জীবন যেন গল্পগুচ্ছ

ভেজা শরীরে কাঁপতে কাঁপতে সে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম।” সঙ্গে সঙ্গে হাসেম চেঁচিয়ে উঠল, “ওই যাহ! সালাম দেস কে? দেখতাছোস না, মাস্টার সাব খানা খাইতাছে?” জামান ভাত মুখে তুলে অবাক হয়ে বলল, “এই লোক কে?” হাসেম বলল, “পাগল, পাগল স্যার। হের নাম পানি পাগলা। সারাদিন পানিতে থাকে।” পানি পাগলা মাথা চুলকে বলল, “হাসেমভাই, এই ব্যাডা ক্যাডা?” হাসেম আবারও চেঁচিয়ে উঠল, “ব্যাডা কি? হ্যাঁ? স্যার বল। হে আমাগো প্রাইমারি স্কুলের নতুন ইংরেজি মাস্টার।” পানি পাগলা কিছু বুঝল বলে মনে হলো না, বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলল, “আমারেও খানা দেন। ভুখ লাগছে।” হাসেম দু’হাতে যাহ যাহ বলে কুকুর তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করল।

চেয়ারম্যান এতক্ষণ দাওয়ায় বসে হুক্কা টানতে টানতে সবই দেখছিলেন। হাসেমের ব্যস্ততা দেখে বললেন, “এই, ওর জন্য খানা নিয়া আসো। কখনও শুনছো আমার বাড়িতে আইসা কেউ ভুখা ফেরত গেছে? আজকে পানি পাগলা আমার বাড়ির মেহমান। ওর জন্য থালা ভইরা খানা আর একটা পরিষ্কার লুঙ্গি নিয়া আসো। বেচারা ঠান্ডায় কাঁপতেছে।” হাসেম বিরক্তমুখে পানি পাগলার জন্য থালা ভরে ভাত-তরকারি নিয়ে আসলো। জামান খেতে খেতে ভাবলো, চেয়ারম্যান সাহেব কতই না দরদী! নাহলে এমন মানুষ আজকাল দেখা যায়! সে গ্রামে এসেছে শুনে তাকে সসম্মানে দাওয়াত করে বাড়িতে খাওয়াচ্ছেন। পাগল মানুষটার প্রতিও তার কতোই না মায়া! পানি পাগলা গালভর্তি ভাত মুখে নিয়ে হাসেমকে বলল, “ভাইজান, একটা মরিচ দেন। মজা কইরা খাই।” চেয়ারম্যান হেসে বললেন, “কিরে পাগলা? আর কতোদিন পানিতে থাকবি? আমার বাড়ির পিছনের ঘরটা খালি পইড়া আছে। ওই ঘরটায় থাক, সংসার কর, পাগলামি ছাগলামি ছাড়।” পানি পাগলা খেতে খেতে বলল, “না, মাইনষের লগে থাকুম না। মানুষ বড়ই খারাপ।” “তাই নাকি? আমিও খারাপ?” চেয়ারম্যান হাসলেন। “আপনে আরও বেশি খারাপ। আপনে আমার বউটারে মাইরা ঘরবাড়ি দখল কইরা নিছেন। আমারে পাগল বানাইছেন।” পানি পাগলা অবলীলায় বলল। জামানের গলায় ভাত আটকে গেল। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেছে তার কথা শুনে। শুধু চেয়ারম্যান হাসতে হাসতে বললেন, “শুনো পাগলের কথা, বলে কি!” পানি পাগলা খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে চলে গেল।

জামানের মাথায় পানি পাগলার কথাগুলোই ঘুরছে। হঠাৎ করে পাগলটা এসব কেন বলল! “মাস্টার সাব, কি ভাবেন? নেন, এক খিলি পান খান।” চেয়ারম্যানের ডাকে সম্বিৎ ফিরল জামানের। “আচ্ছা, পানি পাগলা কি পানিতেই থাকে সারাদিন?” চেয়ারম্যান মুচকি হেসে বলল, “আপনে ওই পাগলটার কথা ভাবতাছেন, তাই না? তাইলে শোনের পাগলের কাহিনী। পানি পাগলার আসল নাম ছিল সেলিম। সেলিমের বউটা ছিল অত্যধিক সুন্দরী। পুরা গ্রামের মানুষ ছিল তার দেওয়ানা। মেয়েটাও ছিল চরিত্রহীনা ধরনের। একদিন সেলিম সদরে গেছিল কোনো কাজে। বাসায় ফিরতে গভীর রাত্র হয়া গেল। ফিরা আইসা দেখে, তার সুন্দরী বউ গলায় শাড়ির আঁচল প্যাঁচায়া ফ্যানের সাথে ঝুইলা ছিল। লোকমুখে শুনছিলাম, তার স্ত্রীর গর্ভে পরপুরুষের সন্তান ছিল। তাই দুর্নাম থেকা বাঁচতে সে গলায় ফাঁস দেয়। তারপর থেইকাই সেলিম পাগল হয়া গেল। পুকুরে ডুব দিয়া থাকে সকাল-সন্ধ্যা, আউলা-ঝাউলা কথা কয়। তার জায়গাজমি, বাড়িঘর সব খালি পইড়া রইল। ভাবলাম, জায়গাটা অকাজে না থাইকা কাজে লাগুক। সেইখানে তৈরি করলাম একটা স্কুলঘর, আপনি সেইখানেই শিক্ষকতার জন্য আসছেন। বলেন, কাজটা কি খারাপ করছি?” “মোটেই না।” মাথা এপাশ ওপাশ নাড়াল জামান। ঘরটা খালি পড়ে থাকার বদলে কিছু বাচ্চা-কাচ্চা সেখানে গিয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাচ্ছে এর থেকে আর ভালো কি হয়? চেয়ারম্যানের মতো মহৎ আর বিচক্ষণ লোকের দেখা পাওয়া বড়ই মুশকিল। আর সে কিনা পাগলের কথা মাথায় নিয়ে বসে আছে!

সকালবেলা গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়ল জামান। বড় পুকুরের গাছের নিচটায় দাঁড়াতেই পুকুরে কি যেন ভুস করে ভেসে উঠল। জামান আঁতকে উঠে ভালো করে তাকাতেই দেখল, ওটা পানি পাগলা। জামান হাতের ইশারা করে তাকে কাছে ডাকল। পানি পাগলা ভেসে ভেসে জামানের পায়ের সামনে এসে পৌঁছালো।

-“কি ব্যাপার? উপরে উঠে আসো। এভাবে ডুবে থাকলে তো নিশ্বাস আটকে মারা যাবে!”

-“মাস্টার সাব, আমার পানিতে ডুইবা থাকার অভ্যাস আছে। একবার টানা দুইঘন্টা পানিতে ডুইবা ছিলাম। তাছাড়া, আজকে আমি উপরে থাকলেও মারা যাব। এমনিতেই আমার মরণ ঘনায়া আসতাছে।”

-“কি বলো এসব!”

পানি পাগলা সাপের মতো পুকুরের ধারে উঠে বসল। তার দেখাদেখি জামানও নিচু হয়ে বসল। পানি পাগলা ফিসফিসিয়ে বলল, “মাস্টার সাব। কথাটা কাউকে বলি নাই। তয় আপনে ভালো মানুষ, আপনেরে বলা যায়। কথাটা গোপন রাইখেন। কাইল রাইতে চেয়ারম্যান আর তার লোকেরা একটা মাইয়ারে মাইরা ওই পশ্চিমদিকের ঝোপের মাঝে ফালায়া দিছে। মেয়েটার মাথায় বারি দিয়া মাইরা ফেলছে। আমি সব দেইখা ফেলছি। তারা আমারে খুঁইজা বেড়াইতেসে মারার জন্য। আমি সারাদিন পুকুরের পানিতে ডুব মাইরা পলায়া ছিলাম। জানেন, আমার বউডারে চেয়ারম্যান প্রায়ই কুনজর দিত। আমি যেদিন রাইতে সদরে গেছিলাম, সেইদিন আমার ফুলের মতো বউডারেও হে-ই মারছিলো। বউ-এর ফ্যানে ঝুলা মরামুখ দেইখা আমার মাথায় কেমন জানি লাগল। আমি দেউলিয়া হয়া গেলাম। চেয়ারম্যান হেরপর কৌশলে আমার সব জায়গাজমি লিখা নিলেন। মাস্টার সাব, আমি অহন যাই। পলাই গিয়া।” বলেই সে ঝপাস করে পানির মধ্যে লাফ দিল।

হাঁটতে হাঁটতে জামান ভাবলো, পানি পাগলা আসলেই পাগল। কি বলে কোন ঠিক-ঠিকানা নাই। ভালো মানুষটার নামে আজেবাজে কথা ছড়ায়। পানি পাগলার কথা মাথা থেকে তাড়িয়ে জামান সদরের পথে হাঁটা ধরল। তার সদরে কিছু জরুরি কাজ আছে। সদরে যাওয়ার রাস্তাটা পড়েছে পশ্চিমদিকের বাঁশঝাড় পেরিয়ে। বাঁশঝাড়ের সামনে আসতেই গোঙানির আওয়াজ পেয়ে থমকে দাঁড়াল জামান। কান খাড়া করে শুনলো সে; একটা মেয়ের গলার আওয়াজ, তীব্র ব্যথায় ঘনঘন কোঁকাচ্ছে। উৎসুক হয়ে সে ঝোপের ভেতর ঢুকতেই দেখতে পেল একটি মেয়ে অসাড় হয়ে শুয়ে আর্তনাদে গোঙাচ্ছে। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে জামানের সাহায্য চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে জামানের পানি পাগলার কথা মনে পড়ে গেল। তবে কি পাগলটা যা বলেছিলো সবই সত্যিই? চেয়ারম্যান সত্যিই মেয়েটিকে… না না। সত্যি মিথ্যা ভাবার সময় এখন নেই। মেয়েটা এখনও বেঁচে আছে, তাকে হাসপাতালে নেওয়াটাই জামানের প্রথম কাজ। জামান মেয়েটিকে কোলে তুলে দ্রুত রওনা দিল সদরের হাসপাতালের দিকে।

ডাক্তারের চিকিৎসায় মেয়েটি এখন অনেক সুস্থ হয়েছে। মেয়েটির জ্ঞান ফিরেছে, টুকটাক কথাও বলতে পারছে। ৪৮ ঘন্টা পার হলেই আশঙ্কাজনক অবস্থা কেটে যাবে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। জামান এরই মধ্যে একটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে তা হলো, ও পুলিশকে খবর দিয়েছে। হামিদপুর গ্রামের ওসি সাহেব মেয়েটার জ্ঞান ফেরার পর তার একটা স্টেটমেন্ট নিয়েছে। মেয়েটার জবানবন্দি শুনে জামানের যেন পায়ের নিচে মাটি রইলো না। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারল না ও। মেয়েটি জানিয়েছে, সে জয়নাল আলীর মেয়ে পুতুল। তার বাবা শহরের কাজে প্রায়ই ঢাকায় থাকে। অন্ধ দাদীকে নিয়েই থাকে পুতুল। গতকাল রাতে পুতুলকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় চেয়ারম্যানের সাঙ্গপাঙ্গ। বাঁশঝাড়ে পৌঁছে চেয়ারম্যানকেও দেখতে পায় সে। পুতুলকে বেঁধে নির্মমভাবে তার সম্ভ্রমহানি করে তারা সবাই, চেয়ারম্যান নিজেও। এরপর তাকে হত্যার উদ্দেশে মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে। এরপর পুতুলের আর কিছুই মনে নেই। সে অচেতন হয়ে গেলে তারা তাকে মৃত মনে করে বাঁশঝাড়ে শুইয়ে রেখে পালিয়ে যায়।

জামানের এখন প্রচন্ড ঘৃণা হচ্ছে লোকটার প্রতি। আর এই পশুকেই কিনা সে এতো শ্রদ্ধা করতো! মেয়েটির কথা যদি সত্যি হয়েই থাকে তাহলে পানি পাগলার তো খুবই বিপদ! তাকে মেরে ফেলার প্ল্যান  করছে চেয়ারম্যান আর তার সাগরেদরা। আর যাই হোক, তাদের পাপের সাক্ষীকে নিশ্চয়ই তারা বাঁচতে দিবে না! ওকে বাঁচতে হলে যা করার এক্ষুণি করতে হবে, এক্ষুণি না গেলে হয়তো তাকে বাঁচানো যাবে না। জামান সদর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দ্রুত রওনা দিল গ্রামের দিকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অটোতে চড়ে দ্রুত পৌঁছালো গ্রামে। পানি পাগলা অন্য কোথাও নিশ্চয়ই থাকবে না। একমাত্র পুকুরেই পাওয়া যাবে ওকে। জামান সবার আগে পুকুরের পাড়েই পৌঁছালো। কিন্তু একি! পুকুরের পাড়ে এতো ভীড় কিসের! গ্রামবাসী কিছু ঘিরে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন বলাবলি করছে। পানি পাগলার কিছু হলো না তো? কথাটা মনে হতেই জামানের বুক ধ্বক করে উঠল। সে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ভীড় সরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। পুকুরের ধারে একটা গামছা দিয়ে আধোভাবে ঢেকে শুইয়ে রেখেছে পানি পাগলার ভেজা শরীর। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, তার দেহে প্রাণের স্পন্দন নেই তবুও যেন নিজের গ্লানিবোধ থেকেই তার মৃতদেহ ধরে জামান চেঁচিয়ে উঠল, “কি হয়েছে?” গ্রামবাসীদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠলো, “পানি পাগলা মইরা গেছে।” “কিভাবে মারা গেল?” জামানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “আজকা সারাদিন পুকুরের পানিতে ডুইবা ছিল, দম আইটকা মইরা গেছে। আমি দেখলাম লাশটা পানিতে ভাসতাছে।” একটি ছেলে এগিয়ে বলল। না, জামান জানে পানি পাগলা দম আটকে মারা যায়নি। নিশ্চয়ই চেয়ারম্যানের লোকেরাই তাকে মেরেছে। জামান বড্ড দেরি করে ফেলল। আর একটু আগে এলে হয়তো প্রাণে বাঁচতে পারতো সে পানি পাগলাকে। চোখের পানি মুছে হাতের মুঠো শক্ত করলো সে। যে করেই হোক, সে পানি পাগলাকে ন্যায়বিচার দিয়েই ছাড়বে। একজন মধ্যবয়স্ক লোক বলল, “লাশটার দাফন কাফন কিছু করা দরকার। নাইলে লাশ কষ্ট পাইবো।” অন্য একজন বলল, “চেয়ারম্যান সাবরে জানানো উচিৎ।” জামান চমকে উঠল। না, কিছুতেই লাশ দাফন করা যাবে না, চেয়ারম্যানকে জানানো যাবে না। জামান হাত তুলে বলল, “না, লাশের ময়নাতদন্ত হবে। এইভাবে কারো মৃত্যু হতে পারে না। এই লাশ আমি হাসপাতালে নিয়ে ময়নাতদন্ত করতে চাই।” গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকেই জামানের কথায় সায় জানালো, অনেকেই আবার দ্বিমত করলো, “একটা পাগলের লাশ নিয়া মাতামাতি করার দরকার কি!” জামান সবাইকে বুঝিয়ে পানি পাগলার লাশ ভ্যানে তুলে হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করলো। যা করার আজকের মধ্যেই করতে হবে। জামান জানে চেয়ারম্যানের কানে তার কর্মকান্ডের কথা পৌঁছালে তাকে আর বাঁচতে দিবে না। গ্রামে ফিরলে আর কখনো প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরতে পারবে কিনা তাও জানে না জামান। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে জানালেন, পানি পাগলাকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার গলায় পেঁচানো হয়েছে তারই ব্যবহৃত গামছা। পানি পাগলা পানিতে ডুবে মারা গেলে তার ফুসফুসে পানি পাওয়া যেত। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। তার মানে সবই স্পষ্ট যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পুতুলের গায়ে পাওয়া ফিঙ্গার প্রিন্টের সাথে পানি পাগলার গায়ের ফিঙ্গার প্রিন্টের সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যক্তিটি একই। সে আর কেউ নয়, চেয়ারম্যান। ওসি হাসপাতালেই ছিলেন। তিনি ডাক্তারের ও জামানের কাছ থেকে সব তথ্য টুকে নিলেন। জামান আর দেরি করলো না, দ্রুত ওসিকে নিয়ে গ্রামে উপস্থিত হলো। চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে সব অস্বীকার করলেও প্রমাণ ও সাক্ষীর জেরে ওসির কাছে তার সকল অপরাধ স্বীকার করল। তিনি চেয়ারম্যান ও তার মদদদাতা হাসেমকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেলেন। জামান খুশিতে চোখের পানি মুছল।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত