আমার সংসার

আমার সংসার
বিয়ের তিনদিন পর পাশের বাসার পিচ্চি ছেলেটা বউ দেখতে এসে ফিরে গেল।কিছুক্ষণ পর ওর মা এসে অভিযোগ করল,তার ছেলে এসে বউ খুঁজে পাইনি।বলল সাদা শাড়ি পরা একটা মেয়েকে দেখেছে।তাই শুনে আমি আর আমার শ্বাশুড়ি মিটিমিটি হাসছি।আমাদের হাসি দেখে ভদ্রমহিলার কিঞ্চিৎ রাগ হল।
বিয়ের পরদিন শ্বাশুড়ি মা উনাকে বলল,আমার জন্যে দুটো শাড়ি আনতে।তা উনি প্রাইডের দুটো শাড়ি আনলেন দুটোই ঘিয়ে রংয়ের।একটা নানি শ্বাশুড়ির জন্যে রেখে আরেকটা নিজেই পরেছিলাম। আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে যখন উত্তর পেলেননা তখনি ভদ্রমহিলার আমার শাড়ির দিকে নজর গেল।উনিও তখন আমাদের সাথে হাসতে লাগলেন। ছেলের জন্মের পর তাকে বললাম,বাবুর জন্যে মশারি নিয়ে এসো।দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল তার আসার কোন নাম নেই।রাতে সে বিজয়ির বেশে বাসায় ফিরল।মশারী এনেছে কিনা জানতে চাইলে এমন ভাব করল যেন তাকে কোন কাজ দিলে ঠিকঠাক না করে পারেনা। প্যাকেট খুলে আমি ত হা।
একি বড় মশারী এনেছ কেন? বারে এত ছোট বাচ্চা আলাদা ঘুমাবে এটা কোন কথা হল?আমরা সবাই এক মশারিতে ঘুমাবো। কিন্তু আমাদের ত মশারি আছে। ভাবলাম বাচ্চা হলে হয়ত সবাই নতুন মশারী কেনে। তার কাচুমাচু মুখ দেখে হাসব না কাঁদব ভেবে পেলাম না। হোম কোয়ারেন্টিনে আছি বেশ কিছুদিন হল।হঠাৎ প্রচুর ঠাণ্ডা লেগে আমার অবস্থা খারাপ।ভয়ে ত আমি শেষ। না জানি করোনায় আমাকে ধরল নাকি?ভয়ে ভয়ে চুপ করে বিছানায় শুয়ে ছিলাম।বাবুর আব্বুকে বললাম,প্লেটগুলো ধুয়ে ফেল।সারাদিন ত বাসায় শুয়ে বসেই আছ।
সেও খুব আগ্রহের সাথে সব পরিষ্কার করল।কিছুক্ষণ পর উঠে দেখি সে দু দুটো মাজুনি রেখে যেটা দিয়ে আমি ময়লা পরিষ্কার করি,সেটা কোথা থেকে নিয়ে প্লেট মেজেছে।রাগে দুঃখে আমার কান্না পেল।সব প্লেট নামিয়ে আবার মাজলাম।আমাকে প্লেট ধুতে দেখে রেগে সে আগুন।আমার নাকি সুচিবায়ু রোগ।কারো কাজই পছন্দ হয়না কথাটা বলতে বলতে সে টিভি দেখতে বসল। এর ঠিক দুদিন পরে সে ভয়াবহ কান্ড ঘটালো।কিচেনে যেয়ে দেখি আমার ননস্টিকি ফ্রাইপ্যানটা রুপার মত ঝকঝক করছে।আমার মাথাচঘোরা শুরু হল।সে তখন মনের সুখে টিভি দেখছে।ফ্রাইপ্যান হাতে রুমে ঢুকতেই এক গাল হেসে বলল,পরিষ্কার হয়েছে না?আমি জানি তুমি সবকিছু পরিষ্কার কর।হয়ত এটা খেয়াল করনি।কেমন পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল।তাই মেজে দিলাম।ভালো করিনি?
আমার ইচ্ছা করছিল প্যান টা ওর মাথায় ছুড়ে মারি।অনেক কষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করে কিচেনে ফিরে আসলাম।
বাসায় সারাদিন থেকে তার আবার আজব আজব খেয়াল চাপে।তো সেদিন আমাকে বলল,তোমার আজ ছুটি।আজ আমিই রান্না করব। আমিও খুশি হলাম।শরীরটা ভালো না।খাবার স্বাদ পাই না।অন্যের রান্না খেতে হয়ত ভালোই লাগবে।শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলাম।শরীর ভালো না তাই ঘুমিয়ে পরেছিলাম।হঠাৎ খুটখাট শব্দে আমার ঘুম ভাংল।ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, কিসের শব্দ?
বলল বাবা রান্না করছে।প্রায় আধা ঘন্টা ধরে এই যন্ত্রণা আমাকে সহ্য করতে হল।ভাবলাম যত যাই হোক ভালো কিছু ত খেতে পারব।উঠে হাত মুখ ধুয়ে ছেলেকে বললাম ভাত দিতে।প্রস্তুতি নিচ্ছি ভালো রকম।ওমা ছেলে আমার ভাতের সাথে ডাল মিশিয়ে এনে দিল।সত্যি বলছি এত দুঃখ আমি কোনদিন পাই নি।একবার যখন আমরা তিন বোন এক ছেলেকে পছন্দ করে বসেছিলাম।তারপর জানলাম ছেলেটা এক নাম্বারের ধরিবাজ।তখনো এতটা কষ্ট পাই নি।
রোজা শুরু হওয়ার পর ত আমার যন্ত্রণা আরো বেড়ে গেছে।এক একদিন একেকটা ভুত তার ঘাড়ে চাপছে।দুপুরে একটু ফেসবুকিং করছিলাম।
অনেকক্ষন পরে কিচেনে গিয়ে দেখি আমার কিচেন লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে।ছেলেকে নিয়ে তিনি আলুর চপ বানানোর মিশনে নেমেছে।ইয়া বড় বড় চারটে আলু সিদ্ধ করে ১৬ টা বড় চপ বানিয়েছে।আর সারা কিচেনে ছড়িয়ে রেখেছে আলুর খোসা।কিচেন পরিষ্কার করতে গিয়ে সেদিন আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত।
সত্যি আমি আর পারছিনা।একে ত সারাদিন বাসায় বন্দী থাকা,তার উপরে তার উদ্ভট কার্যকলাপে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেছি।নানা ফন্দি ফিকির করেও তাকে আটকানো যাচ্ছে না।অবশেষে একটা বুদ্ধি বের করলাম।তাকে বললাম,তুমি ত তোমার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কর না,এই সুযোগে সবার সাথে ফোনে কথা বল।মনে হল আইডিয়া টা তার পছন্দ হয়েছে।সকাল থেকে শুরু হচ্ছে ফোনালাম।
এদিকে আমি কি ইফতারি বানাব,সেহরিতে কি রান্না করব এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই।২/১ দিন ব্যাপারটা ভালোলাগলেও এখন ভীষণ বিরক্ত লাগছে।এক সময় আমিই তাকে বন্ধুদের সাথে বেশি আড্ডা দিতে না করতাম।বিয়ের পর অনেক সময় সে বন্ধুদের নিয়ে কাটাত।তাই নিয়ে আমি অভিমান করেছি।এক সময় সেগুলো বন্ধ হয়েছে।আজ নিজেই আবার সেই বন্ধ অধ্যায় খুলে দিলাম।জীবনে যা করিনি তাই করলাম।ওর মোবাইল চেক করে দেখলাম কার সাথে কথা বলে।ওমা সবার নাম সেভ করা থাকলেও একটা নাম্বার সেভ নেই।ওই নাম্বারে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কথা হয়।কৌতুহল দমন করতে না পেরে কল দিলাম ওই নাম্বার।ওমা একটা মহিলা রিসিভ করল।রাগে আমার গা জ্বলে গেল।শেষ মেশ পুরনো প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে।
রাতে আবার সেই নাম্বার থেকে কল।আমি তাকে ডেকে ফোনটা দিলাম।আজ ও কথা বলল প্রায় ৩০ মিনিট।সেকি হাসাহাসি!রাগে আমার নিজের মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছিল।অনেক কষ্টে তা দমন করলাম।এমনিতেই আমার মাথার চুল সব পরে যাচ্ছে।আমার গত জন্মদিনে তিনি আমাকে একটা শ্যাম্পু গিফট করেছিলেন।সেই শ্যাম্পু মেখে আমার অর্ধেক চুল উঠে গেছে।
সে ফোন রাখতেই আমি ফুসে উঠলাম।কার সাথে এত কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল,ওর বন্ধুর সাথে কথা বলে।বন্ধু তার বউয়ের মোবাইল থেকে কল দেয়।আমার রাগ দেখে তার সেকি হাসি!তার হাসি দেখে রেগেমেগে চলে যাচ্ছিলাম।মেঝেতে ছেলেটা শরবত ফেলেছিল।হাটতে গিয়ে দড়াম করে পরলাম।ব্যস কোমর ব্যাথায় এখন আর নড়তেই পারছিনা।
বাবা ছেলে আমাকে আস্বস্ত করল চিন্তার কিছু নেই।আমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সব কাজ ওরা করবে।কথাটা শুনে আমার মাথা কাজ করছিল না।কাজ করতে গিয়ে আমার পুরা বাসার যে অবস্থা ওরা করে রাখবে তাতে সুস্থ হওয়ার পর আমার যে কি দূর্দশা হবে তা ভাবতেই আমি শিউরে উঠলাম।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত