আমার মেয়ের কান্না

আপনারা যারা আমার লেখা পড়েন,আপনারা সবাই জানেন আমার কথা আমার বর্তমান বাস্তবতা।

আজ আমি আপনাদের কাছে তুলে ধরবো আমার বর্তমান অবস্হা। আমি আজ আপনাদের সমনে তুলে ধরবো আমার বর্তমান অসহায় অবস্হার কথা।

আমার বড় মেয়েটা দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়ে গেছে। কিন্তু মনে হয় এই তো সেদিন ও আমার জীবনে খুশির বারতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলো। সে সময় আমার বয়সও কম ছিলো,মনে হতো ছোট্র একটা জীবন্ত পুতুল যেন আমার সাথে সমস্ত সময় খেলা করে। তার পর সময় আস্তে আস্তে বয়ে যেতে লাগলো নদীর স্রোতের মতোন। আমার সেই ছোট্র পুতুলটি এক সময় নিজেই পুতুল খেলা শুরু করলো, এক সময় আমার মেয়েটার পুতুল খেলার বয়সটাও পার হলো।

আস্তে আস্তে স্কুলে যেতে লাগলো। প্রথম যেদিন ওকে স্কুলের পোশাকে দেখলাম মনটা কেমন যেন এক অজানা খুশিতে ভরে গেলো।

সময় কখনো থেমে থাকে না আস্তে আস্তে ভরা নদীতেও পড়ে সরু বয়ে চলার স্মৃতি চিহৃ। আমার মেয়েটাও তার স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে প্রবেশ করলো কলেজ জীবনের অধ্যায়ে ওর কলেজ জীবনের ১ম বর্ষের শেষে আমার জীবনেও নেমে এলো এক মহা বিপর্যয়। কেবল নিজের সততা আর নীতি বাঁধা হয়ে দাড়ালো আমার চাকুরীর ক্ষেত্রে। আসলে সততার মূল্য দিতে যেয়ে হারাতে হলো আমার চাকুরীটা।চাকুরীটা হারিয়ে হয়ে গেলাম সম্পুর্ন বেকার।

কিন্তু প্রকৃতির সময় তো আর আমার জন্য থেমে থাকেবে না, এটাই নিয়ম। আর এ নিয়মে এক সময় আমার মেয়েও উঠে যায় কলেজের ১ম বর্ষ থেকে ২য় বর্ষে কিন্তু বাধ সাধলো আমার আর্থিক সমস্যা। এক সময় অসম্ভাব হয়ে উঠলো ওর পড়াশুনার ভবিষৎ, ঠিক এমন কঠিন সময়ে আমার সামনে এগিয়ে আসলো আমার ফেসবুকের পরিচিত বন্ধু শাহজাহান কবির(সম্রাট) আর আমার বিশ্ব বিদ্যালয়ের বন্ধুরা, আমার স্কুলের বন্ধু হাবিব সহ তাদের সকলের সহযোগীতায় আমার মেয়ের পড়াশুনাটা আবার চালু হয়। ২য় বর্ষে আবার সে নতুন উদ্যমে ওর পড়া চালিয়ে যেতে থাকে।

নিষ্ঠুর সময় তার প্রবল আঘাতটা হানে আমার উপর, শত চেষ্টার পরেও একটা চাকুরী কোথায় পাচ্ছি না। কিন্তু সংসার কিম্বা খরচ কোনটাই তো আর থেমে থাকে না।

তাই সব লাজ লজ্জাকে কবর দিয়ে হাতের কলমের জায়গায় ধরলাম রিক্সার শক্ত হাতোলকে। সমাজের কাউকে জানতে দিলাম না সে কথা নিজের হার্টে একটা রিং লাগানো আবার ১০০% ব্লক নিয়েই ঝাপিয়ে পড়লাম জীবন সংগ্রামে।

রাতের অন্ধকার আমার সবচেয়ে ভয়,তাই সেই অন্ধকার হয়ে গেলো আমার সাথী। রাতের অন্ধকার আর রিক্সার শক্ত হাতোল আর সমাজের সকলের সাথে প্রতিনীয়ত ভালোথাকার অভিনয়টা হয়ে উঠলো আমার জীবনের একটা অংশ।

দিনের বেলায় আমার স্বাভাবিক ভালো থাকার জীবনটা দেখে কেউ বুঝতেও পারেনা আমার রাতের নিরব কান্নার সেই ক্ষত। সমাজের সাথে আর নিজের সাথে অভিনয় করতে করতে যে সময় আমি ক্লান্ত, যে সময় আমার মেয়েদের পড়াশুনার খরচটা আমার কাছে পাহাড় সম মনে হতে লাগলো সে সময় আবার এলো আমার কাছে বড় এক আঘাত, চলে আসলো মেয়ের এইচ,এস,সি, পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়।

হাতে পেলাম ৫ মাসের বাড়ী ভাড়া বকেয়ার কারনে ১ মাসের মধ্যে বাড়ী ছাড়ার নোটিশ। আর আমি হয়ে পড়লাম সম্পুর্ন অসহায়।

রাতের শারিরিক পরিশ্রম আর মেয়ের পরীক্ষার চিন্তা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিলো আমার হৃদয় যন্ত্রটা ভালো নেই।

প্রচন্ড ব্যাথা,যেটা সহ্যের সীমানাও অতিক্রম করেছে। আর আমি কারো কাছে হাত পেতে ভিক্ষা নিতেও পারছি না। অবশেষে সিন্ধান্ত নিলাম না আর নয়, আর নয় নিজের সাথে নিজেকে ছোট করার প্রায়াস। তাই বাধ্য হয়ে মেয়েটার পড়াশুনাটাই বন্ধ করে দিলাম।

আমার জীবনে আমি আমার মেয়েকে ৩ বার কাঁদতে দেখেছি,

প্রথম বার ও যখন পৃথিবীর বুকে আসলো,সে দিন সে প্রচন্ড কান্না করেছিলো হয়তো ও বুঝতে পেরেছিলো জন্মই তার আজন্মের পাপ।

দ্বিতীয় বার ওকে আমি কাঁদতে দেখেছিলাম যে দিন আমি হার্ট স্ট্রোক করে প্রথম বার চোখ খুলে তাকালাম।

আর আজ তৃতীয় বার যখন সে জানতে পারলো তার আর পড়াশুনা হবে না।

একজন বাবার কাছে তার আদরের সন্তানের কান্না যে কতোটা ভয়ানক হতে পারে তা বাবা না হলে হয়তো বুঝতেও পারতাম না।

হয়তো সময়ের প্রবাহে আমি থাকবো না কিন্তু কবরের অন্ধকার ঘরে ওর কান্নার শব্দটা যে আমাকে প্রত্যেক সময় অস্হির করে তুলবে।

আর বেঁচে থাকার সময়টা আমার মেয়েটার চোখের পানি আমাকে করে তুলেছে জীবন্ত এক মমী। বেঁচে থেকে বাবার সামনে সন্তানের চোখের জল যে কতোটা ভারী তা হয়তো যারা জানেন তারা ছাড়া অন্য কেউ তো বুঝবে না।

আজ আমি প্রতিনীয়ত বয়ে চলছি সেই জীবন্ত মমী কে।

আমি জানি না এর শেষ কোথায়?

আমার মৃত্ত্যতে?

নাকি আমার মেয়ের আত্নহত্যাতে?

এসব কোন প্রশ্নের উত্তর আসলে আমার জানা নেই,আমি জানিনা কেউ এর উত্তর জানেন কিনা!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত