আশা

আশা

চাকরীটা আমার খুব দরকার। এই দুটানার জীবন আর মেনে নিতে পারছি না। বাবা মারা গিয়েছেন বছর পনেরো আগে। তারপরে অভাবের সংসারে নেমে এসেছে ঝড়-তুফান। কী করে এক রুটি ভাগ করে দুবেলা খেতে হয় তা ছোটবেলা থেকেই শিখেছি। বাবা মারা যাওয়ার পর মা এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে সংসার চালিয়েছেন আর দু’কলম লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মায়ের আশা ছিল বড় হয়ে আমি চাকরি করবো মার দুঃখ ঘুচবে। আমি তাই চেয়েছিলাম। কিন্তু হায়! বিধাতা বোধহয় তা চাননি। বড় আমি হয়েছি, লেখাপড়াও শিখেছি কিন্তু চাকরি আমি পাইনি। সরকারি চাকরি নাকি সোনার হরিণ।

আমি জানি সে কপাল আমার নেই, সোনার হরিণ তো পাবে তারা যারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। মায়ের শরীর ভালো না। তবুও মুখ ফুঁটে বলতে পারে না, বাবা একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা। ডাক্তার দেখানো যেন বিলাসিতা। যাদের চাল আনতে ডাল ফুরায় তাদের কাছে প্রয়োজনীয় চাহিদাটুকুও বিলাসিতার শামিল। গাছের সতেজ চারাকে ঢেকে রাখলে যেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়, রোগে শোকে মার চেহারাও তেমন হয়েছে। চোখের সামনে দেখছি মা কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার কি কিছু করার আছে? হয়তোবা আছে। আজ পর্যন্ত মাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিতে পারিনি সেখানে চিকিৎসা করানো আমার পক্ষে সম্ভব না।

ছোটবেলায় ভাবতাম বড় হলে পৃথিবীর সর্ব সুখ মায়ের পায়ের নিচে এনে হাজির করব। কিন্তু একি হায়! বাস্তব যে বড় কঠিন। সে লজ্জায় মা’র সাথে আর কথা বলতে পারি না। ছেলে হিসেবে কোন দায়িত্ব আমি পালন করতে পারিনি। না মা’কে দিতে পেরেছি নিরাপত্তা, না পেরেছি সুখ দিতে। আমি আশা ছেড়ে দিলেও মা এখনো আশা ছাড়েনি। মায়ের মনে এখনো উঁকি দেয় তার সন্তান বড় একটা চাকরি পেয়েছে আর তার সব দুঃখ দূর করেছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাকে শহরে পাঠাবে সেখানে গিয়ে যদি কোন কাজ জুটে কপালে। কিন্তু হায়! কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগরও শুকিয়ে যায়। মায়ের অসুস্থতার পরিমাণ হুট করে বেড়ে গেল। মাকে যেদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম সেদিনই ছিল শেষ ডাক্তার দেখানো। তারপরে আর কী শুরু হল একাকীত্ব জীবন কাটানো। শুধু মনে একটা কথা ভাবি, মা তুমি নেই, তাই অভিযোগ ও নেই।

শুয়ে বসে আর দিন কাটে না। ভাবলাম শহরে যাই। শুনেছি সেখানে নাকি টাকা উড়ে। দেখি আমার কপালে কী আছে? একবার শেষ চেষ্টা করতে আপত্তি কিসে? হাতে টাকাপয়সা ও নেই। শেষ সম্বল বসতবাড়ি বিক্রি করে রওনা দিলাম শহরের পথে। এলাকার এক নামীদামী লোক থাকেন শহরে। ভাবলাম তার কাছেই যাব যদি কিছু একটা জুটে এই আশায়। বিধাতা বোধহয় আমাকে আর নিরাশ করতে চান না। ভাগ্য আমার সদয় হয়েছে। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সাথে আমার দেখা মিললো এবং তিনিই আমাকে একটা কাজ দিলেন। মাইনে যা দিবে তাতে আমার একার সংসার ভালোভাবেই চলে যাবে। এখন আমি মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে পারব কিন্তু মাকে দিতে পারব না। ভদ্রলোক নিজে আমাকে থাকার ব্যবস্থাদি করে দিলেন।

এক আবাসিক হোটেলে তিনি আমার জন্য বন্দোবস্ত করছেন। হোটেলটা নিচুমানের হলেও আমার জন্যে তা যথেষ্ট। ঘুম আসছিল না হোটেলের ভাঙ্গা জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে তারা গুনছিলাম আর ভাবছিলাম ভদ্রলোকের মতো মহান মানুষ হয় না। আল্লাহ তার মঙ্গল করুক। হঠাৎ দূরে কিছু একটার ছায়া দেখতে পেলাম না। দুজন লোকের ধস্তাধস্তি, হালকা বোঝা যাচ্ছিল। জানি না কী মনে করে হোটেলের রুম থেকে বেরিয়ে পড়লাম। দৌঁড়ে লোকটার সামনে হাজির হলাম। আবছা আলোতে চেহারা বুঝা যাচ্ছিল না কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছিল দুজনের একজন ছেলে আরেকজন মেয়ে। মেয়েটি আমাকে দেখেই বলতে লাগল ভাইয়া আমাকে বাঁচান। আমি লোকটাকে মারার জন্য হাত তুলতেই এক ঝলক আলো এসে লোকটার মুখে পড়ল। একি হায়! এ যে সেই ভদ্রলোক।

যার উপর আমার বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। ইনি-ই আমাকে বেঁচে থাকার আশা দিয়েছেন। মেয়েটার মুখের দিকে তাকালাম দেখলাম আমাকে দেখে সাহস ফিরে পেয়েছে যেন। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, একি তুমি এখানে এসেছো কেন? আসলে চাচা ভালো লাগছে না তাই ভাবলাম একটু হেঁটে আসি বলেই নিঃশব্দে চলে এলাম। হয়তো পরেরদিন পত্রিকায় খবর বের হবে, রাতে এক তরুণীকে একা পেয়ে…..। আবার হয়তো না। মনে মনে একটা কথা ভাবলাম, ধর্ষকদের জন্য ফাঁসি নয়। একটা চিড়িয়াখানা চাই যেখানে গিয়ে আগামী দিনের শিশুরা জানতে পারবে, পৃথিবীতে থাকা মানুষের মতো দেখতে সকল প্রাণী মানুষ নয়।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত