চিলে কান লই গেছে

চিলে কান লই গেছে

ভাবী, এ কতা খালি আন্নেরে কইয়ের; আন্নে চাইয়েন আর কারোরে কইয়েন্না! কথা শুনতে শুনতে রুমালী মুখে পান পুরে দিলো। আঙুলের ডগা থেকে জিহ্বার উপরিভাগে চুন লাগিয়ে মুখ কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে বলল, ”কিয়া যে কন ভাবী! আন্নের মনে অয়নি আঁই কারো কাছে কমু?”

দুর, হিয়ান কনো কতা ন’। ইটা গোপন কতা। আঁই কেন্নে কেন্নে হুনি গেছি, আর খালি আন্নেরে কইয়ের কথা শেষ করার আগেই রুমালী এক খিলি পান সাজিয়ে তাকে দিতে দিতে বলল, “ভাবী, জদ্দা দিতামনি? আন্নের দেয়রে কাইল্লা নোয়া জদ্দা আইনছে “আইচ্ছা, অল্প করি দেন; টেস করি চাই এর মাঝেই নার্গিস এসে পড়লো; দরজার এক পাশে ঠেঁশ দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “চাচী, আন্নেগো জামাই বিদাশ তুন টেঁয়া হাডাইছে বাইশ আজার। কইছে জমি রেয়ান লইবেল্লাই।”

হঠাৎ করে নার্গিসের আগমনে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। এটা অবশ্য শুচিবায়ুর মতো। মূল সমস্যা কিন্তু নার্গিস না। আসলে সে কোনো কথা শুনে থাকলে তা বলার আগ পর্যন্ত শান্তি পায় না। পেট ফুলতে থাকে, অস্বস্তি লাগে। মনে হয় যেন মুখ থেকে জিহ্বা খসে পড়বে। সে ফাঁক খুঁজছে, একটুখানি সুযোগ পেলেই ঠাস করে কথাটা বলে ফেলবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, বলা তো যায় না; নার্গিস যে মুখ পাতলা! কখন কী কথার মাঝে ফুস করে বলে ফেলে স্লিত করে পানের পিক ফেলে রুমালী বলল, “নার্গিস, তুই অইলি অকর্মার ঢেঁই। হাগল মাইয়া কনাইর। জামাই বিদাশ গেছে ভালা কতা।

তুই বাইচ্চাকাইচ্চা ওগ্যা লই লইতি। আঁইসতে খেইলতে বড্ডা অই যাইত। ইয়ানে আছস ভালা কথা, তোর হই যে শাশুড়ি প্রসঙ্গ এলে নার্গিস তা ছাড়তে রাজী না। দোরের উপর বসে বলল, “চাচী গো চাচী, বুইর কতা কইয়েন্না কথা শেষ করার আগেই নার্গিসের ইমোতে কল এসেছে! সে মোবাইল নিয়ে উঠে গেল। সে এবার একটু সুযোগ পেল। এর আগে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “ভাবী, আন্নের বাইউরেরে আইজ্জা কতদিন দরি কইয়ের এক্কেন টাইস মোবাইল লইবেল্লাই। হেতেনে কানেও তুইলত চান্না!”

দম্ভ প্রকাশের সুযোগ রুমালীও ছাড়তে চায় না; আরেক খিলি পান মুখে চালান দিয়ে বলল, “আন্নের দেয়রে ইয়ান্দি খুব ভালা। যেসুমে জিয়ান দরকার হেসুমে হিয়ান লই আনে। আল্লার রহমতে জিনিসহত্রের দিগদি আঁরে কনো জামিলায় রাখে ন।” তারপর চার আলিফ টেনে বলল, “টায়া…স মোবাইল আইনচে দে’বছর আগে এসব জ্বালাময়ী ভাষণ শোনার পাত্রী নয় সে। প্রসঙ্গ পাল্টে আরেক খিলি পান চাইল। রুমালী পান দিতে দিতে বলল, “জদ্দা এগুন কিন্তুক হোয়াদ বেশি সে পান মুখে দিয়ে বলল, “ভাবী, জিয়ান কইতাম আইছি; হুইনলাম সুমনের বউর বলে আগে এক বিয়া অইছে!”

আচমকা এমন কথা শুনে রুমালী বিস্ময়ে থ হয়ে গেল! মুহূর্তেক বাদে বলল, “আন্নে কনাই হুইনচেন? বিতি মাইয়া চলনবলন দেকলেই কওন যায়!” সে বলল, “আরে ভাবী, এক্কেরে ইনটেক কতা; আঁই হিতির বারগো বাইর একজনেরতুন হুনচি!” রুমালী এবার দার্শনিকের মতো করে বলল, “জিয়ান মকর হিয়ান অক, বেডি মানুষ হুরান অয় না।” সে বলল, “কী জানি, কি যুগ আইল। অইনগার মাইয়া অগল নাগর লই গুইরত ন হাইরলে যেনতে হেগুনের হেডের বাত অজম অয় না!”

রুমালীর কাছে আরও তাজা খবর আছে। রুমালী অবশ্য তার মতো এত বাচাল না। মনে মনে বলল, উজি বই হাঙ্গা বইলে বউয়ে মোরানার হক হায় না। খানিক নীরবতা নীরবতা ভেঙে রুমালী বলল, “রত্যইন্নার হোলা অইছে হোরুগা। আঁতির মতো শরীল। আর আন্ডা এত খাইদাইও আংগো গুন কাঁল্লিশের মতো অইছে!”

ঘরের পাশ দিয়ে পাড়া বেড়াতে যাচ্ছিল ষাটোর্ধ হুক্কুনির মা। কানে একটু কম শুনে। রুমালীর ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় শুনতে পেল, রত্যইন্নার গরে আঁতি অইছে! এমন সময় তার নোকিয়া বারোশো দশ মডেলের মোবাইলটা বেজে উঠল। রুমালীর থেকে বিদায় নিয়ে যাবার সময় বলল, “ভাবী, সুমইন্নার বউর কতা চাইয়েন কারো কাছে কইয়েন্না…”

দুপুর হয়ে আসছে; রুমালী পানেরবাঁটা তুলে রেখে চাল ধুয়ে আনতে পুকুরে গেল। এমন সময় ঘাটে বেশ মানুষ থাকে। কথাটা ছড়াতে রুমালীর বেশি কষ্ট হবে না। হাসার ফাঁকে টুক করে বলে ফেললেই কিসসা খতম! ঘণ্টাখানেক পর, পুরো গ্রামে রটে গেল; রত্যইন্নার গরে আঁতি অইছে পনেরো দিন পর সুমন তার বউটাকেও তালাক দিয়ে দিলো…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত