আল্লাহর পথে

“ভাইয়া, বাজার করতে যাচ্ছিস?” ন্যাকামো কণ্ঠ শুনে পিছন ঘুরে তাকালাম। যা ভেবেছিলাম, তাই! ছোটবোন কাঁকন দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি শুক্রবারে মা আমাকে সাপ্তাহিক বাজার করতে পাঠান। বাবা মারা যাওয়ার পর যেদিন থেকে আমি সংসারের হাল ধরতে শুরু করলাম, সেদিন থেকেই আমার উপর মায়ের আস্থা যেন বেড়ে গেল। ছোটবোনটাও মন উজাড় করে বায়না করার একটা মানুষ পেল! বাজারে যাওয়ার সময় যেহেতু কাঁকন ডাক দিয়েছে, কোন একটা বায়না তো ধরে বসবেই। আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে? কিছু বলবি?”

-বাজারে যখন যাচ্ছিস, তো আমার জন্য আজ গরুর গোশত নিয়ে আসিস। প্রতিদিন এই ছোট ছোট মাছ খেতে আর ভাল্য লাগে না।

-ছোট মাছ খেলে চোখ ভালো থাকে। গরুর গোশত খেলে তোর বুদ্ধিও হবে গরুর মতোই। গরু হতে চাস?

-হোক গরুর মতো। তবুও আমি আজকে মায়ের হাতের গোশতের ঝোল দিয়ে ভাত খাবো। তুই আনবি কিন্তু ভাইয়া।

কোন জবাব না দিয়ে আমি হনহনিয়ে বের হয়ে এলাম। আমি জানি, পাগলিটা ক্ষেপেছে। এদিকে আমি তাড়াতাড়ি না গেলে কসাই দোকানে ভালো গোশত পাবো না। বোনটা আজ কতদিন পর ভালোমন্দ কিছু খাওয়ার আবদার করেছে। ভাই হয়ে যদি তার মনটাই রাখতে না পারি তবে কীসের ভাই হলাম আমি!

বাজারে আজ প্রচুর ভীড়! শুক্রবারে যেন বাজারে ইদের আমেজ আসে। লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে, গাদাগাদি অবস্থা। কাঁকনের জন্য গরুর গোশত কিনে নিলাম। ফলের দোকানে এসে কিছু কমলাও কিনে নিলাম। কাঁকন কমলা খেতে খুব পছন্দ করে। পাশেই একটা লোক গলা উঁচু করে কমলা দামাদামি করছে। পরিচিত কণ্ঠ শুনে তাকিয়ে দেখি তিনি আমাদের এলাকার টগর ভাই। অনেকদিন পর তার সাথে দেখা। শেষবার দেখেছিলাম তার বিয়ের দিন। এরপর আর আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। কাছে গিয়ে বললাম, “আসসালামু আলাইকুম ভাই। ভালো আছেন?”

টগর ভাই পাশ ফিরে আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। বললেন, “আরেহ! লাবিব যে! ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”

-আলহামদুলিল্লাহ্‌। ভালো। ভাবী কেমন আছে?

ভাবীর প্রসঙ্গ আসতেই টগর ভাইয়ের মুখ কেমন চুপসে গেল। বললেন, “বিয়ে করে পড়েছি বিরাট ঝামেলায়। বুঝেছ? তোমার ভাবী শুধু আমার উপর রাগ করে বাপের বাড়িতে চলে যায়।

টগর ভাইয়ের হাতে মিষ্টির প্যাকেট। বোঝাই যাচ্ছে এগুলো নিয়ে উনি ভাবীকে আনতে যাচ্ছেন। বললাম, “টগর ভাই, হাতে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বুঝি শ্বশুড়বাড়ি যাচ্ছেন ভাবীকে আনতে?”

টগর ভাই হেসে বললেন, “হ্যাঁ। শ্বশুড়বাড়ি যাচ্ছি। খালি হাতে কী আর যাওয়া যায় বলো?”

-আচ্ছা, ভাবী আপনার উপর রাগ করে চলে গেল কেন?

-আর কী? ওই একই সমস্যা। আমি সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাস করি না, নামাজ পড়ি না, কালাম পড়ি না। তোমার ভাবীর ধারণা আমি নাস্তিক! আরেহ বাবা, যেই জিনিষ দেখা যায় না সেটা কেন বিশ্বাস করবো বলো তো?

আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। টগর ভাই এমনিতে খুব ভালো মানুষ। কিন্তু ওনার সমস্যা একটাই। তার ধারণা, সৃষ্টিকর্তা বলে কিছু নেই। আল্লাহ বলে কিছু নেই। নাউজুবিল্লাহ। একারণে ভাইয়ের সাথে নাকি ভাবীর প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয়। হবেই বা না কেন? ভাবী একজন পরহেজগার নারী, তার বিয়ে হয়েছে এমন এক লোকের সাথে যে কিনা সৃষ্টিকর্তাতে বিশ্বাস করে না। সংসারে দুজনের মত যখন ভিন্ন হয়, তখন সংসারের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। টগর ভাইকে বললাম, “যেই জিনিষ দেখা যায় না আপনি সেটা বিশ্বাস করেন না?”

-না।

-আপনার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?

-আচ্ছা, তুমিই বলো। তোমাদের মতে আল্লাহ তো পৃথিবীর সকল ভালোমন্দ সৃষ্টি করেছেন। তাই না?

-হ্যাঁ, আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন।

-আল্লাহ যদি ভালো হয়ে থাকেন, তাহলে মন্দসমূহ কেন সৃষ্টি করলেন?

-এসব কী বলছেন ভাই!

-আচ্ছা, তুমি কি কখনো আল্লাহকে দেখেছ?

-না।

-বিজ্ঞান কী বলে জানো? যে জিনিষ কোন যন্ত্র বা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, অনুভব করা যায় না, তার কোন অস্তিত্ব নেই! সুতরাং আল্লাহর অস্তিত্ব নেই!

নাউজুবিল্লাহ! টগর ভাইয়ের কথা শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। কতটা ভুল ধারণা নিয়ে তিনি বসে আছেন! আমি একটু ভেবে বললাম, “আচ্ছা টগর ভাই বলেন তো, পৃথিবীতে ঠান্ডা বলতে কিছু আছে?”

-হ্যাঁ আছেই তো।

-না টগর ভাই, আসলে ঠান্ডা বলতে কোন পদার্থই নেই!  তাপমাত্রার অনুপস্থিতিকেই ঠান্ডা বলে। ঠান্ডা পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু তাপমাত্রার পরিমাপ করা যায়। আচ্ছা, অন্ধকার বলে কি কিছু আছে?

-হ্যাঁ আছে।

-না টগর ভাই, অন্ধকার বলেও আসলে কোন পদার্থ নেই। আলোর অনুপস্থিতিকেই অন্ধকার বলা হয়। ঠিক তেমনি আল্লাহ মন্দ সৃষ্টি করেননি। ভালোর অনুপস্থিতিকেই মন্দ লাগে। আচ্ছা, আপনি কি কখনো আপনার মস্তিষ্ক দেখেছেন?

-না, সেটা কীভাবে দেখবো! তবে স্ক্যানারের মাধ্যমে দেখা সম্ভব।

-এই যে আপনি এত পড়াশোনা করলেন, এত জ্ঞান অর্জন করলেন, এই জ্ঞানের পরিধি কি কোন যন্ত্র দিয়ে পরিমাপ করা বা পঞ্চ ইন্দ্রিয় অনুভব করা সম্ভব?

-না। এটা তো কখনোই সম্ভব না।

-তাহলে তো আপনার মতামত অনুযায়ী একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যেহেতু আপনার জ্ঞানের পরিধি কোন অত্যাধুনিক যন্ত্র বা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা বা পরিমাপ করা সম্ভব নয়, তারমানে আপনার মস্তিষ্কে জ্ঞানের কোন অস্তিত্ব নেই। আপনি একটা মূর্খ!

টগর ভাই চমকে আমার দিকে তাকালেন। এভাবে ওনাকে যুক্তি দিয়ে পরাস্ত করবো উনি হয়তো তা ভাবতে পারেননি। আমি আবার বললাম, “আপনি কখনো লন্ডন দেখেছেন?”

-না।

-তারমানে কি লন্ডন বলে দেশ নেই?

টগর ভাই কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “আমাকে মাফ করে দাও ভাই। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি আসলেই এতোদিন অনেক বড় একটা মূর্খ ছিলাম। আজ তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। আমাকে মাফ করে দাও।” তিনি হাউমাউ করে উঠলেন বাজারভর্তি মানুষের সামনেই!

আমি ওনাকে শান্ত করে বললাম, “আমার কাছে নয়, আপনি আল্লাহর কাছে মাফ চান ভাই। আল্লাহ ক্ষমাশীল। কেউ যদি খাঁটি মনে তওবা করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চায় তবে আল্লাহ তার বান্দাকে ক্ষমা না করে পারেন না। যোহরের আজান দিচ্ছে, চলুন আমরা দুইভাই মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করি।”

টগর ভাই চোখের পানি মুছে বললেন, “কিন্তু এখানেই আমি তোমার ভাবীকে আনতে শ্বশুড়বাড়ি যাওয়ার রওনা না দিলে পরে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে যে!”

আমি হেসে বললাম, “ভাই। আপনি ভাবীর টানে তার বাড়িতে ছুটে যেতে চাইছেন তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তবে নিজেকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আপনি আল্লাহর টানে মসজিদে ছুটে যাবেন না? শ্বশুড়বাড়িতে খালি হাতে গেলে খারাপ দেখা যায়। কিন্তু একবারো কি ভেবেছেন খালি হাত নিয়ে কীভাবে আল্লাহর সামনে যেয়ে দাঁড়াবেন? “নামাজ বেহেশতের চাবি।” চাবি না থাকলে আপনি বেহেশতের দরজা খুলবেন কীভাবে? মহানবী (সা.) বলেছেন, “নামাজকে বলো না কাজ আছে। কাজকে বলো নামাজ আছে।”

টগর ভাই তার ভুল বুঝতে পেরে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “চলো রাকিব। আজ আল্লাহর দরবারে লুটিয়ে পড়ে দুইভাই ক্ষমা চাইবো।”

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত