রিংটোন

রিংটোন

সবসময় রুপা আমার জন্য অপেক্ষা করে।আজকে আমি অপেক্ষা করছি।আগে অনেকবার ই ওকে আসতে বলে আমি আসিনি।আজকে এসেছি।হয়ত ও আমাকে দেখে অনেকটাই অবাক হয়ে যাবে।আর ওকে অবাক হলে কেমন দেখাবে সেটা দেখার জন্য আমি সত্যি ই আজ ওর সাথে দেখা করতে এসেছি। এখন ভোর পাঁচটা।আমি জানি দশটার আগে কখনোই ওর ঘুম ভাঙে না।তাই ইচ্ছে করেই ওকে পাঁচটা বাজে চৌরাস্তায় যেখান টায় রোজ একটা ভিক্ষুক বসে থাকে সেখান টায় আসতে বলেছি। ওর সাথে ফোনে কথোপকথন টা ছিল অনেকটা এইরকম।

-হ্যালো এটা কি ফায়ার সার্ভিস??
-হিমু তুমি?আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো আজকে তুমি আমাকে কল করবে।তাই সারাদিন ল্যান্ডফোন টা সাথে নিয়ে বসে ছিলাম।বিশ্বাস না হলে আমাদের বাসার বিমলা মাসিকে জিজ্ঞেস করো।

-আমি তোমাকে বিশ্বাস করি রুপা।
-কোথায় আছো তুমি?আজ ছয় বছর তোমার কোনো সাক্ষাত নেই।
-একবার দেখা করবে রুপা?
-হ্যা।কোথায় আসবো?
-রহমত চাচা রোজ যেখান টায় ভিক্ষে করে সেখানটায়।
-রহমত চাচা কে?আর উনি কোথায় ভিক্ষে করেন?
-তোমাদের বাসার গলির সামনে একটা লোক ভিক্ষে করে।সেখানটায়।
-ঠিক আছে।
-আর কিছু বলবে? আমি ফোন রেখে দিবো।একটা লোক খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে।
-আমি কি নীল শাড়ি পড়ে আসবো?

আমি আর কিছু না বলে ফোন টা রেখে দিলাম। আমি জানি আমি কিছু না বললেও রুপা ঠিক নীল শাড়ি পড়েই আসবে।।যেই লোকটা দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল সেই লোকটাকে দেখলাম লজ্জা পেয়ে চলে গেল।আমি হাসি মুখে জামাল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে  বললাম

-তোমার দোকান কেমন চলছে জামাল ভাই?
-আর দোকান! অবস্থা ভালো না হিমু ভাই।যত টাকা লাভ হয় তার চাইতে বেশি কারেন্ট বিল আর দোকান ভাড়াতেই চলে যায়।
-তোমার মেয়েটা কেমন আছে? প্রশ্ন টা শুনে মুখ কালো হয়ে গেল জামাল ভাইয়ের।
-আপনি জেনেও কেন এই প্রশ্ন টা করেন হিমু ভাই?

আমার মেয়েটা তো দুইবছর আগেই রোড এক্সিডেন্ট আর কিছু বলার আগেই গলাটা ধরে এলো ওর। চোখটাও ছলছল করছে।যতবার ই কোন কল করার প্রয়োজন হয়েছে আমি উনার দোকানের ফোনটাই ব্যবহার করেছি।আর আমার এই উপকার টা করার প্রতিদানে ওকে ওর মৃত মেয়েটার কথা মনে করিয়ে দিয়ে যাই।অবশ্য মানুষ প্রিয় মানুষের মৃত্যু ভুলে না।শুধু ভুলে থাকার অভিনয় করে। একটু স্বাভাবিক হয়ে ও বলল

-হিমুভাই যদি কিছু মনে না করে আপনারে একটা কথা কই?
-বলো।
-আপনি একটু সাবধানে থাকবেন।
-কেন?
-আমার বউ পরশু স্বপ্নে দেখছে আপনাকে কতগুলা গুন্ডা মিলে অনেক মারতাসে।
-স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না জামাল ভাই।
-না হিমু ভাই। ওর স্বপ্ন সত্যি হয়।

আমার মাইয়া টা যেদিন মরলো তার আগের দিন ই ওয় স্বপ্নে দেখছিলো যে অনিকার নাকি বাস এক্সিডেন্ট হইছে।তারপরের দিন তো স্কুলেও যাইতে দিতে চায় নাই।আমি ই বিশ্বাস করি নাই।

-আমার কিছু হবে না।
-আপনি আমার এই মোবাইল টা রাখেন।

যদি না রাখেন কসম কইরা কইতাসি আমার মুখ এই জিন্দেগি তে দেখবেন না।কোনো বিপদ হইলেই আমারে কল দিবেন জামাল ভাইয়ের দেয়া ফোন টা আমার পাঞ্জাবির পকেটে।অবশ্য আমার পাঞ্জাবিতে পকেট থাকে না।খালা নতুন সেলাই কাজ শিখছে। যার ফলস্বরূপ আমার হলুদ পাঞ্জাবিতে সবুজ রঙের একটা আলগা পকেট শোভা পাচ্ছে।খালার কাছে নাকি হলুদ রঙের কাপড় ছিলো না। রুপা অনেকটা হাপাতে হাপাতে এসে বললো..

-তুমি সত্যি ই এসেছো?আমি ভেবেছি তুমি আসবে না।
-বিয়ে করেছো রুপা? রুপা থমথমে গলায় উত্তর দিলো
-না আমি আর কেন জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না। আমাকে চুপ থাকতে দেখে রুপা বলল
-স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেলো।

রেডি হতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে।কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হবে তাই মনের মত করে সেজেছি।আমাকে কেমন দেখাচ্ছে? হাসিহাসি মুখ করে জানতে চাইলো রুপা। রুপাকে অপরূপ লাগচে।আমার হয়ত বলা উচিত ছিল ‘তোমাকে সুন্দর লাগছে রুপা।আমার যদি ক্ষমতা  থাকতো পৃথিবীর সব সুখ তোমার পায়ের তলায় এনে জমা করতাম।’ কিন্তু আমি মুখে কিছুই বললাম না।রুপা কিছুটা হতাশ হলো।চোখের কোণায় কিছুটা জল উকি দিচ্ছে গাল পেয়ে পড়ার জন্য।কিন্তু রুপা জল টাকে গাল বেয়ে পড়ার অনুমতি দিলো না।

-রুপা,একটা নাম্বার বলছি মুখস্ত করে নাও।
-কিসের নাম্বার?
-সিম নাম্বার।আজকে জামাল ভাই আমাকে একটা ফোন দিয়েছে।ফোনের রিংটোন টা খুব সুন্দর।তুমি আজকে রাত ৮ টা থেকে ১০০ বার আমাকে কল দিবে।আমি রিংটোন এর আওয়াজ শুনতে শুনতে আজকে ঘুমাবো।

-রিংটোন এর আওয়াজ তো তুমি এমনিতেও শুনতে পারো।
-আমি চাই আমার প্রিয় কেউ কল করুক।
-আমি কি তোমার প্রিয় কেউ? আমি শুধু হাসলাম।রুপাও জানে এই প্রশ্নের উত্তর সে পাবে না।
-কিন্তু আমার যে ফোন নাম্বার মনে থাকে না।
-এই নাম্বার টা তুমি ভুলতে পারবে না।
-ঠিক আছে বলো।

এখন রাত সাতটা চল্লিশ।হাতে ঘড়ি না থাকলেও মোবাইলের কল্যাণে সময় জানতে পারছি।মেসে ফিরছি।একটু পরেই হয়ত রুপা আমাকে কল করতে শুরু করবে।বিকেল থেকে আকাশ টাও মেঘলা। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ লাঠি দিয়ে আঘাত করলো।পিছনে ফিরতেই দেখলাম হাট্টাগাট্টা কয়েকজন গুন্ডামত লোক হাতে লাঠি আর চাকুও দেখা যাচ্ছে। আমি মাথায় হাত রেখে বললাম

-আমাকে মারার জন্য এতগুলি লোকের দরকার ছিলো না। উনারা হয়ত কথা বলার মুডে ছিল না।আমাকে ইচ্ছে মত মারতে লাগলো।আমি বাধা দিলাম না। আমার এত শক্তি কোথায়?মাটিতে পরে গেলাম। ওরা মেরে চলে যাচ্ছে।মাথা আর শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।আমি দেখলাম একটু দূরেই রুপার বাবার গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিলো।এক্ষুণি সেটা সাই করে চলে গেল।আর গাড়ির খোলা কাচ টাদিয়ে ভদ্রলোকের হাসিমুখ টা দেখা গেল।

ভদ্রলোককে কখনো হাসতে দেখিনি।সময় পেলে একদিন বলে আসবো ‘আপনার হাসিটা খুব সুন্দর।আপনি সবসময় হাসবেন প্লিজ।’ ঝুম বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ডগস এন্ড ক্যাটস রেইন।আমি রাস্তায় পড়ে আছি। বৃষ্টির পানিতে রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে।পকেট থেকে ফোন টা বাজতে শুরু করলো।আমি চোখ খোলা রাখতে পারছি না।রিংটোন এর শুব্দ শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ হয়ে আসলো।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত