মায়া চোখ

মায়া চোখ

ভালোবাসার কি আদৌ কোনো সংজ্ঞা হয়, আমি জানি না, সত্যিই আমার জানা নেই। শুধু এটুকুই জানি-ভালোবাসা একটা অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না – শুধু অনুভব করা যায়।

আমি কেমন যেন ! নিজের মতো থাকতেই বেশি ভালোলাগে আমার। অযথা কোলাহল, হৈচৈ এইগুলো সচরাচর এড়িয়ে চলি এবং সেই কারণেই আমার ফ্রেন্ড সার্কেল ‘ও যথেষ্টই সীমিত। হয়তো আমার এই’ বিচিত্র’ স্বভাবের জন্যই মেসে আমাকে অনেকেই এড়িয়ে চলে। তবে আমার তাতে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। আসল ঘটনা শুরুর আগে, এই কথাগুলো বলা দরকার, তাই অনেকটা ভূমিকার মতো করে ব্যক্ত করলাম। আমি যে মেসে থাকি সেখান থেকে প্রায় মিনিট দশেক এর হাঁটা পথ আমাদের কলেজ এবং আমি সাধারণত হেঁটেই কলেজ যাওয়া আসা করি। কেউ কেউ অবশ্য বাইকে আসে যায়।

যাইহোক, আমাদের মেস থেকে কলেজ যাওয়ার পথে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। প্রতিদিনের মতো সেদিন’ও কলেজ যাওয়ার সময় রাস্তায় একদল খুদে পড়ুয়াদের দেখি তারা স্কুলে যাচ্ছে, প্রায় ৬/৭ জনের একটি দল, সবচেয়ে মজার ব্যপার তাদের ছোট্ট পিঠে তাদের থেকে বড়ো বইয়ের ব্যাগ। তাদের ঠিক পিছনে অল্প দূরে যাচ্ছে আরো একজন, তাদেরই সমবয়সী ৬/৭ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে,হাতে প্লাস্টিকের একটা ব্যাগ, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এর ভেতরে বইখাতা আছে, ড্রেস দেখে বুঝলাম এরা সবাই একই ইস্কুলে পড়ে, হয়তোবা একই ক্লাসে! এদের দেখে নিজের ছোট্টবেলার কথা মনে পড়ে যাই, সময় যেন কত তাড়াতাড়ি পার হয়ে যাচ্ছে !

প্রায় প্রতিদিনই কলেজ যাওয়ার সময় দেখতাম সেই খুদে পড়ুয়াদের, কিন্তু এদের ঠিক একটু পেছনের সেই বাচ্চা মেয়েটিকে আমার কেন জানিনা খুব অদ্ভুত লাগতো – কি যে মায়া তার ছোট্ট দুই ‘চোখে, তা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা আমার অভিধানে নেই ! খুব ইচ্ছে করতো, একদিন তার সাথে কথা বলতে, জিজ্ঞেস করতে – তুই এত মন খারাপ করে থাকিস কেন, কেন ওদের সাথে একসাথে হাত ধরে ইস্কুলে যাস না?

-করেছিলাম, একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল সেই ছোট্ট মেয়েটি ! কিন্তু উত্তরে সেই এতটুকু বাচ্চা যা বলেছিল, শুনে আমি একটা কথাও বলতে পারি নি, আমার গলার কাছে সমস্ত কথা গুলো যেন দলা পাকিয়ে গিয়েছিল! মেয়েটি এরপর একছুটে মিলিয়ে গিয়েছিল ইস্কুলের ভিতর সেই নীল সাদা ড্রেস’এর ভীড়ে, আলাদা করে খুঁজে পাইনি আমি তাকে, আমার ঝাপসা চোখে !

-এই পিচ্চি এদিকে একটু শোন, নাম কি তোর? পিউ.
-বাহ, খুব সুন্দর নাম তো! বাড়ি কোথায় তোর?

সে তার ছোট্ট হাত নেড়ে নেড়ে যা বললো, তাতে বুঝলাম, আমাদের মেস থেকে রাস্তাটা সোজা গিয়ে ডানদিকে মিনিট পাঁচেক গেলে যে বস্তি ‘টা, সে সেই নূতনবস্তি তেই থাকে।

-তুই তোর বন্ধুদের সাথে কথা বলিস না? একা একা ওদের পেছন পেছন আসিস যে?

সে কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, আমার মা নীশী আপু, তানিয়া আপু এদের বাসায় রান্না করে, বাসন ধুয়ে দেয়, তাই ওরা আমাকে ঝি’ এর মেয়ে বলে, আমাকে খেলতে নেই না, ক্লাসে ওদের সাথে বসতে দেই না, ওরা নিজেদের মধ্যে টিফিন ভাগ করে খায়, আমাকে দেয়না। শিউলি বলছিল, ওদের মা-বাবা নাকি আমার সাথে মিশতে বারণ করেছে।

আমরা গরীব তাই ওরা আমার সাথে মিশে না, আমাকে টিফিনের ভাগ দেয় না. . . তাই না ভাইয়া। ছলছল চোখে এই কথাটা বলেই চলে গিয়েছিল মেয়েটি। পরে জেনেছি, মেয়েটির বাবা নেই, ছোট একটা ভাই আছে তার, কত ছোট সেইটা বলার ক্ষমতা এইটুকু বাচ্চার নেই ! কোনো কোনো দিন তা’র মা’র কাজ থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গেলে না খেয়েই ইস্কুলে চলে আসে সে ! হায়রে, উপরওয়ালা – তুমি যাকে দাও তাকে এত কিছু দাও, আর যার কেড়ে নাও, তার সবকিছুই কেড়ে নাও ! কেন এত্ত কষ্ট পাবে এইটুকু ছোট্ট একটা নিষ্পাপ ফুলের মত শিশু, কী অপরাধ তার ? ” বাবা ” নামক পরম নির্ভরযোগ্য এই আহ্বান থেকে বঞ্চিত, কিন্তু পেটের ক্ষুধা কি করে সহ্য করবে সে ?

জানি না, সত্যিই আমার জানা নেই ! এর প্রায় তিন চার দিন পরে, আমি মেয়েটিকে তার ইস্কুলের পাশের দোকান থেকে টিফিনের সময় খাওয়ার জন্য এক প্যাকেট কেক আর ছোট একটা ফ্রুটি কিনে দিই। তাকে চোখ বন্ধ করতে বলি, তারপর আমার ব্যাগ থেকে বের করি তার জন্য কেনা নীল রং এর ইস্কুল ব্যাগ। সেইদিন তার মায়াবী কাজল কালো চোখে কি জানি দেখেছিলাম !

মেয়েটি কি বুঝলো জানি না, আমাকে জড়িয়ে ধরবে বলে দুই হাত বাড়িয়ে দিল, আমি একটু ঝুঁকে যেতেই সে তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম আমার শার্ট এর কলারের কাছে শীতল স্পর্শ, মেয়েটির চোখের জল ! সে চলে যায় তার ইস্কুলে, আমি চেয়ে থাকি তার চলে যাওয়া পথের দিকে! সেদিন আর আমার কলেজে যাওয়া হয় নি, ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে খুব কেঁদেছিলাম !

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত