খু্ব অসুস্থ।দাদিকে দেখতে এসেছিলাম।আজকেই ঢাকা যাচ্ছি।তো নওগাঁ এসে শুনলাম,এখানে মেলা হচ্ছে। তাই একটু ঘুরতে এলাম।(সাদমান)
-ভাল করেছিশ।দাদি এখন কেমন আছে…?
-ভাল।
-ওকে,,,কি খাবি বল?
-না দোস্ত আমি কিছু খাব না।আমাকে যেতে হবে,,,১০.৩০টায় বাস ছাড়ার কথা।
এখন অলরেডি ১০টা ১১ বাজে।তাছাড়া, রাস্তায় যে য্যাম।
-ওকে দোস্ত।তাহলে যা,ভাল ভাবে যাশ।
-ভাল থাকিশ।আর হ্যা,ফোন দিশ।
-ওকে।
সাদমান চলে গেল।এদিকে প্রধান অতিথির উদ্ভোধনী ভাষণ ও শেষ।পিছনে তাকালাম আর অবাক হলাম।
মেয়েটি ওখানে নেই।
তখন কথা বলার মাঝে আর খেয়াল করিনি।কখন জানি চলে গিয়েছে।
পুলিশদের স্টলের দিকে এগোলাম।কিন্তু স্টলে গিয়ে কোন খোঁজ পেলাম না।
হয়তো ডিউটি শেষ, চলে গিয়েছে।
হঠাৎ রব্বানী ভাই-এর সাথে দেখা।আর হ্যাঁ,রব্বানী ভাই হচ্ছে আমাদের টিম লিডার।
-কি ব্যাপার, রাজু?তোমাকে কতবার ফোন দিলাম, ধরতেছো না কেন?(রব্বানী ভাই)
-তাই…?সরি,,,খুব সরি ভাইয়া।
(একি পকেটে হাত দিয়ে দেখি,মোবাইল নাই।)ভাইয়া, একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে।(আমি)
-কি হইছে?
-আমার মোবাইল কোথায় জানি পড়ে গেছে।
-বল কি…!আচ্ছা কোন ব্যাপার না।আমি দেখছি…
সকালে কিছু খেয়ে আসছো?
-না।
-দোতলায় যাও,খেয়ে আসো।আমি দেখছি কি করা যায়।
-না থাক,এখন খাব না।
ভাই আর আমি আগে একটু খোঁজাখোজি করলাম কিন্তু কোন লাভ হল না।
তারপর রব্বানী ভাই, মাইকে ঘোষণা দিয়ে আসলো।
-ভাগ্য ভাল হলে ফিরে পেতে পারো।(রব্বানী ভাই)
-(আমি মাথা নাড়লাম।(
-চিন্তা করো না তো।পেয়ে যাবে…।যাও,এখন খেয়ে আসো।
আমি খেতে চলে গেলাম।
মনটা বেশ কিছুক্ষণ আগে ভালই ছিল।এখন কেমন জানি লাগছে…।
-আসসালামু আলাইকুম,স্যার।(আমি)
-ওয়ালাইকুম সালাম।(মালেক স্যার)শুনলাম তোমার মোবাইল হারিয়ে গেছে।তো কি খবর?পেলে?
-না,স্যার।
-হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া খুব মুশকিল।তারমধ্যে আবার মোবাইল। দেখ….কিছু হয় নাকি!
-জ্বি,স্যার।
-হুম,খেয়ে আমাদের স্টলে এসো।
-জ্বি,স্যার।
আমি খেতে বসলাম।
খাওয়া শেষ করে, হাত ধুয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম।
আবারো সেই মেয়ে পুলিশের সঙ্গে দেখা।মেয়েটির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছি।
কিন্তু আমার এ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যেন,মেয়েটির নজরেই পড়লো না।পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
পিছন পিছন আবার খাবার ঘরে যেতে চাইলাম।কিন্তু গেলাম না।মনটা ভাল ছিল না তো।
স্টলে গিয়ে বসে আছি।
কয়েক ঘন্টা পরে…
-এই যে,আপনাদের মধ্যে রাজু কে?(সেই মেয়ে পুলিশ)
-জ্বি,আমি।(আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।)
-ওসি স্যার দেখা করতে বললেন।একটা মোবাইল পাওয়া গেছে,ওটা আপনার কিনা দেখার জন্য।
-জ্বি, আমি আসছি।
রব্বানী ভাই আর আমি পুলিশ স্টলে গিয়ে ওসি স্যারের সাথে দেখা করলাম।
-আপনার মোবাইলের মডেল কত?(ওসি স্যার)
-স্যামসাং জে ৫
-এটা কিনা,দেখেন তো।
-জ্বি,,,এটাই তো।কোথায় পেলেন?
-ওই যে,,,চোর বেটা, গেটে একজনের ম্যানিব্যাগ নিতে ধরা খাইছে।ওর কাছেই ৩ টা মোবাইল পাইছি।
-ওহ আচ্ছা।আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।
-আপনাকে ও ধন্যবাদ।
মোবাইল ফিরে পেয়ে বেশ ভাল লাগছিল।ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্টেজে নাচতেছে।নাচ দেখতেছি।
আর এদিক সেদিক তাকিয়ে মেয়েটিকে খুঁজছিলাম।
অবশেষে মেয়েটির সন্ধান মিললো,ফুচকাওয়ালার দোকানে।
ভাবছিলাম কিভাবে কথা বলবো!!!
কি বলবো!!! মাইন্ড করবে না তো!!!
একে পুলিশ…!তারপরে আবার মেয়ে পুলিশ।
যাইহোক আমি ও দোকানে গেলাম।এমন ভাব করলাম যেন তাকে দেখতেই পাইনি।
মামাকে হাফপ্লেট ফুচকা দিতে বলে চেয়ারে বসলাম।
হঠাৎ তাঁর দিকে তাকিয়ে অবাক চাহনিতে বললাম
-আরে আপনি…! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
-কেন…?
-আপনার জন্যই তো আমার হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন ফেরত পেলাম।
-আপনি ভুল করছেন,,,আমি চোরকে ধরিনি।
-তাই…?কিন্তু তাতে কি?আপনি না ধরলে কি হবে,,,!কোন এক পুলিশ তো ধরছে।
সবাইকে ধন্যবাদ।
-জ্বি,স্বাগতম।আর হ্যাঁ,একটু সচেতন থাকবেন।অন্যের সেবা করতে এসে,নিজেই অসহায় হয়ে পড়া বিষয়টা কেমন দেখায়!!!
-না আসলে……
আর বেশি কিছু বললো না।উঠে চলে গেল।
বেশ ভালই রাগী মনে হচ্ছে।
অবশ্য মেয়েদের রাগ না থাকলে, তাঁদের রূপে অপূর্ণতা থেকে যায়।
যেরকমই হোক না কেন…! বন্ধুত্ব করতেই হবে।
ভাল লেগে গেছে যে…আর একটু একটু ভালও বেসে ফেলেছি মনে হচ্ছে।
-এই যে শুনুন।(আমি)
-বলেন(সে)
-এখানে একা একা বসে আছেন যে!মন খারাপ?
-খারাপ হতে যাবে কি জন্য?
-তাহলে?
-গান-বাজনা বিরক্ত লাগছিল।তাই এই ফাঁকা জায়গায় বসে আছি।
-আমি বসি….?
-জ্বি, বসেন।
-ধন্যবাদ।
.
.
-ঝালমুড়ি খাবেন?(আমি)
-না।(সে)
-তো ফুচকা?
-না।কিছুক্ষণ আগেই খাইলাম,ঝাল জাতীয় কিছু খাওয়ার মুড নাই এখন।
-তো আইসক্রিম?
-আমার প্রিয় খাবার।তবে এখন আইসক্রিম ও খেতে ইচ্ছে করছে না।
-তাহলে চলেন চা খাই।একদম চাঙ্গা হয়ে যাবো।
-হুম,এটা অবশ্য খাওয়া যায়।
চা-এর স্টলে চলে গেলাম দুজনে।
মামাকে চা-দিতে বললাম।ভিতরে বসতে যাব তখন…
-এই যে,ভিতরে না যাই….দাঁড়িয়ে চা খেতেই বেশি ভাল লাগে।(সে)
….
….
-জানেন, আগে স্কুলে পড়তে খুব চা খেতাম বান্ধবীরা একসাথে।আমাদের স্কুলের পাশেই শরীফ মামার চা-এর দোকান।খুব ভাল চা বানান ওনি।
-চা তাহলে তো খু্ব পছন্দ করেন।
-হুম অনেক।
-আচ্ছা,,,আপনি এত অল্প বয়সে চাকরি করতে গেলেন কেন?
-ইচ্ছে…পুলিশকে আমার খুব ভাল লাগে।সেজন্য সুযোগ মিস করতে চাই নি।আর তাছাড়া পড়াশুনা চলতেছে তো পাশাপাশি।
-ওয়াও…গুড।
-ধন্যবাদ।
-এখানে কোথায় থাকেন?
-হোস্টেলে।
-দেশের বাড়ি কই…?
-ঢাকা।
-কি…?ঢাকার মেয়ে এই গ্রাম্য শহরে পড়ে আছে,আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
এই যে আলো, স্যার ডাকছেন তোমাকে(আরেক মেয়ে পুলিশ।)
আলো বাই বলে চলে গেল।
আমি কেমন যানি অপূর্ণতাই ভুগতে শুরু করলাম।মনে হচ্ছে যেন,,,অারো অনেক কিছু বলার ছিল,কিন্তু বলতে পারলাম না।
চা-শেষ করে আবার মেলায় গেলাম।
স্টলে,মেলার চারিপাশ তাঁকে খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না।
সেদিনের মেলার পর্ব শেষ করে মেসে চলে আসলাম।
মেসে এসে ভাল লাগছিল না।
শুধু তাকেই মনে পড়তেছিল। ঘুমানোর চেষ্ঠা করলাম কিন্তু ঘুম আসছে না।অপেক্ষায় থাকলাম,কখন সকাল হবে!কখন আবার দেখা হবে!!!
তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যানি ঘুমাই পড়েছিলাম।
সকাল ১১টায় উঠলাম।তবে সেদিন আর মেলায় যেতে পারলাম না।জরুরি একটা কাজ পড়ে গেছিল।
কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে গেল।মেলায় আর যাওয়াই হল না।পরশু গেলাম।কিন্তু তাকে পেলাম না।সেদিনই মেলার শেষ দিন ছিল,একদম শেষ সময় পযর্ন্ত অপেক্ষা করেছিলাম কিন্তু লাভ হয় নি।
তাকে খুব মিস করছিলাম।
ধীরে ধীরে মিস করার পরিমাণ বাড়তে লাগল।বুঝতে পারলাম , পুরোপুরি ভালবেসে ফেলেছি।এবং তাকে আমার মনের কথা বলতেই হবে।না বলা পযর্ন্ত শান্তি পাব না।
তাই পরের দিন বন্ধু সজল কে নিয়ে থানায় গেলাম।তার সাথে দেখা করার জন্য।
-এই যে মামা,আলো ম্যাডামকে একটু ডেকে দিবেন প্লিজ।(আমি)
-পুরো নাম কি?(পুলিশ মামা)
-পুরো নাম তো জানি না।
-মানে?
-মানে,,, শুধু আলো নামটাই জানি।
-আছে একজন অবশ্য।তোমরা বসো,আমি ডেকে দিচ্ছি।
-কে বাবা তোমরা?(বয়স্ক পুলিশ মহিলা)
-ইয়ে মানে, আলো ম্যাডামের সাথে দেখা করতে আসছিলাম।
-আমিই তো আলো।
-না মানে, অন্য আলোর জন্য এসেছিলাম।
-এখানে তো আলো নামের আর কেউ নাই।
-মানে কি?অল্প বয়স,অনেক সুন্দর দেখতে,,,ঐ আলো ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছি।
-ওহ আচ্ছা।তোমরা ওর কে হও?
-বন্ধু…..
-তোমাদের কিছু বলে যায় নাই?ওর তো টান্সফার হইছে ঢাকাতে।
-বলেন কি?
-হুম।গত পরশুই তো ও চলে গিয়েছে।
-কোন ঠিকানা পাওয়া যাবে কি?
-না।কিছু বলে যায় নি তো।তবে জানি যে,ঢাকার উত্তরাতে টান্সফার হইছে।
-উত্তরার তো অনেক কয়টা সেক্টর?কোন সেক্টরে?
-সেটা জানি না।তোমরা আসো বাবা,আমার কাজ আছে।
এটা কেমন হল!মনের কথা জানাবার আগেই দূরে চলে গেল!!!
ঢাকা চলে আসছি।
ট্রেন এখন ঢাকা এয়ারপোর্ট স্টেশনে।এ স্টেশনেই নেমে পড়লাম।পা রাখলাম অচেনা ঢাকা শহরে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত