রুমী পাগলী

রুমী পাগলী

-এই শুনেছিস রুমি পাগলীর নাকি ছেলে হবে।

-হুম শুনলাম তো। ছেলে হোক আর যাই হোক বেচারির কপালটাই খারাপ ওর স্বামী তো আর ওকে ঘরে তুলবে না।

-তা যা বলেছিস, ওমন পাগলি বউ দিয়ে কি আর সংসার চলে!!

এতক্ষণ রুমী পাগলী কে নিয়ে কথা বলছিল আমার দুই প্রতিবেশী। তাদের কথা শুনে সহ্য করতে না পেরে আমি সরে আসলাম সেখান থেকে।। আমাদের পাশের বাড়ির এক চাচার সাথে বিয়ে হয়েছিল রুমী পাগলির। মা-শা-আল্লাহ তাকে দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। টানা টানা হরিণী চোখ, দুধে আলতা গায়ের রঙ, মায়াবী চেহারা যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোন ডানাকাটা পরি।

চাচীর রূপ দেখেই ফিদা হয়ে বউ বানিয়ে নিয়ে এসেছিল চাচা। কিন্তু চাচী যে পাগলী বিয়ের আগে তা কোনভাবেই বুঝতে পারে নি কেউ। বিয়ের দিন থেকেই সবাই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল। কেননা চাচী যেদিন প্রথম বউ হয়ে বাড়ি আসে সেদিনই নতুন বউয়ের মত লজ্জা না পেয়ে চুপচাপ বসে না থেকে সারাবাড়িতে ঘুরঘুর করতে থাকে। এতেই লোকের কানাঘুষো শুরু হয়ে যায়। কারণ সারাজীবন সবাই নতুন বউ কে লজ্জা পেয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখেছে। আজ এর অন্যথা হলে কেউই সেটা সহজ ভাবে নিতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।

চাচী কে সবাই পাগলী বললেও আমার তাকে কখনো পাগলী মনে হয় নি। তার কারণ তাকে যে কারণগুলোর জন্য পাগলী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে মূলত আমার কাছে তা চাচীর সরলতা বলেই মনে হয়েছে। চাচী কে সবাই পাগলি বলার পিছনে কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক।

একবার চাচীর শাশুড়ি অন্য এক মহিলার হাঁস তাদের বাড়িতে ধান খাওয়ার জন্য আসলে সেই হাঁসগুলোকে বেঁধে লুকিয়ে ফেলে। আর ওই মহিলা যখন হাঁস খুঁজতে আসে তখন উনার শাশুড়ি বলে, “কিসের হাঁস কই আমাদের বাড়িতে আসতে তো আমি দেখি নি। তখন চাচি মুখের উপরেই বলে দেয়,” আম্মা আপনি না বকাবকি করে কয়েকটা হাঁস কে খোঁয়াড়ে বেঁধে রেখেছেন। আর তাতেই শুরু হয়ে গেল তুলকালাম। আর চাচী হয়ে গেল পাগল কারণ সে তার পরিবারের স্বার্থ বুঝলো না।

রুমী পাগলী নতুন বউ হয়েও গাছে চড়ে আম পাড়তো, পেয়ারা পাড়তো, বাচ্চাদের সাথে কুতকুত খেলতো, পুকুরে ঝাপাঝাপি করে বাচ্চাদের সাথে সাঁতার কাটতো, মাঝেমাঝে মুরগির বাচ্চাকে কে আলতো করে হাতের মুঠোতে তুলে আদর করতো, তাদের সাথে কথা বলতো, হাসতো। আর এইসব কারণের জন্যই রুমী চাচী কে পাগলী বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

বউ হয়ে আসার পর সংসারের বেশির ভাগ কাজ নতুন চাচী কে করতে হয়। এমনকি তাদের ক্ষেতের ধান মাড়াইয়ের কাজ ও করতে হয়। আর অন্য বউ প্রেগন্যান্টের বাহানায় কোন কাজেই হাত দেয় না। তার উপর শাশুড়ি বলে ওই বউয়ের ঘরে খাবার দিয়ে আসতে সেই জন্য নতুন চাচী রেগে বলেছিল আমি কেন সব কাজ করবো আমাকে কি চাকরানি আনা হয়েছে? বউ যখন দুইজনেই তবে উনাকে ও কিছু কাজ করতে হবে, আমি বান্দির মত খেটে আবার উনার রুমে খাবার পৌঁছে দিতে পারবো না।

এতেই শাশুড়ি তেলেবেগুনে রেগে বলল, কি!!! তুই আমার মুখের উপর কথা বলিস!!! আজ আসুক আমার ছেলে তোরে বুঝাবো মজা। চাচা বাড়ি ফিরতেই তার মা আরো নানান কথা বানিয়ে কাকার কান ভাঙালো। আর চাচা ও চাচী কে কিছু জিজ্ঞাস না করেই গালাগালি করতে থাকে । তখন চাচীও রেগে বলছিল তুই রাতে বিছানায় এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলিস, আদর-সোহাগ করিস। রাতে তোর মা খারাপ থাকে আর দিন হলে তোর মায়ের কথায় আমি খারাপ হয়ে যাই তাই না? ব্যস উচিত কথাটা মুখের উপর বলার কারণেই চাচী হয়ে গেল পাগলী। কারণ স্বামী -স্ত্রী এর গোপন কথা বাইরে বলতে নেই অথচ চাচি হাটে হাড়ি ভেঙে দিল!!!

আরেকদিন চাচী তার শাশুড়ি কে বলেছিল আপনি এমন পাগলের মত চলাফেরা করেন কেন? একটু সাজগোজ করতে পারেন না? মাথায় একটু তেল দিয়ে চুল আছড়াতে পারেন তো!! যেরকম ভাবে চলেন দেখতে তো একদম ডাইনী বুড়ির মত মনে হয়। ব্যস চাচা আসতেই শুরু হয়ে যায় ক্যাচাল তোর বউ আমাকে ডাইনী বলছে আমারে পাগল বলছে। ওর এত বড় সাহস হয় কি করে? কেন বলছে আসল কথাটা চেপে গিয়ে কাকার কানে উলটা পালটা কথা বলে চাচি কে মার খাওয়াতে থাকে। আর চাচি তাতে রেগে গিয়ে কোন কাজ না করে দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এই জন্য চাচী পাগলী।

একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই থাকে তাদের বাড়িতে। অতিষ্ঠ হয়ে চাচা চাচীকে বাপের বাড়ি রেখে আসেন। আর উনার মা সারা পাড়া রটাতে থাকেন ছেলের বউ পাগলী মাথা খারাপ।

চাচা চাচীর ফোন না ধরাতে বাধ্য হয়ে চাচী উনার ননদ, চাচার ভাবীদের এবং চাচার বন্ধুদের ফোন করতে থাকে। আর সহজ সরল এই মহিলা সবাইকে বলে দেয় তার দুর্বলতার কথা। চাচার সাথে বিয়ের আগে চাচীর ফুফাতো ভাই প্রেম করে পালিয়ে চাচীকে বিয়ে করেছিল। চাচী অসম্ভব সুন্দর হলেও তার সহজ সরল চালচলন এবং মুখের উপর ফটফট সত্য কথা বলে ফেলার দরুণ তার ফুফুর ও অত্যাচার শুরু হয়ে যায়। এবং নানান ঝামেলার সৃষ্টি হয় এবং খুব অল্পদিনের মধ্যেই আবার তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর চাচী সবাইকে বলতে থাকে, আমার আগে এক বিয়ে হয়েছে বলে উনি এখন আমার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করছে। এই জন্য আমাকে তাড়িয়ে দিছেন। কিন্তু আমার কি দোষ উনি তো বিয়ের আগেই সব জেনেছেন। এখন কেন আমাকে অবহেলা করছেন?

চাচা এই সত্যটা জেনেও চাচীর রূপে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এই সত্যটা চাচার বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনরা কেউ জানতো না। অথচ চাচীর কারণে সবাই ঘটনাটা জেনে যায়। ফলে চাচা একটা ডিভোর্সি মেয়ে কে বিয়ে করেছে শুনে সবাই ছিঃ ছিঃ করতে লাগলো। কারণ আমাদের সমাজের মানুষেরা ডিভোর্সি মেয়েদের ভালো চোখে দেখে না। এরপর চাচা আরো ক্ষেপে যান চাচীর উপর এবং সিদ্ধান্ত নেন চাচি কে ডিভোর্স দিবেন।

কিন্তু চাচী ও তার পরিবারের লোকেরা বিনা অন্যায়ে বার বার ক্ষমা চায় চাচার পরিবারের কাছে, চাচার কাছে। কিন্তু তারা আর কোন ভাবেই চাচী কে ঘরে তুলবেনা বলে জানিয়ে দেয়। এমনকি সন্তান হওয়ার কথাটা শুনেও তাদের পাষণ্ড হৃদয় বিগলিত হয় নি। চাচার পরিবার জানায় সন্তান হওয়ার পর সন্তানের দায়িত্ব নিলেও চাচা চাচীর দায়িত্ব নিবেনা। সময়মত ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবেন বলে জানান চাচা।

যে সময়টা স্বামী কে খুব বেশি পাশে প্রয়োজন ছিল চাচীর সেই সময়টা একা একা চোখের জল ফেলে কাটাতে থাকে চাচী। চাচীর বাড়ির পাশেই আমার এক বান্ধবীর বাড়ি ওর কাছ থেকেই মাঝেমাঝে চাচীর খবর পেয়ে থাকি। বান্ধবীর কাছে শুনলাম চাচীর পাড়াপড়শি, পরিবারের লোক এবং আত্মীয়স্বজন সবাই উনাকে নানান রকম খারাপ খারাপ কথা বলে। সবাই উনার দোষ দিতে থাকে। বলতে থাকে, পোড়াকপালি তোর নিজের কপাল তুই নিজে খাইছিস। দুই দুইটা বিয়া একটা জায়গায় ও সংসার করতে পারলিনা।

আর কার বালে তোরে বিয়া করবে? সারাজীবন আমাদের বোঝা হয়ে থাকবি। আমাগো মাথায় কাঁঠাল ভাইঙ্গা খাইতে তো তোর মজা লাগতাছে মাগি। এমন নানান কথার আঘাতে জর্জরিত হতে থাকে চাচী। আসলে সব মেয়েই বিয়ের পরে বাবার বাড়িতে একটা বোঝা হয়ে যায়, আর সারাজীবনের জন্য যদি বাপের বাড়ি যেতে হয় তাহলে তো কথাই নেই। রুমি চাচীর পরিবার ও তার ব্যতিক্রম নয়। সব নিরবে সহ্য করে যায় চাচী। কারণ তার যে আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই। সে যে নিরুপায়। কিন্তু মুখে কিছু না বললেও চাচীর ভিতরটা কথার ধারালো অস্ত্রে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

সবাই তাকে পাগলী ভাবলেও সে মোটেই পাগলী নয় আমি বুঝি, কারণ পাগলদের কোন অনুভূতি কাজ করেনা অথচ রুমী চাচী কষ্ট পেয়ে কান্না করেন তার অর্থ এই যে সে পাগলী নয়। অনেকবার আত্মহত্যা করবে ভেবেও পেটের বাচ্চাটার কথা ভেবে মরতে পারে নি সে। কেন জানি উনার উপর খুব মায়া হয় আমার। আর যতবার ফোন দিতাম বেচারি কাঁদতে কাঁদতে কথা বলতে পারতো না। আমায় অনেক বার বলেছে সে মরতে চায়, কিন্তু বাচ্চাটাকে মারতে চায় না। কারণ সে তো কিছু করে নি, সে তো নিষ্পাপ শিশু। চাচী রাতদিন আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করতে থাকে আল্লাহ যেন এই কষ্টেভরা নষ্ট জীবন থেকে তাকে মুক্তি দেয়। আমি খুব করে বুঝাতাম এভাবে বলো না চাচী। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। দেখবে বাবুর মুখ দেখলে চাচা আর তোমার থেকে মুখ ফেরাতে পারবেনা। সবাই তোমায় মেনে নিবে। যতটা পারতাম শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম উনাকে।

কয়েকমাস পরের কথা, একদিন পুকুরঘাটে গোসল করতে যাওয়ার সময় দেখি পাশের বাড়িতে কিছুটা সোরগোল হচ্ছে। ব্যাপারটা কি জানার জন্য আমিও এগিয়ে গেলাম। গিয়ে যা শুনলাম এটা শোনার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। রুমী পাগলী নাকি ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। এই খবর শুনে ওই বাড়ির সবাই এমনকি চাচা এবং উনার মা ও কাঁদতে থাকেন। তাদের কান্না দেখে আমার ঘৃণায় চোখ দিয়ে উত্তপ্ত পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আজ কেন কাঁদছে তারা, কম কষ্ট তো দেয় নি তারা মেয়েটিকে। রুমী পাগলীকে মুক্তি দিতে হয় নি সেই তোমাদের মুক্ত করে দিয়ে গেছে। কেন তবে কাঁদছো তোমরা? উল্লাস করো উল্লাস।

রুমী পাগলীর প্রার্থনা বিধাতা কবুল করে নিয়েছে। এই কষ্টের জিবন থেকে বিধাতা ওকে মুক্তি দিয়েছে। তাহলে, আজ কেন কাঁদছে ওরা?? লোকলজ্জার ভয়ে?? ছিঃ!!! অথচ রুমি পাগলী যখন কেঁদেছিল তখন তো তোমরা কেউ যাও নি তার অশ্রু মুছে দিতে। তবে আজ কি দাম তোমাদের এই চোখের পানির। তোমরা তো রুমি পাগলীর চোখের পানির মূল্য দাও নি। এই সমাজের মানুষেরা তোমাদের জন্যই রুমি পাগলীরা মরে যায় আর তোমরাই দায়ী রুমি পাগলীর মত হাজার হাজার মেয়ের মৃত্যুর জন্য। রুমী পাগলীরা মরে না, তোমরা ওদের খুন করো। খুন করো ওদের হাজার হাজার স্বপ্ন কে, খুন করো ওদের প্রতিটা সুন্দর মুহূর্ত কে। হ্যাঁ হ্যাঁ তোমরাই খুন করো রুমী পাগলীদের সুন্দর জীবনকে…..

-এই শুনেছিস রুমি পাগলীর নাকি ছেলে হবে।

-হুম শুনলাম তো। ছেলে হোক আর যাই হোক বেচারির কপালটাই খারাপ ওর স্বামী তো আর ওকে ঘরে তুলবে না।

-তা যা বলেছিস, ওমন পাগলি বউ দিয়ে কি আর সংসার চলে!!

এতক্ষণ রুমী পাগলী কে নিয়ে কথা বলছিল আমার দুই প্রতিবেশী। তাদের কথা শুনে সহ্য করতে না পেরে আমি সরে আসলাম সেখান থেকে।। আমাদের পাশের বাড়ির এক চাচার সাথে বিয়ে হয়েছিল রুমী পাগলির। মা-শা-আল্লাহ তাকে দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। টানা টানা হরিণী চোখ, দুধে আলতা গায়ের রঙ, মায়াবী চেহারা যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোন ডানাকাটা পরি। চাচীর রূপ দেখেই ফিদা হয়ে বউ বানিয়ে নিয়ে এসেছিল চাচা। কিন্তু চাচী যে পাগলী বিয়ের আগে তা কোনভাবেই বুঝতে পারে নি কেউ। বিয়ের দিন থেকেই সবাই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল। কেননা চাচী যেদিন প্রথম বউ হয়ে বাড়ি আসে সেদিনই নতুন বউয়ের মত লজ্জা না পেয়ে চুপচাপ বসে না থেকে সারাবাড়িতে ঘুরঘুর করতে থাকে। এতেই লোকের কানাঘুষো শুরু হয়ে যায়। কারণ সারাজীবন সবাই নতুন বউ কে লজ্জা পেয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখেছে। আজ এর অন্যথা হলে কেউই সেটা সহজ ভাবে নিতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।

চাচী কে সবাই পাগলী বললেও আমার তাকে কখনো পাগলী মনে হয় নি। তার কারণ তাকে যে কারণগুলোর জন্য পাগলী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে মূলত আমার কাছে তা চাচীর সরলতা বলেই মনে হয়েছে। চাচী কে সবাই পাগলি বলার পিছনে কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক।

একবার চাচীর শাশুড়ি অন্য এক মহিলার হাঁস তাদের বাড়িতে ধান খাওয়ার জন্য আসলে সেই হাঁসগুলোকে বেঁধে লুকিয়ে ফেলে। আর ওই মহিলা যখন হাঁস খুঁজতে আসে তখন উনার শাশুড়ি বলে, “কিসের হাঁস কই আমাদের বাড়িতে আসতে তো আমি দেখি নি। তখন চাচি মুখের উপরেই বলে দেয়,” আম্মা আপনি না বকাবকি করে কয়েকটা হাঁস কে খোঁয়াড়ে বেঁধে রেখেছেন। আর তাতেই শুরু হয়ে গেল তুলকালাম। আর চাচী হয়ে গেল পাগল কারণ সে তার পরিবারের স্বার্থ বুঝলো না।

রুমী পাগলী নতুন বউ হয়েও গাছে চড়ে আম পাড়তো, পেয়ারা পাড়তো, বাচ্চাদের সাথে কুতকুত খেলতো, পুকুরে ঝাপাঝাপি করে বাচ্চাদের সাথে সাঁতার কাটতো, মাঝেমাঝে মুরগির বাচ্চাকে কে আলতো করে হাতের মুঠোতে তুলে আদর করতো, তাদের সাথে কথা বলতো, হাসতো। আর এইসব কারণের জন্যই রুমী চাচী কে পাগলী বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

বউ হয়ে আসার পর সংসারের বেশির ভাগ কাজ নতুন চাচী কে করতে হয়। এমনকি তাদের ক্ষেতের ধান মাড়াইয়ের কাজ ও করতে হয়। আর অন্য বউ প্রেগন্যান্টের বাহানায় কোন কাজেই হাত দেয় না। তার উপর শাশুড়ি বলে ওই বউয়ের ঘরে খাবার দিয়ে আসতে সেই জন্য নতুন চাচী রেগে বলেছিল আমি কেন সব কাজ করবো আমাকে কি চাকরানি আনা হয়েছে? বউ যখন দুইজনেই তবে উনাকে ও কিছু কাজ করতে হবে, আমি বান্দির মত খেটে আবার উনার রুমে খাবার পৌঁছে দিতে পারবো না।

এতেই শাশুড়ি তেলেবেগুনে রেগে বলল, কি!!! তুই আমার মুখের উপর কথা বলিস!!! আজ আসুক আমার ছেলে তোরে বুঝাবো মজা। চাচা বাড়ি ফিরতেই তার মা আরো নানান কথা বানিয়ে কাকার কান ভাঙালো। আর চাচা ও চাচী কে কিছু জিজ্ঞাস না করেই গালাগালি করতে থাকে । তখন চাচীও রেগে বলছিল তুই রাতে বিছানায় এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলিস, আদর-সোহাগ করিস। রাতে তোর মা খারাপ থাকে আর দিন হলে তোর মায়ের কথায় আমি খারাপ হয়ে যাই তাই না? ব্যস উচিত কথাটা মুখের উপর বলার কারণেই চাচী হয়ে গেল পাগলী। কারণ স্বামী -স্ত্রী এর গোপন কথা বাইরে বলতে নেই অথচ চাচি হাটে হাড়ি ভেঙে দিল!!!

আরেকদিন চাচী তার শাশুড়ি কে বলেছিল আপনি এমন পাগলের মত চলাফেরা করেন কেন? একটু সাজগোজ করতে পারেন না? মাথায় একটু তেল দিয়ে চুল আছড়াতে পারেন তো!! যেরকম ভাবে চলেন দেখতে তো একদম ডাইনী বুড়ির মত মনে হয়। ব্যস চাচা আসতেই শুরু হয়ে যায় ক্যাচাল তোর বউ আমাকে ডাইনী বলছে আমারে পাগল বলছে। ওর এত বড় সাহস হয় কি করে? কেন বলছে আসল কথাটা চেপে গিয়ে কাকার কানে উলটা পালটা কথা বলে চাচি কে মার খাওয়াতে থাকে। আর চাচি তাতে রেগে গিয়ে কোন কাজ না করে দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এই জন্য চাচী পাগলী। একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই থাকে তাদের বাড়িতে। অতিষ্ঠ হয়ে চাচা চাচীকে বাপের বাড়ি রেখে আসেন। আর উনার মা সারা পাড়া রটাতে থাকেন ছেলের বউ পাগলী মাথা খারাপ।

চাচা চাচীর ফোন না ধরাতে বাধ্য হয়ে চাচী উনার ননদ, চাচার ভাবীদের এবং চাচার বন্ধুদের ফোন করতে থাকে। আর সহজ সরল এই মহিলা সবাইকে বলে দেয় তার দুর্বলতার কথা। চাচার সাথে বিয়ের আগে চাচীর ফুফাতো ভাই প্রেম করে পালিয়ে চাচীকে বিয়ে করেছিল। চাচী অসম্ভব সুন্দর হলেও তার সহজ সরল চালচলন এবং মুখের উপর ফটফট সত্য কথা বলে ফেলার দরুণ তার ফুফুর ও অত্যাচার শুরু হয়ে যায়। এবং নানান ঝামেলার সৃষ্টি হয় এবং খুব অল্পদিনের মধ্যেই আবার তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর চাচী সবাইকে বলতে থাকে, আমার আগে এক বিয়ে হয়েছে বলে উনি এখন আমার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করছে। এই জন্য আমাকে তাড়িয়ে দিছেন। কিন্তু আমার কি দোষ উনি তো বিয়ের আগেই সব জেনেছেন। এখন কেন আমাকে অবহেলা করছেন?

চাচা এই সত্যটা জেনেও চাচীর রূপে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এই সত্যটা চাচার বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনরা কেউ জানতো না। অথচ চাচীর কারণে সবাই ঘটনাটা জেনে যায়। ফলে চাচা একটা ডিভোর্সি মেয়ে কে বিয়ে করেছে শুনে সবাই ছিঃ ছিঃ করতে লাগলো। কারণ আমাদের সমাজের মানুষেরা ডিভোর্সি মেয়েদের ভালো চোখে দেখে না। এরপর চাচা আরো ক্ষেপে যান চাচীর উপর এবং সিদ্ধান্ত নেন চাচি কে ডিভোর্স দিবেন।

কিন্তু চাচী ও তার পরিবারের লোকেরা বিনা অন্যায়ে বার বার ক্ষমা চায় চাচার পরিবারের কাছে, চাচার কাছে। কিন্তু তারা আর কোন ভাবেই চাচী কে ঘরে তুলবেনা বলে জানিয়ে দেয়। এমনকি সন্তান হওয়ার কথাটা শুনেও তাদের পাষণ্ড হৃদয় বিগলিত হয় নি। চাচার পরিবার জানায় সন্তান হওয়ার পর সন্তানের দায়িত্ব নিলেও চাচা চাচীর দায়িত্ব নিবেনা। সময়মত ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবেন বলে জানান চাচা।

যে সময়টা স্বামী কে খুব বেশি পাশে প্রয়োজন ছিল চাচীর সেই সময়টা একা একা চোখের জল ফেলে কাটাতে থাকে চাচী। চাচীর বাড়ির পাশেই আমার এক বান্ধবীর বাড়ি ওর কাছ থেকেই মাঝেমাঝে চাচীর খবর পেয়ে থাকি। বান্ধবীর কাছে শুনলাম চাচীর পাড়াপড়শি, পরিবারের লোক এবং আত্মীয়স্বজন সবাই উনাকে নানান রকম খারাপ খারাপ কথা বলে। সবাই উনার দোষ দিতে থাকে। বলতে থাকে, পোড়াকপালি তোর নিজের কপাল তুই নিজে খাইছিস। দুই দুইটা বিয়া একটা জায়গায় ও সংসার করতে পারলিনা। আর কার বালে তোরে বিয়া করবে? সারাজীবন আমাদের বোঝা হয়ে থাকবি।

আমাগো মাথায় কাঁঠাল ভাইঙ্গা খাইতে তো তোর মজা লাগতাছে মাগি। এমন নানান কথার আঘাতে জর্জরিত হতে থাকে চাচী। আসলে সব মেয়েই বিয়ের পরে বাবার বাড়িতে একটা বোঝা হয়ে যায়, আর সারাজীবনের জন্য যদি বাপের বাড়ি যেতে হয় তাহলে তো কথাই নেই। রুমি চাচীর পরিবার ও তার ব্যতিক্রম নয়। সব নিরবে সহ্য করে যায় চাচী। কারণ তার যে আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই। সে যে নিরুপায়। কিন্তু মুখে কিছু না বললেও চাচীর ভিতরটা কথার ধারালো অস্ত্রে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

সবাই তাকে পাগলী ভাবলেও সে মোটেই পাগলী নয় আমি বুঝি, কারণ পাগলদের কোন অনুভূতি কাজ করেনা অথচ রুমী চাচী কষ্ট পেয়ে কান্না করেন তার অর্থ এই যে সে পাগলী নয়। অনেকবার আত্মহত্যা করবে ভেবেও পেটের বাচ্চাটার কথা ভেবে মরতে পারে নি সে। কেন জানি উনার উপর খুব মায়া হয় আমার। আর যতবার ফোন দিতাম বেচারি কাঁদতে কাঁদতে কথা বলতে পারতো না। আমায় অনেক বার বলেছে সে মরতে চায়, কিন্তু বাচ্চাটাকে মারতে চায় না। কারণ সে তো কিছু করে নি, সে তো নিষ্পাপ শিশু। চাচী রাতদিন আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করতে থাকে আল্লাহ যেন এই কষ্টেভরা নষ্ট জীবন থেকে তাকে মুক্তি দেয়। আমি খুব করে বুঝাতাম এভাবে বলো না চাচী। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। দেখবে বাবুর মুখ দেখলে চাচা আর তোমার থেকে মুখ ফেরাতে পারবেনা। সবাই তোমায় মেনে নিবে। যতটা পারতাম শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম উনাকে।

কয়েকমাস পরের কথা, একদিন পুকুরঘাটে গোসল করতে যাওয়ার সময় দেখি পাশের বাড়িতে কিছুটা সোরগোল হচ্ছে। ব্যাপারটা কি জানার জন্য আমিও এগিয়ে গেলাম। গিয়ে যা শুনলাম এটা শোনার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। রুমী পাগলী নাকি ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। এই খবর শুনে ওই বাড়ির সবাই এমনকি চাচা এবং উনার মা ও কাঁদতে থাকেন। তাদের কান্না দেখে আমার ঘৃণায় চোখ দিয়ে উত্তপ্ত পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আজ কেন কাঁদছে তারা, কম কষ্ট তো দেয় নি তারা মেয়েটিকে। রুমী পাগলীকে মুক্তি দিতে হয় নি সেই তোমাদের মুক্ত করে দিয়ে গেছে। কেন তবে কাঁদছো তোমরা? উল্লাস করো উল্লাস। রুমী পাগলীর প্রার্থনা বিধাতা কবুল করে নিয়েছে। এই কষ্টের জিবন থেকে বিধাতা ওকে মুক্তি দিয়েছে।

তাহলে, আজ কেন কাঁদছে ওরা?? লোকলজ্জার ভয়ে?? ছিঃ!!!
অথচ রুমি পাগলী যখন কেঁদেছিল তখন তো তোমরা কেউ যাও নি তার অশ্রু মুছে দিতে। তবে আজ কি দাম তোমাদের এই চোখের পানির। তোমরা তো রুমি পাগলীর চোখের পানির মূল্য দাও নি। এই সমাজের মানুষেরা তোমাদের জন্যই রুমি পাগলীরা মরে যায় আর তোমরাই দায়ী রুমি পাগলীর মত হাজার হাজার মেয়ের মৃত্যুর জন্য। রুমী পাগলীরা মরে না, তোমরা ওদের খুন করো। খুন করো ওদের হাজার হাজার স্বপ্ন কে, খুন করো ওদের প্রতিটা সুন্দর মুহূর্ত কে। হ্যাঁ হ্যাঁ তোমরাই খুন করো রুমী পাগলীদের সুন্দর জীবনকে…..

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত