চরণ ফেলে ফেলে

চরণ ফেলে ফেলে
চলন্ত ট্রেনের জানালার বাইরে কী থাকে এমন; মেয়েটি অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অনেক্ষণ। মেয়েটির কোলে চুপচাপ বসে আছে হলুদ ফ্রক পরা ছোট্ট কন্যা শিশু। একটু পর পর মাথা তোলে চেয়ে দেখছে মায়ের অশ্রু সিক্ত মায়াবী মুখ। মুখে মলিন হাসি, চোখে চাঞ্চল্য, কোলে অবুঝ শিশু। অথচ, গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এই বুঝি নারী!
ছোট্ট মেয়েটি রিহানের দিকে হাত বাড়াল। রিহান ভ্রু কুঁচকে মুচকি হাসল। মেয়েটি মাড়ি ফেটে বেড়িয়ে আসা দুটো দাঁত বের করে হেসে ফেলল। বাঁ হাতের আঙুল সব মুষ্টিবদ্ধ করে মুখের ভিতর দিয়ে পা ছুঁড়াছুড়ি করে খেলতে খেলতে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ল সে। কপালের বাঁ পাশের কালো কালির টিপ রিহানকে নিয়ে গেল ছেলেবেলায়। নানুর বাড়ি যেতে কত আয়োজন হত তখন। ভোরে ঘুম থেকে তোলে সারা শরীরে সাবান মাখিয়ে গোসল করিয়ে দিতেন মা। মাটির চুলা থেকে কালো কালি আঙুলে নিয়ে কপালের বাঁ পাশে বসিয়ে দিতেন। আরো কত কী! বেলা বাড়ার সাথে সাথে রৌদ্রের তাপ বাড়ছে। ভ্যাপসা গরম পড়েছে। আকাশ পরিষ্কার। রিহান বলল, ‘কী দেখছেন অমন করে?’
মেয়েটি কিছু বলল না। নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে রইল জানালার বাইরে। এখন আর চোখ থেকে পানি ঝড়ছে না। গালে অশ্রুজলের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যাচ্ছে। চোখদুটো স্বচ্ছ, সাদার উপর কালো বিন্দু। একটুও লাল হয়নি। একটুও না। অথচ, রিহানের মন খারাপ হলেই চোখদুটো লাল হয়ে যায়। টকটকে লাল। আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় হয় তখন।
রিহান অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, ‘আপনার নামটা জানতে পারি?’ মেয়েটি কিছু বলল না। রিহানের দিকে তাকাল। মুচকি হাসল একটুখানি। হাসিতে কৃতজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে মস্ত কাপড়ের ব্যাগ ট্রেনে তোলতে পারছিল না সে। রিহান বাচ্চা মেয়েটিকে কোলে নিয়েছিল তখন। ব্যাগ এনে সিটের পাশে রাখার পরেই আবার ফেরৎ দিয়ে দেয়। মেয়েটি তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। এখন হাসির ছলে ধন্যবাদটুকু দিয়ে দিচ্ছে না তো! ব্যাগ থেকে এক টুকরো কাগজ হাতে নিয়ে রিহানের চোখের সামনে মেলে ধরল সে। কাগজে লেখা, ইরা ইসলাম। রিহান বলল, ‘আপনার নাম?’
মেয়েটি তখন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে আবারো জানালার বাইরে দৃষ্টি রাখল। আপন গতিতে ছুটে চলেছে যাত্রীবাহী ট্রেন। সাই সাই করে পিছন দিকে চলে যাচ্ছে মাঠের পর মাঠ। জানালা দিয়ে ধু ধু বাতাস প্রবেশ করে ওড়নার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা ইরার এক গোছা চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। রিহান বই খোলে বসে আসে। পড়ছে না। আজ সে বই পড়বে না। সামনে বসে থাকা ইরা নামক মেয়েটিকে পড়ে দেখবে সে। এক বৃদ্ধ চা বিক্রি করছেন। প্লাস্টিকের পেয়ালায় লেবু চা। পরনের লুঙ্গি আর শার্ট পুরনো হলেও মুখের হাসিটা মলিন নয়। বরং উজ্জ্বল। পরনের কাপড় দেখলে বোঝা যায় দরিদ্রতা তাকে কতটা কাবু করেছে। অথচ, মুখের হাসিটা দেখলে মনে হয়, তার চেয়ে সুখি এ-জগতে দ্বিতীয় কেউ নেই! রিহান বিনয়ী কণ্ঠে বলল, ‘চা?’
ইরা মৃদু হেসে ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়াল। চা’অলা বিনীত কণ্ঠে বললেন, ‘এক কাপ দিই, মা। গরম চা, টাটকা গরম। দেব এক কাপ?’ ইরা এবারও ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়াল। চা’অলা চা ফেরি করতে করতে এগিয়ে গেলেন। ইরার কোলে শুয়ে থাকা মেয়েটি চোখ খোলে তাকাল। রিহান আঁড়চোখে চেয়ে দেখল। ছোট্ট মেয়েটি তীব্র বিরক্তি নিয়ে হাই তুলল। রিহান চোখ টিপি দিতেই মেয়েটি শব্দ করে হেসে উঠল। ইরা তাকে ওড়নার ভিতর লুকিয়ে রাখল। মেয়েটি একটু পর পর ওড়নার ভিতর থেকে মাথা বের করে চেয়ে দেখছে রিহানকে। আবারো লুকিয়ে যাচ্ছে মায়ের ওড়নার আড়ালে।
চট্টগ্রাম স্টেশনে ট্রেন থামল। পড়ন্ত বিকেল। যাত্রীরা একে একে ট্রেন থেকে নামছেন। ইরা মেয়েকে কোলে নিয়ে ব্যাগ টানতে টানতে হারিয়ে গেল যাত্রীদের ভীড়ে। স্টেশনের প্লাটফর্মে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল রিহান। বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে খুব আপন কেউ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাকে। অল্প সময়ের যাত্রায় খুব বেশি মায়া পড়ে গেছে মেয়েটির প্রতি। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসলো ইরা। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমার বইটা আপনার কাছে রয়ে গেছে। খুব প্রিয় একটি বই। নাহলে নিতাম না।’ বই নিয়ে ব্যাগ টানতে টানতে ধীর গতিতে চরণ ফেলে ফেলে যাত্রীদের ভীড়ে হারিয়ে গেল সে।
গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত