সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা

সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা

কলেজ না গিয়ে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে হাটতে হাটতে চিলমারি বাস টার্মিনালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি,লক্ষ্য ঢাকায় যাব থাকব না আর বাড়িতে।থেকেই বা কি হবে?একটা ফোন কিনে চাইলাম সেটাও কিনে দিলো না।বন্ধুদের সকলের দামি ফোন। আর আমার একটা সিম্ফনি বাটন ফোন বন্ধুদের সাথে চলতে লজ্জা লাগে তাই প্রাইভেট কলেজ ফর্মফিলাপের টাকা কাটিয়ে একটা ফোন কিনলাম।বাবা সেটাও বিক্রি করে দিয়ে বলল ইন্টার পাশ কর তারপর আমি কিনে দেব এখন বাটন ফোন ব্যবহার করতে হবে।তাই রাগ করে আজ সকালে বাসা থেকে বের হয়ে আসছি আর থাকবনা।সারাটাদিন চিলমারির এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম।দুপুরবেলা বন্ধুর বাসায় খেয়েছি তাই ক্ষিধেটাও নেই।এখন সন্ধ্যা ৭টা।আর একটু পরেই বাসে উঠব মনের মাঝে এক অন্যরকম অনুভূতি।
এখন বাসে উঠব এক পা দিতেই দেখি হাতে টান পড়ছে আমি গাড়িতে উঠতে পারছিনা।পিছনে ফিরে দেখি বাবা হাত টেনে ধরছে।টেনে বাস থেকে একটু দুরে নিয়ে গিয়ে আমার দু,গালে ২টা থাপ্পড় দিলেন।তারপর বললেন কোথায় যাচ্ছ জাবের?·জবাবে বললাম যেখানে আমার চাওয়ার কোন মুল্য নেই সেখানে আমি থাকবনা।(অনেকটা রেগে গিয়ে)কি একটা ফোনেই তো চেয়েছি আর বেশি কিছু তো চাইনি। বাবার সামনে কোনদিন রেগে কথা বলিনি।আজকে এভাবে বলাতে বাবা একটু চমকে গেলেন তারপর বললেন ঠিক আছে যাও।তবে তার আগে আজকে তোমাকে একটা ভিন্ন গল্প শোনাবো গল্পটা শুনে তারপর যাও।মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে বাবা বলতে লাগল।
.
গ্রামের দরিদ্র একটা পরিবারে আমার জন্ম।ভাই বোন সংখ্যায় অনেক চার ভাই দুই বোন।পরিবারের একমাত্র উপাজর্নক্ষম ব্যক্তি বাবা।সারাদিনে যা আয় করেন তা দিয়ে কোন রকম ৩বেলা খেয়ে না খেয়ে কাটাই।ধীরে ধীরে আমরা বড় হতে থাকি স্কুলেও ভর্তি হয়ে যাই।তখন আমাদের লেখাপড়া ও খাবার খরচ চালাতে বাবা পুরা হিমশিম খেতে থাকে।তাই আমরা প্রায়দিনে গমের রুটি খেতাম।এভাবে প্রাইমারি স্কুল পাশ করে আমি মাদ্রাসায় ও ভাইয়েরা মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম।আর তখনি সংসারে নেমে আসে কালো ছায়া গমের রুটিটাও আর প্রতিদিন খাওয়া হয়না তাই মা কচুর মুল কুড়িয়ে এনে সিদ্ধ করতেন আর খেয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের গলা চুলকাতো তারপরো ক্ষুধার কাছে হার মেনে যায় কচুর মুল।মাঝে মাঝে বাবা আড়াই টাকা মনে মিষ্টি আলু কিনে আনতেন যা খেয়ে মনে হতো সবচেয়ে ভাল খাবারটা খেলাম বুঝি।লেখাপড়ায় আমরা সকলে অনেকটা মেধাবি ছিলাম।তাই মাষ্টারগন অনেক সুযোগ সুবিধা দিলেও ন্যায্য ফিসটা দিতে পারতাম না।আমার গায়ের পোশাক ছিল ১টা।তাই একবার গরমের দিনে মেলায় শীতের পোশাক পড়ে যাওয়াতে বন্ধুরা অনেক তিরষ্কার করেছিল আমার দরিদ্রতাকে নিয়ে।লেখাপড়ার মাঝে আমরা এগিয়ে যেতে পারলেও পারিনি দরিদ্রতাকে কাটিয়ে এগিয়ে যেতে।এরই মাঝে বড় ভাইয়ের এসএসসি ফর্ম ফিলাপের সময় হলে বাড়ির গাভিটা বিক্রি করে টাকা দেই।ভাই পরিক্ষা দিয়ে ভাল রেজাল্ট করলো।কিন্তু বাবা বলেছিলেন তিনি আর খরচ বহন পারবেন না।তাই ভাই একদিন তার পুরাতন তালি দেয়া শার্ট আর প্যান্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন উদ্দেশ্য কোন বড় লোকের সন্তানকে পড়িয়ে তার বাড়িতে জায়গা নিয়ে নিজের লেখাপড়া চালানো।এদিকে আমার দাখিল পরিক্ষা ঘনিয়ে আসছে ফর্ম ফিলাপের টাকা পূর্ব থেকে যোগার করার লক্ষ্যে ছোট ভাইকে নিয়ে অন্যের জমিতে কাজ করে টাকা জমিয়েছি।তাই হয়তো পরিক্ষাটা দিতে পারছি।এরপর রেজাল্ট বের হলে আমি অনেকটা ভালোভাবেই পাশ করি।কিন্তু আর লেখাপড়া চালাতে পারবনা ভেবে সেদিন থেকে শুরু হল আমার বালিশ ভেজানো কান্না।পরিবারের কারো কাছে প্রকাশ করতম না।যদি বাবা মা কষ্ট পায়।গ্রামের অনেকে আমাকে দেখে দেখে বলতো যারা তিন বেলা খেতে পারেনা।তাদের কিসের লেখাপড়া,তারা মাঠে কাজ করুক গিয়ে।কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিল বলে থেমে যায়নি শাহরিয়ার খন্দকারের লেখাপড়া।আমারো জায়গা হল কুড়িগ্রাম শহরের পাশেই একটা গ্রামে অন্যের বাড়িতে থেকে তার সন্তানকে পড়ানোর মাধ্যমে আমার লেখাপড়া। চালানো।বাড়ির মালিকের অবস্থাও ততোটা ভালো ছিলোনা তবে আমার খাবারটা প্রতিনিয়ত ভালোই চলতো ভাতের গামলা তরকারির বাটি আমার সামনে রাখতো আমি উঠায় নিতাম।আহ!কত শান্তি তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারতাম।কিন্তু খাতা কলমের খরচ চালানোর মত পর্যাপ্ত টাকা পেতাম না।তাই একই মাদ্রাসায় পড়া চিলমারী এলাকা থেকে আসা কয়েকজন ছাত্র মিলে একটা দল করলাম।কোথাও মিলাদ মাহফিল হলে আমাদের দলকে ডাকতো,মিলাদের পর কিছু টাকা দিতো যা ভাগ করে নিয়ে খাতা কলমের খরচ চালাতাম এবং টাকা বাচিয়ে বাড়িতে পাঠাতাম ছোট ভাইবোনদের জন্য।এভাবে দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার বাড়ির মালিক অসুস্থ হল।ডাক্তারের কাছে নিলে ডাক্তার জানান যে খাবার অভাবে খেতে না পারায় শরির দুর্বল।আমি তো অবাক যে মানুষ আমাকে এতোটা যত্নে সবকিছু এগিয়ে দিয়ে খাওয়াতো তিনি কিভাবে খেতে না পেরে অসুস্থ হন।পরক্ষনে মনে হল আমার খাওয়া শেষ হবার পর মালিক খুব দ্রুত গামলা বাটি সড়িয়ে ফেলতেন,আমি ভাবতাম এমনি সরাতো কিন্তু না সেদিন বুঝলাম এমনি নয় দ্রুত খাবার সড়িয়ে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে সকলে ভাগ করে খেতেন যার ফলে মালিক প্রায়দিন না খেয়ে থাকতো তার ফল স্বরুপ আজকে অসুস্থ আর আমি স্বার্থপরের ন্যায় খাবার খেতাম ভাবতেই চোখ বেয়ে জল নেমে আসলো।এরপর থেকে খাবারটা ভাগ করে অল্প পরিমানে খেতাম।এভাবে দিনকাল চলতে থাকে এরই মাঝে আলিম পরিক্ষা হয় রেজাল্ট বের হয় এটাতেও বেশ সফলতার সহিত পাশ করেছি।তারপর আমি বাড়িতে যাই দীর্ঘ দুই বছর পর বাড়িতে যাই,যাবার পথে ছোট ভাই বোনদের জন্য ক্রিমবল নিয়ে যাই।বাড়িতে পৌছানোর পর যখন ওদের হাতে দিলাম,দেখি ছোট বোনটি খাচ্ছে আর হাসছে বললাম পাগলি হাসিস কেন?ও বলেছিল ভাই মেলাদিন থাকি আব্বার কাছে ক্রিমবল চাই কিন্তু আব্বা আনে না,আব্বা বুঝি মোক ভালবাসেনা।কথাটা শুনেই ওকে জরিয়ে ধরে কেদে ফেললাম আর বলতে লাগলাম আর কখনো এভাবে বলবিনা পাগলি আব্বা তোকে খুব ভালবাসে দেখবি এরপর ঠিক আনবে তখন কিন্তূ আমাকে তোর ভাগের থেকে দিবি।ও তখন হাতে থাকা অর্ধেক ক্রিমবলটা আমার মুখের সামনে ধরে বলতে লাগলো ভাই তখন তো থাকবিনা তাই আইজকে এই অর্ধেকটা নে পরে আব্বা আনলে পুরাটাই খাব কাউকে দেবনা।বলেই সে আমার মুখে পুরে দিয়ে হাসতে লাগলো মনে হচ্ছে বাবা যেন ওকে এনে দিয়েছে আর আমি হাসি কান্না এক করে বোনের হাতে খেতে লাগলাম।এরপর আর কয়েকটাদিন বাড়িতে থেকে রংপুর চল গেলাম।
রংপুর মাহিগন্জে একটা মাদ্রাসায় ফাযিলে ভর্তি হলাম।এখানেও এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় সহজে একটা লজিং থাকার বাড়ি মিললো।এখানে মাস শেষে কিছু করে টাকাও দিতো যার দ্বারা সেই সময়ে বড় বোনটার বিয়েটা একটু ভালভাবেই দিতে পারি।বেশ ভালভাবেই দিন যাচ্ছিলো রংপুরে তারপর একদিন কুড়িগ্রামে পূর্বের বাড়িতে বেড়াতে গেলে স্থানিয় একটা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার জন্য গ্রামবাসিরা বলতে লাগলো তারপর আমিও সুযোগটা লুফে নিলাম।চাকরিটা হবার কিছুদিন পর কুড়িগ্রামে এক রমনীকে বিয়ে করি।আর তার কোল আলোকিত করে আসে চারটা মেয়ে ও একটামাত্র ছেলে।ছেলেমেয়ের চাওয়াগুলো কখনো অপূর্ন রাখার চেষ্টা করিনি।কারন চাকরি আছে এখন আমি কিছুটা সাবলম্বী আগেরমত আর না খেয়ে থাকি না।এই তো বছর পাঁচ পূর্বে সেভেনে পড়ার সময় ছেলেটা ফোন চেয়েছিলো বলেছিল ওর বন্ধুদের আছে।তখন বলেছিলাম এস এস সি পরিক্ষা দাও তারপর দেব এখন দিলে পড়া পড়বানা।তখন সে আমার কথা বুঝতে পেরে আর চায়নি।পরিক্ষার পর একটা বাটন ফোন কিনে দিছি।গল্পের এটুকু বলেই বাবা থামলেন।
এদিকে আমি লক্ষ্য করে দেখলাম যে আমার বুকটা অশ্রু জলে ভেসে গেছে।বাবার চোখেও বিন্দু বিন্দু জল।বাবা আবার বলতে লাগলেন আমি অনেক আগে থেকে ভেবেছি যে আমার ছেলেটার
এইচ এস সি পরিক্ষাটা শেষ হলে তাকে একটা ফোন কিনে দেব তার আগে দিলে ফেসবুক ইন্টারনেই এসব চালাতে পড়ার সময়টা হারিয়ে ফেলবে,সেই ভাবনার মত করে তাকে বলেও ছিলাম কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে এখন সে অনেক বড় হয়ে গেছে,নিজেই সব বুঝতে পারে।তাই হয়তো আমার ভাবনাটা তার কাছে হেরে গেছে তাই তো আজ আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে,গল্পটা এখানেই শেষ বলেই বাবা পিছন ফিরে হাটত লাগলেন।আর আমি নির্বাকভাবে দাড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগলাম আসলে বাবাই তো ঠিক আমি নতুন দামি ফোনের আবদার করেছি যাতে করে বন্ধুদের সাথে গ্রুপ চ্যাটিংয়ে সুবিধা হয়,নেট থেকে মুভি ডাউনলোড করতে পারি আর বাবা আমার লেখাপড়ার কথা ভেবে ফোনটা পরিক্ষার পর দিতে চেয়েছেন।বাবাতো আমার ভালোর জন্যই তো পরিক্ষার পরে দিতে চেয়েছে আর আমি কি না সেই বাবাকে ছেড়ে যাচ্ছি।ভেবেই দৌড় শুরু করলাম দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।অনেকদিন হল বাবাকে জড়িয়ে ধরিনা তাই আজকে সুযোগ পেয়ে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলাম বাবা আমার দামি ফোন চাই না বাবা,বাবা আমি তোমাকে চাই,বাবা আমি আমার স্বর্গ পেতে চাই।বলেই বাবাকে জড়িয়ে ধরছি আর দুইজনের চোখেই আনন্দ অশ্রু।বেশ কিছুক্ষন কেটে গেলেও বাবাকে ছাড়ছিনা।আমি সারাজীবন এভাবেই বাবাকে জড়িয়ে ধরেই থাকতে চাই।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত