বিবাহবিভ্রাট

বিবাহবিভ্রাট

রাঙামুলা আজ আমাকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করবে,,,,কিভাবে কি,,,? বাস থেকে নেমেই দৌড়াচ্ছি আর ভাবছি কেন এমন তো হবার কথা ছিলো না।এতো বছরের ভালোবাসা কি তাহলে,,,?

দৌড়াতে দৌড়াতে একটু দূরে যেয়েই রিকশার সাথে বড়োসড়ো এ্যক্সিডেন্ট করলাম, মরতে মরতে বাঁচলাম রিকশার নিচে পড়া থেকে,,,,আর ধাক্কার চোটে আমার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিটকে যেয়ে রাস্তার ওপারে পড়লো,,,,ওখানে যেয়ে ব্যাগ নেয়ার সময় হাতে নেই আমার তাই আরো জোরে দৌড়াচ্ছি।রাস্তার দুই-তিন জন মানুষও আমার পিছনে দৌড়াচ্ছে কিন্তু কেন দৌড়াচ্ছে বুঝতে পারলাম না।আমিও আরো জোরে জোরে দৌড়াতে লাগলাম যেন তাদের সাথে রেস হচ্ছে আমার,,,,

কিছুদূর যেয়ে হাঁপিয়ে উঠে একটু স্লো হলাম তখন দুই-তিন জনের মধ্যে থেকে একজন এসে বললো, আপা আপনার ব্যাগ,,,!আপনি কি পাবনা থেকে পালিয়ে আসছেন নাকি যে এমন ভাবে দৌড়াচ্ছেন,,,? আমি কি বলবো বুঝতেছি না শুধু ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে আছি একনজরে চোখের পলক না ফেলে। হয়তো লোকটা আমাকে সত্যি পাগল ভেবে ভয়ে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে গেলো,,

রাঙামুলার কথা মনে পড়তেই আবার ম্যারাথন দৌড় শুরু করলাম। একটু দূরে যেতেই ইটের সাথে উষ্টা খেয়ে পড়লাম মুচির গায়ের উপর। আরে আরে আপা কি হইছে আপনার,,,? কিছু হয় নায় তবে হতে যাচ্ছে তাই দৌড়াচ্ছি।মুচির হাতে জুতার কালি দেখে মনে হলো এটাই তো আমার খুব দরকার,,,, মুচিকে বললাম ভাই এটা আমার খুবই দরকার আমাকে এটা দিয়ে দেন। মুচি বললো আপা আপনি এটা দোকানে পাবেন। ওই শালা,সেটা তো আমিও জানি। দেখোস না আমার সময় নাই, ওটাই আমাকে দে। কয়টাকা লাগবে সেটা বল,,,?মুচি কিছু না বলেই জুতার কালি আমার হাতে দিয়ে বললো, আপা আজ আপনি জলদির উপরে আছেন, অন্যদিন টাকা দিয়েন। আজ যেখানে যাইতেছেন যান,,,,

রাঙামুলার আসল নাম ফারহান। আমার থেকে গুনে গুনে ছয় বছরের বড় হলেও কোনদিন ভাইয়া বলে ডেকেছি কিনা মনে নাই।বাবার ছোটবেলার বন্ধুর ছেলে ফারহান। একই এলাকায় থাকি আর প্রতিদিন আমার বাসার নিচে খেলতে আসতো। আমি শ্যামলা আর আব্বু আম্মু ফর্সা তাই রাঙামুলা বলতো, আমাকে নাকি ডাস্টবিন থেকে নিয়ে আসছে তাই আমার গায়ের রং ময়লা। আমি তো একথা শুনলেই ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতাম। একদিন বাড়ির দারোয়ান আমাকে বললো রাঙামুলার কথায় কান্না করো না। আসলে ফারহান বিদেশিদের মতো ফর্সা আর লম্বা তাই দারোয়ান ফারহানকে রাঙামুলা বলছিলো।রাঙামুলা কথাটা আমার কাছে বেশ মজার লাগছে তাই তখন থেকেই ফারহানকে আমি রাঙামুলা বলে চেতাইতাম। রাঙামুলা ডাক শুনলেই ফারহান পারলে আমার চুল ছিড়তে আসতো।

এভাবে স্কুলের সবার সামনে মাঝে মাঝেই রাঙামুলা ডাকতাম আর ফারহান সত্যি সত্যি রাঙা হয়ে যেতো।আমাকেও শাঁকচুন্নি বলে ডাকতো কিন্তু আমি বেশ মজাই পেতাম।

স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠলাম আর রাঙামুলা বিবিএ শেষ করলো। কিন্তু আমরা ছোটবেলার মতোই কাউকে কোন ছাড় দিতাম না। যেখানে সেখানে দুজনের দেখা হলেই একজন আরেকজনকে রাঙামুলা আর শাঁকচুন্নি বলে ডাকতাম।

একদিন আমার আব্বু-আম্মু আর রাঙামুলার আব্বু-আম্মুর সামনে রাঙামুলা আমাকে বললো,শাঁকচুন্নি ভাবছি প্লাস্টিক সার্জারি করে গায়ের রঙ কালো করবো,,, কি বলিস তুই,,,? সবাই তো রাঙামুলার কথা শুনে থ,,,,

আমি বললাম কেনো,কি হইলো যে অমন চাঁদের মতো রাঙা মুখ খানা কালো করবেন,,,,?রাঙামুলা বললো,” শাকচুন্নির জন্য। রাঙামুলা আর শাঁকচুন্নির যদি বিয়ে হয় তাহলে মানুষ বলবে শাঁকচুন্নি বেশি সুন্দর তাই আমি চাই আমাকেও মানুষ তোর মতো সুন্দর বলুক। আমি তো তোকে ভালোবাসিরে শাঁকচুন্নি। তুই আমাকে ভালোবাসবি রে,,,,?”

আব্বু-আম্মু আর আঙ্কেল -আন্টির সামনে এমন কথা শুনে আমিই সেদিন লজ্জায় লাল হয়ে গেছিলাম।আন্টি জোরে জোরে বলতে লাগলো কি রে অন্তি, ভালোবাসবি তো রাঙামুলাকে,,,?আমি আস্তে আস্তে মাথা নাড়িয়ে বললাম হ্যা।

কিছুদিন পরেই রাঙামুলা এমবিএ করতে দেশের বাহিরে গেলো আর আমি বিবিএতে ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ।আমি আমার রাঙামুলাকে একটাই কন্ডিশন দিলাম যে, এই দুই বছরে আমরা একবারের জন্যও ফোনে কথা বলবো না আর একবারের জন্য দেখবোও না কেউ কাউকে। যদি ভালোবাসা সত্যি হয়,একে অন্যের প্রতি টান থাকে তাহলে সেটা দূরে থেকেই অনুভব করতে পারবো কোন কথা না বলে, একবারের জন্যও না দেখে।রাঙামুলা আমার কথা মেনে নিয়েছিলো।

আমি আঙ্কেল -আন্টির কাছ থেকে আর ওর বন্ধুদের কাছ থেকে খবর নিতাম।বিদেশে আবার কোন মেয়ের পাল্লায় পড়েছে কিনা সেটাও ওর বন্ধুদের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতাম।

দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়াল হলো যে, আমি দৌড়াচ্ছি কেন,,,?একটা সিএনজি নিলেই তো রাঙামুলার বাসায় তাড়াতাড়ি যেতে পারবো আর ওর সাদা মুখটা জুতার কালি দিয়ে কালো করে দিবো,,,,,

সিএনজি থেকে নেমেই দেখি পুরো বিল্ডিং সাজানো। ভাবলাম কাল রাতে দেশে এসে আজই বিয়ে করবে এতো ধুমধাম করে আর আঙ্কেল-আন্টিও কিছু জানালো না আমাকে,,,,

সিড়ি দিয়ে উঠতেই দেখি আমার বান্ধবী শান্তা আর তুলি।হারামি গুলোও সেজে আসছে রাঙামুলার বিয়ে খাইতে।রনি ভাই কাল রাতে আমাকে ফোন দিয়ে রাঙামুলার দেশে আসার আর আজ বিয়ের খবর জানাইছে। আমিও দেরি না করে সোজা বাসে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছি।

তাদের সাথে কোন কথা না বলেই উপরে উঠে দেখি আব্বু আম্মুকেও।আমি তো পুরাই থ।সবাই জানে রাঙামুলা কাউকে বিয়ে করছে আর আমিই কিনা জানি না যে আমার রাঙামুলা অন্য কারো জামাই হবে।নিজের আব্বু আম্মুকেও আজ পর মনে হলো। রাঙামুলা ঠিকই বলতো যে আমাকে ডাস্টবিন থেকেই নিয়ে আসছিলো,,,,,,,

আম্মু বললো তাড়াতাড়ি যা রেডি হয়ে নে,বিয়েতে যাবি না,,,,?তোর আন্টির রুমে তোর ড্রেস রাখা আছে। ফারহান নিজে পছন্দ করে কিনে রেখেছে তোর জন্য। এই কথা শুনে সত্যি আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি রাঙামুলার সাথে দেখা করা আর জিজ্ঞেস করার জন্য যে আমাকে এভাবে ধোঁকা কেন দিলো তাই ওর রুমে গেলাম।যেয়ে দেখি রাঙামুলা সোনালী শেরওয়ানি পড়ে বসে আছে আর ফোনে কথা বলছে যেন কার সাথে,,,,,,,,

আমি কিছু না বলেই চলে আসতে চাইলাম তখনি পিছন থেকে রাঙামুলা আমার হাত ধরলো। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলে রাঙামুলা জোরে আমাকে একটা চড় দিলো।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। রাঙামুলা বললো কোথায় যাস শাঁকচুন্নি,,, দুই বছর তো দূরে সরিয়ে রাখলি এখনো কি তোর শখ মিটে নাই যে চলে যাচ্ছিস,,,,!আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

শান্তা, তুলি আর রনি ভাই বলছে বিয়েটা যে রাঙামুলা আর শাঁকচুন্নির সে খেয়াল করেছো অন্তি,,,,,?নিচের গেটে যে তোমাদের নাম লেখা আছে অন্তি!

আব্বু আম্মু, আঙ্কেল আন্টিও এসে পড়লো ততোক্ষণে। তারা সবাই মিটিমিটি হাসছে। তার মানে এটা তাদেরই প্ল্যান ছিলো আমাকে বোকা বানানোর।আমি তখন জোরে জোরে কাঁদতে লাগলাম।রাঙামুলা তখন আমার হাত ধরে বলছে, এখন এতো কাঁদলে বিদায়ের সময় তো চোখে পানি আসবে না তখন চোখে গ্লিসারিন দিয়ে কাঁদতে হবে,,,,!সবার সামনে তখন রাঙামুলাকে চিমটি দিতে থাকলাম আর রাঙামুলা তো ব্যাথায় ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছে,,,,,

আন্টি বললো হইছে হইছে দুজনের দুষ্টামি। অন্তি আয় তোকে সাজিয়ে দেই, আমার ছেলের বউকে আজ আমি নিজ হাতে সাজাবো আমার মনের মতো করে,,,,কি বলিস ফারহান?রাঙামুলা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো হুম আর আমিও লজ্জায় মাথা নিচু করে আছি।কি বিভ্রাটের মধ্যেই না ছিলাম,,,,,

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত