এই পথ যদি না শেষ হয়

এই পথ যদি না শেষ হয়

আমাদের কাজুদা সেই সাতসকালে বিশেষ কাজে ফরিদপুর থেকে বাসে চাপিয়া বসিলো ঢাকা যাইবার উদ্দেশ্য৷ ঢাকাতে কাজুর জরুরী কাজ পড়িয়াছে৷ কাজু মানে কাজী মোনায়েম৷ বন্ধুরা কাজু বলিয়াই ডাকিয়া থাকে৷ অল্প বয়সের বড্ড খোশ মানুষ৷ কাজুর সিট পড়িলো বাসের মাঝামাঝি অবস্থানে৷ কাজুর ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলিতে হইবে, জানালা সংলগ্ন সিটটা কাজুর অধিকারে আসিয়াছে বটে৷ বাস ছাড়িতে সময় এখনো ঢের বাকি৷ ইত্যবসরে কাজু মোবাইলটা হাতে লইয়া ফেসবুকে মনোনিবেশ করিলো৷ বাসের মধ্যে কে উঠিতেছে বা কে নামিতেছে কিবা বাস ছাড়িতে বিলম্ব হইতেছে কিনা এসবে কাজু উদাসীন৷ ভার্চুয়াল জগতে অবগাহন করিতেছেন তিনি৷

এক্সকিউজ মি! এক মিষ্টি কোকিলকন্ঠ কাজুর কর্ণকূহরে প্রবেশ করিলো৷ কোকিলের সন্ধানে ভার্চুয়াল হইতে বাস্তব জগতে মনোনিবেশ করিতেই দেখিলো এতো সাক্ষাৎ ময়না পাখি! আরে ময়না বলিলে কম হইবে৷ এতো মূর্তিমান নীলপরি স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিয়াছে৷ নীল জামা পরিহিত পরিটার শুধু ডানাটা নাই৷ পরি বলিলো, আপনি যদি দয়া পরশে জানালার পাশের সিটটা আমাকে দান করিতেন তবে আমি কৃতার্থ হইতুম৷ যদিও মোনায়েমের কিঞ্চিত মেয়েলী রোগ তথা বমন অভ্যাস রহিয়াছে তবুও এমন ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশী হুর পরির অনুরোধে ঢেকিও গেলা সম্ভব৷ এমন সুন্দরীর অনুরোধ কখনো কোন যুবক ফেলিতে পারিয়াছিলো কি? সেই ধরনের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুজিয়া পাওয়া দুষ্কর হইবে৷ তাই দয়া ও মায়া সে সাথে ভালোবাসা বিতরণের তরে মোনায়েম জানালার পার্শ্ব ছাড়িয়া আসিলো৷

এহেন জনসেবায়… এটাকে জনসেবা না বলিয়া সুন্দরী সেবা বলিলে কী অত্যুক্তি হইবে? সে যাহা হউক, এতটুকু সেবা করিতে পারিয়া মোনায়েমের মনটা গর্ভবতী হইয়া ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিলো৷ ধন্য জীবন ধন্য৷ মানুষতো মানুষেরই জন্য নাকি? মোনায়েম ভাবছে, এমন একখান সুন্দরীকে জানালার পার্শ্ব ছাড়িয়া দিলাম এ আর এমন কী? পরিটা বলিলেতো জীবনটাই দিয়ে দিতে পারতুম৷ নীলপরি নিজ আসনে বসিলো কিন্তু ফেসবুকিং এ মোনায়েমের মনটা আর বসিতে চাহে না৷ ষোড়শী কিবা অষ্টাদশীটা ভাইরাস নাকি? তাকে দর্শনের পর কাজুর মনটা ভীষণ রকম উড়ু উড়ু ক্যান? কাজুর যুবক মনের গহীনে কত্তো কিছু উঁকি ঝুঁকি দিতেছে৷ আকাশের সাদা মেঘের সাথে উড়িয়া বেড়াইতেছে কাজুর মনভ্রমরা৷ এই মুহুর্তে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখিতে মন চাইতেছে কাজুর৷ কিন্তু কেমন করিয়া লিখিবে? সেতো কখনো কবিতা লিখেনাই!

জীবনে কততো শতো বার কাজু কামনা করিয়াছিলো লম্বা ভ্রমণে পাশের সিটে এটা ডানাকাটা পরি বসিবে৷ আর তাহার সাহিত খোশ গপপো করিতে করিতে সময় কাটিয়া যাইবে৷ কাজুর সেই আশা কখনো পূরণ হয়নি৷ সৃষ্টিকর্তা এইবার মুখ তুলিয়া দেখিয়াছেন মনে হইতেছে৷ এইবার ধীরলয়ে সুন্দরীর সাহিত ভাব জমাইতে পারিলেই কেল্লা ফতেহ৷ মোনায়েম ভাবনায় বিভোর কী পদ্ধতিতে আলাপ জমানো যায় সেইটা লইয়া৷ ভাব জমানোত সূদূর পরাহত, এখনো সংলাপ অারম্ভইতো করা গেলো না৷ মেয়েটাকে কি জিজ্ঞেস করিবে “আপু আপনার নাম কী?” আরে সেটা কি ঠিক হইবে? কাজুর বুক দুরুদুরু করিতেছে৷ বাস ছাড়িয়াছে কিছু সময় হইয়া গেলো৷ সুন্দরী এইবার ওড়না দিয়া মুখ বাধিয়া ফেলিলো৷ মেয়েটি পর্দানশীল নাকি? আহারে! এহেন খুবসুরত বদন খানি ঢাকিয়া ফেলিলো? এখন শুধু নয়ন জোড়া দেখা যাইতেছে৷ তাতে কী? নীলপরিটার শুধু আখিদ্বয়ও সেইরকম সুন্দর লাগিতেছে৷ কাজু ভাবিতেছে পর্দানশীল মেয়ে ভালো৷ আমার নীলপরিকে আর কেহ দেখিবে না৷

ওমা! একীগো! হৃদয়ে আঘাত দিয়া পাষাণিটা ঘুমাইয়া পড়িলো৷ কীভাবে নাক ডাকিয়া নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছে পরিটা৷ আর এদিকে তাহার চিন্তায় কাজু অস্থির চঞ্চল হইয়া আছে৷ কাজু এইবার কামনা করিলো মেয়েটা যেনো বাংলা সিনেমার রোমান্টিক দৃশ্যের মতো ঘুমের ঘোরে হেলিয়া দুলিয়া কাজুর গতরে ঢলিয়া পড়ে৷ দীর্ঘ সময় কাজু সেই কান্ডের জন্য অপেক্ষা করিলো৷ কিন্তু কাজুকে হতাশ করিয়া সেইরকম কোন ঘটনা ঘটিলো না৷ এইবার কাজু আশা করিলো বাস যখন যাত্রা বিরতি দিবে ঠিক তখনি সুযোগ কাজে লাগাইবে৷ আজকে এই সুযোগ হাত ছাড়া করা ঠিক হইবে না৷ জ্ঞানীরা বলিয়াছেন, সুযোগ বারবার আসে না৷

আরিচা ঘাটে বাস যখন ফেরিতে উঠিলো ঠিক তখনি রাজকন্যার নিদ্রা গত হইলো৷ স্বপ্নকন্যা যখন বাস হইতে ফেরিতে অবতরণ করিলো তখন অবগুন্ঠন উম্মোচন করিলো৷ চাঁদমুখ থেকে আভা বিকিরণ হইলো আবার৷ সেই আভায় কাজুর বদনখানি উজ্জল হইয়া উঠিলো৷ আহ! কী সুন্দর মুখ, দেখিয়াই হয় সুখ৷ আজকে কথা বলিতে না পারিলে জীবনটা ষোলআনাই বৃথা যাইবে৷ মোনায়েন সমগ্র ফেরির মধ্যে টিকটিকির মতো নীলপরির পশ্চাতে ঘুরঘুর করিয়া অনুসরণ করিবার কসরত করিয়া গেলো৷ কিন্ত কোনভাবেই কথা বলিবার সুযোগ করিতে পারিলো না৷ এই ভাবেই ফেরি অধ্যায়ের অস্থিরর সমাপ্তি ঘটিলো৷

বাস আবার চলিতে শুরু করিলো৷ হৃদয়ের রানী হৃদয়ের কাছেই আবার আসন করিলো৷ এত কাছে তবু কতইনা দূরে! দুই পরানের মাঝে অদৃশ্য দেওয়ালটা মনে হচ্ছে কততো বড়ো৷ অনুমান হইতেছে বাসের শেষ গন্তব্য গাবতলী খুব একটা দূরে নয়৷ কাজুর পরানটা কেমন জানি আনচান করিয়া উঠিলো৷ বিরহ কাতর এ হিয়ায় হাহাকারের সহিত মনে হইলো এই পথ যদি না শেষ হয়…. তবে কতইনা ভালো হইতো৷ আহা! ফরিদপুর হইতে ঢাকার দূরত্ব এত কম কেন? দূরত্বটা পাঁচশতাধিক কিবা সহস্র কিলোমিটার হইলে কী এমন ক্ষতি হইতো? শেষাবধি বাস গবতলী চলিয়াই আসিলো৷ ব্যর্থ মনোরথ অন্তরে কাজু পরাজিত সৈনিকের মতো হেলিয়া দুলিয়া বাস হইতে অনিচ্ছা হেতু নামিয়া আসিলো৷ কাজু ভাবিতেছে আজকেতো যুদ্ধে অবতীর্ণ না হইয়াই পরাজিত সৈনিক হইতে হইয়াছে৷

কাধে ব্যাগ লইয়া বাস হইতে নামিয়া চিন্তিত মনে দাড়াইয়া রহিলো কাজু৷ শেষ বারের মতো পরান পাাখিকে দেখিবার আকাঙ্খা কাজুর৷ ময়না পাখিটা যাত্রীদের শেষেরদিকেই নামিলো বাস হইতে৷ তখনো মুখখানি অবগুন্ঠন মুক্ত৷ ও খোদা! কী ঘটিতে যাইতেছে? লীনপরিটা বাস হইতে নামিয়া সোজা কাজুর দিকে হাটিতেছে৷ মেঘ না চাহিতেই বৃষ্টি নাকি? ডানাকাটা পরিটা সোজা কাজুর সামনে এসে দাড়ালো৷ এবার কী হবে? কাজুর হার্টবিট হু হু করিয়া বাড়িয়া গেলো৷ এই বুঝি দম বন্ধ হইয়া যায়? তাহাহইলে ময়না পাখি কি নিজেই ধরা দিলো? আবারো মিষ্টি কন্ঠে সুধাইলো, এক্সকিউজ মি, একটা কথা বলিবার ছিলো, রাগ করিবেন নাতো? আরে বলে কী? কাজুতো কথা বলিবার জন্যই আকুল ব্যাকুল হইয়া আছে৷ আর সে কীনা বলে রাগ করার কথা৷

একটা কেন, হাজারটা বলিলেও কোন আপত্তি থাকিবে না৷ প্রয়োজনে আজকে কাজে না যাইয়া সারাদিন কথা বলিতে প্রস্তুত কাজু৷ এতশত ভাবিতেছে কাজু, কিন্তু মুখ হইতে কোন কথা সরিতেছে না৷ ডানাকাটা পরি বলিলো, শরীরে এত দুর্গন্ধ লইয়া ভ্রমণ করেন কীভাবে? নিয়মিত গোসল করিতে পারেন না? আর শরীরে পিরফিউম লাগাইতে পারেন না? আপনার সহিত যাহারা ভ্রমণ করিবে তাহাদের যে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হয় সেই দিকে লক্ষ করা আপনার কর্তব্য নয় কি?” এই পর্যন্ত উদগিরণ করিয়া ডানাকাটা পরিটা উড়াল দিলো৷ তাহার গন্তব্য পথে শুধু চাতক পাখির ন্যায় চাহিয়া রহিলো আমাদের কাজুদা৷

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত