কালো মেয়ে

কালো মেয়ে

খুব উঁচু একজোড়া জুতা এনে আম্মু আমার সামনে রাখলো, কিছুটা অনুরোধ ভঙ্গিতে নরম গলায় বললো, নে মা এই জুতা জোড়া পরে নে তোকে লম্বা দেখাবে। আমি খুব শান্ত চোখে আম্মুর দিকে তাকালাম। আম্মু বুঝে গেছিলো সেই চোখের ভাষা। কিছু না বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আমার চোখে পানি টলমল করলেও, কাঁদতে পারিনি। কারন কাজল লেপ্টে গেলে আরও বেশি কালো লাগবে। তাহলে কালো বলে আবারও রিজেক্ট হতে হবে। তাই চুপচাপ জুতা জোড়া পরে নিলাম।

কিছুক্ষণ পর ছোট খালামনি আমার রুমে আসলো। আর এসেই বলতে শুরু করলো। শোন ভালো করে একটু ফাউন্ডেশন লাগা যাতে ফর্সা দেখায়। তখনও কিছু বলিনি খালামনি কে। একই ভাবে শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলাম। খালামনি বুঝতে পেরেও ব্যাপারটা পুরোপুরি ইগনোর করে। নিজ হাতেই আমার কপালে একটা টিপ পরিয়ে দিলো।
টিপ পরিয়ে খালামনি বলতে লাগলো, কালো টিপে তোকে বেশ লাগে।

শুনেই মুচকি হাসলাম। কারন বুঝতে দেরি হয়নি এটা খুশী করার জন্যই খালামনি বলেছে। আম্মু খালামনি কে ডাক দেয়াতে আমার রুম থেকে চলে যায়। আমি ওই উঁচু জুতা জোড়া পায়ে দিয়ে কোন রকম হেঁটে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। উঁচু জুতা পরে হাঁটার অভ্যাস বা ফাউন্ডেশন লাগিয়ে সাজা কোনটারই অভ্যাস আমার নাই। তবুও এসব করতে হয়। মানিয়ে নিয়েছি এসবে নিজেকে। তবে ভিতরে ভিতরে বেশ হাপিয়ে উঠেছি।

পড়া টা এখনো শেষ হয়নি, বিয়ে করার কোন ইচ্ছাই আমার নেই তবুও পরিবারের চাপে পড়েই বিয়েতে রাজি হলাম। তাতে লাভ হয়নি, কালো আর খাটো বলে বার বার পাত্র পক্ষ আমাকে রিজেক্ট করে। বেশ কিছুক্ষন আনমনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। হুট করেই আম্মু এসে আমাকে ডাক দিলো। পাত্র পক্ষ এসেছে। তাদের সামনে আবার আমাকে যেতে হবে। জোকারের মতো বসে থাকতে হবে, তাদের নানা প্রশ্নে উত্তর দিতে হবে। বোরিং লাগে তবুও আম্মুকে খুশি করার জন্য আমি আপ্রান চেষ্টা করি।

ছেলের বাবা, মা, ছোট বোন এসেছে আমাকে দেখতে। সাথে ছেলেও ছিলো। তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর প্রায় সাথে সাথেই ছেলের বোন বলে উঠলো, আরে মেয়ে তো কালো। চুপ করে ছিলাম, কিছুই বলিনি। কারন আম্মু আর কাকুর সম্মান জড়িয়ে আছে।

ছেলের মা নানা রকম প্রশ্ন করলো। কিন্তু ছেলের বাবা বা ছেলে কোন প্রশ্ন করেনি আমাকে। তারপর আমাকে আর ছেলেকে পাঠালো আলাদা কথা বলতে, সেখানেও ছেলে একটা কথাও বলেনি। আমিও কিছু বলিনি। বুঝে গেছি এরাও আমাকে পছন্দ করেনি। তারা চলে যায়, যাওয়ার সময় ছেলের বাবা বলে গেছে তারা পরে জানাবে পছন্দ হলো কিনা।

বরাবরের মতোই আম্মুর মন খারাপ হয়ে গেলো। আম্মুও বুঝে গেছে আমাকে পছন্দ হয়নি। ঠিক ৩দিন পর কাকুর কাছে ছেলের বাবা ফোন করে, তারা জানায় ছেলে আমাকে খুব পছন্দ করেছে। কথা টা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলো। যাই হোক, সব কথা পাকাপাকি হলো। ছেলে আমাকে নিয়ে বিয়ের শপিং করতে গেলো। সে প্রথমেই আমাকে নিয়ে জুতা কিনতে গেলো। নিচু একজোড়া জুতা কিনে দিলো। তারপর বাকি সব শপিং করলো। বাসায় ফেরার পথে সে আমার হাতে একটা চিঠি দিলো। চুপচাপ চিঠি টা নিয়ে বাসায় চলে আসি।

এসেই রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চিঠিটা পড়তে শুরু করি। গুটিগুটি হাতের লেখা, বেশ সুন্দর আর স্পষ্ট। যা লেখা ছিলো তা পড়ে মোটামুটি ভাবে একটু অবাক হলাম, ” কেমন আছেন এই প্রশ্নটা করবো না। কারন সেদিন আপনার মুখ দেখে বুঝে গেছিলাম ঠিক কেমন ছিলেন বা আছেন। সেদিন আপনাকে কিছুই জিজ্ঞেস করিনি, তবে আজ কিছু প্রশ্ন করছিঃ আচ্ছা কাজল দিয়ে কি কখনো নিজেকে আয়নায় দেখেছেন? কালো টিপে ঠিক কতটা মায়াবী লাগে কখনো বুঝতে পেরেছেন? শাড়িতে একটা মেয়েকে এতোটা সুন্দর লাগে আপনাকে দেখেই সেটা বুঝতে পেরেছি। কখনো কি আমার মতো করে আপনি নিজেকে আয়নায় দেখেছেন?

জানি দেখেন নি। কারন মনের ভিতর সব সময় নিজেকে কালো,খাটো এসব নিয়ে দেখতেন। সেদিন আপনাকে আমি অপলক দেখেছি কিছুই বলিনি। কারন মুগ্ধতা আমাকে ঘিরে রেখেছিলো। জানেন সেদিন মনে মনে আপনার একটা নাম ঠিক করি, “কাজল মেয়ে”। আমাকে জানাবেন নামটা পছন্দ হলো কিনা।

আজ হয়তো অবাক হলেন আপনাকে আমি নিচু জুতা কেন কিনে দিলাম, সেদিন খেয়াল করেছিলাম উঁচু জুতা পরে আপনার হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। সহ্য হয়নি ব্যাপার টা। তাই বিয়ের জন্য নিচু জুতা কিনে দিলাম। আর একটা কথা আমি কিন্তু এই কাজল মেয়ে টাকে বড্ড ভালোবেসে পেলেছি”

আমি চিঠিটা পড়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ ছিলাম। আমি নিজেই ঘোরের মধ্যে ছিলাম, একটা মানুষ কি করে এতো অল্প সময়ে এতো কিছু খেয়াল করলো। তবে কি আল্লাহ আমার জন্য এই মানুষ টাকেই রেখেছিলেন। কাঁদলাম খুব, তবে কষ্টে নয় শুকরিয়া আদাই করেই কাঁদলাম।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত