দূরত্ব

দূরত্ব

আমার এক ধনী বন্ধু ছিল। বন্ধুটার প্রেমিকা ভুল করে আমার নাম্বারে ফোন দিয়েছিল। দুই চারদিন কথাও হয়েছে। বন্ধুটা প্রেমিকার ফোন ঘেটে আমার নাম্বার পায়। তখন আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব ছিল না। মূলত আমি কে সেটা জানার জন্যই আমার সাথে বন্ধুত্ব করেছিল ছেলেটি। সে নিজে আমাকে ফোন দিত। প্রথম দিন বললো ভুলে চলে গেছে। তারপর বললো, একই জেলায় থাকি, আমরা তো বন্ধুত্ব করতেই পারি। সে থেকে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হলো। দেখা হলো, একসাথে ঘুরাফিরাও হলো অনেকদিন। সে আমার বাড়ি এলো। আমি তার বাড়ি গেলাম। সে বন্ধুত্বের খাতিরে আমার মনের সব কথা জেনে গেল।

যখন সে বুঝতে পারলো আসলে তার প্রেমিকার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই তখন একদিন ব্রক্ষপুত্র মরা নদীর উপরের ব্রীজে দাঁড়িয়ে বলেছিল আসলে আমি তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছি জানার জন্য আমার প্রেমিকার সাথে তোমার সম্পর্ক আছে নাকি? তার মোবাইলে তোমার নাম্বার পেয়েছিলাম। খুব বেশি অবাক হলাম যখন দেখি বন্ধুটি আর আমার সাথে যোগাযোগ করে না। আমি নিজে থেকে ফোন দিলেও ব্যস্ততা দেখায়। একটু কথা বলার জন্য যে কত ফোন দিতাম। নিজেকে মাঝে মধ্যে নির্লজ্জ মনে হতো। আরেকবার ভাবতাম, বন্ধু তো। একটু কথা বললে ভালো লাগবে। সে বন্ধুটি নিজ থেকে একদিন ফোন দিল। ফোন দিয়ে বললো, তার প্রেমিকাকে মেয়ের নানীর বাড়ি নিয়ে গেছে, বিয়ে দিয়ে দেবে। সে খুব কষ্টে আছে, তাকে যেন সাহায্য করি।

আমি আমার সাথের আরো তিন বন্ধুকে নিয়ে তাকেও সাথে করে মেয়ের নানীর বাড়ির এলাকায় গিয়েছি। রাত জেগে মশার কামড় খেয়েছি ঝোঁপে বসে। মেয়ে সে রাতে পালিয়ে এসেছিল আমাদের সাথে। পরদিন তাদের দু’জনের বিয়ে। এরও দুইদিন পর দুই পক্ষের বাবা মা মেনে নেয়।  অবাক করার মতো একটি ব্যাপার ঘটলো এর কিছুদিন পর। বন্ধুটি তার বউয়ের কাছে প্রথমবারের মতো বললো, আমিই সেই রং নাম্বারের ছেলেটি। ওমা, মেয়েটির চেহারায় আগুণের ঝিলকি। চোয়াল শক্ত করে বললো, আপনার জন্য আমাদের দুই মাস একটানা ঝগড়া হয়েছিল। সেদিন একবুক কষ্ট নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। এখন আর কষ্ট পাই না, কারণ সে বন্ধুটি এখন আর আমার সাথে যোগাযোগ করে না।

এলাকার এক মেয়ে বন্ধুর সাথে সাত বছর কথা বলিনি। যদিও সে সম্পর্কে ভাগনি। কথা না বলার কারণ হলো আমরা ছোটবেলা ঝগড়া করে আড়ি কেটেছিলাম। অভিমান নিয়ে কথা বলিনি কেউ। একটু কথা বলার জন্য কত যে ঘুরঘুর করতাম। ভাবতাম আমাকে দেখলেই হয় তো সমবয়সী ভাগনিটা কথা বলবে। কিন্তু না, সে আশায় বালি। কথা হয়েছে তার গায়ে হলুদের রাতে। মজার বিষয় হলো সেদিন দু’জনের চোখেই পানি ছিল। বছরের পর বছর কথা না বলেও বন্ধুত্বটা টিকে ছিল।

উপরের দুটো অংশেই একটি বিষয়ের মিল রয়েছে। সেটি হলো একটু কথা বলার তীব্র ইচ্ছা। হোক বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা। প্রিয় বন্ধুটি বা প্রিয় মানুষটির সাথে কথা বলার যে তীব্র ইচ্ছা থাকে তা হাজারবার ঝগড়া হলেও কমে যায় না। কত অজুহাতেই একটু কথা বলতে ইচ্ছে হয়।  এখন যদি ঘটনা হয় দ্বিতীয় অংশের মতো। সে কথা বলে না, আমি বলব কেন? তাহলে দু’জনের কষ্টই বাড়তে থাকে। হৃদয়ে রক্তক্ষরন হতে থাকে। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, বলা যায় না সে কষ্টের কথা।

কেঁদেছো কখনো কারো জন্য? ধরে নিলাম কারো জন্য কেঁদেছো। তাই বলে কি তুমি প্রতিশোধ স্বরূপ তাকে কাঁদাতে পারবে? সে আমাকে কাঁদিয়েছে আমি তাকে দ্বিগুণ কাঁদাবো। সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে তাকে দ্বিগুণ কষ্ট দেব। ভাবো তো একটু, যার জন্য তুমি নীরবে কাঁদতে পারো সে প্রিয় মানুষটাকে তুমি কাঁদাতে পারবে? আমার মনে হয় পারবে না। তবে তবে কেউ কেউ হয় তো কাঁদিয়ে মজা পায়। মনে মনে আনন্দ পায়, ইশ, আমার জন্য কেউ কান্না করছে। কত ভালোবাসে আমাকে। তার কান্না দেখে তোমার আত্মতৃপ্তি হতে পারে, তবে সে যে কষ্টে কান্না করলো তা উপলব্ধি করার মতো বিবেক বা মন তোমার আছে?

প্রিয়জন বা বন্ধুর সাথে প্রতিহিংসা চলে? জিদ চলে? যেমন আমি বলেছি এটা আমার ইচ্ছে, আমার ইচ্ছে মতোই হবে। সেও একই জিদ করলো। ফলাফল? সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি। তুমি গালের সাথে গাল মিলিয়ে বসে থাকলেও মনের দূরত্ব যে বাড়ছে সে খেয়াল রাখো?  মনে করো তুমি বেশি কষ্ট পেয়েছো। তুমিই বেশি ভালোবাসো। হিসাব বিজ্ঞানের চূড়ান্ত হিসেব নিয়ে বসেছো তুমি? হিসেব করে ব্যবসা করা যায়। বন্ধুত্ব করা যায় না, ভালোবাসা লাভ ক্ষতির হিসেব করে হয় না।

শেষ করি সেই স্বার্থপর বন্ধুকে দিয়ে। তার সাথে কথা বলার জন্য আমার মন আর এখন ব্যকুল থাকে না। একটু কথা বলার জন্য আর মন পোঁড়ে না। কারণ সে তো একটু দূরত্ব চেয়েছিল। আমি মন থেকেই এতটা দূরে ফেলে দিয়েছি যে অনুবীক্ষন যন্ত্র দিয়ে দেখা যাবে কিনা তার তা নিয়েও সন্দেহ আছে। সম্পর্ক তৈরীও হয় মন দিয়ে। সম্পর্কের মানুষটি থাকেও মনে। সেখানে দূরত্ব সৃষ্টি করো না। অনুবীক্ষন যন্ত্র দিয়েও খোঁজে পাবে না।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত