নিশাত

নিশাত

“বেস্ট ফ্রেন্ডের ছোট বোনের সঙ্গে প্রেম করছিস?”হু।”  আসতাগফিরুল্লাহ! তুই একটা প্রথম শ্রেণির ছোটলোক।” ফারহানার গালি খেয়ে চকিতে ফিরে তাকালাম আমি। ফারহানা ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে হল চঠাস করে ওর গালে একটা থাবড়া বসিয়ে দেই। কিন্তু এইটা কিছুতেই সম্ভব না। ফারহানা আমার খালাতো বোন। ওরা খুব বিত্তবান। তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই একইসঙ্গে খেলাধুলা করে আসছি আমরা। এক সঙ্গে লেখাপড়া। একই সঙ্গে বড় হচ্ছি। ওকে কটু কথা বলে আঘাত দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। কিন্তু ফারহানা আমাকে ক্ষমা করল না। বিতৃষ্ণা মাখা গলায় জানতে চাইল,”নাম কি মেয়েটার?” “নিশু।””ও লে লে লে! আদর করে আবার নিশাতকে নিশু বলা হচ্ছে! বুড়া বয়সে বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে লটঘট করতে লজ্জা হয় না তোর?”

এইবার সত্যিই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ধৈর্য্যের বাধ গেল ভেঙে। বিরস গলায় বললাম,”তোর খুব হিংসে হচ্ছে তাই না? তুই নিজেও তো সেই ইস্কুল বয়স হতে শুরু করে এখন অবধি প্রেম প্রেম খেলা করে যাচ্ছিস। ছেলেদের হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে শুকিয়ে চিমসে হয়ে গেলি। দশটা-বারটা ছেলের সাথে প্রেম করে এখনো কাউকে বিয়ে করতে পারছিস না। লজ্জা তো তোরই হওয়া উচিত।”ফারহানা এতটা আশা করে নি। আমার কথা শুনে ওর চোখে প্রায় জল নেমে আসল। ধরা গলায় বলল,”তুই এইটা বলতে পারলি? এতটা খারাপ মেয়ে আমি? আমি যদি খারাপ হই তবে দীপা, মনিকা, ইশিতাকে তুই কি বলবি? ওরা তো প্রফেশনাল লাভার। টাকা পেলেই বিভিন্ন রিসোর্টে রুম ডেটিং-এ যায়।”

“এইটাই তো তোর প্রধান সমস্যা ফারহানা। জগতে এত ভালো ভালো মেয়ে থাকতে তুই তোর চেনাজানা সবচে খারাপ মেয়েগুলির সঙ্গে নিজের তুলনা করছিস।” “তুই আমাকে এত ঘেন্না করিস?”

“ঘেন্না নয়, তোর কথা ভেবে করুনা হয় আমার। তুই জয়া আপার ছোট বোন। অথচ জয়া আপার সঙ্গে নিজের তুলনা না করে মনিকার মত একটা সস্তা কল-গার্ল এর সঙ্গে নিজের তুলনা করছিস।” “জয়া আপার কথা বাদ দে। ঐটা মানুষ না। রসকষ বিহীন একটা রোবট। মাইক্রোবায়োলজিতে ফাস্ট-ক্লাস পেলেই কেউ অতি মানবী হয়ে যায় না। অথচ নিজেকে সে তাই ভাবছে। এলিয়েন কোথাকার!” “হ্যা। জয়া আপার একটু বেশিই নাক উঁচু। সে এখনো যোগ্য কোন ছেলে খুঁজে পায় নি তাই প্রেম করে নি। কিন্তু তুই তো অল্প বয়সেই নিজেকে রসের দোকান বানিয়ে ফেলেছিস। আখেরে জয়ী হল কে? তুই নাকি জয়া আপা?”

ফারহানা দিশেহারা বোধ করে। আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। ওর জন্যে এখন আমার নিজেরই খারাপ লাগছে। সামান্য একটা টপিক নিয়ে আমাকে ঠাট্টা করতে বসে বেচারি নিজেই ফেঁসে গেছে। ফারহানা ম্লান গলায় জানতে চাইল,”এইটা তোর ফাস্ট লাভ নাই না?” “হু।” “নিশুকে বিয়ে করবি তুই?” “অবশ্যই করব।” “এত কনফিডেন্স?” “হ্যা। যার সাথে প্রেম করব তাকে বিয়ে করব বলেই তো এতকাল অপেক্ষা করেছি। গুরুদেব বলেছেন, অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়। দেখা যাক, আমার ক্ষেত্রে কি হয়।”

“তুই জিতে গেছিস নূর। সত্যিই জিতে গেছিস। নিশাতের সঙ্গে সেদিন গ্যারিশনে দেখা হয়েছে আমার। আমি তো চিনতাম না, সফিক সঙ্গে ছিল। ওই আমার সঙ্গে নিশাতের পরিচয় করিয়ে দিল। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। খুব নিষ্পাপ। ওর সঙ্গে কথা বলে এত ভালো লেগেছে, আবার নিজের কথা ভেবে কষ্টও হয়েছে।” “কষ্ট হয়েছে কেন?” “এক সময় আমিও তো ওর বয়সী ছিলাম। ওর মতো কিউট এবং ইনোসেন্ট ছিলাম।”বুঝতে পারছি, ফারহানা খুব নস্টালজিক হয়ে গেছে। বেপরোয়া জীবন যাপনের কথা ভেবে একটু বোধহয় অপরাধ বোধও ওর ভেতর জেগে উঠেছে। কিন্তু যে মেয়ের তিন নাম্বার রিলেশন কাট-আপ হবার পরের রাতেই চার নাম্বার প্রেমিকের সঙ্গে ডেট করার জন্যে ইনবক্সে নাম্বার চায়, তাকে আমি সান্ত্বনা দেব কি বলে? ওর জন্যে সেই রিমিক্স গানটাই বোধহয় বেস্ট প্রণোদনা,”দিলে পাত্থর রেখে মুখে মেকাপ লাগাও সখী, চল ওয়ান-টু ওয়ান-টু খেলি…”

ফারহানা জানতে চাইল,”কি ভাবছিস?” মাথা ঝাঁকিয়ে অস্বীকার করলাম,”কিছুই ভাবছি না।” ফারহানা হঠাৎ কী ভেবে হি হি করে হেসে উঠে। অবাক গলায় জানতে চাইলাম,”হাসছিস কেন?” “বেস্ট ফ্রেন্ডের ছোট বোনের সঙ্গে প্রেম করছিস তুই। জীবনে অনেক ছোটলোক দেখেছি, কিন্তু তোর মতো কাউকে দেখি না। তুই একটা ক্ষেত!” ফারহানা উন্নাদের মতো হাসতে লাগল। আমি কথা বাড়ালাম না। সিগারেট ধরানোর ছল করে বারান্দায় চলে গেলাম।

নিশাতের বয়স সতের। বাল্যবন্ধু জহিরের ছোট বোন। বন্ধুর বোন হলেও নিশাতের সঙ্গে আগে কখনো দেখা হয় নি আমার। আমাদের বিয়ের কথা পাকা হবার পরই প্রথম আলাপ। সত্যিই অনিন্দ্য সুন্দর একটা মেয়ে। খুব টেলেন্ট। খুব পড়ুয়া। এত অল্প বয়সেই মানিক-বিভূতি সহ হারুকি মুরাকামি, খুশবন্ত সিং, অরুন্ধতী রায় পর্যন্ত পড়ে ফেলেছে। আমি মুগ্ধ। “জীবন তার মঙ্গলময় হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করেছে।”

আসছে অগাস্টের এগার তারিখ আমাদের বিয়ে। বিয়ের কথা পাকা হবার পর হতেই নিশাতের সঙ্গে টুকিটাকি প্রেমালাপ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। অভিজ্ঞতার অভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারছি না। তবু হবু বউয়ের সঙ্গে বিয়ের আগে একটুখানি সখ্যতা তৈরি বাসনা আমাকে বার বার ওর কাছে টেনে নিয়ে যায়। নিশাত যদি বয়সে ছেলেমানুষ হয়, অভিজ্ঞতায় আমিও ওর মতো নাদান এক ছেলে। কিন্তু এই খবর ফারহানাকে দিয়ে লাভ নেই। ওর চোখে আমি ক্ষেত। ক্ষেতই ভাল। যে আধুনিকতা ছেলে-মেয়েদের বিকৃতির পথে নিয়ে যায়, সেই আধুনিকতার মায়েরে বাপ, আধুনিকতার খেতা পুড়ি!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত