বাটারফ্লাই

বাটারফ্লাই

আম্মু যেদিন মারা যায় , সেদিন সকালেও মনে হয় এভাবেই ছুটে গিয়েছিলাম । ডাক্তারের ফোন এসেছিল , বাসার টিএন্ডটিতে । লিমা তখন ছয় মাসের প্রেগনেন্ট । ফোনটা রেখেই দৌড়ে গিয়েছিলাম তার কাছে , ফোনের কথা তাকে জানিয়ে টেবিলের উপর রাখা মানিব্যাগটা পেছনের পকেটে ঢুকিয়ে ছুটেছিলাম লিফটের দিকে । সকাল আটটার আগে লিফট ছাড়েনা , সিড়ি দিয়েই নামলাম । সেদিন বাইকে করে কিভাবে যে আমি হাসপাতালে পৌছেছি , সেটা আমিই জানি ।

আইসিউতে ভর্তি ছিল আম্মু । আগের রাতেও দেখে গিয়েছিলাম মুখে পাইপ লাগানো একটা মাস্ক , আরও হাজারটা চিকন মোটা পাইপ তাঁর মুখের আর মাথার চারপাশে । আর সেদিন সকালে কিছু ছিলনা মুখে । চালু ছিলনা তাঁর বেডের পাশে রাখা অদ্ভুত মেশিনগুলো । সেখানে কতোক্ষণ জানি ছিলাম, কিন্তু হাসপাতাল থেকে বডি আমাদের বাসায় আনার পর খুব বেশিক্ষণ সময় যায়নি । দিয়ে আসতে হয়েছে আম্মুকে মাটির নিচে । অস্থির একটা সময় কেটেছিল তখন । তবে কিভাবে কেটেছিল মনে পড়ছেনা । কিছুই করতে পারিনি আমি আম্মুর জন্য সারাজীবন । সারাটা জীবন কষ্ট করে গেল আমার জন্য । ছোটবেলা থেকেই বাবা নেই আমার । সংসার করেনি সে আম্মুর সাথে আমি জন্মানোর পর । সেই আম্মু ঘরে বসে কাপড় সেলাই করে , জামা বানিয়ে সংসার চালাতো । আমাকে স্কুলে পড়ালো , কলেজে পড়ালো ।

আমি টিউশনি করাতাম ম্যাট্রিকের পর থেকেই । টুকটাক করে সময় কেটে যেত । আম্মুর জন্মদিনে পাশের দোকান থেকে পচিশ টাকার প্লেন কেক আর পাঁচটাকার মোমবাতি এনে রাত বারোটায় ‘হ্যাপি বার্থডে আম্মু’ বলে ঘুম থেকে উঠিয়ে আনতাম । আম্মু অনেক খুশি হতো । কিন্তু জানি , আম্মুকে আমি কিছুই দিতে পারিনি কখনও । ভার্সিটিতে ওঠার পর আম্মুকে বলেছিলাম কাপড় সেলাই করার আর দরকার নেই , আমি পার্টটাইম একটা কাজ খুঁজে নেব । আম্মু রাজী হতোনা । আস্তে আস্তে অনার্স শেষ হল আমার , ছোটখাটো একটা জব পেলাম । আসাদগেটের আড়ং থেকে একটা শাড়ি কিনেছিলাম আম্মুর জন্য । এখনও মনে পড়ে আমার, অনেক কেঁদেছিল আম্মু সেদিন , খুশিতেই মনে হয় । কিন্তু কিছু করতে পারলাম না আম্মুর জন্য ।

আমার জবের প্রোমোশনের পরে আমি বিয়ে করি । নতুন একটা ফ্ল্যাটে বাসা ভাড়া নেই , আম্মুকে আর বউকে নিয়ে উঠি এখানে । কয়েকমাসের মাথায় যখন শুনলাম লিমা প্রেগনেন্ট , আমার থেকে বেশি খুশি মনে হয় আম্মু হয়েছিল । সেদিন দ্বিতীয়বারের মতো আম্মুকে কাঁদতে দেখেছিলাম , খুশিতে । কিন্তু যার জন্য এতো খুশি , তাকে দেখে যেতে পারলোনা আম্মু । একদিন সকালে অনেক ডাকাডাকির পরেও যখন আম্মুর ঘুম ভাঙলো না আম্মুর , নিয়ে গেলাম হাসপাতালে । ডাক্তার বললেন , স্ট্রোক করেছে আম্মু , ঘুমের মধ্যেই ।

আম্মু চলে যাওয়ার পরে তাঁর রুমে প্রায়েই অনেকক্ষণ বসে থাকতাম আমি । বিছানাটা সেরকমই আছে , জানালার পর্দাগুলি , আর বিছানার পাশের ছোট সাইড টেবিল টা । টেবিলের উপর রাখা অনেকগুলি প্লাস্টিকের প্রজাপতি । খেলনা প্রজাপতি । প্রজাপতির স্টিকার । আইসিউতে নেওয়ার আগে মাঝখানে কিছুদিন আম্মু কেবিনে ছিল । কথা বলতে পারতোনা । শব্দ জড়িয়ে জড়িয়ে আসতো । একদিন লিমা বলল , আমি যখন বাইরে গিয়েছিলাম ওষুধ কিনতে , আম্মুকে নাকি ‘বাটার’ বলতে শুনেছে সে । ঠিক বুঝিনি , আম্মুর মাখন খেতে ইচ্ছা হয়েছিল নাকি সেদিন । তবুও ,কখনও কিছুই দিতে পারিনি তাঁকে , তাই ভাবলাম যা ইচ্ছা করবে আম্মু , তাই হবে । কিন্তু ভাবলাম নিজে একবার জিজ্ঞেস করি ।

পরদিন আম্মুকে অনেক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম , কিন্তু আম্মু জবাব দেয়না । ইশারাতে হ্যা নাও বলে না । ঐদিন ডাক্তার ভাইয়াটা একটা বুদ্ধি দিলো ,”আপনার মা মনে হয় বাটারফ্লাই বলতে চেয়েছেন , তিনি মনে হয় প্রজাপতি পছন্দ করতেন” , তাই বলে আম্মু ইংলিশে বলবে ? – মনে মনে সন্দেহ ছিল আমার , তবুও আম্মুর কানের সামনে আস্তে আস্তে বললাম , “আম্মু , বাটারফ্লাই দেখতে চেয়েছো ? প্রজাপতি ?” , আম্মুর চোখ নড়ে উঠলো, ঠোঁটও নড়লো একটু । ভাল লাগলো আমার । তখুনি গেলাম কাঁটাবন । সেখানেতো কুকুর বিড়াল সবই পাওয়া যায় , পাওয়া যায় পাখি । হতে পারে প্রজাপতিও পাওয়া যাবে । আমার আম্মু এই প্রথম কিছু একটা চেয়েছে আমার কাছে , আর আমি দিবোনা ? সারাদিন ঘুরেও প্রজাপতি পেলাম না ।

পরে এলিফ্যান্ট রোড থেকে অনেকগুলি প্লাস্টিকের প্রজাপতি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম , আর অনেকগুলো প্রজাপতির স্টিকার লাগিয়ে দিয়েছিলাম আম্মুর বেডের উল্টা দিক বরাবর । যাতে আম্মু চোখ খুললেই প্রজাপতি দেখতে পারে । কিন্তু আম্মু মাঝে মাঝে চোখ খুললেও প্রজাপতির দিকে তাকাতো না । একবারের জন্যও না । আম্মু মারা যাওয়ার পর সেই স্টিকার প্রজাপতি গুলো আমার বাসায় নিয়ে এসেছি , রেখে দিয়েছি বিছানার পাশের টেবিলে । আম্মুর স্মৃতি বলতে এখন এগুলোই আছে । আর আছে তাঁর ব্যবহার করা কাপড় শাড়ি , বিছানার ঐপাশের ঐ আলমারিটাতে । কখনও খোলার সাহস হয় না । ভাবি , আম্মুর গায়ের গন্ধ এখনও জমা আছে ঐ কাপড়গুলোতে । আলমারির দরজা খুললেই গন্ধ চলে যাবে ।

এভাবে মোটামুটি অনেকদিন কেটে গেছে । ছেলে হয়েছে আমার । এক বন্ধের দিন, দুপুরবেলা, ছেলে আর বউ ঘুমাচ্ছে । আমার ঘুম ধরছিল না , ইচ্ছা হল , তাই আম্মুর রুমে গিয়ে সাহস করে খুললাম সেই আলমারি । সেটার এক দরজায় আমার ছোটবেলার কয়েকটা ছবি লাগানো । অন্য দরজায় আমার আর লিমার বিয়ের ছবি । সামনে বরাবর তাকটাতে বেশ কিছু শাড়ি সাজিয়ে রাখা । ডানপাশের কোণায় একটা মেরুন কালারের শাড়ির দিকে চোখ আটকে গেল , আস্তে করে টান দিয়ে বের করে আনলাম তাক থেকে । মুখের সাথে জড়িয়ে ধরে শাড়িটার গন্ধ নিলাম , নাহ , নতুনই ছিল , আম্মু পড়েনি একবারও , মনে মনে হাসলাম , ছেলের দেয়া প্রথম শাড়ি , পড়লে নষ্ট হয়ে যাবে হয়তো , তাই যত্ন করে উঠিয়ে রেখেছিল আম্মু । শাড়িটা টানতে গিয়ে পায়ের তাকের উপর থেকে কিছু একটা পায়ের উপর পড়েছিল আমার, খামের মতো ।

শাড়িটা জায়গামতো রেখে খামটা হাতে নিয়ে ভিতর থেকে বের করলাম একটা ভাজ করা কাগজ , তারমধ্যে অনেকগুলো ছবি , পুরানো ছবি । অদ্ভুতভাবে এই ছবিগুলোও আমার । কয়েকটাতে আম্মুও আছে । বেশিরভাগ ছবিই আমার । ছোটবেলার । কোনওটাতে আমি খেলছি , কোনওটাতে আমি খাতা পেন্সিল নিয়ে বসে আছি আম্মুর পাশে । নিজের অজান্তেই চোখে পানি এসে গিয়েছিল আমার । হঠাৎ একটা জিনিস মনে হল । কিছু একটা মিল আছে কয়েকটা ছবিতে । কি মিল কি মিল ভাবতে ভাবতে ছবিগুলো নিয়ে চলে আসলাম আমার রুমে । তখনই চোখ আটকে গেল ছবিতে আম্মুর হাতের দিকে । বেশীরভাগ ছবিতেই আমি ছিলাম, আম্মু ছিল , আর আম্মুর হাতে বা আম্মুর পাশে ছিল সেলাই মেশিন । যেই সেলাই মেশিন দিয়ে আম্মু সারারাত সারাদিন কাজ করতো । আর সেলাই মেশিনটার নাম ছিল ‘বাটারফ্লাই’ ।

মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো আমার । আম্মু শেষসময়ে ‘বাটার’ বলেছিল , লিমা তাহলে ভুল শুনেনি , আম্মু সেলাই মেশিনটার কথাই বলতে চেয়েছিল নিশ্চয়ই । এজন্যই আম্মু দেয়ালে লাগানো প্রজাপতির দিকে তাকাতো না । তাকাবে কেন , সে তো প্রজাপতি দেখতে চায়নি । সে মনে হয় দেখতে চেয়েছিল তাঁর হাতের সেই সেলাই মেশিনটা । আমি ছবিগুলো হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম , খেয়াল করিনি কখন লিমা আমার পাশে এসে বসেছে । নিজেকে কিছুটা ঠিক করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে আম্মুর সেলাই মেশিনটা কোথায় । বাসা পাল্টানোর সময় এবাসার স্টোর রুমে এনে রাখা হয়েছিল সেটা । লিমা যা উত্তর দিলো , সেটা শুনে আমি আবার কেঁদে উঠলাম বাচ্চাদের মতো , ‘ঐ সেলাই মেশিনটাতো গত মাসে দিয়ে দিয়েছি’ ।

‘কা কে ?’ ‘আমাদের বুয়ার এক পরিচিত মহিলার বাসায় , ঐ মহিলা খুব গরীব, ভাবলাম সেলাই মেশিনটা আমাদের কোনও কাজের না, ওদেরকে দিলেও কিছু করে খেতে পারবে’ এই কথা শুনে আমি কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম । নিচে দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের বাসায় যে বুয়া কাজ করে, সে কোথায় থাকে জানে নাকি । দারোয়ান আমাকে ঠিকানা বুঝিয়ে দিলো , কাছেই , রুপনগর বস্তিতে । দৌড় দিলাম আমি । ঐযে বললাম , আম্মু যেদিন মারা যায় , সেদিন সকালেও মনে হয় এভাবেই ছুটে গিয়েছিলাম ।

অনেক খোজার পর বুয়ার বাসা পেয়েছি , পেয়েছি তার আত্মীয়র বাসাও । বাসায় এক মহিলা আর এক বাচ্চা থাকে । মহিলার স্বামী নেই । আমি গিয়েছিলাম সেলাই মেশিনটা নিয়ে আসার জন্য । কিন্তু পারলামনা । ওইতো আম্মুর সেলাই মেশিনটা । সামনে ছোট একটা বাচ্চা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । আমার চোখের সামনে মনে হলো আমিই বসে আছি , আর মেশিনটার পাশে বসে আছে আমার আম্মু । আমার ইচ্ছা করছিলো একটু যেয়ে জড়িয়ে ধরি মেশিনটা ।

ঐতো , বাটারফ্লাই লেখা স্টিলের লোগোটা লাগানো মেশিনে । ইচ্ছা করছিলো একটু চিৎকার করে কাঁদি । কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না , না চিৎকার করতে পারলাম , না কিছু বলতে পারলাম তাদের । কয়েক নজর মেশিনটা দেখে বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে আর মহিলাটার হাতে কিছু টাকা দিয়ে উল্টা ঘুরে হাঁটা দিলাম বাসার দিকে । আম্মুও থাকলে হয়তো এটাই করতো ।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত