আব্বা

আব্বা

আম্মা মারা যাওয়ার পর আমিই আব্বার দেখাশোনা করি। আব্বার সাথে আমার যে দূরত্বটা ছিলো তা এই ক’মাসে একদম নেই বললেই চলে।আব্বার দেখাশোনা করা বলতে বাহির থেকে আসলে এক গ্লাস পানি নিয়ে তার সামনে দাঁড়ানো। তার আবার একটু বাছবিচার ছিলো বেশিই। তার মায়ের জামানার কাঁসার গ্লাসে করেই পানি দিতে হবে।

আম্মা নিজের হাতে সব সময় এই কাজ গুলো করতেন।কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর এই সব বিষয় গুলো আমাকেই দেখতে হয়।এমন নয় যে বাড়িতে কেউ নেই।চার চার জন ভাবি আছে।তবুও আমাকেই করতে হয় কাজ গুলো।আম্মা চলে যাওয়ার পর আব্বা আমার মাঝে নাকি আম্মাকে দেখতে পায়।

একটা মজার বিষয় হলো যে, আব্বাকে কখনো আমি সাদা শার্ট ছাড়া অন্য কোন রঙ্গের শার্ট পড়তে দেখি নি। যে রোববার আম্মা মারা গেলেন তার ঠিক চারদিন পর শুক্রবার আব্বা শার্ট ধোয়ার জন্য কলের পাড় গেলেন। সেঝো ভাবি দেখে গিয়ে বললেন যে আব্বার কি করছেন দেন আমি ধুই। আব্বার দেবে না।নিজের কাজ এখন থেকে নিজেই করবে। তার জেদের কাছে ভাবি হেরে গেলেন। আব্বার নিজের শার্ট নিজেই ধুলেন।এই অব্দি সব কিছুই ঠিক ছিলো।

কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আবার সেই শার্ট নিয়ে কলেরপাড় গেলো। সন্ধ্যা বেলায় আব্বাকে শার্ট ধুতে দেখে বড় ভাইয়া তো বাড়িতে হুলুস্তল কান্ড বাধিয়ে দিলো। বড় ভাবির উপর তো সেই কি চিৎকার।

তখন মেঝো ভাবি এসে বললেন আব্বা আপনি না আজ দিনে এই শার্টটা ধুলেন?

–হ্যাঁ।দেখো দেখি কি অবস্থা।শার্টে নীল একটু বেশিই হয়ে গেছে।তাই আবার ধুতে এলাম।

তখন বড় ভাবি শার্ট আবার ধুয়ে নতুন করে নীল দিয়ে দিলো।কিন্তু তার মন মতো হলো না। তখন আব্বা আমাকে আম্মা মারা যাওয়ার পর প্রথম ডাকে। এর পর থেকে প্রায়ই সময় আমি আব্বার কাপড় ধুয়ে দেই।আমি যে দিনই আব্বার শার্ট ধুতে যাই সেদিনই শার্টের পকেটে টাকা পাই। কিন্তু ভাবিরা যখন ধোয়ার জন্য নিতেন তারা পেতো কিছু কাগজের টুকরো। এই নিয়ে তাদের আফসোসের শেষ ছিলো না। আর যেদিনই পকেটে টাকা পেতাম আমাদের একটা ছোটখাটো হই হুল্লোড় পড়ে যেতো।

বড় ভাবি আবদার করতেন তেঁতুলের, মেঝো ভাবি আইসক্রিম, সেঝো ভাবির জন্য ঝাল লজেন্স। আর ছোট ভাবি সে তো একটু আধুনিক। তার জন্য পুরো দশটাকা দিয়ে ভাড়া করে গানের ফিতা আনতে হতো।যদি পেতাম দশ বিশ টাকা আমার পকেট থেকে তার দুতিন গুণ টাকা চলে যেতো। কিন্তু কখনো না ব্যপারটা আমার খারাপ লাগতো না।বরং ভালোই লাগতো। অল্পতেই সবাই কি খুশি হয়ে যেতো।

এর কিছুদিন পর থেকে পকেটে টাকা পাওয়ার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। ষাট সত্তর টাকার মতো প্রায়ি পেতাম।প্রথম যখন টাকা পেয়ে আব্বাকে দিতে নিতাম তখন আব্বা বলতেন তোর কাছেই রাখ।আর একদিন তো বলেই দিলেন যে, পকেটে টাকা পয়সা পেলে তাকে ফেরত না দেয়ার জন্য।তাই সেই টাকাটার মালিক আমি সহ চার ভাবি হয়ে যেতাম।

অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে।আজ এতো বছর পর বুঝতে পারলাম আব্বা পকেটে টাকা ভুল করে রাখতেন না।ইচ্ছে করেই রাখতেন। আব্বা আমাকে অন্যদের থেকে একটু বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু কখনো বলা তো দূরের কথা বুঝতেও দিতেন না।হ্যাঁ এখন বুঝতে পারি। কিন্তু এখন যে দুজন দুদিকের বাসিন্দা। চাইলেও তাকে কখনো বলতে পারবো না আব্বা আপনার মতো আমিও ভালোবাসি অনেক আপনায়।কিন্তু এইসব শুধু কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। আব্বা আপনি যেখানেই থাকেন ভালো থাকেন।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত