হারুনের নীল জুতা

মজিদ অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তা সঠিক সে নিজেও বলতে পারে না। সে অপেক্ষা করছে যোহরের আজানের। শুনে মনে হতে পারে সে অনেক নামাজী বান্দা, কিন্তু সে আসলে জুম্মার নামাজ ছাড়া আর কোনো নামাজই আদায় করেনি জীবনে। প্রতি ওয়াক্তেই সে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে আজানের জন্য, আজান শেষ হলে সকলের ভীড়ে সেও ঢুকে যায় মসজিদে। সুযোগ পেলে হাতটান দিয়ে লুঙ্গির কোচরে রেখে দেয় নতুন চকচকে জুতা। আজ তাকে চুরি করতে হবে একটা রঙিন ছোট্ট জুতা, ছয় বছরের ছেলের পায়ের মাপের। জুতাটা নিতে হবে মজিদের পাঁচ বছরের ছেলে হারুনের জন্য।

বছরের শুরুটায় শীত থাকে প্রচণ্ড। গায়ের সোয়েটারও শীত মানতে চায় না, সেখানে মজিদ পরে আছে নরম, পাতলা একটা গেঞ্জি। তবে এতে ও’ম আছে অনেক। গেঞ্জিটা সে গত পরশু গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে গরম কাপড় কেনার বাহানায় হাতসাফাই করেছে। বিক্রেতা বুঝতেও পারে নি, কত সহজভাবেই না শার্টের আড়াল করে সে সেটা চুরি করে নিয়েছে! শুধু কি তার নিজের জন্য? তার হারুনের জন্যও সুন্দর নীল রঙের একটা সোয়েটার চুরি করেছে সে। ফুটপাতের লোকটাকে ফাঁকি দেওয়ার আনন্দে মুচকি হাসি ফুটে উঠল মজিদের ঠোঁটের কোণে। কয়েক পা এগিয়ে সামনের হোটেলে বেশ আয়েশ করে বসল সে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে, তবুও বেশকিছু মানুষ বসে সকালের নাশতা হামলে পড়ে খাচ্ছে। ঠোঁটের কোণায় বিড়ি ধরিয়ে হাতের ইশারায় একজনকে এক কাপ চা আনতে বলল মজিদ। আজানের অপেক্ষা করতে চা খেয়ে সময়টুকু কাটানো যাক। বিড়িতে জোরে একটা টান দিয়ে আকাশে ধোঁয়া উড়িয়ে ভাবতে লাগল তার হারুনের কথা। চাঁদের মত মিষ্টি দেখতে তার ছেলের মুখটা, অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! তার জন্ম হয়েছে বস্তির নীল পলিথিনে ঘেরা এক ছাউনিতে। ছেলেটার জন্মের সময় মজিদ তার স্ত্রীর কাছে থাকতে পারে নি; তখন সে ছিল হাজতে, আফজাল সাহেবের বাসায় চুরি করার অপরাধে। তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাকে পরদিনই ছেড়ে দেয়া হয়। পলিথিনের তৈরি নিজের নাজুক বাসায় ফিরে ছোট্ট একটা চাঁদকে পেয়েছে ঠিকই, সেইসাথে হারিয়েছে তার ঘরের লক্ষ্মীকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার স্ত্রী দু’জনকেই একা রেখে ওপারে চলে গেল। স্ত্রীকে কবরে শুইয়ে বাচ্চাটাকে কোলে জড়িয়ে কত কেঁদেছে সে। সেই থেকেই বড় মায়া তার মা হারা ছেলেটার উপর। তাকে দেখাশোনার জন্য দুইবছর পর বিয়ে করে আনল নতুন বৌকে। কিন্তু ছেলেটার নতুন মা যে তাকে একেবারেই সইতে পারে না সেটা মজিদ বুঝে। শুধু সে বাড়ি ফিরলেই যেন নতুন বৌয়ের সমস্ত মায়া এসে পড়ত তার হারুনের উপর। মজিদ বুঝেও কিছু বলতে পারত না, তবে মাঝে মাঝে যখন নেশা করে বাড়ি ফিরত, বৌ পান থেকে চুন খসালেই তাকে মেরে সমস্ত জিদ মিটিয়ে নিত। সুযোগটা সে হাতছাড়া করে নি।

হারুনের চেহারাটা বড় মায়াকাড়া। কত আবদার তার বাবার কাছে। মজিদ গরীব হলে কি হবে, চোর হলে কি হবে, সেও তো মানুষ! বড়লোকদের মত তার বুকেও ছেলের জন্য অনেক মায়া আছে। যখনই পেরেছে ছেলেটার আবদার পূরণ করেছে, তা সেটা চুরি করেই হোক না কেন! সেদিন ছেলেটা নতুন সোয়েটার পেয়ে কতই না খুশিতে লাফিয়েছে। সাথে সাথে পরে তার সব বন্ধুদের দেখিয়েছে। রাতের বেলায়ও সে ছেঁড়া কাঁথার নিচে সোয়াটার পরে ঘুমায়। “কি পাগল ছাউয়াল আমার!” বলেই মনে মনে হাসে মজিদ। ছেলেটা এবার বায়না ধরেছে নীল সোয়েটারের সাথে মিলিয়ে সে নীল জুতা পরবে। সামনের বাড়ির বাবুসাহেবের ছেলে নাকি নীল সোয়েটারের সাথে নীল জুতা পরে স্কুলে যায়। হারুন সেদিন বরফপানি খেলার সময় দেখেছে। এখন তার শখ হয়েছে সেও অমন নীল সোয়েটারের সাথে মিলিয়ে নীল জুতা পরবে। হারুন নিশ্চিন্ত। কারণ সে জানে তার বাবা যে করেই হোক তার আবদার পূরণ করবেই। তবে মজিদ চিন্তিত কারণ, এখন পর্যন্ত কোনো ছয় বছরের ছেলেই নামাজ পড়তে আসে নি। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়েই মজিদ আবার তাকাল মসজিদের গেটের সামনে। ওইতো ওইতো একটা ছয় সাত বছরের ছেলে জুতা খুলে তার বাবার সাথে মসজিদে ঢুকছে। কিন্তু ছেলেটার পায়ে যে লাল জুতা! মজিদ কি আর একটু অপেক্ষা করবে? নাহ, আর অপেক্ষা করলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চা শেষ করে টাকা দিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ল মজিদ। লোকে যেন সন্দেহ না করে তাই আস্তে করে হেঁটে চলে গেল ওজুখানায়। মসজিদে সে যেমন নামাজ পড়তে ঢুকে না তেমনি ওজুখানায়ও সে ওজু করতে আসে নি। সে তো শুধুমাত্র ওজু করার ভান করছে। আড়চোখে দেখতে লাগল ওজু করতে গিয়ে কেউ তার ঘড়ি, ব্রেসলেট মানিব্যাগ খুলে রেখেছে কিনা! হ্যাঁ, ওইতো লোকটা তার হাতের দামি ঘড়ি, চশমা আর পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেলফের উপর রাখল। মজিদ মুখ মুছার বাহানায় উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে করে হাতটান দিয়ে নিয়ে নিল সেগুলো। বেশ পেটমোটা মানিব্যাগ মনে হচ্ছে, খুশিতে চকচক করে উঠল মজিদের চোখ। সবকিছু বগলের তলায় লুকিয়ে চট করে ওজুখানা থেকে বেরিয়ে পড়ল সে। নামাজ শুরু হয়ে গেছে। কাঁধের গামছাটা বিছিয়ে নিরিবিলি জায়গা বেছে বসে পড়ল মজিদ। তার নামাজের দিকে ধ্যান নেই, সমস্ত ধ্যান পড়ে আছে সামনে বসে থাকা লোকটার প্যান্টের পকেটে উঁকি দিয়ে থাকা মানিব্যাগ আর তাসবীহটার দিকে। নামাজের তৃতীর রাকাতে সবাই সিজদাহ দিলেই মজিদ সাবধানে হাত বাড়িয়ে লোকটার পকেট থেকে মানিব্যাগ আর তাসবীহটা নিয়ে নিজের লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে নিল। চতুর্থ রাকাত শেষ হলেই সে মোনাজাত শেষ করে হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো মসজিদ থেকে।

মসজিদের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জুতা খুঁজার বাহানায় খুঁজতে লাগল সেই ছোট্ট লাল জুতাজোড়া। ছেলেটা সিঁড়ির কোণায় জুতাটা রেখেছিল, এত এত মানুষের জুতার মধ্যে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে লাল জুতাটা খুঁজে পেতেই বুকে শান্তি ফিরল তার। আড়চোখে চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে জুতাটা গেঞ্জির নিচে লুকিয়ে নিল সে। নিজের স্যাণ্ডেলটারও বেহাল দশা হয়েছে ভেবে নতুন একজোড়া স্যাণ্ডেলে পা গলিয়ে অবলীলায় হাঁটতে লাগল সে। মনে মনে ভাবতে লাগল, “ইশ ছাওয়ালডা আমার জুতাখান পাইলে কি খুশিডাই না হইবি। তয় মনে দুক্কু পাইতে পারে লাল জুতা নিসি বইলে। থাইক গে, জুতাখান পায়ে দিলে তার মনে আর গোসসা থাকবি নে। নীল সুইটার, নীল জুতায় আমার ছাওয়ালডারে ঠিক বাবুসাহেবের মত ছাওয়ালডার মত লাগবি।” গেঞ্জির নিচে জুতাটা বুকে চেপে ধরে দ্রুত পা চালাতে লাগল মজিদ।

বস্তির রাস্তার মাঝখানে এসেই থমকে দাঁড়াল মজিদ। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল তার। রাস্তার মাঝে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। দেখে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই এখানে কোনো দূর্ঘটনা ঘটে গেছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। সবাই মুখ কালো করে কি যেন বলাবলি করছে। এদিকটায় গাড়ির যাতায়াত বেশি। তার হারুনটাও তো এদিকেই বেশি খেলতে আসে। একথা মনে পড়তেই আবার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল তার। হারুনটা এদিকে বরফপানি খেলতে গিয়ে আবার… বুকের মধ্যে ব্যাথায় চিনচিন করে উঠল তার, মাথা ঘুরিয়ে আরেকটু হলে পড়েই যেত সে, যদি না কোনো নরম ছোট্ট হাত তাকে ছুটে এসে জড়িয়ে না ধরত। “বাপজান, তোমার কি হইছে?” হারুনের কণ্ঠস্বর শুনেই চমকে পাশে তাকাল মজিদ। হারুন বলল, “বাপজান, এহানে একটু আগে যেই ফাইট হইছে! মতি চাচা আর পরাণভাইয়ের মধ্যে কি মারামারিটা লাগল। পরাণভাই ইটা দিয়া বারি মাইরা মতিচাচার মাথা ফাটায়া দিসে। ম্যালা রক্ত বাইর হইসে। দেহো না রাস্তায় রক্ত!” মজিদ আরেকবার রাস্তার দিকে তাকাল।

রক্ষণেই পাশ ফিরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিল হারুনের দুই গাল। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ঠিক তেমনিভাবে যেমনটি সে পাঁচবছর আগে কেঁদেছিল। হারুন কিছু বুঝে উঠতে পারল না, শুধু তার বাবার গালের পানিটুকু মুছে দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “বাপজান আমার জুতা আনসো?” মজিদ গেঞ্জির নিচ থেকে জুতাজোড়া বের করে ছেলের হাতে তুলে দিল। হারুনের খুশি আর দেখে কে! তক্ষুণি জুতাজোড়া পায়ে দিয়ে দৌড়ে ছুটে গেল হাবুদের দেখানোর জন্য। মজিদ চোখের পানি মুছে তাকিয়ে দেখল, নীল সোয়েটারে সাথে লাল জুতায় তার রাজপুত্রকে বেশ মানিয়ে গেছে তো!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত