অসমাপ্ত ঈদ

আজ সকাল থেকে মা মহা সমারোহে ঘর গোছাচ্ছেন। কাল সকালে ভাইয়া ইদের ছুটি নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরছে। তাই আজ মায়ের মনে খুশি ধরছে না। কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে ঘরের কোণার মাকড়সার জালগুলো ঝাড় দিয়ে ফেলছেন। আমাকে মাঝে মাঝে এসে ধমকা ধমকি করছেন, “আচ্ছা, তুষারের বিছানায় চাদর বিছিয়েছিস? এমন আইলসা কেন তুই? যা, আলমারিতে একটা নীল রঙের চাদর আছে, ওইটা বের করে বিছিয়ে দে।” কেমন বিরক্ত লাগে! মা এতোটা যন্ত্রণা করছে যেন তার ছেলে নয়, কোন ভি.আই.পি গেস্ট আসছে আমাদের বাসায়। নাড়ী ছেঁড়া সন্তানের প্রতি টান এমনই হয়!

দুইটা টিউশনি করি, এরমধ্যে একটির বেতন আর বোনাস দুইটাই হাতে পেয়েছি। অন্যটার বোনাস তো দূরের কথা! বেতনটাই এখনো দেয়নি! এবার ইদে নতুন কোন জামা, কাপড় কিছুই নেইনি। মা’কে একটা চিকন পাড়ের হালকা হলদে রঙের শাড়ি কিনে দিয়েছি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মাকে আর কখনও উজ্জ্বল রঙের শাড়ি পড়তে দেখিনি। মা সেই নতুন শাড়ি বের করে আলনায় গুছিয়ে রাখছেন। ছেলে আসবে, একটু ভালো কাপড় না পড়লে কেমন দেখা যায়!

ভাইয়া মিষ্টি পছন্দ করে, মা তাই পায়েস রেঁধেছেন। এই পায়েস খাইয়ে তবে ছেলেকে চৌকাঠ থেকে ঘরে ঢুকতে দিবেন, এর আগে নয়। কতো বছর পর তার ছেলে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছে। মায়ের হাতে কিছু টাকা জমানো ছিল। সেই টাকা দিয়ে ছেলের জন্য পাঞ্জাবি কিনেয়েছেন। পাঞ্জাবি এনেও তার চিন্তার শেষ নেই। এই পাঞ্জাবি তার গায়ে মানানসই হবে তো? রঙটা মানাবে তো? এই পাঞ্জাবি কি তুষারের পছন্দ হবে?

মায়ের মন এই কয়দিন ধরে বেশ ফুরফুরে। মাঝে মাঝে শুনতে পাই গুনগুন করে গানও গাইছেন। এমনিতে মা সারাদিন মনমরা হয়ে থাকেন। একয়দিন তাকে এতো খোশমেজাজে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই ঈদ এসে গেছে।

আজ বাদে কাল ঈদ। আজ চাঁদরাত। ঘরে ঘরে মেহেদী পরার ধুম পড়েছে। বসে বসে হাতে মেহেদী পড়ছিলাম, ঠিক এমন সময় রাফি ফোন করলো। রাফির সাথে আমার আমাদের বাগদান হয়েছে। ইদের পরে বিয়ের কাজটাও সেরে ফেলা হবে অতিদ্রুত। রাফি ফোনে আমার কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারলো আমি কাঁদছি। ওপাশের ঘর থেকে মায়ের গুনগুন গানের শব্দ যতোই তীব্র হচ্ছে, আমার কান্নার শব্দও যেন ততোটাই তীব্র হচ্ছে।

আজ ইদ। মা এখনও তার শেষ আশা ছাড়েননি। অপেক্ষায় বসে আছেন, তার ছেলে আসবে। রাফি আর আমি সোফায় বসে আছি। সামনের টেবিলে সেমাই রাখা। মা শখ করে ভাইয়ার জন্য সেমাই বানিয়েছেন। রাফিকে ক্ষণে ক্ষণে জিজ্ঞেস করছেন, “বাবা, মিষ্টি কি বেশি হইছে?” মার্কেট থেকে কিনে আনা সেই পাঞ্জাবিটার ভাঁজ খুলে খুলে রাফিকে দেখাচ্ছেন। মায়ের চোখ আনন্দে চকচক করছে। সেই চোখের কোণে আনন্দে পানি জমে গেছে। সেই পানি আড়াল করতে মা চোখ মুছতে মুছতে রান্নাঘরে চলে গেলেন।

রাফি আমার দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকালো। আমি সেই চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না, চট করে চোখ সরিয়ে নিলাম। নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধী মনে হচ্ছে। রাফি ভারী গলায় বলল, “তিথি, তোমার আন্টির ভুল ভাঙানো উচিৎ।”
– আমি পারবো না।
– তোমাকে পারতে হবে। যতদিন পর্যন্ত তুমি সত্যিটা ওনাকে না বলবে ওনার সিজোফ্রেনিয়া রোগটা মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। দিন দিন আন্টির অবস্থা কী হয়েছে দেখছো তুমি?
– এমন কথা আমি কীভাবে বলবো বলো? গতবছর ঈদের ছুটি নিয়ে ভাইয়ার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। যে বাসে করে ভাইয়া আসছিল সেই বাস এক্সিডেন্টে নিহত চারজনের মধ্যে আমার ভাইটাও ছিল। ভাইয়া ইদের ছুটি কাটাতে সত্যিই বাড়ি ফিরল, তবে লাশ হয়ে… ভাইয়ার পুরো শরীর থেঁতলে গিয়েছিল, কতটা কষ্ট নিয়ে যে তাকে মরতে হয়েছে! না.. আমি আর মনে করতে চাই না। মা কত আশা নিয়ে বসে ছিলেন তার ছেলে ঘরে ফিরে ইদ করবে, কিন্তু ভাইয়ার লাশটা দেখে মা একটুও কাঁদেনি জানো? ধীরে ধীরে মায়ের মাথাটা কেমন যেন হয়ে গেল। মা যেন ব্যাপারটা ভুলেই গেলেন তার ছেলে আর পৃথিবীতে নেই। প্রতি ঈদে অপেক্ষায় বসে থাকেন তার ছেলে বাড়ি ফিরবে। এই আশায় তার মুখে হাসি ফুটে। এই আশাটুকু আমি কেমন করে মুছে দেই বলো? আমার ভাইটা যে আমাদের ছেড়ে চলে গেল… ও আর ঈদ করতে পারবে না… ও..

আমার গলা জড়িয়ে এলো। হু হু করে কান্নার বাঁধ আমার চোখ ঝাঁপিয়ে বের হয়ে এলো। অথচ, অথচ মা গুনগুন করে আনন্দে রান্নাঘরে গান গাইছেন। এ আনন্দ তার ছেলে ঘরে ফিরে আসার আনন্দ, যে ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত