জলাতঙ্ক

আষাঢ়ের অবিশ্রান্ত ধারা শুরু হয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ চারিদিকে মাতিয়ে তুলছে।

চারিদিকে কেবলি সবুজের সমারোহ। একটু সামনের নদী উপচে পড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে চারিদিক। চারদিকে থৈ থৈ পানি এক নতুন আবহাওয়ার সৃষ্টি করছে। সব ডোবা গুলো আজ কানায় কানায় ভরে উঠেছে। বিলে বিলে হেলেঞ্চা ও কলমিলতার সমারোহ যোগ করেছে প্রকৃতিতে এক নতুন মাত্রা। কেয়া, কদম, কামিনী, জুঁই, গন্ধরাজ এর মন পাগল করা গন্ধ মনটাকে কেমন যেন ব্যাকুল করে তুলছে।

এ রকম আবহাওয়ায় জানালার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে পারুল। পারুলের দু চোখ বয়ে ঝরছে শ্রাবনের অঝোর ধারা। কেমন যেন উদাস হয়ে দাড়িয়ে আছে।

শিমুল আর পারুল দুই ভাই বোন। পারুল এবার সবে মাত্র উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে। আর শিমুল ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়তো । পড়তো এই ভাষায় বললম, কারন গত বছর আষাঢ়ের এই সময় শিমুল চলে গেছে না ফেরার দেশে।

শিমুল বেশ দুরন্ত গোছেরে ছেলে, সারাদিন কেবল ছুটাছুটি । বেশ ডানপিটে ছিল। পারুল অসম্ভাব ভালোবাসতো ওর ছোট ভাই শিমুলকে। দুই ভাই বোনের মধ্যে খুনসুটি লেগে থাকতো সব সময়। স্কুলে যাবার সময় শিমুল পারুলকে সব সময় কিছু না কিছু বলে যেত, এই যেমন আজ স্কুল ছুটির পর শিমুল ঘুড়ি উড়াতে যাবে কিম্বা আজ ও ফুটবল খেলতে যাবে। সে দিনও শিমুল বলে ছিল , “বুবু আজ স্কুল থেকে এসে তোমাকে নিয়ে মোহন পুরের মেলায় যাব। ”

সকাল শেষ দুপুর গড়িয়ে গেল শিমুলের আসার সময় হয়ে গেছে। পারুলের মনের মাঝে কেন যেন অজানা এক শংকা কাজ করছে। হঠাৎ বাড়ীর সামনে কিছু লোকের জটলা দেখে দৌড়ে ঘরের বাইরে বের হলো , দেখলো সাত আটজন জন লোক , এর মাঝে দুজন লোক শিমুলকে ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে আসছে।

শিমুল তখনো হাসছে আর বলছে , “আমার কিছু হয় নি ,কুকুরে একটু কামড়েছে। ” আর তখনও শিমুলের পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। পারুল পারিস্কার করে ক্ষততে স্যাভলন দিল। রক্ত পড়া বন্ধ হলো। এর মধ্যেই শহরে থাকা ওদের বাবার কাছে খবর পৌঁছে গেছে। আগামী কাল দুপুর নাগাত ওদের বাবা আসবে । বাবা এলে শিমুলকে গঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে যাবে। পারুল অনেক বকাঝকা করলো শিমুলকে।

পরের দিন ওদের বাবা এলো। সাথে সাথে গঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে গেলো। হাসপাতালে নিতে নিতে প্রায় ২৬ ঘন্টা পার হলো। তবে ডাক্টারের শংকা ছিল যে ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গিয়েছে। তবুও প্রথম ইনজেকশনটি দিল।

বাড়ীতে এলো শিমুল। শিমুল যে দিন বাড়ী এলো সে দিনও বেশ বৃষ্টি ছিল।তার পর থেকে বৃষ্টি যেন আর থামছে না। একে তো আষাঢ় মাস তার পর বাধ ভাংগা বৃষ্টি যনে জন জীবনকে অচল করে দিয়েছে।

দু’দিন পরেই শিমুলের জ্বর আসলো। রাতের দিকে জ্বরের প্রকোপ ক্রমেই বাড়তে লাগলো। জ্বরের মধ্যে শিমুল কেমন যেন করতে লাগলো। পারুল কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না,সারাটা সময় শিমুলের পাশে পাশে থাকে পারুল। পারুলের সাধ্য মতোন চেস্টা করতে লাগলো শিমুলের যেন কোন কষ্ট না হয়। এর মধ্যেই শিমুলের সমস্ত হাত পা ম্যাজ ম্যাজ করছে। মাথায় প্রচন্ড বেগ। আর মাঝে মাঝে বমির ভাব , পারুল ঘবিড়ে যায়। সারাটা সময় শিমুলের মাথা টিপে দেয়,হাত পা টিপে দেয় আর যা খেতে ইচ্ছে করে শিমুলের তা তার সামনে হাজির করে।

৫ দিনের মাথায় শিমুলের জ্বর কোমার লক্ষণ নেই। সারাটা সময় বলে,” বুবু আমার গলায় ভীষন ব্যাথা, ঢোক গিলতে ভীষন কষ্ট হচ্ছে।” বার বার পানি চাইছে শিমুল কিন্তু সামনে পানি আনলেই হাত দিয়ে তা খেতে চেষ্টা করে শিমুল কিন্তু কিছুতেই পানি পান করতে পারে না। এর পর পানি আনলেই কেমন যেন আতঙ্ক বোধ করে। পারুলের বুকটা ফেটে যায় কিন্তু কিছুই করতে পারছে না,শুধুই চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।

ডাক্টার বলেছে যে, শিমুলের জলাতঙ্ক হয়েছে। কোন চিকিৎসায় কাজ করছে না। পারুল দেখছে শিমুলের মুখ থেকে লালা ঝরছে, ও কেমন যেন ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে। আর ড্যাব ড্যাব চোখে চেয়ে আছে পারুলের দিকে। এ সময় বৃষ্টির প্রবলতাও বাড়ছে। চারিদিক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবল বর্ষার মাঝে কিছু কিছু উঁচু জায়গা কে পাহাড়ের ঢিবির মতোন মনে হচ্ছে।রাতের দিকে শিমুলের মধ্যে অস্বাভাবিক মাসিক আচরন দেখা যায় ,কেবলি পানি পানি বলে চিৎকার করছে ,বৃষ্টিার পানি দেখে কেমন যেন করছে। শেষ রাতের দিকে ছটফট করতে করতে শিমুল কেমন যেন নিথর হয়ে যায়। হ্যা, শিমুল চলে গেছে না ফেরার দেশে।

পরের দিন সকালে সবাই এলো সাদা কাপড়ে মোড়ানো হলো শিমুলের দেহ। কবর দেবার জন্য এই প্রবল বর্ষায় কোথাও এতটুকু শুকনো জায়গা পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত সেই উঁচু ঢিবিতেই কবর দেওয়া হলো শিমুলকে। পারুল আজ এই বর্ষণ মুখর দিনে জানালার বাইরের দৃষ্টিসীমার মধ্যে তাকিয়ে ভাবছে ,যে শিমুল পানিকে এত ভয় পেত আজ তার শেষ ঠিকানা হলো সেই পানির মধ্যেই। তাইতো পারুল আজও বর্ষণ মুখর দিনের এই প্লাবনের মাঝে খুজে ফিরে শিমুলকে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত