আশার আলো

আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি প্রতিমা সরণীর মোড়ে। দুপুরের এই সময়টায় রাস্তায় প্রচুর গাড়ি চলাফেরা করে, তাই অহরহ ট্রাফিক জ্যাম লেগেই থাকে। সেই জ্যাম ছুটতে লাগে দশ-বিশ মিনিট। ঠিক তেমনই একটা কঠিন জ্যাম লেগে আছে এখন সরণীর মোড়ে। জ্যাম হলে যেমন সবচেয়ে ভোগান্তি হয় যাত্রীদের তেমনই সবচেয়ে সুবিধা হয় চিপসওয়ালা, ফুলওয়ালা, হকার কিংবা ভিখারীদের। ময়লা কাপড় পরিহিত কিছু হাত-পাবিহীন ভিক্ষুক গড়িয়ে গড়িয়ে ভিক্ষা করছে। ওদের দিকে তাকিয়ে মন থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার। এই যে আমি শার্ট-প্যান্ট পরে ফুলবাবু সেজে দাঁড়িয়ে আছি, আমি কী ওদের চেয়ে কোন অংশে কম ভিক্ষুক? ওদের তো তাও ভিক্ষা করে নিজের আয়-রোজগার করার সামর্থ আছে, পেটের ক্ষুধা দূর করার সক্ষমতা আছে। আমি তো ওদের চেয়েও অকর্মণ্য। “অকর্মণ্য!” নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে বসলাম আমি। হ্যাঁ, অকর্মণ্য নয়তো কী? অন্যদের মতো স্বপ্ন-আশা কোনোটাই তো কম ছিল না আমার! কোনোটা কি পূরণ করতে পেরেছি? ছোটবেলায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কেউ যখন জিজ্ঞেস করতো, “খোকা, বড় হয়ে তুমি কী হবে?” তখন বুক ফুলিয়ে কত অনায়াসেই না বলেছিলাম, “আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো।” কিন্তু আমি কি আদৌ ডাক্তার হতে পেরেছি? বরং জীবনের এ পর্যায়ে এসে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি, ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখা সহজ কিন্তু বাস্তবে তা সফল করা সহজ ব্যাপার না। চাকরি কোন হাতের মোয়া না। চাচা-মামা কিংবা টাকাকড়ির কাছে মেধা আর যোগ্যতা অতি তুচ্ছ। একমাস হয়েছে বহু কষ্টে জোগাড় করা একটা চাকরি আমি হারিয়েছি। গ্রামে বাবা-মা, পুরো পরিবার রেখে পাঁচ বছর ধরে পড়ে আছি এই ঢাকায়। ইউনিভার্সিটি পাশ করেছি গতবছর। তারপর থেকেই হন্যে হয়ে ঘুরছি চাকরির জন্য। যেখানেই যাই, কেউ আমার সার্টিফিকেটের ধার ধারে না, হয় তাদের টাকা চাই নয়তো বিত্তশালী কারো সুপারিশ। তাহলে পড়ালেখার মূল্যটা রইল কোথায়? খুব কষ্ট করে একটা পত্রিকার অফিসে চাকরি নিয়েছিলাম, কিন্তু একমাস হলো সেই চাকরি হাতের মুঠো থেকে চলে গেছে। এদিকে বাবা ঘনঘন ফোন দিচ্ছে, ছোটবোন রিংকির পরীক্ষার ফি দেওয়া দরকার। ওদিকে নাকি বড়আপার শ্বশুরবাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে মোটা অংকের কিছু যৌতুকের জন্য। বেচারীকে অত্যাচার করে পাঠিয়ে দিয়েছে আমাদের বাড়িতে, যতদিন যৌতুকের টাকা না দেওয়া হবে ততদিন শ্বশুরবাড়ির কেউ ওর মুখ দেখবে না। বাবার ফুসফুসের অসুখ দিন দিন বাড়ছে, ডাক্তার বলেছে বুকের এক্সরে, রক্ত-কফ পরীক্ষা সাথে আরো কিছু টেস্ট করা লাগবে। মায়ের চোখের ছানি এবার পরিষ্কার না করালেই নয়, অপারেশন করতে আরও দেরি হলে হয়তো মা আর কখনোই দুনিয়ার আলো দেখতে পাবেন না। চাকরিটা যাওয়ার পর দু’একটা টিউশনি করতাম, তাদের থেকে অনেক বলে কয়ে সামান্য কিছু অগ্রীম বেতন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে পাঠিয়েছি। এই সামান্য ক’টা টাকা দু’দিনের খরচেই শেষ হয়ে গেছে কিন্তু বাবার চিন্তার শেষ হচ্ছে না। ওরা যে কীভাবে চলছে কে জানে? এদিকে আমারও হয়েছে করুণ দশা। মেসের ভাড়া দিতে পারছি না দু’মাস হলো ম্যানেজার বলেছেন এমাসে ঘর ছেড়ে দিতে। মাইনুল ভাইয়ের কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার করেছিলাম। উনি কয়েকদিন পর পর তাগাদা দিচ্ছেন টাকা শোধ করার জন্য। আমি আজ সকালে তার টাকা শোধ করার চিন্তায় বিরাট একটা অন্যায় করে ফেলেছি। রুমমেট জলিল ভাইয়ের ওয়ালেট থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেছি। অনেকবার ভেবেছিলাম জলিল ভাইয়ের কাছ থেকে সরাসরি ধার চাইবো কিন্তু অভাব-অনটনে পড়ে মুখ ফুটে চাওয়া আর হয়ে উঠেনি। সকালবেলা জলিল ভাই টেবিলের উপর ওয়ালেট রেখে শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢুকেছিল। তার চকচকে ওয়ালেটের পেটভর্তি নোটগুলো দেখে আমি লোভ সামলাতে পারিনি। চট করে তুলে নিয়ে নিজের পকেটে চালান করে বেরিয়ে পড়েছি। চুরি করে টাকাটা নিলেও মনকে ভরসা দিয়েছি এটা চুরি না, কারণ আমি তো টাকাটা তাকে পরে পরিশোধ করেই দিব। কিন্তু এখন মানবিকতা আর বিবেকবোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, কারণ জলিল ভাই একটু পরপর আমাকে কল দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই তিনি বুঝে ফেলেছেন তার টাকা আমিই চুরি করেছি। এখন মনে হচ্ছে, আমি শুধু একটা অকর্মণ্যই নই, আমি একটা চোর! আজ দিব, কাল দিব বলে কত কত মানুষকে টাকার আশায় বসিয়ে রেখেছি। আমি একটা মিথ্যাবাদীও! এতসব অপরাধের বোঝা আমি আর সইতে পারছি না। ইচ্ছা করছে বোঝাটাকে কাঁধ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিই। নিজেকে বোঝার ভার থেকে বাঁচানোর একটাই উপায় হচ্ছে নিজেকে শেষ করে ফেলা। হ্যাঁ আত্মহত্যা! আজ আমি কোন ট্রাকের নিচে পড়ে নিজের প্রাণ দিব। না, হুট করে এই সিদ্ধান্ত আমি মাথায় নেইনি। গত তিনদিন ধরে নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি, কোনো গাড়িচাপা দিয়ে নিজের প্রাণটা দিব বলেই ঘুরঘুর করছি এই রাস্তায়। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি বড় কোনো ট্রাকের জন্য, সিদ্ধান্ত নেই এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ব ট্রাকের নিচে। কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তে বাঁচার সাধ যেন তীব্রভাবে জেগে উঠে, মনের ভেতর আরেক ‘আমি’ বলে উঠে, “আমি বাঁচতে চাই।” কোনবারই আত্মহত্যা করার সাহসটুকু বুকে আনতে পারিনি। কিন্তু আজ আমার বুকভর্তি সাহস, কারণ আমার কাঁধভর্তি অপরাধের বোঝা।

নিজের হতাশ ভাবনায় আমি যখন মগ্ন ঠিক তখনই ভাবনায় ছেদ পড়ল এক বিকট চিৎকার শুনে। আমি চমকে ঘুরে তাকালাম রাস্তার দিকে। ট্রাফিক জ্যাম ছোটার পর থেকে দ্রুত গাড়ির যাতায়াত শুরু হয়ে গেছে। ত্রিমোড়ের রাস্তায় অপরদিক থেকে হঠাৎ একটা গাড়ি দ্রুত এসে ধাক্কা লাগিয়েছে একটা তিনচাকার রিকশাকে। রিকশায় কোন প্যাসেঞ্জার নেই, কিন্তু রিকশাওয়ালা গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। তার কপাল ফেটে গেছে, সেই ফাটা জায়গা থেকে গলগলিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, সেই রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে তার শার্ট। আমি যাওয়ার আগেই লোকটার কাছে জমে গেছে আরো মানুষ। তারা ধরাধরি করে তাকে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। লোকটার হাত কনুই থেকে পিছনে বেঁকে আছে, সম্ভবত হাতটাও ভেঙে গেছে বেচারার। ব্যাথায় সে কাতরাচ্ছে, গুঙিয়ে বলছে, “বাঁচান, আমারে বাঁচান… আমারে কেউ ধরেন, হাসপাতালে নিয়া যান।” অবাক হলাম আমি! একটা মানুষের বাঁচার কতো আকাঙ্ক্ষা। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে পারে না কেউই। এক মূহুর্তের জন্য হলেও সবাই বাঁচতে চায়। ঠিক তক্ষুনি মনে হলো, রিকশাওয়ালার জায়গায় এই মূহুর্তে আমি থাকতে পারতাম। নিজেকে শেষ করার জন্য তো আমি নিজেও হন্যে হয়ে ঘুরছি এই রাস্তায়। যদি ঠিক এভাবেই আমিও কোন গাড়ির ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় লুটপাট হয়ে পড়ে থাকতাম, তবে শেষ মূহুর্তে কি আমিও বাঁচার জন্য সাহায্য চাইতাম? হয়তো! একজন দুঃখী অসহায় রিকশাচালক যদি অভাব অনটনে থেকেও বাঁচার আশা করতে পারে, হাত-পাবিহীন অকেজো মানুষগুলো ভিক্ষা করে হলেও নিজের ভাতের জোগাড় করে নিতে পারে তবে আমি কেন পারবো না নিজের জীবন গড়ে নিতে?

রিকশাওয়ালাকে ধরাধরি করে কিছু মানুষ হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে, আমিও সাথে এসেছি। টাকা দিয়ে সাহায্য করতে না পারি, কিন্তু রক্ত দিয়ে তো সাহায্য করতে পারবো। বেচারার যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাতে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। ডাক্তারের কাছে ছুটে গেলাম রোগীর রক্তের গ্রুপ কি জানার জন্য। ঠিক তখনই পকেটের মাঝে ক্রিংক্রিং শব্দ করে মোবাইল বেজে উঠল। তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। অচেনা এক নাম্বার থেকে কল করেছে। নিশ্চয়ই তার কাছ থেকেও কোন এককালে ধারদেনা করেছিলাম, এখন রিসিভ করলে সেটা শোধ করার কথাই বলবে। অভাবের তাড়নায় কার কাছ থেকে কতো টাকা ধার করেছিলাম তার কোন হিসেব নেই। এখন টাকা শোধ করার তাগাদায় নানান পরিচিত অপরিচিত জায়গা থেকে কল আসে। আমি ইতস্তত করে কল রিসিভ করলাম। “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে ভারিক্কি গলায় কেউ বললে উঠল, “হ্যালো আপনি কি জিসান বলছেন?” আমি হতাশ কন্ঠে বললাম, “জ্বী।” সাথে সাথেই অপরপাশ থেকে লোকটি বলে উঠল, “অভিনন্দন! আপনার ভার্সিটির লাস্ট সেমিস্টারে মেরিট রেজাল্ট অনুযায়ী আপনি ২য় স্থান অধিকার করেছিলেন। আমাদের ইস্ট-ওয়েস্ট কোম্পানির শর্ত অনুযায়ী প্রথম তিনজন মেধাবীকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি দেয়া হচ্ছে। তার মধ্যে একজন সৌভাগ্যবান আপনি। আপনি খুব দ্রুত আনাদের সাথে যোগাযোগ করে চাকরিতে জয়েন করুন।” ঠিক তখন মনে পড়ল, গতবছর ভার্সিটির লাস্ট সেমিস্টার পাশ করার পর কথা ছিল প্রথম তিনজন মেধাবীকে ছাত্র/ ছাত্রীকে এই কোম্পানীতেই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পদে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু সেটা মুখের কথা ভেবে রীতিমতো উড়িয়েই দিয়েছিলাম আমি। পরীক্ষায় ২য় স্থান অর্জন করলেও দেখা মিলেনি কোন চাকরির। অবশেষে একজন হতাশ বেকারের সাথে যা যা ঘটে, তা ঘটেছে আমার সাথেও। তবে সৃষ্টিকর্তা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন, প্রজ্জ্বলিত করেছেন আশার আলো। এখন আর আমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না মোটেই।

সেদিনের পর ঠিক দুটো বছর পার হয়ে গেছে। সকালের তাড়াহুড়ো। প্রতিমা সরণীর সামনে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছি। একটা খালি রিকশা পেতেই ডাক দিয়ে চড়ে বসলাম তাতে। গন্তব্য অফিস, কাজের প্রচুর চাপ; তাড়াতাড়ি না পৌঁছালেই নয়। কিন্তু ঢিমেতেতালায়য় রিকশা চলছে। কিছু বলতে যাবো, ঠিক এমন সময় রিকশাওয়ালা নিজেই বলে উঠলো, “ভাইজান, আপনে ভালা আছেন?” কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, “আপনি চিনেন আমাকে?” রিকশাওয়ালা এবার হেসে বলল, “ভাইজান, আপনের উছিলায় সেদিন আমার জীবন বাঁচছিলো। আপনের দেওয়া রক্ত শইল্লে নিয়াই তো আমি বাঁইচা আছি। সেই দিনটা আসলেই অনেক ভাইগ্যের ছিল।” তখনই মনে পড়ে গেল দুই বছর আগের ঠিক সেই দিনের কথা! সেই দিনটার জন্য আজ আমি বেঁচে আছি, বাবা চিকিৎসায় অনেকটা সুস্থ হয়েছে, মায়ের চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে, বোন শ্বশুরবাড়িতে সুখে-শান্তিতে থাকছে, রিংকিও পরীক্ষা দিতে পেরেছে। সেই দিনের জন্যই আমি আজ “অকর্মণ্য” নই, একজন “কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।” বিড়বিড় করে বললাম, “সেই দিনটা শুধু তোমার জন্যই ভাগ্যের ছিল, ভাগ্যের ছিল আমারও!”

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত