লাল না হয়ে নীল

লাল না হয়ে নীল

বাসা থেকে রাগ করে বেরিয়ে এসেছি, হাতে হাজার চারেক টাকা, গন্তব্য চট্টগ্রামে থাকা এক ফ্রেন্ডের বাসা, বন্ধু থাকলে এই একটা দিক থেকে সুবিধা, বাসা থেকে রাগ করে বেরিয়ে পড়লে, কোথায় থাকবো, কি খাবো সেই চিন্তা করা লাগে না,

তবুও মন মেজাজ খুব বেশি খারাপ, বাসায় একটা বড় মাপের ঝগড়া করে এসেছি, একটা ব্যাপার নিশ্চিত, বাসা থেকে যতোদিন ফোন দিয়ে ফিরে আসার জন্য বলবে না, ততদিন আর ফিরছি না….

ট্রেনে টিকিট কেটে যে কামরাটায় উঠলাম সেটা বেশ নিরব, রাত হয়ে গেছে, কানে হেডফোন লাগিয়ে অনেকে তখন গান শুনতে ব্যস্ত, কেউ আবার প্রেমিকার সাথে বাক্যলাপে, একটু পর খেয়াল করলাম আমার পাশের মানুষটা কেমন জানি উশখুশ করছে, বয়সে আমার থেকে দশ বারো বছরের বড় হবে হয়তো, মেজাজ আরো ত্যাক্ত হলো, কিন্তু কিছু বললাম না কারণ বয়সে বড় মানুষ, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শোনার চেষ্টা করলাম, কিছুটা ঘুম চলেও আসলো হঠাৎ মানুষটা সাইড থেকে গুঁতো দিয়ে বললো-

– ভাই কি সজাগ আছেন?
– জ্বি ভাইয়া বলেন (মনে মনে চরম বিরক্ত হলাম)
– ভাই এর কি মন মেজাজ খারাপ নাকি?
– না ভাইয়া মন মেজাজ তো চরম ভালো
– বোঝা যাচ্ছে খারাপ , কেন খারাপ সেইটা কি বলা যাবে?
– হ্যাঁ ভাই খারাপ, খুশি?
– কারণটা তো বললেন না ভাই (হেসে হেসে বললেন তিনি)
– বাসায় বাবা মার সাথে ঝগড়া করে আসছি তাই খারাপ, এখন ঘুমাতে দেন।
– ওহ আচ্ছা, ভাই একটা গল্প শুনবেন? না হয় গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমোলেন …
– আচ্ছা শুরু করেন।
– মাস দুয়েক আগের কথা, চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেছি, মা অনেক আগেই মারা গেছেন, বাবা আছেন, আর কোনো ভাই বোন ছিলো না, দিনে দশবার ফোন দিয়ে খোঁজখবর না নিলে তিনি শান্তি পেতেন না, বিরক্ত হয়ে কিছু বললে বলতেন, “একটা মাত্র ছেলে, তার খোজখবর কি নিতেও পারবো না?”, শুধুমাত্র খোজখবর নেওয়াতেই যদি সীমাবদ্ধ থাকতো তবুও একটা কথা ছিলো , কিন্তু না, তিনি কথা বলতে শুরু করলে উপদেশের ঝুড়ি নিয়ে বসতেন, এহেন কর্মকাণ্ডে আমি ভীষণ ত্যাক্ত হয়ে উঠলাম, ভাবলাম বাড়ি গিয়ে এর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে, যথারীতি বাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা নিয়ে বড়সড় একটা ঝগড়া বাধিয়ে ফেললাম, বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে আসার সময় বলেছিলাম, “তোমার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নাই, আজকের থেকে আর ফোন দিয়ে বিরক্ত করো না”, আরো অনেক খারাপ ব্যবহার করে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বাড়ি থেকে চলে এসেছিলাম, এক মাস যাওয়ার পরও আমার ফোনে কোনো ফোন কল আসলো না, আমি ভাবলাম উনি কল না দিলে আমিও দিবো না, সত্যি বলতে উনার প্রতিদিনকার ফোন কলগুলা ভীষণ মিস করতে লাগলাম, কেউ আর এখন খোঁজখবর নেয় না, কেউ আর এখন উপদেশ দেয় না, মাসখানেক পর বাড়ি থেকে কল আসলো, অপাশ থেকে বললো এক আত্মীয় বললো আমার বাবা আর নেই, সকালে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি যাওয়ার জন্য বললেন, আমি তাড়াহুড়ো করে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম, সারাটা রাস্তা তার সাথে করা খারাপ ব্যবহারের কথা মনে করে কেঁদে কেঁদেই পার করে দিলাম, বাড়িতে গিয়ে আমার বাবা আর আমাকে আগের মতো বুকে জড়িয়ে ধরলেন না, আজ আমার বাবা সাদা কাফন পড়ে খাঁটিয়ায় শুয়ে আছেন, আমার করা ব্যবহারের জন্য তার কাছে আর একটিবার মাফ চাওয়া হলো না আমার….

তিনি এতটুকু বলে থামলেন, তাকিয়ে দেখলাম তার চোখে পানি, একটু খেয়াল করে দেখলাম আমার চোখেও পানি জমে গেছে, তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
– তোমাকে এতসব বলার পিছনে কারণ একটাই, লাইফে যতোই ঝড় ঝঞ্ঝাট আসুক, এই মানুষগুলোর হাত কখনো ছেড়ে দিওনা, কারণ এই মানুষগুলোই আমাদের প্রতিনিয়ত নিঃস্বার্থে আগলে রাখে, এদের কষ্ট দিতে হয় না, এদের কষ্ট দিলে আল্লাহ্ও কষ্ট পান…

আমার সারাদিনের চিন্তাভাবনা, মন মেজাজ পুরোটাই তার কথায় বদলে গেল একনিমিষেই, ভাবতে লাগলাম প্রতিনিয়ত কতো ভুল করেছি, সব চিন্তা দূর করে বাসায় একটা ফোন দিলাম বাবাকে, সব বললাম, মাফ চাইলাম, তিনিও সব ভুলে আমাকে ফিরে আসতে বললেন…..

জীবনটা সুন্দর, বড্ড সুন্দর, যদি কেউ সুন্দর রাখতে চায়, আপনার বাগানের ফুলগুলো লাল হবে কিনা নীল হবে সেটা নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের গাছ লাগাবেন তার উপর,
.পরম প্রশান্তিতে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম, কানে বাজছে অর্ণবের,
“হোক কলরব ফুলগুলো সব
লাল না হয়ে নীল হলো কেন”.

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত