সুলতানপুরের ডাইনি

সুলতানপুরের ডাইনি

শামীমের একটা কথা শুনে আমি তাকে পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মুখের ভাষায় গালি দিলাম।
গালিটা ভয়াবহ। এতটা খারাপ গালি আমার মুখে কখনই আসেনা। সেও এসব গালি শুনে অভ্যস্ত নয়। বেচারার কান লাল হয়ে গেল।
সে শুধু বলেছে, “দোস্ত! তোকে আমি পিচাশ দেখাতে এনেছি।”
পিচাশ মানে পিশাচ। ভূত প্রেত জাতীয় পারলৌকিক প্রাণী।
শামীম খুব চমৎকার শুদ্ধ বাংলায় কথা বললেও মাঝে মাঝে কিছু গ্রাম্য শব্দ ব্যবহার করে। এটি তারই একটি। তবে গালিটা তাকে গ্রাম্য শব্দ উচ্চারণের জন্য দেইনি।
সেই সময়টায় আমার ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ চলছে। মাত্রই প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ হবো হবো করছে। অর্ধ গোলার্ধ পাড়ি দিয়ে এসেও তাঁর বিয়ে ঠ্যাকাতে পারছি না। যেকোন দিন অন্য একটা ছেলে ফুলে মোড়ানো গাড়িতে এসে আমার বাগানের ফুলকে তুলে নিয়ে যাবে, এমন সংকটময় মুহূর্তে প্রানপ্রিয় বাল্যসখা যদি পিচাশ দেখানোর জন্য আমাকে তাঁর গ্রামে নিয়ে আসে, তখন মুখ দিয়ে নিশ্চই অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা বের হবার কথা না। আমি তাই পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা – যিনি একটা ছিচকা চোরকে ধরতে দীর্ঘদিন নাকানি চুবানি খেয়েছেন – এবং যা নিয়ে তাঁর স্ত্রী তাঁকে প্রতিটা সুযোগে ব্যঙ্গ করেছেন – অবশেষে সেই চোরকে ধরে তিনি বুকের ভিতরের ১০০% আবেগ দিয়ে যে গালি দেন – আমি সেই গালিটা তাঁকে দিলাম।
দিয়ে অবশ্য অনুতাপও হলো সাথে সাথে।
আমি তখন মাত্রই প্রবাসী হয়েছি। ছয়মাস আগেও বাংলাদেশে ছিলাম। অ্যামেরিকার ভিসা পাওয়ার পর সেদেশে স্থায়ী হতে চলে গেছি।
নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে রীতিমত হাবুডুবু খাচ্ছি তখন। পায়ের নিচে এতটুকু মাটি নেই। এদিকে বিরুদ্ধ স্রোতের তীব্র টান ক্রমশ গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন প্রানপনে হাতপা ছুড়ছি। একটা খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরছি।
এবং এমন দুরূহ পরিবেশে প্রেমিকা জানিয়ে দিল তাঁর বাবা তাঁর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। যদি তাঁকে বিয়ে করতেই হয় – তবে এখনই সময় কিছু করার। নাহলে তাঁকে ভুলে যেতে হবে।
সাড়ে চার বছরের প্রেম। এতই সহজ ভুলে যাওয়া?
আমি ফোনে ইন্টারনেটে হাজারবার চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে নিজের সঞ্চয়ের সমস্ত টাকা দিয়ে প্লেনের টিকিট কেটে পৃথিবীর উল্টো দিকের দেশটিতে উড়ে এলাম।
এবং এসে দেখি অবস্থার বরং আরও অবনতি হয়েছে। এখন উল্টো আফসোস হচ্ছে কেন টিকিট কেটে এতদূর আসতে গেলাম? শুধুশুধু চোখের সামনে নিজের প্রেমিকাকে অন্যের বৌ হতে দেখতে হবে। মাঝে দিয়ে সব সঞ্চয় শেষ করে আবারও ফতুর হয়েই জীবন শুরু করতে হবে। এরচেয়ে বিদেশে থেকে যাওয়াটাই ভাল ছিল। হয়তোবা কাজ-কর্ম-লেখাপড়ার ডাস্টার প্রেমের স্মৃতির ব্ল্যাকবোর্ডের সব লেখা দ্রুত মুছে দিত।
এই সময়ে বিক্ষিপ্ত মন ভাল করার দায়িত্ব বন্ধুরা নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুলে নেয়। বাল্যবন্ধু হলেতো কথাই নেই। শামীম আমার বাল্যবন্ধু। ক্লাস টুতে আমি যখন স্কুল বদল করেছিলাম – তখন থেকে শামীমের সাথে আমার বন্ধুত্ব। ক্লাস চলাকালীন পাঠ্যবইয়ে লুকিয়ে কমিক্স পড়া থেকে শুরু করে বাড়িতে লুকিয়ে ভিসিআরে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য নিষিদ্ধ সিনেমা দেখা – সব কুকর্মের সঙ্গী আমার বন্ধু শামীম।
কাজেই সুমনার সাথে আমার এই দুর্দিনে সে আমার পাশে এসে দাঁড়াবে এইতো স্বাভাবিক।
সে বলল, “দোস্ত! চল আমার গ্রামের বাড়ির দিকে একটা চক্কর মেরে আসি।”
দেশে গেলে শহর আমাকে কাছে টানে না। আমি থাকি পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক নগরীগুলোর একটিতে, দেশের ছোট শহর আমাকে কিই বা বিস্ময় উপহার দিতে পারবে? বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য্য এর গ্রামে। তাছাড়া আমরা নিজেরাও মফস্বলে মানুষ হয়েছি। ঢাকা শহরের দূষণে অতি দ্রুত হাপিয়ে উঠি।
শামীমদের গ্রামে তাঁর চাচার গুষ্ঠি স্থায়ীভাবে থাকেন। গেলে খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোন সমস্যা হবার কথা না। তাছাড়া আমার তখন একটা পরিবেশগত পরিবর্তন ফরজ হয়ে গেছে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।
শামীম সেই ছোটবেলা থেকে বললেও কখনই তাঁর গ্রামে যাওয়া হয়নি।
ওর গ্রামটা চাঁদপুরের কাছাকাছি, পদ্মা মেঘনা মোহনায়। লঞ্চে যেতে হয়। আমি পারিনা সাঁতার। নদীতে মাঝে মাঝে ঘূর্ণি দেখছি। বিশাল ঘূর্ণি! টাইটানিকের মতন বড় জাহাজকেও এই ঘূর্ণি কপ করে গিলে খাওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমাদের লঞ্চতো সেই তুলনায় একদমই ডিঙি নাও। আমি সমানে আল্লাহ আল্লাহ করে যাচ্ছি। শামীম নির্বিকার। হেসে ভরসা দিতে বলে, “ভয় পাবার কিছু নেই। এই রুটে প্রতিদিন হাজারটা লঞ্চ চলে। এইসব ঘূর্ণি পাড়ি দেয়া এদের কাছে ওয়ান টু!”
আমি ভরসা পাইনা। প্রতি সপ্তাহে পত্রিকায় লঞ্চ ডুবার ঘটনা আসে। এমন লঞ্চ ডোবানো পদ্মা মেঘনার মতন নদীর কাছেই বরং ওয়ানটু।
আমার ভয় বাড়িয়ে দিতেই যেন এইসময়ে আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামে। এবং বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে নদী যে কতটা উন্মাতাল হয়ে উঠতে পারে সেটা আমার মতন স্বশরীরে যারা পদ্মার মাঝে ভাসেননি, তাঁরা বুঝতে পারবেন না। প্রেমিকার স্পর্শে প্রেমিকের মতন নদী তখন পাগলা ষাঁড়। এপার ওপার তোলপাড় না করে শান্ত হবার নয়। আমি দোয়া দুরুদের পরিমান কয়েকগুন বাড়িয়ে দিলাম।
যাই হোক। আল্লাহর অশেষ রহমতে কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই আমরা লঞ্চ ঘাটে পৌছালাম। পত্রিকায় শিরোনাম হতে হয়নি, এই সৌভাগ্যে তখন আত্মতৃপ্ত!
তারপর গাড়িতে একটা লম্বা যাত্রা (তীব্র ঝাঁকুনিযুক্ত) শেষে কিছুদূর রিক্সা এবং তারপর পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তবেই শামীমদের গ্রামে পৌঁছতে হয়। বুঝতে পারলাম কেন শামীমের বাবা শহরবাসী হয়ে আর গ্রামে ফিরে আসেননি। এত দুরূহ পথ কে সাধে পাড়ি দিতে চায়?
গ্রামের রাস্তায় একটি ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে একটি অচেনা ফুলের সুগন্ধে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গন্ধটা খুবই সুন্দর। নেশা ধরে যায়। চারপাশে চোখ বুলিয়েও তেমন কোন ফুলের সন্ধান পেলাম না।
শামীমকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কিসের গন্ধরে? খুবই সুন্দর।”
শামীম ইতস্তত করে বললো, “এই পথ দিয়ে জ্বিন চলাফেরা করে। যখন ভাল জ্বিন যায় – তখন সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়। আর যখন খারাপ জ্বিন যায়, তখন বাজে গন্ধ নাকে আসে।”
আমি আরেকবার গালি দিতে গিয়েও দিলাম না। বেচারার জন্য ওভারডোজ হয়ে যাবে।
আমি বললাম, “তুই কখনও এই রাস্তায় খারাপ গন্ধ পেয়েছিস?”
“একবার পেয়েছিলাম।” শামীমের সরল উত্তর।
আমি বললাম, “খোঁজ নিলে জানতে পারতি যে তোর সাথের সঙ্গীর সেদিন পেটে সমস্যা ছিল।”
শামীম আহত স্বরে বলল, “দোস্ত বিশ্বাস কর। এইসব জ্বিন ভূত কিন্তু সত্যি আছে। এইসব অঞ্চলে রেগুলার দেখতে পাওয়া যায়।”
আমি পাত্তা দিলাম না।
“তুই যদি নিজের চোখে দেখিস তাহলে বিশ্বাস করবি?”
“তুই কী দেখানোর ব্যবস্থা করবি?”
“আমি ব্যবস্থা করবো কিভাবে? আমার কী কুটুম লাগে নাকি যে ডাক দিলেই চলে আসবে? কিন্তু যেহেতু এ অঞ্চলের প্রায় সবাই দেখেছে – তুইও দেখতে পারিস।”
আমার মতে “গ্রামের সবাই দেখেছে” – একটি অতি ফালতু তত্ব। চলতি ভাষায়, আজাইরা থিওরি। গ্রামের মানুষের চিত্ত বিনোদনের বড়ই অভাব। তাঁদের জীবনে এক্সাইটমেন্ট বলতে এইসব জ্বিন-ভূত-পরী ইত্যাদিই সম্বল। কেউ যদি বলে “আমি নিজের চোখে জ্বিন দেখেছি” – সাথে সাথে সে সেলিব্রেটি হয়ে যায়। দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে লোকজন আসে তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে। নিজেকে তখন সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোক মনে করে। নিজের সাহিত্যপ্রতিভাকে তখন সে শ্রোতাদের কাছে প্রকাশ করে। যার গল্প যত রংচঙা, সে তত হিট। শ্রোতাদের মধ্যেই কারও কারও তখন সেলিব্রেটি হতে ইচ্ছে করে। সেও তখন তাঁর মতন একটি গল্প ফাঁদে। সেও সেলিব্রেটি হয়। এবং এইভাবে একটা সময়ে “গ্রামের সবাই দেখেছে” বাক্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুই নিজে দেখেছিস?”
শামীম বলল, “নিজে দেখিনি – তবে আমার অনেক আপনজনেরা দেখেছেন। আমার চাচা এখনও মাঝে মাঝে দেখেন। তিনি কী মিথ্যা বলবেন?”
আমার তত্ব প্রমাণিত হয়ে গেছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না।
২.
লঞ্চডুবির আশংকা, দীর্ঘ পথশ্রম, প্রেমিকা বিচ্ছেদের কষ্ট সব মোটামুটি এক ঝটকায় কিছুক্ষনের জন্য ঢাকা পরে গেল শামীমের চাচির রান্নার আয়োজনে। নদীর তাজা মাছ, নিজের গাছের সবজি, ডাল এবং চিকন চালের ভাত – আয়োজন বলতে এটুকুই – কিন্তু এত সুস্বাদু রান্না আমি জীবনেও খাইনি। ভবিষ্যৎ জীবনেও খাব কিনা সন্দেহ।
আমি মাছ এড়িয়ে চলা ছেলে। সেই আমিই স্বানন্দে মাছের তৃতীয় পেটি তুলতে তুলতে বললাম, “চাচী, আপনার রান্নার হাতে জাদু আছে। ঠিক কুটু মিয়ার মতন।”
চাচী অবাক হয়ে বললেন, “কুটু মিয়া আবার কে?”
আমি সরল গলায় বললাম, “এক বিখ্যাত বাবুর্চি। যার মালিক বাথটাবে শুয়ে শুয়ে গান গাইতো, ‘আমার যমুনার জল দেখতে কালো, চান করিতে লাগে ভাল।'”
চাচী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হয়তো ভাবলেন আমাকে জ্বিনে ধরেছে। আমিতো পথ দিয়ে আসার সময়ে তীব্র সুগন্ধ পেয়েছিলাম।
শামীম জল ঢেলে দিল।
“ও ফাজলামি করছে চাচী। তুমি কিছু মনে নিওনা। শহরের পোলাপানদের আদব কায়দা কম।”
চাচী এই কথায় যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন। কেন পেলেন তিনিই জানেন।
খাওয়া শেষে বিশ্রাম নেবার সময়ে শামীমের বড় চাচা আমাদের বললেন, “বাবারা, তোমরাতো শহরের মানুষ, আমাদের মূর্খ্য মনে করতে পারো। কিন্তু একটা কথা তোমাদের বলা আমি আমার দায়িত্ব বইলা মনে করি বইলাই বলতেছি। বাবারা, আমরা গেরামে গঞ্জে থাকি। এইখানে অনেক কিছুই ঘটে এবং আমরাও সেইসব দেখি। চোখের সামনে ঘটা জিনিসরেতো আর মিথ্যা কইতে পারিনা। তা বাবারা, গেরামে একটা কথা পচলোন আছে – সেইটা হইলো – যে বাড়িতে মাছ রান্না হয়, সেই বাড়িতে পিচাশ আসে। আমি আয়াতুল কুরসী পইড়া ঘর বান্ধায়া দিতেছি – কিন্তু তারপরেও একটু সাবধানে চলা ফেরা কইরো।”
চাচার বয়স ষাটের কাছাকাছি বা উপরে হবে হয়তো। কথা বলেন খুব চমৎকারভাবে। কোন শব্দ টানতে হবে, কোথায় জোর দিতে হবে এবং কোথায় বিরতি – তা তিনি বেশ ভালোই জানেন। শুনতে ভাল লাগে।
আমি তাঁর কথায় হ্যা সূচক মাথা নেড়ে বললাম, “ঠিক আছে চাচা।”
কী দরকার একটি ভদ্রলোকের সাথে শুধুশুধু তর্কে জড়িয়ে? বেচারা সারাটা জীবন স্বযতনে কিছু বিশ্বাস লালন করে এসেছেন। আমার মতন দুইদিনের ছোকরার পাঁচ মিনিটের বিতর্কে তিনি সেটা পাল্টাতে যাবেন কেন?
৩.
পরিশ্রমেই হোক কিংবা গ্রামের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশের কারনে – আমি এত গভীর ঘুম দীর্ঘদিন ঘুমাইনি। শেয়ালের ডাকে ঘুম যখন ভাঙলো তখন রীতিমত রাত। অনেক দিন পর শেয়ালের পালের এমন সমবেত সংগীত শুনতে পেলাম। দেশ থেকে শেয়ালতো প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে।
শামীমের চাচার পোষা কুকুর ভুলু একাই শেয়ালদের দমাতে চিৎকার করে যাচ্ছে। বিকেলেই ভুলুকে খুঁটির সাথে বাঁধা থাকতে দেখেছি। আমার কুকুরভীতির কথা শামীম ভালই জানে। তাই আসবার আগেই তাকে বেঁধে রাখতে বলেছে। বিশালাকার দেশি কুকুর ভুলু। বেচারা বুড়ো হয়ে গেছে, তবু বুঝা যায় তেজ কমেনি এতটুকুও। এখনও সে একাই একপাল শেয়ালকে তাড়া করে গ্রাম ছাড়া করার সামর্থ্য রাখে।
কটা বাজে ঘড়ি ছাড়া বোঝার কোনই উপায় নেই। গ্রামে আকাশ অন্ধকার হলেই মনে হয় রাত নিশুতি।
অবশ্য গ্রামের মানুষেরা রাতের আকাশের চাঁদ তারার অবস্থান দেখেই বলে দিতে পারেন ভোর হতে কতটা দেরি। প্রযুক্তি আমাদের শহরের মানুষের কাছ থেকে এই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।
আমার মোবাইল ফোন বের করে সময় দেখতে চাইলাম। পারলাম না। চার্জ শেষ। এখানে ইলেক্ট্রিসিটিও গভীর রাতের আগে আসেনা। গভীর রাতে হঠাৎ করেই পাখা ঘুরতে শুরু করে। দুই তিন ঘন্টা নিজের অস্তিত্বের প্রমান দিয়ে আবারও সারাদিনের জন্য গায়েব হয়ে যায়। তাতেও অবশ্য গ্রামের মানুষের অভিযোগ নেই। ঘরের দেয়ালে কিছু বৈদ্যুতিক তার এবং মাথার উপর বৈদ্যুতিক পাখা ঝুলছে – এই আনন্দেই তাঁরা আপাতত আত্মহারা।
আমি উঠে জানালা খুলতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলাম। কিছুতেই খুলছে না। মনে হচ্ছে ওপাশ থেকে পেরেক ঠুকে কেউ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে রেখেছে। একে গরম, তার উপরে জানালাও বন্ধ – সমস্যাটা কী?
আমি বিছানা থেকে নামতেই দরজা খুলে শামীম ঢুকলো। হাতে হারিকেন। অাহ্! কতদিন পর হারিকেন দেখা হলো! চার্জ লাইট, আইপিএসের যুগে হারিকেন-কুপি বাতি একদম বিলুপ্ত হতে চলেছে। “আলাদিনের চ্যারাগ দৈত্য” শিশুরা ঠিকই পড়ছে – কিন্তু চ্যারাগটা কী সেটা কী কখনও নিজ চোখে দেখেছে? আফসোস।
“কয়টা বাজে?”
“সাড়ে সাত।”
হিসেব করে দেখলাম মাত্র দুই ঘন্টার মতন ঘুমিয়েছি – অথচ মনে হচ্ছে যেন সাত আটঘন্টা ধরে নাক ডেকেছি।
“বলিস কী? এই অঞ্চলে কী সময় থেমে থাকে নাকি?”
শামীম বেশ দার্শনিকের মতন বলল, “কেন, উপন্যাসের পড়িসনি? ‘রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরানো রাত?’ হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলে সময় থেমেই আছে।”
আমি আর দার্শনিক আলোচনায় যোগ দিলাম না।
“রাতে কী করিস তোরা? এইরকম রুমে বসে থাকিস?”
“গানের আসর বসে মাঝেমাঝে। পারিবারিক আড্ডা বসে। তারপর ভাত টাত খেয়ে সবাই ঘুম। সকালে সূর্য উঠার আগেই সবাই উঠে যায়। Early to bed, early to rise থিওরি। গ্রামীণ জীবন খুবই স্বাস্থকর জীবন।”
“তুই এখানে আসলে কী করিস? তুইও কী সন্ধ্যা হতেই ঘুমিয়ে পড়িস?”
“জেগে জেগে তাহলে কী করবো? বোর হয়েতো লাভ নাই। বরং সকালের দিকে সূর্য ওঠার আগে আগে ক্ষেতের আইল বা নদীর তীরে হাঁটতে ভালই লাগে।”
আমার সমস্যা হচ্ছে, আমি মধ্যরাতের আগে ঘুমাতে পারিনা। কিছুতেই না। সময় কাটানোর জন্য আমার কিছু না কিছু লাগবেই। বই হলেতো কথাই নাই। সমস্যা হচ্ছে, এখানে হারিকেনের আলোয় বই পড়লে শুধু শুধু বেচারাদের কেরোসিন পোড়ানো হবে। কে জানে, এই দুর্গম অঞ্চলে কেরোসিন আনতে তাঁদের কত ঝামেলা পোহাতে হয়।
শামীম বলল, “শোন, রাতের খাবার কী এখুনি দিবে? ওরা সাধারণত এই সময়েই ভাত খেয়ে ফেলে। তুই চাইলে আরও পরেও দিতে পারে। কিন্তু তোর কারণেই সবাই না খেয়ে অপেক্ষা করবে।”
আমার যদিও খিধা পায়নি তেমন, তাছাড়া এই সময়ে আমি জীবনেও ভাত খাইনা, তবু ব্যস্ত স্বরে বললাম, “না না, এখুনি খাওয়া যাক। শুধু শুধু দেরি করিয়ে লাভ নেই।”
“বারান্দায় পানি রাখা আছে, হাত মুখ ধুয়ে নে। উত্তর বাড়ির বারান্দায় পাটিতে খাবার সার্ভ করা হবে।”
“উত্তর বাড়িটা আবার কোথায়?”
“উঠানের ওপাশেই। এইটা দক্ষিণ বাড়ি। আমাদের জায়গা জমির অভাব নেই। ডিজাইনেরও বালাই নেই। যার যখন খুশি, যখন স্বামর্থ্য হয়, বাড়ি বানিয়ে নেয়। এইটা বাবার বানানো ঘর, আমরা গ্রামে এলে এখানেই থাকি। বাকিটা সময়ে চাচারা তালাবন্ধ করে রাখেন।”
বারান্দায় গিয়ে দেখি একটা বদনায় পানি রাখা আছে। আমি বললাম, “দোস্ত, হাতমুখ ধুব, এখন বাথরুম যাওয়া লাগবে না।”
শামীম হেসে বলল, “ও আচ্ছা, বলা হয়নি। এইটা হাতমুখ ধোয়ারই বদনা। এটা দিয়ে ওজু করে। পায়খানার বদনা পায়খানাতেই থাকে।”
বদনা দিয়ে জীবনেও হাতমুখ ধুইনি। আমার চেহারা দেখেই শামীম বুঝলো। বলল, “ঠিক আছে, আমি জগে করে তোকে পানি দিতে বলছি। নো প্রব্লেম।”
রাতের খাওয়া দিনের খাওয়ার চেয়েও অসাধারন হলো। আমি চার পিস ইলিশ মাছ গবগবিয়ে খেয়ে ফেললাম। মাছ এবং মাংস কখনই একসাথে খাইনা। আজকে দেশি মুরগির রান দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। তারপর খাবো কি খাবোনা করতে করতে ডিম ভুনাও খেয়ে ফেললাম। সাথে কাকরোল ভাজি, ঢেড়শ ভাজির কথা নাহয় বাদই দিলাম। প্রতিটা পদ দিয়ে এক এক গামলা ভাত খাওয়া সম্ভব। শামীমের চাচী যেন নিজের সাথেই নিজে প্রতিযোগিতা করেন। আমার পেটে বাতাস ধারণেরও জায়গা রইলো না। রীতিমতন হাঁসফাঁস করছি। শামীমের চাচা অতিরিক্ত বিনয়ী হয়ে কিছুক্ষন পরপর বলছেন, “কোনই খাতির করতে পারছি না বাবাজি, আমরা খুবই লজ্জায় পরে গেলাম।”
আমিও কিছুক্ষন পরপর বলছি, “এই যদি খাতির না করার নমুনা হয়, তাহলে খাতির করলেতো আমি মারাই যেতাম।”
ও আচ্ছা, বলা হয়নি। এ বাড়িতে সব পুরুষ একসাথে খায়, মহিলারা পুরুষদের পরে খেতে বসেন। শামীমের চাচাদের বাচ্চাকাচ্চার মাশাল্লাহ কোনই অভাব নেই। কোন চাচীই মনে হয় না বিয়ের পর খালি পেটে একটা বছর পার করতে পেরেছেন। সব বয়সের জন্যই একটা করে স্যাম্পল এই বাড়িতে আছে। চাচাতো ভাই বোনে ঘর গিজগিজ করছে। আমরা যখন খাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম দরজা জানালার ওপাশ থেকে ছোট বড় মেয়েরা উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখছিল।
খাওয়া দাওয়া শেষে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শামীমের চাচা আবারও এসে রিমাইন্ডার দিয়ে গেলেন, “ভাতিজা, রাইতের বেলা যাই ঘটুক না কেন, একলা বাইরে বাইর হইয়ো না। “ভাতরুম” পাইলেও আওয়াজ দিও, কেউ না কেউ তোমার লগে ঠিকই যাইবো।”
মিছিল নিয়ে বাথরুম গমন কেমন কেমন যেন লাগে। আমার অবশ্য এমনিতেই রাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার অভ্যাস নেই। একবার ঘুম চটে গেলেই আমার সারারাত নির্ঘুম কাটে। তাই চাচাকে আস্বস্ত করে বললাম যে “ভাতরুমে” একা যাবোনা।
রাতে শামীমের সাথে এদিক সেদিকের কথা বলতে বলতে একটা সময়ে ঘুমিয়েও গেলাম। ভরপেট নিয়ে বেশিক্ষন জেগে থাকা যায়না। পেটের সাথে সাথে যেন চোখটাও ভারী হয়ে যায়।
রাতে ঘুম ভাঙলো শেয়ালের ডাকে। সেই সন্ধ্যা থেকেই ননস্টপ ডেকে যাচ্ছিল এবং ভুলুও সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিল, এখন মনে হচ্ছে যেন বাড়ির একদম পাশেই চলে এসেছে তারা। এবং ভুলুও নিশ্চুপ।
আমি চোখ মেললাম। যদিও জানি খুবই বড় ভুল করতে যাচ্ছি। একবার চোখ পুরোপুরি খুলে ফেললেই আমার সারারাতের জন্য ঘুম বিদায় নিবে। তারপর জেগে জেগে শেয়ালের ডাক শুনে শুনে সময় কাটবে। তবু চোখ খুলেই দেখি জোছনার আলোয় ঘর একদম নীল হয়ে আছে। শহুরে সোডিয়াম আলো মিশ্রিত জোছনার দূষিত আলো না, ১০০% বিশুদ্ধ খাঁটি গ্রামীণ জোছনা! মাথা নষ্ট করে দেবার ক্ষমতা রাখে! ইংরেজি “লুনাটিক” শব্দটি তাহলে এই জোছনার সাথেই সম্পর্কযুক্ত। এই জোছনার প্রেমে পড়েই সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ লিখে ফেলেছিলেন দুই শতাধিক গল্প, উপন্যাস ও নাটক।
শামীম নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। পাশ থেকে তাঁর নাকের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমার ঘুম ভাঙ্গার জন্য এই শব্দও দায়ী হতে পারে।
ওপাশ ফিরে দেখি জানালার কপাট হা করে খোলা। আস্ত পূর্ণিমার চাঁদ ছবি হয়ে দেয়ালে ঝুলে আছে। বাতাসের ধাক্কায় একখন্ড কালো মেঘ চাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। খানিক দূরেই বনাঞ্চলে বাতাস তুলেছে হাহাকার ধ্বনি। সাথে বাড়ছে শেয়ালের ডাক। সুন্দর দৃশ্য।
আমি উঠে বসলাম। মনটা উদাস হয়ে গেল সুমনার জন্য। ইশ! তাঁকে পাশে নিয়ে যদি এ দৃশ্য দেখা যেত! তাঁরও কী কখনও আমাকে নিয়ে এমন সাধ জাগে মনে?
বিষন্নতাকে বেশি পাত্তা দিতে নেই। তাহলে এটি রোগ হয়ে ক্ষতিই করে। বরং রাতের অন্ধকার উপভোগ করা যাক।
আমি বাইরে চোখ দিলাম। জোছনার নীল গুঁড়ো ছুঁয়ে দিচ্ছে ঘন সবুজ ধানক্ষেত, কিংবা অদূরের গাঢ় শ্যামলিমা বনানী। খেলছে আলো, খেলছে ছায়া। দিনের আলোর সব দৃশ্য জোছনা রাত্রিতে পাল্টে যায়। সব ছবি পাল্টে গেছে। আকাশ থেকে বা পাতাল ফুঁড়ে যদি হাজির হতে চায় কোন অশরীরী, এইতো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। আমি মুগ্ধ হয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। এই প্রথম চন্দ্রাহত হলাম।
বুঝতেই পারিনি কখন শেয়ালের ডাক থেমে গেছে। ভুলুর ডাকতো সেই কখন থেকেই শোনা যায়নি। আরও যেসব নিশাচর পাখি, শ্বাপদ কিংবা পোকামাকড়ের ডাক শোনা যাচ্ছিল, সব আচমকাই থেমে গেল। মরে যাওয়া পাতায় বাতাসের অস্তিত্বের শব্দ ছাড়া পুরো পৃথিবী যেন একদম নীরব হয়ে গেল। এবং তখনই আমি যেন ধান ক্ষেতের মাঠের উপর কাউকে দেখলাম। মানুষের মূর্তি। ভুল নয়। একদম স্পষ্ট বোঝা যায় কেউ হেঁটে চলেছে আইল ধরে। কিংবা বাতাসে ভেসে এগুচ্ছে। এত রাতে জীবন মরণ সংকট না হলে অথবা কোন চোর ডাকাত না হলে এইভাবে কেউ কেন বেরুবে?
আমি পাশ ফিরে দেখি শামীম এখনও বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওকে ধাক্কা দিলাম। জাগলো না। আমি ফিরে তাকালাম মাঠের দিকে। নেই। আবারও ফাঁকা মাঠ ধুধু করছে। কেউ কোথাও নেই। অথচ চোখের নিমেষে অত বড় মাঠ দৌড়ে পেরুতে হলেও কাউকে অলিম্পিক গোল্ড মেডেলিস্ট হতে হবে।
ফিরে এসেছে শেয়ালের পাল। কাছেই হুক্কাহুয়া রব তুলেছে। ফিরে এসেছে অন্যান্য নিশাচরেরাও। পৃথিবী আবারও স্বরব হয়ে উঠলো।
ধানক্ষেতের সেই অবয়বটি এখন আর নেই। চোখের ভুল ছিল? অবশ্যই। জোছনার আলোয় কী দেখতে কী দেখেছি, মানুষ ভেবে বসে আছি। অবশ্যই চোখের ধোঁকা।
৪.
সকালে নিশ্চিত হয়ে গেলাম ওটা স্বপ্ন ছিল।
যে জানালা দিয়ে ঐ অলৌকিক সৌন্দর্য দেখছিলাম, সেই জানালা অনেকগুলো পেরেক দিয়ে সিল করা। বেশ শক্ত গাঁথুনি। ধাক্কাধাক্কিতেও এক চুল পরিমান নড়ে না। এক রাতের জন্য কেউ অতগুলো প্যারেক সরিয়ে জানালা খুলে দিয়ে আবার সকাল হতেই লাগিয়ে দিয়েছে এ এক অসম্ভব ব্যাপার। হলে প্যারেক ঠোকার শব্দেই ঘুম ভেঙে যেত।
রাতের ঘটনা কাউকে বললাম না। বললে দেখা যাবে দুইদিনের মধ্যেই গ্রামে রটে যাবে যে আমিও নিজের চোখে ভূত দেখেছি। ভবিষ্যতে এই শামীমই হয়তো অন্য কাউকে বয়ান শোনাবে, “আমার বন্ধু নিজের চোখে দেখেছে। ও কী তবে মিথ্যা বলেছিল?”
সারাদিন ঘুরাঘুরি করেই কেটে গেল। গ্রামের দিকে বেশি ঘুরাঘুরিরও কিছু নেই অবশ্য। ক্ষেত, পুকুর, গোয়ালঘর, এবং নদীর তীর। তীরে একটা বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়ায় বসে দারুন সময় কাটলো। ছিপি দিয়ে মাছও ধরেছি টুকিটাকি। মৎস শিকার অনেক ধৈর্য্যের ব্যাপার। সেই সাথে চুপ করে বসে থাকতে হয় বহুক্ষণ। নাহলে শব্দে মাছ তীরে ভিড়েনা। বুঝে গেলাম ওটা আমাকে দিয়ে হবেনা।
ক্ষেতের ওপারের জঙ্গলে যেতে ইচ্ছে করছিল। যেহেতু বাঘ বা এইজাতীয় কোন হিংস্র জানোয়ার নেই, তাই হাতের কাছে অমন জঙ্গল পেয়েও না যাওয়াটা অন্যায় মনে হলো। কতদিন অরণ্যে যাওয়া হয়না!
যাওয়া হলোও না। শামীম দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করলো। সরাসরি না বললেও বুঝিয়ে দিল ঐ জঙ্গলেই যাবতীয় “পিচাশের” বাস। সে নিজে পিচাশ দেখায় আগ্রহী নয়, আমাকেও দেখতে দিতে চায় না।
সেরাতেও ঘুম ভাঙলো। তবে শুধুই শেয়ালের ডাকে না। এক নারী কণ্ঠের কান্নার শব্দে। কেউ যেন বুকের সব কষ্ট নিংড়ে “বাজানরে, ও বাজান” বলে হাহাকার করে উঠছে। মধ্যরাত্রির নির্জনতা খানখান করা সেই শব্দে বুকে কাঁপন ধরে।
চোখ মেলে দেখি শামীম বিছানায় শুয়ে আছে, এবং সমানে বিড়বিড় করে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম সুরাহ পড়ছে।
আমি জেগে উঠেছি বুঝতে পেরে ফিসফিসিয়ে বললো, “দোয়া পড়।”
আমি বুঝার চেষ্টা করলাম কোত্থেকে শব্দটি আসতে পারে। অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে সেটা ঠাহর করা অসম্ভবই ছিল। তবে মনে হলো যেন জঙ্গল থেকেই আসছে। ক্ষেতের ওপারের জঙ্গল এলাকা, যেখানে নাকি পিচাশ পেত্নীদের বাস।
মিথ্যা বলবো না, ভয় আমিও পেয়েছি তখন। ভূতের ভয় নাকি এখন নিশ্চিত না, কিন্তু সেই সময়ে বুকের ভিতরের খাঁচায় হৃদপিণ্ডের লাফালাফি অস্বাভাবিক ছিল। শেয়ালের ডাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভুলু কুকুরটাও কেমন কিঁউ কিঁউ শব্দ তুলছে। বাতাস চিড়ে কেবল সেই নারী কণ্ঠের হাহাকার ধ্বনি। রক্ত মাংসের মানুষের কণ্ঠেও সেই কান্নার ধ্বনি সাধারনের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অশরীরী হলেতো কথাই নেই।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “কে কাঁদে?”
শামীম জবাব দিল না। মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করে দোয়া পড়ার তাড়া দিল।
আশেপাশের অন্যান্য ঘর থেকেও “আল্লাহ আল্লাহ” জিকিরের শব্দ শোনা যেতে লাগলো। সবাই আতঙ্কে জেগে উঠেছে। সবাই অশুভ শক্তির হাত থেকে আল্লাহর সাহায্য চায়।
আমিও পড়তে শুরু করলাম আয়াতুল কুরসী। ইবলিস শয়তান থেকে রক্ষা পাবার অব্যর্থ ওষুধ। ইবলিসের চেয়ে বড় অশরীরী আর কে থাকতে পারে?
পরদিন এই বিষয়ে আমি কোন কথা বললাম না। শামীমদের বাড়ির সবাই এমন ভাব করতে লাগলো যেন মনে মনে বলছে, “বলেছিলাম না? বিশ্বাস তো করো নাই – এখন নিজে দেখেছো?”
আমি বেশ চিন্তায় পরে গেলাম। ব্যাপারটা হজম করতে পারছি না। দিনের আলোয় ভয়টা কেটে গেছে। তাই ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করছি। সেই রাতের মতন এটি যে স্বপ্ন নয়, তাতো প্রমাণিতই। আস্ত গ্রামসুদ্ধ লোক একই কান্নার আওয়াজ শুনেছে। সবাই নিশ্চই একসাথে একই স্বপ্ন দেখেনি।
শামীম বেশ আয়োজন করে কিংবদন্তি গল্পখানা শোনালো।
তাঁর মতন গুছিয়ে বলতে না পারলেও গল্পটির সারসংক্ষেপ হচ্ছে, বহু কাল আগে এই গ্রামের এক অতি রূপবান ছেলের উপর এক ডাইনির নজর পরে। ডাইনিটি এক সুন্দরী নারীর ছদ্মবেশে ছেলেটির সামনে এসে তাঁকে প্রলুব্ধ করে, এবং তাঁর প্রেমে ফেলে। ছেলেটি সেই ডাইনিকে বিয়ে করে। তাঁদের একটি সন্তান হয়। এবং সন্তানের চেহারা দেখেই লোকে বুঝতে পারে এটি কোন মানুষের সন্তান নয়। শিশুটির চোখে কোন সাদা অংশ ছিল না। পুরো চোখ জুড়ে কালো মণি ছিল। শিশুর জিভটিও ছিল কুচকুচে কালো এবং সাপের মতোই দোফলা। জন্মের সময়ে মানব শিশুর কোন দাঁত থাকেনা। মানব শিশু জন্মের পরপরই হাসতেও পারেনা। কিন্তু এই শিশু দিব্যি হাসতে পারতো, এবং হাসির সময়ে তার সাদা কালো দাঁত গুলো স্পষ্ট বোঝা যেত।
পুরো গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। ডাইনি স্বীকার করতে বাধ্য হলো সে ছল করেছে। কদমতলীর পীর সাহেবকে ডেকে আনা হলো এই ডাইনিকে হত্যা করতে। হুজুরকে দেখে ডাইনি তাঁর পায়ে পড়ে গেল। সে জানালো মানুষকে বিয়ে করায় তাঁকে তাঁর জ্বিন সমাজ কখনই গ্রহণ করবেনা। এখন সে বুঝতে পারছে, মানব সমাজেও সেই গৃহীত নয়। তাঁকে যেন তাঁর পুত্র সহ যেতে দেয়া হয়। তারা অন্য কোথাও বসত খুঁজে নিবে।
হুজুরের মনে দয়া হলো। তিনি মাতাপুত্রকে যেতে দিলেন। তাঁদের থেকে এই অঙ্গীকার নিলেন যে তাঁরা এই গ্রামবাসীর কোন ক্ষতি করবে না।
কিন্তু তার পরদিনই হুজুরকে সাপে কাটলো। তিনি তাৎক্ষণিক ইন্তেকাল করলেন।
এবং সেই রাতেই এক প্রচন্ড ঝড়ে গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে গেল। প্রচুর মানুষ মারা গেলেন।
গ্রামবাসীর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ডাইনিকে তাঁর সন্তানসহ জীবিত যেতে দেয়া উচিৎ হয়নি। তারা তাদের প্রতিশোধ ঠিকই নিয়েছে।
সেই থেকে এই গ্রামে জ্বিন-পরী-ডাইনির উপদ্রব বেড়ে গেছে। রাতের বেলা কেউ মাছ শিকারে বেরোয় না। দিনের বেলাতেও না পারতে কেউ এক থাকেনা। সাপের কামড়ে, বা ঝড়ের কবলে প্রতিবছর এই গ্রামে নিয়মমাফিক কেউ না কেউ মারা যায়। সবাই বুঝে, এই সাপ, বা এই ঝড়ের আসল পরিচয় কী।
গল্পটা আমার কাছে মোটেও বিচিত্র মনে হয়নি। প্রতিটা গ্রামেই এমন ভৌতিক জ্বিন পরীর কাহিনীর প্রচলন আছে। এর সাথে অন্ধকার রাতে সেই মহিলার কান্নার কী সম্পর্ক সেটা বুঝতে পারলাম না।
শামীম নিজের মতোই ব্যাখ্যা করে, “আরে বুঝলি না। ঐ যে জ্বিনের বাচ্চাটাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল – হয়তো সেটাই এখন বড় হয়েছে। হয়তো বাবার স্নেহ পাবার জন্য মাঝে মাঝে কেঁদে উঠে।”
“কত বছর আগের কাহিনী হবে সেটা?” জানতে চাই।
“একশো বছরতো মিনিমান। কদমতলীর পীর সাহেবতো সেই মিড এইটিন হান্ড্রেডসের লোক।”
“এত বছর পরেও বাচ্চা তার বাপের জন্য কাঁদে? এতদিনেতো তার এডাল্ট হয়ে যাবার কথা।”
“আরে, জ্বিনদের জীবন কী আমাদের মতন নাকি? হাজার বছর আছে। কয়েকশো বছর ধরে হয়তো বড় হয়।”
বুঝলাম শামীমের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। নিশ্চই অন্য কোন ঘটনা আছে। এদিকে আমার যাবার সময় চলে এসেছে। একবার এই রহস্য ভেদ না করে গেলে বাকিটা জীবন নিজের কাছেই নিজে উত্তর খুঁজে বেড়াবো। হেলোইনের পার্টির আড্ডায় নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনী সবাইকে শোনাবো। পরীর কান্না শোনা কী সহজ কথা?
রহস্য ভেদ করতে হলে জঙ্গল যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। যেহেতু ওখান থেকেই শব্দটি এসেছে, কাজেই ওখানেই সব রহস্য লুকিয়ে আছে। শামীমকে বলে লাভ নেই। ও যাবেনা। আমাকেই যেতে হবে। একা হলেও। সমস্যা হচ্ছে, শামীমকে কাছ ছাড়া করা যাচ্ছেনা। ও কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়ছে না। ওকে আলাদা করার উপায় আগে খুঁজতে হবে।

৫.
শামীমকে আলাদা করা গেল না। ও আমার সাথে লেগে রইলো। এবং আমার যেহেতু সময় নেই, তাই ওকে নিয়েই আমার জঙ্গলে আসতে হলো।
আসবার সময়ে পুরো রাস্তা সে আমাকে গালাগালি করতে করতে এলো। সেই উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার গালি, যে অফিসার বহুদিন ধরেও একটি ছিঁচকে চোরকে ধরতে না পারার ক্ষোভে টগবগ করে ফুটছে।
রাগের তাপে বেচারার বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে। গজগজ করে বলছে, “আমি যদি আজকে মারা যাই, তাহলে তোকে কিন্তু আমি ছাড়বোনা, বলে দিলাম!”
বেচারা মরে গেলে আমাকে ধরবে কিভাবে সেই প্রশ্ন আর করলাম না।
জঙ্গলটা দেখে প্রথমেই মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মাস্টারপিসের হোসেন আলীর জঙ্গলের কথা মনে হয়। “সৃষ্টির পর থেকে ওখানে কোন মনুষ্য পদ পড়েনি।”
ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের এক জনাকীর্ণ গ্রামের পাশেই যে এমন ঘন জঙ্গল থাকতে পারে সেটা কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবেনা। মানুষের ছায়া পড়েনি বলে গাছেরা নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করেছে। দশ হাত দূরে একটা হাতি দাঁড়িয়ে থাকলেও দেখা যাবেনা এমন সবুজের পুরুত্ব।
আমি শামীমকে জিজ্ঞেস করে নিলাম, “তুই শিওরতো এখানে কোন বাঘ বা হিংস্র প্রাণী নেই?”
শামীম তেজের সাথে বলল, “ভূত পেত্নী গিজগিজ করছে আর তুই বাঘ সিংহে পড়ে আছিস। এখনও সময় আছে, চল যাই।”
সে সমানে শব্দ করে দোয়া দুরুদ পড়তে লাগলো। আমি বললাম, “আমরা এসেছি এখানে ভূত দেখতে। তুই যদি তাদের কাছেই ঘেঁষতে না দিস, তাহলে এখানে আসার ফায়দা কী?”
সে আরেক দফা গালাগালি করে সুরাহ পাঠে মন দিল।
কিনার ঘেঁষেই হাঁটাহাঁটি করছি। বেশি গভীরে গেলাম না। অমন ঘন বনে একবার পথ হারালে জিন্দেগীতে বেরুতে পারবো কিনা সন্দেহ। তাছাড়া আমাদের সন্ধানে কেউ খোঁজ নিতেও আসবেনা। ধরেই নিবে আমরা জ্বিনের নগরী কোহকাফে বন্দি হয়ে গেছি। কোন সুন্দরী পরীর নজর পড়েছিল আমাদের উপর, এবং ওখানেই আমাদের শাদী করে সংসার করতে নিয়ে গেছে।
হঠাৎ জুতার উপর একটি আট দশ হাত লম্বা সাপ ছোবল মারলো। আচমকাই ঘটে গেল ঘটনা। মাটির সাথে বলতে গেলে মিশে ছিল সাপটা, তাই আগেভাগে বুঝতে পারিনি।
ভাগ্য ভাল, আমি সাপের কামড়ের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম। দেশে বিদেশে শহরের বাইরে যেকোন জঙ্গুলে জায়গায় বেড়াতে গেলে আমি বিশেষ একটা জুতা পরি। মোটা, ভারী, শক্ত এবং জঙ্গল ট্র্যাকিংয়ের উপযোগী বিদেশী বুটে সাপ তার বিষাক্ত দাঁত বসাতে পারলো না। সে নিজেও সেটা বুঝতে পেরেছে। ব্যর্থ হয়ে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে ফণা তুলে দ্বিতীয় আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমার হাতে একটা ধারালো দা ধরা। আমিও এখন তৈরী হলাম সামনে এগুলেই কোপ বসাবো।
শামীম “ওরে আল্লাহরে” বলে লাফিয়ে উঠলো। তারপর জোরে জোরে অতি দ্রুত সুরাহ পাঠ করতে লাগলো। সে নিশ্চিত, এইটা কোন সাধারণ সাপ না। কদমতলীর ঈমামকে হত্যা করা সেই জ্বিন সাপের ছদ্মবেশে আমাদের মারতে এসেছে।
সাপটা ফোঁসফোঁস করতে করতেই পেছাতে লাগলো।
আমি আর এগিয়ে গিয়ে তাকে মারলাম না। জানি, মানুষ ছাড়া পৃথিবীর কোন প্রাণীই অযথা অপর প্রাণীর উপর আক্রমন করেনা। সাধারণত, সাপ, খোপ এমনকি বাঘ পর্যন্ত মানুষকে এড়িয়ে চলে। আশেপাশেই হয়তো তার গর্ত, হয়তো গর্তে তার বাচ্চাকাচ্চা আছে। আমাদের আগমনে সে বিপদের আশংকা করেছে।
আমরা দ্রুত সে স্থান থেকে সরে এলাম।
জঙ্গলে কিছুই পেলাম না। তবে আমি নিশ্চিত, আরেকটু ভালভাবে খোঁজ নিতে পারলে নিশ্চই কিছু না কিছু পেতাম। যেমন ঘন জঙ্গল, আদিবাসী কারোর বাস করার সম্ভাবনাও ফেলে দেবার মতন নয়।
রাতে ঘুমাতে যাবার সময়ে অপেক্ষায় থাকলাম আবারও যদি ডাইনির কান্নার শব্দ শোনা যায়। তখন যদি কোন সূত্র ধরা পরে।
সেই রাতে ডাইনি কান্না করলো না।
যথা সময়ে আমাকে শহরে ফিরে আসতে হলো। আমি দেশে গিয়েছি স্বল্প সময়ের জন্য। নানান অঞ্চলের নানান মানুষের সাথে দেখা করতে হবে। একটি গ্রামেই এক অলৌকিক কান্না শোনার অপেক্ষায় পুরো ছুটি কাটিয়ে দেয়ার কোন যুক্তি হয়না। একটা সময়ে অ্যামেরিকাতেও ফিরতে হলো। আবারও কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
সুমনার বিয়ে হয়ে গেল আরেকজনের সাথে। মন খুব বিক্ষিপ্ত হলো। তবু জীবনের সাথে মানিয়ে নেবার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। ডবল কাজ করতে শুরু করলাম। যখনই সময় পাই, তখনই পড়ালেখায় জোর বাড়িয়ে দিলাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শুরু করলাম। বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডার পরিমান বাড়িয়ে দিলাম। মাঝে মাঝেই আড্ডায় ভূতের গল্পের আসর বসে। তখন আর আগের মতন জোর গলায় ভূতে অবিশ্বাসের কথা বলতে পারিনা। আমার মাথায় যে সুলতানপুরের ডাইনির হাহাকার ধ্বনি তখনও গেঁথে আছে।
মাঝে মাঝেই গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন খোলা জানালায় ঝুলন্ত চাঁদ দেখতে পেলে সেই রাতের রক্ত হিম করা কান্নার কথা শোনা যায়। হৃদয় নিংড়ানো স্বরে কেউ ডাকছে, “বাজানরে…..ও বাজান!”
বুক তখন ঝুকপুক করে। ভয়ে শরীর কাঁটা দেয়।
৬.
গল্পের শেষটা একদম আচমকাই হলো।
চার বছর পর আবারও গেলাম সুলতানপুর। এইবার আমি প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম যে প্রয়োজনে বেশ কয়েকরাত থাকবো। জঙ্গল ট্র্যাকিং কাপড় চোপড়, কম্পাস, দড়ি সব নিয়ে গেলাম। এইবার প্রয়োজনে জঙ্গল চোষে বেড়াবো। এইবার ডাইনি রহস্য ভেদ না করে ফিরছি না।
শামীম, তাঁর চাচা আমাকে হাজারবার নিষেধ করলেন। তারপরেও আমি কোন কথা শুনলাম না। আমি ঠিকই গেলাম জঙ্গলে। যাবতীয় আধুনিক সরঞ্জাম, ক্যামেরা ইত্যাদি নিয়ে অনেক খোঁজা খুঁজি করলাম। এখানে ওখানে কিছু সাপ, এবং মাঝে মাঝে কিছু শেয়ালের দৌড়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই পেলাম না। বুঝতে পারলাম, জঙ্গলে কারোর উপস্থিতি ট্র্যাক করতে হলে আরও বিস্তর পড়াশোনার ব্যাপার আছে। কেবল গ্যাজেট চাপিয়ে চলে আসলেই হবে না।
প্রথম এক সপ্তাহ ডাইনিও কোন কান্নাকাটি করলো না। শেষ কবে কেঁদেছিল জিজ্ঞেস করতে একেকজন একেক কথা বলেন। কেউ বলেন তিন সপ্তাহ আগে, কেউ বলেন মাসখানেকতো হবেই। তবে খুব বেশি আগেনা এইটা নিশ্চিত করলেন সবাই।
এবং একদিন সেই কাঙ্খিত রাতটি এলো। সেই রাতটিও ছিল পূর্ণিমা। জোছনার রহস্যময় আলোর বন্যায় ভেসে যাওয়া এক রাত্রি।
আমি ঘরের লাগোয়া বাথরুমে গিয়েছিলাম। বাথরুম সেরে গ্রামীণ জোছনা উপভোগ করছি। দেখি ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে কোন এক অবয়ব ভেসে চলে যাচ্ছে। অন্তত সেই জোছনার আলোয় তাই মনে হলো।
বুকটা দরাস দরাস করে লাফাতে শুরু করলো। চোখের সামনেই যেন ভূত দেখলাম। তারপরে হঠাৎ মনে হলো অন্য কিছুও হতে পারে। চোর, ডাকাত হবার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে কেন?
আমি পিছু নিলাম। ভয়ের কিছু নেই। সাথে একটা ছোট্ট রিভলবার আছে। বলেছিলাম না, এইবার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছি। চোর ডাকাত হলে ব্যবস্থা নিতে পারবো। আর যদি সত্যি সত্যিই ডাইনি হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ ভরসা। এক মনে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবো। কাজ হলে ওতেই হবে, না হলে……থাক। এত ভাবলে আর কিছু করা হবেনা।
জোছনার আলো ফক ফকা, কিন্তু সেতো আর সূর্যের আলো নয়। প্রায়ই সেই অবয়বটি চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলো। আমি যত দ্রুত সম্ভব তার কাছাকাছি পৌঁছাতে চেষ্টা করলাম।
বুক কাঁপছে। হাঁপিয়ে উঠছি দ্রুত। মুখ থেকে জিভ বেরিয়ে এসেছে আধহাত। বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আবারও একই সাথে চেষ্টা করছি সামনের জন যেন কিছুতেই টের না পায় যে আমি তার পেছনে আছি। মানুষ হলে সে তাহলে সাবধান হয়ে যাবে। আর যদি অন্য কিছু হয়ে থাকে, তাহলে এতক্ষনে সে নিশ্চই জানে যে আমি তার পেছনে আছি।
অবয়বটি জঙ্গলে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি জঙ্গলে এসে আর তাঁকে খুঁজে পেলাম না। এমনিতেই এই জঙ্গল এত গভীর আর ঘন। দিনের বেলাতেই এর মাটিতে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। রাতের বেলাতো কথাই নাই। এর মধ্যে খেয়াল হলো আমি জঙ্গলে প্রবেশ করার মত কোন প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। পায়ে শক্ত বুটের জায়গায় বেল্টওয়ালা স্যান্ডেল। শরীরে জ্যাকেটের জায়গায় ঘুমানোর জামা। অবয়বকে হারিয়ে না ফেলতে আমি যে অবস্থায় ছিলাম, সে অবস্থাতেই রওনা দিয়েছি। তাও ভাগ্য ভাল রিভলবার নিজের সাথেই লুকিয়ে রাখতাম বলে সেটা আনতে পেরেছি। আরেকটু প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারলে ভাল হতো।
নিজের উপরই রাগ হলো খুব। ঘুষি চালালাম বাতাসে। কিছু একটা যে এখানে ঘটছে সেটাতো নিজের চোখেই দেখলাম। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না সেটাই বিরক্তিকর।
শেয়ালের ডাক বাড়ছে। জঙ্গলে শেয়ালের পাল যদি আক্রমন করে বসে, তাহলে আর কিছু দেখতে হবেনা। বাহাদুরি আর কৌতূহলের সাথে সাথে আমার নিজের জীবনেরও এখানেই ইতি ঘটে যাবে। সাত সাগরের ওপারে আমার জন্য এক বিদেশিনী অপেক্ষা করে আছে। সময় মতন না ফিরলে যে আমার জন্য দুফোঁটা অশ্রু ফেলে অন্য কারোর গলায় ঝুলে যাবে। ওদের প্রেম আমাদের মতন লাইলী মজনু মার্কা ইমোশনাল প্রেম নয় যে একটা জীবন সঙ্গীর অকাল প্রয়াণের কষ্টে কাটিয়ে দিবে। ওরা সবকিছুতেই প্র্যাকটিক্যাল। ভাল। সুমনার ক্ষেত্রে আমি যদি এরকম প্র্যাকটিকাল হতে পারতাম, তাহলে ডিপ্রেশনে আমার জীবনের মূল্যবান তিনটা বছর নষ্ট হতো না।
আমি বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করলাম।
এবং ঠিক তখনই জঙ্গলে আমি কারোর নড়াচড়ার শব্দ পেলাম। খুব গহীনে না। আমার থেকে পাঁচ দশ হাত ভিতরেই। শেয়াল নাকি বুঝলাম না। মনে হয়না। আওয়াজ শুনে মানুষই বলে মনে হলো।
আমার হাত চলে গেল রিভলবারের বাটে। আঙ্গুল ট্রিগারে। যদি আমার উপর আক্রমন হয়, তাহলে আমি যেন প্রস্তুত থাকি।
স্পষ্ট কানে ভেসে এলো নারী কণ্ঠ।
“বাজান….ও বাজান!”
আমার হৃদপিন্ড তখন পারলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। ভয়ে হাতপা হিম হয়ে আসছে। বরফের হাত দিয়ে কেউ যেন শিরদাঁড়া খামচে ধরেছে। সমস্ত শরীরের প্রতিটা লোম একসাথে দাঁড়িয়ে গেছে। আতংকে লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেলাম কয়েক পা। মন চাইছে ঝেড়ে দৌড় দিতে। জোর করে দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে।
নারী কণ্ঠের শব্দটি আরেকটু স্পষ্ট হলো।
“বাজানরে….ও বাজান!”
আমি এইবার আরও সাবধান হলাম। ভয়টা সামান্য কমলো। কণ্ঠস্বরে হাহাকারের পরিমান আরেকটু বেড়েছে। যেন সে কাউকে খুঁজছে।
আমি আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে পিস্তল তাক করলাম।
এবং তখনই জঙ্গল ভেদ করে সুলতানপুরের ডাইনি আমার সামনে প্রকট হলো। গগনবিদারী আর্তনাদ তাঁর কণ্ঠে।
“বাজানরে…..ও বাজান! বাজান!!”
মুখ দিয়ে অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এলো আমার। ট্রিগার চাপতে চাপতেও চাপলাম না। চিৎকার করে বললাম, “কে? কে?”
ডাইনি আমার দিকে তাকালো না। জঙ্গলের দিকে ফিরে আবারও চিৎকার করলো, “বাজানরে…..ও বাজান! বাজান!!”
জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ডাইনির চেহারা। আমি পিস্তল সরিয়ে নিলাম। বিস্ফোরিত কিন্তু অস্ফুট স্বরে বললাম, “ফাতেমা খালা!”
গ্রামের দিক থেকে প্রচন্ড হৈচৈ শোনা গেল। একটা দুটা করে কয়েকটা মশাল নিয়ে লোকজন এদিকে ছুটে আসছে।
আমি ওদিকে একবার তাকিয়ে এদিকে ফিরে দেখি ফাতেমা খালা আবার গায়েব হয়ে গেছেন। আমি জঙ্গলের দিকে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। আমার এটাই ধারণা ছিল। সুলতানপুরের ডাইনি আসলে সুলতানপুরেরই কেউ একজন হবেন। তবে ফাতেমা খালা হবেন, এইটা দূর কল্পনাতেও ছিল না।
কাহিনী শেষ করার আগে ফাতেমা খালার পরিচয় দিয়ে দেই।
আমি অ্যামেরিকায় থাকি শুনে গ্রামের অনেকেই আমার সাথে দেখা করতে এলেন। গ্রামের মানুষের বিনোদনের অভাব। এরা রাস্তা খোঁড়ার কাজও খুব আগ্রহ নিয়ে দেখে। সেদিক দিয়ে অ্যামেরিকান কারোর সাথে দেখা করাটাতো অনেক বড় ব্যাপার।
গ্রামের লোকজনের কৌতূহলের কোন শেষ নেই। বিচিত্র জ্ঞানে জ্ঞানী হতে তাঁদের প্রবল আগ্রহ।
যেমন, কেউ কেউ জানতে আগ্রহী, অ্যামেরিকান নারীদের কী আসলেই লজ্জা শরম নাই? নেংটা হয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়?
কেউ জানতে চান বুশ সাহেবের সাথে আমার দেখা হয়েছে কিনা। যদি দেখা হয়, তাহলে আমি যেন তাঁকে সাবধান করে বলি, এই যে ইরাকে যুদ্ধ লাগিয়ে লাখ লাখ মুসলমান মেরে ফেলছে, একদিন তার পরিণতিও ফেরাউনের মতোই হবে।
সবাই অসীম আগ্রহে জানতে চান, আসলেই কী পেশাব পায়খানা শেষে বিদেশিরা কেউ পানি নেয় না? ঐদেশে বদনার অস্তিত্ব নাই শুনে সবার চোখ কপালে উঠে যায়। এরপর অবধারিত প্রশ্ন, আমি তাহলে কী করি!
তো এরমধ্যে একদিন আমার কাছে এক যুবক এলো যে কিনা শামীমের দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই। শামীমের মায়ের চাচাতো (এই চাচাও আপন চাচা না, আত্মীয় সম্পর্কের চাচা) বোনের স্বামীর মামাতো বোনের ছেলে। অতি জটিল সম্পর্ক। শহরে এত হিসাব কেউ রাখেনা। আজকাল সেকেন্ড বা থার্ড কাজিনদেরও কেউ চেনেনা। এইটা কততম কাজিন সেটা হিসাব করতেও ক্যালকুলেটর দরকার।
তো যাই হোক, যুবকের নাম জোবায়ের এবং বয়স আঠারো উনিশ হবে। গাল ভর্তি ফিনফিনে দাড়ি। মাথায় সফেদ পাগড়ি, গায়ে ইমাম সাহেবদের মতন আলখাল্লা, এবং চোখে সুরমা। গা থেকে ভুরভুর করে আসে আতরের গন্ধ। হাসলে পান খাওয়া লাল দাঁত দেখা যায়। সে আমাকে একথা সেকথার পর জানালো সে আমার সাথে আমেরিকা যেতে চায়। আমি যেন যাবার সময়ে তাকে আমেরিকা নিয়ে যাই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কতটুকু পড়াশোনা করেছেন? অ্যামেরিকা গিয়ে কী করবেন?”
ছেলেটি জানালো, “আমি মাদ্রাসার ছাত্র। উলা পাশ দিয়েছি। সেখানে গিয়ে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করবো।”
আমি বললাম, “ওখানে যে কোন মাদ্রাসা নেই।”
ছেলেটি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই বললো, “তাহলেও কোন সমস্যা নাই ভাই। আমি আপনার সাথে থাকবো, আপনার হয়ে সব কাজ করে দিব। আমি নিয়মিত চিল্লায় যাই, আমাকে নিলে আপনার ফায়দা ছাড়া কোন ক্ষতি হবেনা ইন শা আল্লাহ। এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
মুশকিলে পড়া গেল। বেচারা হয়তো ভেবেছে অ্যামেরিকা যাওয়া আর ঢাকায় যাওয়া একই ব্যাপার। ভিসা জটিলতার কথা তাঁকে বোঝালাম। এবং সে অবাক হয়ে জানতে চাইলো, “আপনি বললেও আমাকে ভিসা দিবেনা?”
আমাকে এই যুবকটি এত ক্ষমতাবান ভাবে ভেবে আমার চোখে পানি চলে এলো। ইশ! যদি আসলেই অ্যামেরিকান সরকার আমার কথায় উঠতো বসতো!
তো যাই হোক – আমি বেচারাকে বুঝালাম অ্যামেরিকায় যাওয়া এতটা সহজ না। “আমি চাইলেও” যে কাউকে ওখানে নিয়ে যেতে পারবো না।
ছেলেটা ভগ্নহৃদয়ে আমার দিকে তাকালো। তারপর আহত কণ্ঠে বলল, “অসুবিধা নাই। আপনি নিতে না চাইলে আমার কিই বা করার আছে। কিন্তু মনে রাখবেন, যদি আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা আমার ভাগ্যে আমেরিকায় যাওয়া লিখে রাখেন, তাহলে কেউই সেটা ঠ্যাকাতে পারবে না।”
বলে ছেলেটি উঠে চলে গেল।
আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। এই ছেলে আসলেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে অ্যামেরিকান সরকার আমার কথায় উঠে বসে। ইশ! ছেলেটাকে যদি একটা ফেরারি গাড়ি বখশিষ হিসেবে দিতে পারতাম!
যাই হোক – শামীম আমাকে স্পষ্টাক্ষরে না করে দিল একে যেন আমি কাছে ভিড়তে না দেই।
জানতে চাইলাম ঘটনা কী?
বলে, “আরে ছেলেটা একটা উন্মাদ! মাথা নষ্ট। ওর ধারণা পৃথিবীর সবাই ওর শত্রু। সবাই ওর পেছনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একটু এদিক ওদিক হলেই ফাত্রামি শুরু করে দেয়।”
এইধরণের লোকজন আমিও এড়িয়ে চলি। খুবই বিপজ্জনক। অ্যামেরিকায় এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। বাঙালি বলেই হালকা টুকটাক কথাবার্তা হয়েছে। দেখতে মোটেও রূপসী ছিল না, এবং কথাবার্তা ছিল তারচেয়েও বিরক্তিকর। এই মেয়ের সাথে বন্ধুত্বেরই আগ্রহ জাগেনা, প্রেমতো বহু দূর। পরে শুনি এই মেয়ে শহরময় ছড়িয়ে বেরিয়েছে আমি নাকি তার দিওয়ানা হয়ে গেছি। তার জন্য এপার্টমেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। সে কাজে গেলে তার পিছু নেই। কলেজে গেলে তার পিছু নেই। দোকানে গেলেও তার পিছু নেই। রোজ রাতে আমি নাকি তার ফোনে মিস কল দেই। তার প্রেম ভিক্ষার জন্য হন্যে হয়ে ফিরি। সে’ই আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না।
যে আমাকে গল্পটা শুনিয়েছিল, আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, “সত্যিই বিশ্বাস করেন এই কথা?”
সে হেসে বললো, “রিল্যাক্স। এই শহরের ৫০% ছেলেই অলরেডি এই মেয়ের পেছনে হন্যে হয়ে ঘোরে। তার প্রেমভিক্ষায় ভিখারি। আমিও তাদের একজন। ওয়েলকাম টু দ্য ক্লাব! হাহাহা।”
এক অদ্ভুত ভিন্ন জগতের বাসিন্দা এরা।
পরেরদিনই জোবায়ের এসে হাজির। ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে আবার শুরু করলো অ্যামেরিকা যাবার আবদার। আমি কোন কোন উপায়ে তাঁকে অ্যামেরিকা নিতে পারি।
বিস্তারিতভাবে বুঝালাম সে কোন কোন উপায়ে অ্যামেরিকা যেতে পারে। সবগুলোর মধ্যে বিবাহসূত্রে অ্যামেরিকা গমনটাই তার অধিক পছন্দ হলো।
“ভাই, আপনার সন্ধানে কোন ভাল বিদেশী মেয়ে আছে?”
আমি আমার ফেসবুক থেকে কয়েকজনের ছবি দেখলাম। বলা ভাল, ততদিনে গ্রামের বিদ্যুৎ অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এইবার দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বারো থেকে চৌদ্দ ঘন্টা কারেন্ট থাকে। এবং মোবাইল নেটওয়ার্কও পৌঁছে গেছে সেখানে।
আমার বান্ধবীদের প্রায় প্রত্যেককেই সে পছন্দ করলো। সাদা চামড়া, সোনালী চুল, নীল চোখ – গ্রাম বাংলার সাধারণ যুবক এদের পছন্দ না করে যাবে কই?
“ভাই, এরা সবাই কী খিরিস্টান?”
আমার হ্যা সূচক মাথা নাড়া দেখে সে সাথে সাথে বললো, “কোনই সমস্যা নাই। খিরিস্টান বিয়া করা জায়েজ আছে। আহলে কিতাব। ইন শা আল্লাহ, আমি দ্বীনের দাওয়াত দিলে অবশ্যই সে শাহাদা পাঠ করবে।”
“তা, কাকে আপনার পছন্দ হয়েছে?”
“সবাইকেই আমার “লাইক” হয়েছে। ভাই, আপনি সবার কাছেই আমার বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। যে আমাকে লাইক করবে, ইন শা আল্লাহ, তার সাথেই আমার বিয়ে হবে।”
“যদি সবারই আপনাকে পছন্দ হয়? তখনতো ওদের বান্ধবী বান্ধবীতেই মারামারি লেগে যাবে। এই ফিৎনা তৈরী করা কী আপনার উচিৎ হবে?”
এই কথায় বেচারা খুব চিন্তিত হয়ে গেল। তারপর আমাকে তালিকা করে দিল। কাকে প্রথমে প্রস্তাব পাঠাবো, তারপর যদি তাঁর পছন্দ না হয়, তাহলে কাকে দ্বিতীয়তে এপ্রোচ করবো। তারপর তৃতীয়। এইরকম সুস্পষ্ট একটি তালিকা।
“ভাই তালিকাটা লিখে রাখেন, নাহলে গুলায় ফেলবেন।”
“মনে থাকবে ভাই, সমস্যা নাই।”
“না ভাই, তারপরেও সাবধানের মাইর নাই।”
আমি কাগজে লিখতে বাধ্য হলাম। বেচারা হৃষ্টচিত্তে বাড়ি গেল। আহারে! কত সহজ সরল হয় মানুষের মন!
এই আলাভোলা ছেলে জোবায়েরের প্রতি আমার শ্রদ্ধা তখন কয়েকশো গুন বেড়ে গেল যখন জানলাম সে এক বাস্তুচ্যুত বৃদ্ধাকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে নিজের মায়ের মতোই দেখাশোনা করছে। এই যুগে যেখানে নিজের আপন ছেলেরাই মায়েদের বৃদ্ধাশ্রমে ছেড়ে দিয়ে আসছে, সেখানে জুবায়ের ঝড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির এক অসহায় বৃদ্ধাকে তুলে এনে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। নিজের মৃত মায়ের ঘরে সেই মহিলাকে তুলে এনে নিজে তাঁর ছেলে হয়ে গেছে। সংসারের বড় ছেলে হিসেবে এতিম জোবায়েরের সব ভাইবোনের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। অভাব অনটন তাঁদের সংসারের স্থায়ী সদস্য। এর মধ্যেও এইভাবে নিঃস্ব মানুষের সাহায্য করতে মস্তিষ্ক নয়, একটি বড় কলিজার প্রয়োজন হয়। বুঝে গেলাম, বুদ্ধিশুদ্ধিতে এই ছেলে আর দশটা মানুষের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও মনুষ্যত্বের দিক দিয়ে এই ছেলে আমাদের সবার চেয়ে কয়েক লক্ষ যোজন এগিয়ে। এই অসহায় বৃদ্ধার নামই ফাতেমা বেগম, খালার সম্পর্ক বলেই আমরা তাঁকে ডাকি ফাতেমা খালা।
এই ফাতেমা বেগমেরই কাহিনী বলতে এত এত গল্প বলা।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একরাতে আচমকাই মিলিটারি আক্রমণ করলো সুলতানপুরে। গ্রামের কিছু যুবক যুদ্ধে গিয়েছে শুনে খ্যাপা কুকুরের মতন ঝাঁপিয়ে পরে বাড়ির পর বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তান মিলিটারির পোশাক পরিহিত জানোয়ারগুলো। নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে পুরুষ, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। লুটে নিয়েছে টাকাপয়সা গয়নাগাঁটি। এমনকি তাদের রোষানল থেকে মুক্তি পায়নি গবাদি পশুও। তেমনি আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল ফাতেমা খালার বাড়ি। বুলেটে বুক ঝাঁঝরা হয়েছিল ফাতেমা খালার স্বামীর। আরো অন্যান্য কিছু গ্রামবাসীর সাথে তিনমাসের কোলের শিশুকে নিয়ে গ্রামের পাশের এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন ফাতেমা খালা।
ভূত প্রেতের আস্তানা হিসেবে এই জঙ্গলের বদনাম সেই অনাদিকাল ধরেই ছিল। লোকজন তাই এই স্থানকে এড়িয়েই চলতেন। কিন্তু মিলিটারির চাইতেও এইবার ভূতকে কম জালিম মনে হলো। ভূত আর যাই হোক, মৃত্যুর আগে হাজার মৃত্যুর স্বাদতো দিবে না।
ওদের ধারণা ছিল যে ভূতের জঙ্গলে মিলিটারি আক্রমণ করবেনা। কিন্তু মিলিটারি তখন পাগলা কুকুরের মতন ক্ষ্যাপাটে হয়ে গেছে। সেই ক্ষেতের ওপার থেকেই মেশিনগান চালিয়ে দিল জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। অসহায় নারীপুরুষ সবাই আবারও যার যা সম্বল তাই নিয়েই দৌড় শুরু করলো জঙ্গলের আরও গভীরের দিকে।
মাইল খানেক শুধু দৌড়। পেছনে বুলেটের শব্দ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর না হয়ে আসা পর্যন্ত কেউই থামলো না। এবং একটা সময়ে জঙ্গলের মাঝে একটা মোটামুটি ফাঁকা স্থান পেয়ে সবাই নিঃশ্বাস নিতে যখন থামলো, তখন ফাতেমা খালা দেখেন নিজের সন্তান ভেবে বুকে জড়িয়ে যা নিয়ে এসেছেন তা হচ্ছে আরেকজনের বালিশ। তাঁর বুকের ধন তাহলে কোই? তাড়াহুড়ায়, আতংকে, স্বামী – ঘর – সংসার হারানোর শোকে তিনি বুঝতেই পারেননি কত্তবড় সর্বনাশ তিনি ঘটিয়ে ফেলেছেন।
তিনি হাহাকার করে উঠলেন। কেউ কী তাঁর সন্তানকে এনেছে? কেউই কোন জবাব দিল না।
আতঙ্কে তাঁর বুদ্ধিলোপ পেল। তিনি আবারও ফেরৎ যেতে চাইলেন। মিলিটারির বুলেটের শব্দ তখনও ক্ষীণ হলেও শোনা যাচ্ছে। অন্যান্য মহিলারা বাঁধা দিলেন। কিন্তু তিনি যে মা! কিভাবে তাঁর সন্তানকে ওভাবে ফেলে রেখে পালাবেন?
তাঁকে ধরে রাখা গেল না। তিনি ফিরতি দৌড় শুরু করলেন। জঙ্গলে পথ চেনা যাচ্ছে না। যেদিকে মনে হচ্ছে তিনি ছুটছেন। গুলির শব্দ গাইডের কাজ করছে। কিন্তু এখন সেই শব্দ অনিয়মিত হয়ে যাওয়ায় খুব একটা লাভ হচ্ছে না।
খালি পায়ে দৌড়াচ্ছেন তিনি। কাটায়, শুকনো ডালে কেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে তাঁর খালি পা। তিনি তবু ছোটার গতি কমাচ্ছেন না। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর বাজান কাঁদছে। তাঁকে বুকে চেপে দুধ না খাওয়ালে সেই কান্না থামবে না।
একটা সময়ে বুলেটের শব্দ থেমে গেল। তিনি জঙ্গলেই হারিয়ে গেলেন।
যুদ্ধ শেষ হবার পরে তিনি তাঁর গ্রামে ফিরেছিলেন। এসেই ছুটে গিয়েছিলেন সেই জঙ্গলে। তাঁর মায়ের মন যেন বারবার বলছিল তাঁর সন্তান বেঁচে আছে। তিনি গেলেই দেখবেন শিশুটি এখনও সেখানে হাতপা ছড়িয়ে কাঁদছে।
তন্নতন্ন করে জঙ্গল ঘেঁটেও তিনি কোন চিহ্ন পাননি।
যুদ্ধের পুরোটা সময় অন্যগ্রামে, শরণার্থী শিবিরে তিনি পাগলিনীর মতন ছিলেন। সারাদিন কাঁদতেন। তখন সারা বাংলাদেশ কাঁদছে। কয়জন তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করবে?
একটা সময়ে তিনি সত্যকে মেনে নিলেন। নিজের ভিটেয় ঘর বাঁধলেন। একা থাকা শুরু করলেন। লোকজনের বাড়িতে টুকটাক কাজ করে যা আয় হয়, তাতেই তাঁর চলে যেত। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে সেই একাত্তর সনেই। ইহকালের প্রতি তাঁর আর কোন চাহিদা নেই।
কোনরকমে এ ক’টা পার করে দিতে পারলেই তিনি বাঁচেন।
মাঝে মাঝে ভরা জোছনা কিংবা অমাবশ্যার রাত্রিতে তাঁর হারানো সন্তানের কথা মনে পরে যায়। মায়ের মন উতলা হয়ে উঠে, মস্তিষ্ক কিছুক্ষনের জন্য তাঁকে ভ্রান্ত করে। তিনি ছুটে যান সেই জঙ্গলে। তাঁর বুকের ভিতরের মাতৃহৃদয় হাহাকার করে উঠে, “বাজানরে……ও বাজান!”
হয়তো আশা করেন তাঁর ডাকে একদিন ছোট্ট শিশু কেঁদে উঠে নিজের অবস্থান জানান দিবে। তিনি আবারও বুকের সাথে তাকে জাপ্টে ধরবেন।
ফাতেমা খালার সন্তান হারানোর ঘটনা এই গ্রামের সবাই জানে। আমি নিজেই শুনেছি শামীমের কাছ থেকে। তবে একটু ভিন্নভাবে। গ্রামবাসী জানতো ৭১ এ ঘর পোড়ানোর সময়ে তিনি তাঁর স্বামী সন্তান হারিয়েছিলেন। তা এই গ্রামের অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটেছিল। সন্তানের পরিবর্তে বালিশ নিয়ে দৌড়ানোর ডিটেইল “সুস্থ” ফাতেমা খালার না বলা পর্যন্ত মোটামুটি কারোরই জানা ছিল না। সেকারনেই আলাদাভাবে জঙ্গলের সাথে যোগসূত্র স্থাপিত হচ্ছিল না। এবং কেউ ধারণা করেনি, তিনি এখনও সেই সন্তানের শোকে মুহ্যমান। গ্রামের দিকে সন্তান হারানো নাকি খুবই সাধারণ ঘটনা। প্রায় প্রতিটা ঘরেই, প্রতিটা পরিবারেই অভিভাবকদের এই তীব্র কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এবং এই কারনে এতদিন তিনিই ছিলেন সুলতানপুরের ডাইনি।
শামীম তাঁর চাচার পরিবার সহ কয়েকজন গ্রামবাসীকে নিয়ে ছুটে এসেছিল ডাইনির হাত থেকে আমাকে রক্ষা করতে। হাতে মশাল, লাঠি, দা, শাবল – যদি অশরীরীর সাথে লড়তে হয়, তার প্রস্তুতি। আমাকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হলো উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে।
সুলতানপুরের ডাইনীকে একজীবনে যথেষ্ট অবিচার সহ্য করতে হয়েছে। আর নয়।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত