শুদ্ধ ভালোবাসা

শুদ্ধ ভালোবাসা

একবার “রুম ডেটে” গেলে কি এমন ক্ষতি হবে? কথাটা বলেই অনিক উত্তরের আশায় নিশার দিকে তাকালো। নিশা এতোক্ষণ বই পড়ছিলো। অনিকের মুখে এ কথাটা শুনার পর সে বরাবরের মতোই অবাক হলো। অনিক ইদানিং রুম ডেটের কথা ঘন ঘন বলছে। নিশা বলল:- রুম ডেটে যেতে হবে কেন? প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে, ঘুরোঘুরি হচ্ছে। এতে হচ্ছে না?

:- না..তা ঠিক আছে, তবুও… আমাদের সম্পর্কের প্রায় ছয়মাস হতে চললো। কিন্তু আমরা এখনো কত দুরে। একদিনও একটু কাছাকাছি আসতে পারলাম না।

:- তুমি তো আমার পাশেই বসা আমাদের মধ্যে খুব বেশি হলে চারআঙ্গুল ফাঁক হবে। এর চাইতে আর কতো বেশি কাছে আসতে চাও?

নিশার এ কথার উত্তরে অনিক কি বলবে বুঝতে পারছে না। তবে তার কিছু একটা বলে নিশাকে রাজি করাতে হবে। এর আগে রুমার সাথে “রুম ডেটে” যেতে, সে সময় নিয়েছিলো মাত্র তিনমাস। আর তারিন? সে তো এত্তো আবেগী ছিল যে, প্রেম করার মাত্র দুইমাসেই অনিক তাকে রুমডেটে নিয়ে গিয়েছিল। রুমডেটে গিয়ে শরির ভোগ করার পর দুজনকেই সে ছেড়ে দিয়েছিলো। তারা অনেক আকুতি-মিনতি কান্নাকাটি করেছিল কিন্তু সে শুনেনি। তার কাছে মেয়ে মানেই ভোগের বস্তু। নিশার সাথে তার সম্পর্ক হয়েছে প্রায় ছয়মাস হতে চললো। তবুও সে কিছুই করতে পারছে না। অনিকের জন্য এটা কোনো কাজের কথা না। নিশা মেয়েটা একটু বেশিই চালাক। তাই সে রুমডেটে যেতে রাজি হচ্ছে না। মেয়েরা তো একটু বেশিই আবেগপ্রবণ হয়। নিশার সাথে একটু আবেগের নাটক করলে কেমন হয়? অনিক বলল:- আমি বুঝতে পেরেছি নিশা..তুমি আমায় একটু ও ভালোবাসো না। ভালোবাসলে আমি যা বলতাম তুমি তাই করতে।

নিশা বলল:- আচ্ছা,অনিক! তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করি! বলোতো প্রেম-ভালোবাসা ব্যাপারগুলো কি দিয়ে হয়? মন দিয়ে নাকি শরির দিয়ে?

প্রশ্নটার উত্তর যদিও অতি সহজ। কিন্তু অনিকের মতো প্লে বয়ের কাছে উত্তর খানিকটা কঠিন। সে ইতস্তত হয়ে বললো:- ইয়ে, মানে মন থেকে!

নিশা আবার বলল:- ধরো আমাদের মধ্যে টানা কয়েকদিন কোনো দেখা নেই, কথা নেই। তুমি অনেক দিন ধরে আমার হাসির শব্দ শুনো না। চোখের কাজল দেখো না। খোলা চুল দেখো না। তবে কি তোমার মন খারাপ হবে? নাকি শরির?

উত্তরে অনিক আমতা আমতা করে বলল:- মন খারাপ হবে।

নিশা বলল, ধরো আমার শরির খুব অসুস্থ, কোনোকিছুই খেতে পারছি না। না খাওয়ার ফলে দিন দিন দূর্বল হয়ে পড়ছি। আমার শরিরের সব সৌন্দর্য বিলীন হয়ে গেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে। ঠোঁটের গোলাপী আভা কালো হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালির দাগ পড়েছে। আমায় দেখতে অনেকটা বৃদ্ধা মহিলার মতো লাগছে। তখন কি আমার সৌন্দর্য বিলীন হওয়ার কারণে আমায় ছেড়ে চলে যাবে তুমি?

অনিক জানে এমন অবস্থায় সে কখনো নিশার সাথে থাকবে না। নতুন কোনো শরির পাওয়ার জন্য অন্য কোনে মেয়ের কাছে চলে যাবে। তবুও সে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য মিন মিন করে বলল: না..না.. আমি চলে যাবো কেন? আমি তো তোমায় মন থেকে ভালোবাসি শরির দিয়ে নয়!

নিশা বলল:- বুঝলে অনিক! সেদিন দেখলাম একজন ভিক্ষুক তার স্ত্রীকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার স্ত্রীর সড়ক দুর্ঘটনায় দুটো পা ই পঙ্গু হয়ে গেছে। চিকিৎসার জন্য সবার কাছে থেকে সাহায্য নিচ্ছে। রৌদ্র দিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী যখন ঘেমে যায় তখন সে তার মুখ মুছে দেয়। খিদে পেলে দুজন মিলে পথের দোকানের ভন রুটি ভাগাভাগি করে খায়। বৃষ্টি এলে একসাথেই ভিজে। কখনো হাসে, কখনো কাঁদে। আচ্ছা, ভালোবাসা যদি শরির দিয়েই হতো, তবে কি ঐ স্বামী তার স্ত্রী পঙ্গু হওয়ার পরেও তার সাথেই থাকতো? সে কি তার সুস্থতার জন্য কারো কাছে হাত পাততো? তার স্ত্রীর এই অসময়ে কি সে তার পাশে থাকতো?

সেদিন যখন আমার দাদী মারা গেলেন তখন আমার দাদাকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখলাম। তিনি এত্তো কাঁদছিলেন যে আমরা সবাই মিলেও তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলাম না। বার বার অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। ভালোবাসা যদি সত্যিই শরির দিয়ে হতো তবে তো চল্লিশের পর যখন ওনাদের যৌবন শেষ, তখনি একজন অন্যজনকে ছেড়ে চলে যেতো। কেউ কাউকে ভালোবাসতো না। মৃত্যুর পর দাদা কান্নাকাটি ও করতো না। আসলে পৃথিবীর পবিত্র ভালোবাসা গুলো মন থেকে হয়। যেটা হয় স্থায়ী। আর শরিরের চাহিদা তো কয়েক মিনিটের সাময়িক উত্তেজনা মাত্র। যেই উত্তেজনা একদিন না একদিন ফুরিয়ে যাবেই। যারা শরিরকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা গুলো ও ফুরিয়ে যায় উত্তেজনার সাথে সাথে। টিকে থাকে শুধু মন থেকে তৈরি হওয়া ভালোবাসাগুলো।

তবে..অনিক! আমার মন আর শরীর নিয়ে কথাগুলো বলার অর্থ এই নয় যে, মন থেকে ভালোবাসলে শরিরকে পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। শরিরের ও দরকার আছে। কারণ তা না হলে পৃথিবীতে সৃষ্টির ধারাবাহিকতা ঠিক থাকবে না। তবে সেটা হতে হবে বৈধ ভাবে অবৈধভাবে না। কারণ ভালোবাসার মতো পবিত্র ব্যাপারটার সাথে যদি অবৈধ কোনো বিষয় যুক্ত থাকে তবে সেটা আর যাই পবিত্র ভালোবাসা না।

নিশার মুখে এই কথাগুলো শুনে অনিক কাঁদছে। সত্যিকারের শুদ্ধতম ভালোবাসা কি? সেটা আজ সে বুঝতে পারছে। ইস্.. ঐ সহজ-সরল মেয়েগুলোর সাথে কতই না খারাপ ব্যবহার করেছে সে। হঠাৎ করেই তার নিজের মধ্যে তীব্র অনুশোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত