অন্দরমহল

অন্দরমহল

পাশের বাড়ির রেশমা আত্মহত্যা করেছে । মারা যাওয়ার আগে চিঠি লিখে রেখে গেছে প্রিয় আব্বা আমি চাইনা আপনাকে কষ্ট দিতে তাই ও চাওয়া সত্ত্বেও আমি পালিয়ে বিয়ে করতে পারলাম না । আবার আমার পবিত্র প্রেমকেও আমি অবজ্ঞা করতে পারি না তাই আগামীকালের নিষ্ঠুর গাঁয়ে হলুদের আগেই আমি চিরতরে চলে গেলাম । তারপর ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে তাতে দুইজনের নাম দেওয়ার পাশাপাশি একটা তীর দিয়ে উভয়ের বুককে তীর দিয়ে বিদ্ধ করেছে ! জানিনা অপর পক্ষের প্রেম কেমন ছিল কিন্তু রেশমার প্রেম যে নির্জলা উপন্যাসনির্ভর এবং আবেগী এটা বুঝতে পারলাম । তাদের মাঝে এই মোবাইলের যুগেও যে চিঠি চালাচালি হত তার প্রমাণ বাবাকে লেখা রেশমার ছোট কিন্তু সাজানো চিঠিটি । মেয়েটা অসম্ভব রকম মিথ্যাবাদী ছিল নিশ্চয় আমাকে আরেকটা পয়েন্ট দিল আজিজ মিয়া প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই একজন চর্মসার বৃদ্ধ । চোখ দুইটি তার পিট পিট করছে একটু রাগের স্বরেই বললাম চাচা আপনি না জেনে এমন কিছু বলতে পারেন না । আহা কি সুন্দর কথা আব্বা আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনা ঐ পোড়ারমূখী এ কাজ করেছে কিন্তু ঐ বাবাকেই কষ্ট দিতে এঁকে মিথ্যাবাদী বলব নাতো কাকে বলব ? চাচা আপনি আদি কালের মানুষ এইসব প্রেম ট্রেম বুঝবেন না আর বুঝেও কাম নাই তার যুক্তি না ফেলতে পেরে ভোকাল থেরাপী দিয়েই থামিয়ে দিতে চাইলাম । তখন শরতের দেবদাস পড়ে কেবল প্রেমের ছবক নিচ্ছি পিতা মাতা যে প্রেমের পথে প্রধান বাঁধা এটার শেখার সাথে সাথে ব্যর্থ হলে মদ খেতে হয় এটাও জেনে ফেলেছি । রেশমার প্রেমটাকে পবিত্র প্রেমের নমূনা হিসেবে বুকে ধারণ করার আবেগ দিয়ে চিন্তা করছি কতটা মজবুত প্রেম হলে এভাবে জীবন বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব ? এই সময় অচেনা অজানা এই বুড়োর কথা শুনে এই আবেগকে অবমূল্যায়ন করার কোন মানে হয় না । শুধু বললাম আপনি আর প্রেমের কি বুঝবেন ? বুড়ো আমার হাত ধড়ে বাড়ির ডানদিকের বট গাছের ছায়ায় বসল । যা রোদ পড়ছে বলেই হাঁপাতে লাগল বৃদ্ধ । আমার নাম মজিদ । তোমার বাপ চাচাদের বলে দেখবে সবাই আমাকে এক নামে চিনবে । তখন এই মহকুমা থেকে একমাত্র আমি স্কলারশীপ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই এ উপলক্ষে আমার বাবা তিনটা গরু জবাই করে সবাইকে খাওয়াইছিল । সেদিন ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন অনেক স্যার অনেক অনেক উপদেশ দিয়ে আর মজা করে ঘোষনা দিলেন তারপর দিন থেকেই ক্লাশ শুরু । আমার অর্থনীতি ডিপার্টমেন্টের প্রথম ক্লাশ । বড় ভাইরা আগেই মোজাম্মেল স্যার সম্বন্ধে সতর্ক করে দিয়েছে স্যার নাকি যেমন মেধাবী তেমনি বদমেজাজী । ক্লাশে পিন পতনের শব্দ হলেই শুরু করেন বিভিন্ন পাগলামী এই যেমন যার আশে পাশে শব্দ হয়েছে তাকে ডেকে এনে লেকচার নিতে বলেন আর স্যার গিয়ে তার আসনে বসেন যদি লেকচারে একটু গড়বড় হয় তবে স্যারের সাবজেক্টে আর তাকে পাশ করতে হবে না ! স্যার রোল কল শুরু করল আমার রোল তিন । তিন বলার সাথে সাথেই আমি দাঁড়াতেইই দেখি সবাই বড় ভাইদের উপদেশ ভুলে হাসি শুরু করেছে । আমি তো ভয়ে কাঁপছি না জানি কি করে ফেললাম । দেখি পিছন থেকে একটা মেয়ে এগিয়ে আসল স্যার এই যে আমার রোল নাম্বারের কপি । স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বলল তোমার রোলের কপি নিয়ে আসো । আমি কোন রকমে বললাম স্যার নিয়ে আসিনি । বলল তুমি নিজের রোল নাম্বার জানোনা ? সামনে আসো । মেয়েটাও দাঁড়িয়ে ছিল । আমিতো শিওর আমার রোল তিনই ছিল । তবুও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি স্যার বলল খাতায় এখনো নাম উঠানো হয়নি তবে আমার মনে হয় মেয়েটির রোলই তিন আর তোমাকে মাফ করে দিতাম যদি তুমি রোল নাম্বারের পেপার নিয়ে আসতে । মেয়েটা আমার বিপদ দেখা সত্ত্বেও মুচকি মুচকি হাসছে মাথা নিচু করেও বেশ বুঝতে পারছিলাম । স্যার বলল আজ তুমি ইন্ট্রোডাকটরী লেকচার দিবা । যা আশংকা করছলাম তাই ঘটতে যাচ্ছে আমার কপালে । মেয়েটাও হয়ত এর পরিনতি সম্পর্কে জানত তাই দেখলাম মেয়েটাও চমকে উঠল এই প্রথম মেয়েটার দিকে তাকালাম সুন্দর অসুন্দর যাচাই করার মত অবস্থা আমার নাই । মেয়েটা ঢোক গিলে বলল স্যার এক কাজ করলে হয় না আজ যেহেতু প্রথম ক্লাশ আসুননা আমরা সবাই মিলে ক্লাশটা করি । স্যার হয়ত জানে তার সম্বন্ধে ভীতির গল্প কতটা মশহুর তাই অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন । হ্যাঁ স্যার আমরা কেউ কাউকে চিনি না আজকে আমরা ট্রাডিশনাল ক্লাশ না করে বরং এঁকে অপরের সাথে পরিচিত হই ভয়ের চিহ্ন মেয়েটার মুখে স্পষ্ট । স্যার কিছুক্ষন মাথা ঝুকিয়ে বললেন খুব সুন্দর বলেছ । যাক সবাই হাঁফ ছেড়ে বাচল প্রথমে হাসাহাসি করলেও পরে পরিস্থিতি বুঝে সবাই চুপ মেরে ছিল । আমিও মেয়েটার দিকে অতিশয় কৃতজ্ঞতার সাথে তাকালাম । যাও মজিদ তোমার সিটে যাও আর তুমি হ্যাঁ তোমার নাম কি ? আয়েশা । এখন তুমি ক্লাশ নিবে ! শুনেই লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম আমাকে বাঁচানোর জন্য আরেকটা মেয়ে ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে কিন্তু স্যারকে কিছু বলার সাহস আমার ছিল না । তবে মেয়েটার জন্য আল্লাহর কাছে মনে মনে দোয়া করতেছিলাম যাতে স্যারের কাছ থেকে বাঁচতে পারে । তারপর কি হল বলছি না শুধু এইটুক বলি এই দিনেই সে স্যারের সুনজরে পড়ে এবং তার জন্য সামনের বেঞ্চে একটি আসন স্যার নিজেই নির্দিষ্ট করে দেয় । ক্লাশ থেকে বের হলাম মেয়েরা স্যারদের সাথে বের হয়ে যেত তাই তার সাথে সেদিন আর কথা হল না হল না ধন্যবাদ জানানোর এক টুকরো অবসর । রুমে এসে দেখি আমার মেধা তালিকা তিন হলেও ভর্তি রোল ছিল চার । তারপরদিন থেকে সে ক্লাশে আসে নাই স্যার ও তার খোঁজ নিল কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারল না । প্রথম দুই একদিন পর সবাই ভুলে গেলেও আমি মেয়েটাকে এক মিনিটের জন্যও ভুলতে পারি নি ক্লাশ নেওয়ার সময় তার বুদ্ধদীপ্ত হাস্যরসগুলো ভুলতে পারিনি সবার পরিচয় নেওয়ার পর অনেকটা স্বাবাভিক হয়ে কথা বলছিল সে মনে হচ্ছিল এই ক্লাশটা তারই নেওয়ার কথা ছিল । কয়েকটা কৌতুক বলার পর সবাই স্যারকে প্রায় ভুলে গিয়ে আবার হাসাহাসি শুরু করেছিল । শুধু দুইজন হাসে নি একজন স্যার আর একজন কে বলার দরকার নেই যে মেয়েটার দিকে ক্যাবলার মত তাকিয়ে ছিল তাই হাসার কথা মনেই ছিল না ! তারপর সে স্যারকে লক্ষ্য করে বলল স্যার আমার মনে হয় পৃথিবীতে আপনি একমাত্র স্যার যিনি ছাত্রদের হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের দিয়ে ক্লাশ নেওয়ান । আপনাকে হাজারো সালাম স্যার । স্যার একেবারে কাত আরে না না কি বল এই একটু …।। আমি তো চাই ছাত্ররা শিখুক মানে এই জায়গা তো ভবিষ্যতে তোমাদের জন্যই ! প্রায় দুই মাস পর আমি ক্যাম্পাসে ঘুরছিলাম হঠাট দেখি একটা মেয়ে আমার দিকেই আসছে হ্যাঁ সেই মেয়েটাই আবার ক্যাবলাকান্তের মত তাকিয়ে আছি মেয়েটা আমার দিকে একবার তাকিয়ে অবজ্ঞা করে চলে গেল । আমার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পর পরই আমার হুঁশ হল । পিছন থেকে ডাকলাম আয়েশা । সে দাঁড়াল বলল আমাকে ডাকছেন কোন রকম ঢোক গিলে বললাম হ্যাঁ । তাকে বলার জন্য কত কথা সাজিয়ে রেখেছিলাম এমনকি রীতিমত রিহার্সেল ও দিয়েছি দিনে তিনবার করে ! কিছুই বলতে পারলাম না শুধু বললাম ধন্যবাদ তোমাকে ! ও একটু মুচকি হেসে বলল ক্যাবলা । বললাম কিভাবে মিলে গেল ? কি ? এই যে তুমি ক্যাবলা বললে ! আমার মাও আমাকে এই নামেই ডাকে । ও তাই বুঝি । আমি কিন্তু ক্যাবলা না আমি মজিদ । ঠিক আছে ? ক্যাবলা । আর কিছু না বলেই চলে গেল । এরপর আমি ছেলেদের ক্লাশের সবার বামে বসতাম আর সে মেয়েদের ক্লাশের সবার ডানে বসত তাই পাশাপাশি বসতাম মাঝে মাঝে চোখাচুখি হত । ব্যস এই পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোন কথা হত না আমি যে চেষ্টা করিনাই তা না কিন্তু তার অনাগ্রহের কারনে পরে আর সেজে কথা বলিনি । কিন্তু অষ্টপ্রহর আমার চোখ কান তার দিকে খোলা থাকত । তার নিঃশ্বাসের গভীরতা দেখে মাঝে মাঝে চমকে যেতাম । ১৯৭০ সালের শেষের দিকে আমরা তখন থার্ড ইয়ারে । আয়েশা মেয়েদের মাঝে খুবই জনপ্রিয় । তার প্রতিটি কথা চালচলন আমাকে মুগ্ধ করত । কিন্তু সে আমি তো না বরং কোন ছেলের সাথেই ও কথা বলত না । তাই তাকে যে কখনো পাব না এটা ধরেই নিয়েছিলাম । তবু একটু অবসরে একা হতেই তার কথা মনে পড়ত মনটা আকুলি বিকুলি করত কথা বলতে । তার কিছু কিছু আচরন আমাকে তার স্বম্বন্ধে আগ্রহি করে তুলত । সে কোন দিনও আমার পাশে ছাড়া অন্য কোথাও বসত না এ নিয়ে নাকি মেয়ে মহলে কি যেন বলাবলি হত ! সে কোদিন এর প্রতিবাদও করত না এগুলো এর ওর মাধ্যমে আমার কাছে আসত । কিন্তু কিছু বললেই শুধু হ্যাঁ না ছাড়া কোন কথা বলত না । একদিন ক্লাশে আমার কাছ থেকে একটা বই নিয়ে আমাকে দেখিয়ে কি যেন ভিতরে রাখল । একটা চিরকুট তাতে লেখা ক্যাবলা কেমন আছো ? তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে । শেষ কিন্তু আমি এটুকুতেই আনন্দে আত্মহারা কে জানত প্রেমের আগেই আমাকে শুনতে হবে বিরহের গল্পগাথা ! আমার দাদা ভারতের বিহার রাজ্যের একজন জমিদার ছিল । ৪৭ এর দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সেখানে মুসলিমদের উপর অকথ্য অত্যাচারের ফলে অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয় আমার সূর্যঅস্পৃশ্য দাদিও একদিন শিকার হয় পশুদের তারপর আমার দাদা যে বাড়িভিটার মায়া ছাড়তে পারেন নি বলে দেশ ত্যাগ করেননি আমার বাবা চাচাদের বাঁচাতে বাধ্য হয়ে প্রিয় দাদীকে কোন রকমে কবর দিয়ে চলে আসে এদেশে । কিন্তু দাদা আর কোনদিন স্বাবাভিক হতে পারেননি কয়েক বছর পরেই মারা যান । সবাই ধারনা করছে পাকিস্তান আবার ভাংবে কিন্তু আমার বাবার আশংকা যদি ভাঙ্গে তবে পূর্ব পাকিস্থান আবার ভারতের অধিকারে চলে যেতে পারে । আর ভারতের পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ হতেই চমকে উঠেন বাবা । দাদার বড় ছেলে হওয়ায় ৪৭ এর স্মৃতি তার হৃদয়ে সবচেয়ে বেশী জাগরুক হয়ে আছে আবার অন্যদিক পশ্চিম পাকিস্থানের বলদর্পী শাসকেরা যেভাবে বৈষম্য করছে পূর্ব পাকিস্থানের উপর যেভাবে শোষন করছে ব্রিটিশদের মত যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা মুজিবুর রহমানকে শাসনভার দিতে টালবাহানা করছে তাতে বাঙ্গালীরা যে তাদের এই অপশাসন বেশী দিন মেনে নিবে না এটাও ঠিক । বাবাও এসব স্বীকার করেন কিন্তু তবুও তিনি অখন্ড থাকতে চান অন্তত ভারতভুক্ত থাকার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুও শ্রেয় কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা কে না জানে ? তাই বাবা হয়ত পশ্চিমে চলে যাবে । ওখানে আমার এক চাচা আছেন । এই মার্চেই আমাদের পরিবার চলে যাওয়ার কথা । কাউকে বলিনি শুধু তোমাকে বললাম কারনটা তোমাকে পরে বলব । অনেক চাপাচাপি করেও শুনতে পারলাম না কারনটা তবে আমার চোখে দু এক ফোঁটা জল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল । কাউকে পাওয়ার আগেই হারানোর কথা শুনলে কেমন বোধ হয় এ ব্যাথা কাউকে বলে বুঝানো যাবে না । আবার যদি সে তার চির আরাধ্য কেউ হয় তবে তো কথাই নেই । ইশ যদি তাকে বোঝাতে পারতাম কত বেশী ভালোবাসী তাকে কিন্তু মুখ উঠাতে পারছিলাম না । সে আবার একটা চিরকুট আমার হাতে দিল লেখা বড় বেশী ভালোবাসি তোমায় ক্যাবলা সেই প্রথম ক্লাশের দিন থেকেই । মনে মনে বললাম কচু ভালোবাসো আমাকে এতদিন বলনি বললে বিদায় বেলায় ঠিক যখন তোমার হারিয়ে যাওয়ার সময় । মুখ তুলো তুমি নাকি শরতের ভক্ত ? না তুলেই বলাম হুম শ্রীকান্ত থেকে একটা লাইন বলোত ? বলেই হাসতে লাগল আমি অবাক সে কি আমার সাথে তামাশা করছে নাকি ? নিজেই উত্তর দিল “বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয় ।“ তারপর গুন গুন করে গাইল একটা শায়রী জিসনে দিল খোয়া ঊসী কো কুছ মিলা, ফায়দা দেখো উসী লুকসান মে যে হৃদয় হারিয়েছে সেই কিছু পেয়েছে। এটাই পৃথিবীর একমাত্র লোকসান যাতে আসলে লাভই ভাগ্যে জুটে যায়। তারপর উদাস হয়ে বলল আমাকে আগলে রাখতে পারবে মজিদ ? অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে আছি তার চোখ আমার মাঝে খুজছে নির্ভরতা । বলাম মানে ? কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেল । ১৫ মার্চ । বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ তেমন নেই । ছাত্ররা স্বাধীন বাংলার জন্য পশ্চিম পাকিস্থানীদের কাছ থেকে মুক্তির দাবিতে এখন রাজপথে । আয়েশা আজ ক্যাম্পাসে এসেছে আমাকে বলল মজিদ শুনো । বাবা অনেক অপেক্ষা করার পর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাল চলে যাবে । আমিও আমার ব্যাগ পত্র কালকে গুছিয়ে রেখেছি । এখন আমাকে কি করতে হবে ? রোবটের মত বললাম একটু হালকা হলেই কেঁদে ফেলব এমন অবস্থা । কিছুই করতে হবে না । আচ্ছা ঢাকা থেকে তোমাদের বাড়ি কতদূর ? কেন ? চল আমাকে নিয়ে যাবে । তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না মজিদ । বলেই কেঁদে ফেলল । মায়ের কাছে তাকে রেখে যোগ দিলাম যুদ্ধের ট্রেনিঙয়ে । সর্বপ্রথম মুক্ত হলো আমাদের শহর যশোর । বাড়ি ফিরতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । আয়েশা নেই তার বড় ভাই সেনাবাহিনীতে চাকরী করত । সে এসে জোর করে নিয়ে গেছে তাকে । মাকে জড়িয়ে ধরে ছিল সে কিছুতেই যাবে না । কিন্তু তার ভাই মাকে গুলি করার হুমকী দিতেই সে একদম পাথর হয়ে গেছে । যা বলেছে তার ভাই তাই সে করেছে । চলে গেছে তার সাথে আমার চির অভিমানী আয়েশা । আমি অনেক খুঁজেছি তাকে কেউ সন্ধান দিতে পারে নি তার পরিবার পাকিস্থানের কোথায় থাকে । তার ভাই মারা গেছে যুদ্ধে । আয়েশাকে পাকিস্থানে পাঠাতে পেরেছে কি না তাও জানি না । তবে স্মৃতি হিসেবে টিকে আছে সে আমার হৃদয়ে আমার মননে । আর কোনদিন যাইনি ঢাবি ক্যাম্পাসে । আয়েশাবিহীন ঐ ক্যাম্পাসের কোন মূল্যই আমার কাছে নেই । তাই গ্রাজুয়েশনটা আটকে আছে ঐ পর্যন্তই । বলেই মাথা নীচু করলেন মজিদ সাহেব । আমি তার প্রিয় একটা শায়ের মুখস্থ করেছি যেটা আমি যুদ্ধে যাবার পর সে বারবার আবৃতি করত আমার ছোট বোন মুখস্থ করেছিল আপকে বিসরী তো হাম খোয়াবোঁমে মিলে যিসতারা শুখি হুই ফুল কিতাবোঁমে মিলে বিচ্ছেদের পর আমাদের দু’জনের মিলন কোথায় হবে? কোথায় তোমায় পাব? জানি পাব সুধু স্মৃতিস্বপ্নের আকাশে। যেমন পবিত্র শুকনো ফুল অনেকদিন পরে মানুষ হঠাৎ খুঁজে পায় বইয়ের পাতার ভাঁজে। তোমার পবিত্র সুখস্মৃতির ফুল তেমনি হঠাৎ খুজে পাব আমার স্বপ্নায়নের পাতার ভাঁজে। কালগ্রাসে বিবর্ন শুষ্ক। কিন্ত পবিত্র, সংরক্ষিত। বলেই মাথা নিচু করেই ধীরে ধীরে চলে গেল মজিদ সাহেব । আমি তাকিয়ে আছি তার চলার পথের দিকে । আমার চোখের একফোটা জল গড়িয়ে পড়ল । না জানি কত সহস্র ফোঁটায় ভরে আছে মজিদ সাহেবের জীর্ন বুকের অন্দরমহল ?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত