প্রার্থিত প্রজন্ম

প্রার্থিত প্রজন্ম

সময়টি ভরা বসন্তের। ভোরের কুয়াশা কেটেছে। সূর্য কেবলই উঠেছে। পাখিরাও জেগেছে। ভালোবাসার আলো ছড়িয়েছে সূর্য। সূর্যকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উড়ছে পাখিরা, গাইছে দল বেঁধে। অনবরত সুরের গুঞ্জনে মাতিয়ে রাখছে প্রকৃতিকে। মাঝে মাঝে কাকও উড়োউড়ি করছে। মূল সড়কে কিছু লোক হাঁটছে। কয়েকটি বাড়ীর সামনে দলবদ্ধ ছাগল দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার মাঝেই ছোট বড় মুরগী ছুটোছুটি করছে। ধীরলয়ে দু’একটি কুকুর হাঁটছে, নিয়মিত বিরতিতে ডেকেও উঠছে। কুকুরের গর্জন ধ্বনি দূর হতে অতি দূরে প্রকম্পিত হচ্ছে। সড়কের পাশে রয়েছে একটি দোকান। একমাত্র দোকানটি খোলেনি এখনও। হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই খুলবে। এটিই মোটামুটি বটতলা গ্রামের সকাল বেলার দৃশ্য। শুভগাঁ শহরের অদূরেই গ্রামটি। এ গ্রামেই সূর্যদের বাড়ী। বাড়ীটি তিনতলা। দোতলায় থাকে সূর্যরা। বাকী দুই তলায় ভাড়াটে। বাড়ীর চারপাশ জুড়ে বিস্তৃত বাগান। নানা প্রজাতির পুষ্প দ্বারা আচ্ছাদিত বাগানটি। পরিচর্যা করেন সূর্যের বাবা। শুভগাঁ শহরের একজন নামকরা ব্যবসায়ী। শিক্ষিত। চাকরিও করেছিলেন কিছুদিন, চট্টগ্রাম রেলওয়েতে। দূরত্বের কারণে বাবা-মায়ের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছিল চাকরিটি। বিপুল সম্পত্তির মালিক ছিলেন তার বাবা। পরিবারের কেউই বেঁচে নেই আজ। একমাত্র বড়বোনও গত হয়েছেন কিছুদিন পূর্বে। বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে নয়। মাঝারি, স্থূল, কালো বর্ণের। একটি চুলও পাকে নি। ক্লিন সেভ করেন সবসময়। ভ্রু এবং গোঁফ অতিশয় পুরু। দু’ভ্রুর পাশের মাংসগুলো ফাঁপা। ঠোঁট দুটি কালো। বোঝাই যায়, তিনি একজন চেইন স্মোকার। দাঁতগুলি মুক্তোর দানার মতো উজ্জ্বল। হাসলে সেই উজ্জ্বলতা চাঁপা কলির মতো ফুটে উঠে। প্রথম দৃষ্টিতে যে কারুরই তাকে বদমেজাজী মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তিনি তেমনটি নন। উদার হৃদয়ের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত বটতলা গ্রামে। বিপদে পড়লে কমবেশী সবাই তার শরণাপন্ন হন। তিনিও কাউকে বিমুখ করেন না।

উজ্জ্বল সাদা রঙের ট্রাউজার ও সবুজ টি-শার্ট পড়েছেন। হাতঘড়িটি বেশ মানিয়েছে। ঘড়িটি সাদা ও ভারী। গত বছর শিলিগুড়ি থেকে এনেছিলেন। প্রতি বছরই ইন্ডিয়া যান, ব্যবসার প্রয়োজনে। ডান হাতে পাইপ নিয়ে পানি দিচ্ছেন ফুলের গাছে। হাতের রগগুলি ভাসাভাসাভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বাড়ীভর্তি কাজের লোক, তবুও পানি দেয়ার কাজটি তিনিই করেন। দীর্ঘদিনের অভ্যেস। তাছাড়া এতেই তিনি প্রশান্তি বোধ করেন। ধারাবাহিকভাবে পানি দিতেই থাকলেন। ফুলের মধুর গন্ধ বাতাসে ভাসছে। বাগানের ফুটিত ফুলগুলি অবলীলায় তার চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। পানি দেবার এক পর্যায়ে ভবনটির পেছনে এলেন। এসেই থমকে দাঁড়ালেন। দৃষ্টি পড়লো হলুদাভ গোলাপের নীচে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কাগজের টুকরোগুলোর উপর। কৌতূহলবশত চোখ তুললেন। গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন দোতলার বারান্দায়। কাউকেই দেখতে পেলেন না। পড়ে থাকা কাগজের টুকরোগুলো হাতে নিলেন। যা আশঙ্কা করেছিলেন তাই– পড়বার পর নিশ্চিত হলেন। মুহূর্তেই গত রাতের ঘটনা তার স্মৃতির দরোজায় কড়া নাড়লো। অস্থিরতা গভীরভাবে আচ্ছন্ন করতে থাকলো তাকে। কপালের রেখাগুলিও দ্রুতই ভাঁজ হয়ে এলো। কখন যে হাত থেকে পাইপটি পড়ে গেছে, লক্ষই করেন নি। পাইপ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তেই থাকলো। অনবরত পায়চারি করতে থাকলেন তিনি। পায়চারি শেষে মূল ফটক পেরিয়ে রাস্তায় এলেন। রাস্তার পাশেই দোকান থেকে সিগারেট নিলেন। দ্রুততার সাথে একটি জ্বালালেন। অনবরত টানতেই থাকলেন। বাড়ীর ভেতর কখনই ধূমপান করেন না তিনি, সন্তানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এই ভেবে। উত্তেজিত হলেই সিগারেটের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। স্বল্প সময়েই একটি শেষ করে আর একটি ধরিয়েছেন। কিন্তু কোনোভাবেই স্থির রাখতে পারছেন না নিজেকে। শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে। হাতঘড়িটির দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন। দশটা বাজতে ত্রিশ মিনিট বাকী। আজ ছেলের প্রথম পরীক্ষা।

দ্রুত মূল ফটক পেরিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। দেখতে পেলেন ছেলেকে। পাশে তার মা। মধ্যবয়সী, মার্জিত। কালো ফ্রেমের চিকন চশমা সেই মার্জিত ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলেছে। মেরুণ রঙের শাড়ীর সাথে ম্যাচ করে চাদর গায়ে জড়িয়েছেন। ডান হাতের হ্যান্ড ব্যাগটিও একই রঙের। সাথে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাড়ীর লোকজনসহ ভাড়াটে। সবাই সূর্যকে পরামর্শ দিচ্ছেন পরীক্ষা বিষয়ে। কারো দেখাদেখি করা যাবে না, খাতায় কাটাকাটি করা যাবে না, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে ইত্যাদি। আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তার প্রতীক্ষায়। তবে চাপ না নিয়ে পরীক্ষার হলে স্বাভাবিক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সূর্যের মা। বরাবরই তাই করে এসেছেন। কখনই চাপ প্রয়োগ করেন নি ছেলেকে। প্রহারের তো প্রশ্নই নয়। শৈশব থেকে ছেলের মাঝে যখনই কোনো সমস্যা প্রত্যক্ষ করেছেন তখনই অসীম ধৈর্য নিয়ে আগলেছেন। শুধুমাত্র সন্তানকে মানুষ করবার লক্ষ্যেই অবসরে শিশু ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের ওপর পড়াশুনা করেছেন। এ প্লাস পেতেই হবে, ফার্স্ট হতে হবে এমন ভাবনার পরিবর্তে প্রত্যাশা করেছেন– তার ছেলে যেন সত্য কথা বলতে শেখে, মূল্যবোধের আলোয় আলোকিত হতে পারে।

নীল রঙের প্রাইভেট কারটি প্রস্তুত। ড্রাইভার বসে আছেন গাড়ীতেই। একমাত্র সন্তানকে দেখবার পর হাঁটার গতি কমে এলো বাবার। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন। আপাদমস্তক দেখতে থাকলেন নিষ্পাপ পুত্রকে। এক পর্যায়ে দু’হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরলেন। ধরবার পরপরই কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে থাকলেন উচ্চ স্বরে। দু’গালের ঊর্ধ্বাংশ চোখের নিম্নাংশের পাতার কাছাকাছি চলে এলো। গলার শিরাগুলিও জেগে উঠলো। এমন দৃশ্য অভাবিত। পুত্র ও সন্তানের দিকে নির্নিমেষ তাকালেন সবাই। বিষয়টি অবাক করলো তাদের। সূর্যের মাও অনুমান করতে পারলেন না মূল কারণটি। অস্থির হয়ে বার বার ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকলেন।

দু’হাত দিয়ে সন্তানের মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন বাবা। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন মুখের দিকেও। ‘এমন সোনার টুকরো ছেলে ক’জনের ভাগ্যে জোটে’– মনে মনে ভাবলেন। এদিকে পরীক্ষার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। বুঝতে পারলেন তিনি। অনেক কষ্টে অশ্রু থামালেন। ছেলেকে আবারও কাছে টেনে নিলেন। কপালে একটি চুমু দিলেন। এবং বিদায় জানালেন। ‘নাস্তা করে বিশ্রাম নিও, এসে কথা হবে।’ গভীর আন্তরিকতার সাথে দ্রুত বলেই পেছনের আসনে বসলেন সূর্যের মা। পাশে বসলো সূর্য। মুহূর্তেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল প্রাইভেট কারটি। অপরাধবোধের যন্ত্রণা নিয়ে অনিমেষ দাঁড়িয়ে রইলেন সূর্যের বাবা, মূল ফটকের সামনেই।

(দুই)

সূর্য, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একটি কিশোর। হালকা পাতলা শরীর। ছোট করে ছাঁটা চুল। উচ্চতায় বাবার মতোই মাঝারি। গোলাকার বড় বড় চোখ, লোমশ ভ্রু। পুরো শরীরের রংটিই কালো। চেহারার মাঝে সহজেই একটি মায়াবী ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। ওর হাঁটার ধরন, কথা বলার ভঙ্গি, আচরণ মুগ্ধ করে সবাইকে। শুভগাঁ সরকারি কলেজের পরিচিত মুখ। অত্যন্ত মেধাবী। এবারের এইচ. এস. সি পরীক্ষার্থী। আগামীকাল প্রথম পরীক্ষা। সঙ্গত কারণেই ব্যস্ত। সারাদিন রুমেই থাকে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোয় না। রুমটি অত্যন্ত গোছালো। গোছালো থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ও। দরজার পাশেই একটি সিঙ্গেল খাট। খাটের সাথেই ওয়ারড্রোবটি সাজানো। ওয়ারড্রোবের উপরে একটি ছোট্ট পতাকা। বিজয় দিবসে কিনেছিল। পতাকার পাশেই একটি চার্জার লাইট, একটি টেবিল ল্যাম্প এমনকি কিছু মোমবাতি ও দেশলাই। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা আই.পি.এস নষ্ট হলে যাতে পড়াশুনার ব্যাঘাত না ঘটে, তাই এত আয়োজন। ওয়ারড্রোবের পাশে ফাঁকা জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি কাঁচের লম্বা বাক্র। বাক্রের ভেতর একটি কঙ্কাল। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার স্বপ্ন সূর্যের। তাই বাবাই ওকে কিনে দিয়েছিলেন কঙ্কালটি। নিজেও ইন্টারনেট থেকে চিকিৎসা সম্পর্কিত অজস্র তথ্য এবং চিত্র প্রিন্ট করে দেয়ালে লাগিয়েছে। জানালার পাশেই রিডিং টেবিল। টেবিলে শুধু অ্যাকাডেমিক বই ও খাতাপত্র। টেবিলের পাশেই একটি মাঝারি আকারের বুক সেলফ। দেশী বিদেশী গ্রন্থ দ্বারা পরিপূর্ণ সেলফটি। বেশিরভাগই কিশোর ক্ল্যাসিক। কিছু সায়েন্স ফিকশনও রয়েছে। পাশের কম্পিউটার টেবিলটি ফাঁকা। কম্পিউটার চালালেই পড়াশুনোর ক্ষতি হবে– বুঝতে পেরেছিল ও। তাই টেস্ট পরীক্ষার পরই প্যাকেটবন্দী করেছিল কম্পিউটারটি ।

টেস্টের পর থেকেই কঠোর পরিশ্রমের সাথে পড়াশুনা চালিয়ে আসছে সূর্য। প্রস্তুতিতে সন্তুষ্ট ও। প্রশস্ত বারান্দায় একটি ইজি চেয়ার রয়েছে। আপাতত সেখানে বসেই পড়ছে। সময় যতই অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই অস্থির হয়ে উঠছে। কলেজের সব স্যারের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে ওর মননে। বিশেষত সত্য স্যার। উদ্ভিদবিদ্যার প্রভাষক। অত্যন্ত স্নেহ করেন ওকে। পাঠদানে স্যারের আন্তরিকতায় মুগ্ধ সূর্য। তত্ত্বীয় ক্লাসের বিষয়গুলি এত আন্তরিকভাবে বোঝাতেন তিনি, প্রাইভেট পড়বার কথা মনেই হতো না কখনো। তাছাড়া প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসও শেষ হতে হতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো বোঝাই যেত না। উদ্ভিদবিদ্যার পাশাপাশি মূল্যবোধের ওপর স্যারের দীক্ষা আত্মিকভাবে উপভোগ করতো সূর্য। সঙ্গত কারণেই স্যারের আদর্শ, চিন্তা ও দেশাত্মবোধের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের আদর্শ হিসেবে মানে প্রিয় স্যারকে। যখনই যে সমস্যায় পড়েছে নিঃসঙ্কোচে বিনিময় করেছে। স্যারও বিমুখ করেন নি। সূর্যের স্বপ্নটিকে নিজ স্বপ্ন হিসেবে বুনে নিয়ে সহায়তা করেছেন। অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন অবিরত। মায়ের মুঠোফোনে প্রথমে যোগাযোগ করলো সত্য স্যারের সাথেই। পরবর্তীতে অন্যান্য স্যারদের সঙ্গেও কথা বলে নিলো। আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও মোবাইল কেনে নি সূর্য। প্রয়োজনও মনে করে নি কখনো। মাথা নিচু করে দিনরাত মোবাইল চালানো নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়-উপলব্ধি করতে পারে ও। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, ডাক্তার হয়ে সেবা করতে চায় দরিদ্র মানুষের। পূরণ করতে চায় সত্য স্যারের স্বপ্ন।

সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। ফাইনাল রিভিশন শেষে খেয়ে নিল সূর্য। দশটার মধ্যেই ঘুমোতে হবে– সত্য স্যারের কড়া নির্দেশ। বিছানাটি ভালো করে ঝাড়লো। বালিশটিও সোজা করে রাখলো। মশারি টানবে এমন সময় দরজায় শব্দ হলো। দরজা খুলেই দেখতে পেল বাবাকে। খানিকটা আশ্চর্য হলো। এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরেন না তিনি। দরজা বন্ধ করে বিছানার এক প্রান্তে ছেলেকে নিয়ে বসলেন বাবা। অত্যন্ত ব্যস্ত দেখাচ্ছে তাকে। ব্যস্ততার পাশাপাশি কিছুটা তৃপ্ততার ছাপ তার চোখেমুখে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে পলকহীন তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। বিলম্ব না করে ডান হাতটি ঢুকালেন প্যান্টের পকেটে। বের করলেন সমাধানসহ একটি প্রশ্নপত্র।

‘এই নে, উত্তরগুলো দ্রুত মুখস্থ কর।’ ছেলের হাতে প্রশ্নপত্রটি দিয়ে বললেন।

প্রশ্নপত্রটি দেখামাত্রই স্তম্ভিত হয়ে উঠলো সূর্য। উদ্বিগ্ন চিত্তে ঘাড় হেলে দেখতে থাকলো প্রশ্নের সাথে থাকা উত্তরগুলি।

‘বাবা, আমি তো এভাবে পড়িনি, আমার মতো করেই উত্তর প্রস্তুত করেছি।’

‘কিন্তু যেগুলো পড়েছিস সেগুলো তো কমন নাও আসতে পারে, আর এই প্রশ্নগুলো অবশ্যই কমন পড়বে।’ বলিষ্ঠতার ভাবটি প্রতিষ্ঠিত হলো বাবার কণ্ঠে।

‘কিন্তু এমন করা তো অন্যায়, বাবা।’ সত্য স্যার বলেছেন।

‘স্যাররা তো সবসময় এমন কথাই বলবেন, স্যারের কাজ স্যার করেছেন, এখন তোর কাজ তুই কর, বুঝলি।’ পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বোঝাতে থাকলেন বাবা।

‘কিন্তু বাবা, আমি তো এস.এস.সিতে প্রশ্ন ছাড়াই ভালো রেজাল্ট করেছি।’

‘এটা এস.এস.সি নয়, এইচ.এস.সি। এখানে রেজাল্ট ভালো না করলে মেডিক্যালে ভর্তি হবি কীভাবে? মানুষের সেবা করতে হবে না!’ সূর্যের বাবার কণ্ঠে কর্কশ ভাবটি লক্ষিত হলো।

‘তাই বলে অন্যায় করবো!’ বাবার কথা শুনে চরম অসহায়ত্বের পাশাপাশি একটি বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন প্রতিভাত হলো সূর্যের মননজুড়ে, পেরেক বিঁধলো অর্জিত মূল্যবোধের শুভ্র মানচিত্রে। বাবাও কিছুটা আঁচ করতে পারলেন।

‘মাঝে মাঝে এরকম একটু আধটু করতে হয়, এতে কিছু হয় না, জানিস! কত কষ্ট করে প্রশ্নটি ম্যানেজ করেছি।’

‘বুঝলাম, কিন্তু বাবা, সত্য স্যার যে বলেছেন– অন্যায় অন্যায়ই, তা ছোট কিংবা বড়, যাই হোক না কেন।’

‘আবার সত্য স্যার। বললাম না, স্যাররা এমনই বলে থাকেন। এখনই এত ন্যায় অন্যায় বুঝে তোর লাভ নেই। আমার কথাগুলি একটু বোঝার চেষ্টা কর, সুযোগকে কাজে লাগাতে হয়।’ এই কথাকটিতে বাবার একটি অব্যক্ত ক্রোধ ফুটে উঠলো বলে মনে হলো সূর্যের। লাল হয়ে আসা বাবার মুখখানিও ওর দৃষ্টির অন্তরালে রইলো না। বিষয়টি উপলব্ধি করে উত্তেজনার মাত্রা হ্রাসের মাধ্যমে প্রশান্ত হবার চেষ্টা করলেন সূর্যের বাবা।

রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। প্রকৃতিও নিস্তরঙ্গ রূপ ধারণ করেছে। ছেলের এমন মানসিকতা দেখে আশ্চর্য হলেন বাবা। কল্পনাই করতে পারেন নি এমনটি ঘটতে পারে। একজন শিক্ষকের ইতিবাচক প্রভাব যে এতটা গভীর হতে পারে- জানা ছিল না তার। আবারও কোনো ভুল করছেন না তো! ভাবতেই চমকে উঠলেন তিনি। কিঞ্চিৎ নমনীয় ভাবও স্পষ্ট হলো। ভুল, ভুল হবে কেন? যারা সুযোগ পাচ্ছে তারাই তো গ্রহণ করছে। সবার ছেলে যখন ভালো রেজাল্ট করবে, মেডিক্যালে পড়বে, তখন আমি কোথায় গিয়ে মুখ লুকোবো? আমার সূর্যের কী হবে? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ও? যেভাবেই হোক ভালো রেজাল্ট করাতেই হবে। যে কোনো মূল্যে মেডিক্যালে পড়াতেই হবে। আপনাআপনি ভাবনাগুলি তাড়িত করতে থাকলো তাকে। অবলীলায় মনে পড়তে থাকলো গত হওয়া সন্ধ্যের কথা। যা তিনি বিশ্বাস করতে পারেন নি বাস্তবে তাই দেখেই নির্বাক হয়েছিলেন। স্পটে থাকা অভিভাবকবৃন্দ যখন প্রশ্নপত্রটি নিয়ে উৎফুল্লতার সাথে নিজ নিজ সন্তানের কাছে ফিরছিল তখন অসহায়ত্বের মধ্যবিন্দুতে আবিস্কার করেছিলেন নিজেকে। সূর্য যেন ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কল্পনায় সন্তানের মুখটি দেখেই আর স্থির থাকতে পারেন নি তিনি। বাধ্য হয়েছিলেন দোদুল্যমান ভাবনার গভীরে প্রবেশ করতে। পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় যৌক্তিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রশ্নপত্র গ্রহণের। আবারো উদ্যোগী হলেন তিনি। সন্তানের গা ঘেঁষে বসলেন। ডান হাতটি পুনরায় পিঠে রাখলেন। সামর্থ্যের শেষ বিন্দু দিয়ে রাজী করানোর প্রচেষ্টা অক্ষুণ্ণ রাখলেন। চেয়ে রইলেন অধীর আগ্রহে সন্তানের মুখের দিকে।

‘আচ্ছা, ঠিক আছে বাবা। তুমি যাও এখন, আমি দেখছি।’ এক প্রকার বাধ্য হয়েই বলতে হলো সূর্যকে। তার অঙ্গভঙ্গিতে সেটিই প্রতিভাত হলো।

‘যাক বাবা, অবশেষে রাজী করানো গেল।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে নির্ভার হলেন বাবা। স্বস্তির ভাবটি ফুটে উঠলো তার অবয়বজুড়ে। চওড়া বুকের ছাতির ভেতরে বেষ্টন করলেন ছেলেকে। বেশ কিছুক্ষণ রইলেন ওভাবেই। অবশেষে বের হলেন। স্ত্রীর কাছে বিষয়টি গোপন রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন।

(তিন)

নীরব বসে আছে সূর্য, বিছানার এক প্রান্তে। প্রশ্নপত্রটি হাতে নিয়ে। মনে হচ্ছে ভাববার সকল শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। উদাস দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে থাকলো কক্ষটির চারিদিকে। সর্বোচ্চ ভালোলাগার জায়গা তার এই কক্ষটি। কিন্তু আজ এমন অস্বস্তিতে পড়তে হবে এ কক্ষেই, ভাবতে পারে নি ও। দরজাটি খোলাই রয়েছে। বাবা চলে যাবার পরও লাগানো হয় নি। বিষণ্ণ ভাবটি জেগে উঠেছে ওর সর্বাঙ্গে। চোখ দুটিও ছানাবড়া হয়ে এসেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লান্ত দেহে দরজাটি বন্ধ করলো। বসে পড়লো রিডিং টেবিলে। বাবার দেয়া প্রশ্নপত্রটি দেখতে থাকলো। কয়েকটি প্রশ্ন এবং উত্তর দেখেও ফেললো। কিন্তু এক একটি শব্দ যেন সূচ হয়ে ওর বক্ষ বিদীর্ণ করছে-অনুভব করলো। উত্তেজনা ও অস্থিরতায় দ্রুতই ঘামতে শুরু করলো। কী করবে ও, কিইবা করা উচিত ওর? বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে। দু’হাত দিয়ে মাথার দু’পাশ চেপে ধরলো। কোনোভাবেই শান্ত হতে পারলো না। চেয়ারে বসেই বাঁ হাত বাড়িয়ে লাইটটি অফ করলো। নিঃসীম আঁধারের মাঝেই টেবিলে মাথা রেখে বসে রইলো। অতঃপর টেবিল থেকে উঠে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। প্রশ্নটি টেবিলের উপরই রইলো। কে যেন তার গলা টিপে ধরছে-শোয়ামাত্রই অনুভব করলো ও। তবু বিছানা ছেড়ে উঠলো না। শুয়েই থাকলো। অনবরত এপাশ ওপাশ করতে থাকলো। কিন্তু ঘুমোতে পারলো না। হালকা ঠাণ্ডা ভাব অনুভূত হলো শরীরে। পায়ের কাছে থাকা কম্বলটি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উপুড় হয়ে শুইলো। মাথা এবং কপালজুড়ে অনুভব করতে থাকলো প্রচণ্ড ব্যথা। অপ্রত্যাশিত অগ্নিশিখা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো ওর অন্তর্জগতজুড়ে। ‘আর পারছি না, কে আছো আমাকে উদ্ধার করো এই যন্ত্রণা থেকে।’ ক্লান্তির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে অনুভব করতে থাকলো সূর্য। শরীরের ওপর থেকে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো।

‘সূর্য—–, এত ভাবছো কেন? ওঠো, প্রশ্নপত্রটি হাতে নাও, টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেল। আলো জ্বালাও, তুমি না সূর্য, তুমি কেন আঁধারে থাকবে। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে সব প্রতিশ্রুতির কথা! ওঠো বলছি, আলো জ্বালাও, অসীম অনিঃশেষ আলো। পতাকাটি হাতে নাও, বুকে হাত রাখো, শপথ করো তোমার দেশের পক্ষে, তোমার জাতির কাছে, নিঃশ্বাস থাকতে অন্যায় করবে না। ওঠো, ওঠো বলছি, ওঠো।’ সত্য স্যারের মতো কে যেন তার অবচেতনাতেই কথাগুলি বললেন। এবং বলবার পরপরই চলে গেলেন নিঃসীম নীল আকাশের নিচে দিগন্ত বিস্তারী সবুজাভ ক্ষেতের আল বেয়ে বেয়ে।

স্যারের প্রতিমূর্তিটি যেন আপনা আপনি মনের মনিকোঠায় ভেসে উঠলো সূর্যের। ক্ষিপ্র গতিতে কথাগুলি শুনলেও এবার আর ভয় পেল না ও। বরং একটু ভালো লাগা বোধ করলো। মাথার ভেতর যন্ত্রণার ভাবটিও কাটতে শুরু করলো। কথাগুলি শুনবার পর পুরো শরীরে অতিরিক্ত শক্তি পেয়ে গেলো ও। দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। লাইটের সুইচ অন করলো। চার্জার লাইট, টেবিল ল্যাম্প, ডিমলাইট, মোমবাতি সবই জ্বালালো। কক্ষটিকে জ্যোতির্ময় করবার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাটি করলো। তবুও আলোগুলি পর্যাপ্ত মনে হলো না ওর কাছে। উত্তরসহ প্রশ্নপত্রটি হাতে নিয়ে বারান্দায় এলো। টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললো। ছেড়া টুকরোগুলি দু’হাত প্রসারিত করে ছুড়ে ফেললো। এক একটি টুকরো ছন্দোবদ্ধভাবে নীচের দিকে পড়তে থাকলো। টুকরোগুলির দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকলো সূর্য। দৃশ্যটি ভীষণভাবে পুলকিত করলো ওকে। এবার রুমে প্রবেশ করলো। ওয়ারড্রোবের উপরে রাখা পতাকাটি হাতে নিয়ে বারান্দায় এলো। এসেই পতাকাসহ দাঁড়িয়ে পড়লো। দাঁড়ানোর পরপরই অসীম সাহস অনুভব করলো ও। পূর্ণ চাঁদের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। অসংখ্য তারকারাজি হতে প্রক্ষিপ্ত আলোর মেলায় বিপুলভাবে উচ্ছ্বসিত হলো। এই বিপুল আলোকরাশির নীচে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলো– স্যার, স্যার, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, কোনোদিনই অন্ধকারের পথে পা বাড়াবো না, এতটুকু শ্বাস থাকতেও অন্যায় করবো না, ন্যায়ের পথে থাকবো, দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবো।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত