গর্বের ধন

গর্বের ধন

বাসার চিপা গলি পার হয়ে মেইন রোডে এসে দেখি আমার বন্ধু রাকিব এর আব্বা রাকিবরে অভিনব পন্থায় থাবড়াচ্ছে। নাকে, মুখে, চোখে, গলায়, মাথায় পাশের ইলেক্ট্রনিক দোকানে স্পিকারে বাজা হিপহপ গানের তালে তালে দুই হাতে সমানে থাবড়াচ্ছে। রাকিবের আব্বা’র চড়-থাপ্পড় সম্পর্কে আপনাদেরকে প্রপার আইডিয়া দিতে বলে রাখি, তিনি একজীবনে রাজমিস্ত্রি ছিলেন। শ্রম ও মেধার সৌজন্যে তিনি এখন বিরাট কন্ট্রাকটর। হাত লোহার চেয়ে সামান্য নরম। রাকিবের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। তবুও আমার সাথে করা রাকিবের কিছু গুটিবাজির প্রতিশোধ হিসেবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওর মাইর খাওয়া দেখলাম, ভীষণ আনন্দ পেলাম। একপর্যায়ে আমার ভেতর মানবতা উঁকি দিলো। বন্ধুর বিপদে বন্ধু সাহায্যের হাত না বাড়ালে কে বাড়াবে? আমি অবশ্য হাত বাড়ালাম না, বাড়িয়েছি পা।

“চোর-চোর-চোর” বলে গলা ফাটিয়ে গলির ভেতরের দিকে দিলাম দৌড়। রাকিবের আব্বা সহ আরো অনেকজন গলিতে চোর ধরা দেখতে গেলো। আমি অন্য এক চিপা গলি দিয়ে বের হয়ে রকিবের কাছে আইসা দেখি গাল ফুলে গেছে, লাল হলেও বেচারার চেহারা কালো বলে তা অদৃশ্য। জানতে চাইলাম “মাইর দিলো কেন তোর বাপে?”
রাকিব কথা না বলে তাড়াতাড়ি দুইটা আইসক্রিম নিতে বললো। আইসক্রিম দুইটা দুইহাতে নিয়ে দুইগালে ঘষতে ঘষতে বিস্তারিত বলছে রাকিব- “একটা বিরাট গুটি হয়ে গেছে মামা। নাস্তা সেরে আমি ওয়াশরুমে গেছি, আমার ছোট বোন রাইসা বাইরে থেকে শিটকিনি লাগাই দিছে। পাঁচ মিনিট পরে খুলছে। যদিও আমার বেশিক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকা লাগেনাই। পাঁচ-সাত মিনিট আমার নরমালিই লাগে। রুমে গিয়ে রেডি হয়ে বের হওয়ার সময় দেখি ওয়াশরুম আটকানো, ভেতরে কেউএকজন গেছে। রাইসা’র রুমে উঁকি দিয়ে দেখি রাইসা রুমে নাই। প্রতিশোধের আগুন ধাও ধাও করে জ্বলে উঠছে। আস্তে করে শিটকিনি আটকে দিয়ে বিজয়ের হাসি হেসে বাসা থেকে বের হইছি। এখন বাসায় ফেরার সময় ভাবলাম রাইসা বেচারি’র জন্য কয়টা সেন্টার ফ্রুট নিয়া যাই। দোকানের সামনে আইসা দাঁড়ানো মাত্রই পেছন থেইকা এলোপাথাড়ি থাবড়ানি।”

:- রাইসা বিচার দিছে কাকার কাছে যে তুই ওরে বাথরুমে আটকাই রাখছিস?
:- নারে ভাই, বথরুমে রাইসা ছিলোনা, রাইসা গেছিলো ছাদে কাপড় নাড়তে।
:- তাইলে তুই তোর আব্বারেই আটকাইছিলি বাথরুমে?
:- হইয়ো। তাও অপরাধ একটা হইলে এত্তগুলা থাবড়ানি দিতো না। আব্বা যখন আমার পিছনে আইসা দাঁড়াইছে, দোকানদার হালায় ভুলে আমারে দিয়া কয় “এই লন মামা আপনের গোল্ডলিফ।” গোল্ডলিফ চাইছিলো আমার পাশের জন, এই কথা আব্বারে কে বয়ান কইরা বুঝাইবো!

রাকিব খুব দুঃখ করে বলছে “শালার দুনিয়ার সবার কাছে কত ভালো হইছি, আব্বার কাছে আমি সারাজীবন বদমাইশই থাইকা গেলাম। এস এস সি রেজাল্টের দিন A+ পাইছি, স্কুলের স্যারেরা, পাড়ার লোকেরা আমারে কত আদর কত প্রশংসা করলো। যে’ই আব্বার কাছে গেছি রেজাল্ট শীটটা নিয়া, গিয়া দেখি আব্বায় লাঠি হাতে বইসা আছে, আগেরদিন রাইতে মসজিদের ডাবগাছ থেইকা কয়ডা ডাব চুরি কইরা খাইছিলাম মসজিদের ছাদে বইসা, ইমাম সাহেব আব্বার কাছে হেই বিচার দিয়া দিছে।

টিউশনির টাকা জমাইয়া ছোটভাইরে সাইকেল কিনা দিছি, ছোট ভাই ও আম্মা কী যে খুশি হইছিলো! আব্বা রাতে বাসায় আইসা দেখে সাইকেল থেইকা পইড়া ছোটভাইয়ের হাটু ছিলা গেছে। দিলো থাবড়ানি। আব্বার কাছে আমি আর ভালো হইতে পারলাম না। এদিন রাত থেকেই রাকিবের বোন রাইসা’র জ্বর, ভয়ানক জ্বর, মুহুর্তেই একশো তিন-চার উঠে যায় আবার নামে। পরদিন টেস্ট করালে রিপোর্ট আসে ডেঙ্গু। রক্তের প্লাটিলেট অনেক কমে গেছে। ডাক্তার বলে দিছেন বাসায় নিয়ে পানি, ফলমূল, ডাব সহ তরল খাবার খাওয়াতে ও মশারির ভেতরে রেস্ট নিতে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুই ব্যাগ রক্ত জোগার করে দিতে।

সন্ধ্যার পর দেখি রাকিবের বাসায় বিভিন্ন বয়সী সাতজন ব্লাড ডোনার হাজির। প্রত্যেকেই ফেসবুকে রাকিবের পোষ্ট দেখে এসেছে ও ওদের সবার কাউকে না কাউকে রাকিব ব্লাড ডোনেট করেছে। সবাই সবার বিপদের সময় রাকিবের রক্তদানের কৃতজ্ঞতার কথা রাকিবের আব্বাকে বলছে। রাকিব দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছে এখন না জানি আবার বাসায় না বলে রক্ত দেয়ার কথা শুনে তার আব্বা রেগে এসে থাবড়ানি শুরু করে!

মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক বলছে, “আমার ছেলের বাইক এক্সিডেন্ট এর পর রক্ত লাগে তিন ব্যাগ, তা শুনে রাকিব নিজে আরো দুইজন ডোনার সহ হাজির হয়। সেদিন রক্ত না পেলে আমার ছেলেকে বাঁচানো যেতো না।”
আমাদের আরেক বন্ধু সেজান বলছে:- “আমার আপুর যখন সিজার হয় রাত বারোটায়। সবকিছু নরমালই ছিলো। রাত তিনটার দিকে শুরু হয় ব্লিডিং। প্রচুর রক্ত যায়। পুনঃ ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার বললো জরুরি ব্লাড লাগবে। আমি রাকিবকে ফোন দিলে সে এতোরাতে বিছানা ছেড়ে দৌড়ে হাসপাতাল পৌঁছে ব্লাড দেয়। রাকিবকে দেখে সেদিন আমাদের ফ্যামিলির সবাই আনন্দে কেঁদেছিলো।”

রাকিবের আব্বা বুকটা ফুলিয়ে গর্ব করে বলছে :- “আমার পোলা না? মানুষের বিপদে সে বসে থাকার ছেলেই না।”
রাকিব বারান্দায় দেয়ালের সাথে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এটা আনন্দের কান্না। বাবার গর্বের ধন হতে পারার কান্না।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত