তুমি রবে নীরবে

তুমি রবে নীরবে

ট্রেনের হটাৎ ঝাঁকুনিতে ঘুমটা ভেঙে গেল আকাশের। ঠাওর করতে সময় লাগলো, বিকাল নাকি ভোর! সে কি তার গন্তব্য স্থানে এসে পড়েছে ? আজ অনেক দিন পরে সে আবার বেলুড় মঠের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। এই বেলুড় মঠের সাথে কতস্মৃতি জড়িয়ে আছে তার। একসময় রোজ সন্ধ্যায় সন্ধারতি দেখা , গঙ্গার পাড়ে ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকা, আরও কত কি ! কিন্তু সে সব আজ অতীত। কালের নিয়মে আর সময়ের স্রোতে গঙ্গার জলপ্রবাহের মতো সেও চলে গেছে বহু দূরে, অনেক দূরে। সেই গানটা আজ ও মনে পড়ে:-

“”তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন , মন রে আমার!!””

 

গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি প্রেমিক আকাশ। মন প্রাণ ভরে প্রকৃতি মায়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত। আর ভালো লাগলে সেই সৌন্দর্যকে ক্যামেরায় বন্দি করতে খুবই পছন্দ করে সদ্য পসার লাভ করা পেশায় ফটোগ্রাফার আকাশ। কাঁধের ওপরে আলতো স্পর্শে পিছন ফিরে দেখে , এক অষ্টাদশী যুবতী তাকে ডাকছে। “বলছিলাম, আমার ফোনে আমাদের একটা ফটো তুলে দেবেন প্লীজ!” ;- মেয়েটি তার বন্ধুদের ইঙ্গিত করে অনুরোধ করে। কিন্তু, আকাশের কানে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। শুধু এই কণ্ঠের মাধুর্যটাই তার কর্ণকুহরে ভরপুর। আরও দুবার ডাকার পরে তার সম্বিৎ ফেরে। খানিক ইতস্তত ও লজ্জা পেয়ে, সে রাজি হলো ফটো তুলে দিতে। কিন্তু, ফটোতোলা তো হলো, কিন্তু এই সৌন্দর্যকে সে যে চলে দিতে যেতে পারে না। ক্যামেরা বন্দি করতে পারলে তো ভালোই হতো, কিন্তু মানসচক্ষে সেই রূপলাবন্যকে ধরে নিয়ে মনের মণিকোঠায় বন্দি করল আকাশ।

 

সদ্য গ্রাজুয়েট হয়ে আকাশ একটা ১বছরের ফটোগ্রাফি কোর্স করে এক পরিচিত দাদার দোকানে পার্ট টাইম ফটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করতে শুরু করেছে। ফটোগ্রাফির ওপর ভালো ধারণা ও দক্ষতা থাকার কারণে তার পসার খুব শীঘ্রই বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক আসতে শুরু করে। এই ভাবেই চলতে থাকে তার জীবন। কিন্তু, কদিন ধরেই মনটা বড্ডো অস্থির। আর তার কারণ সেই কোকিলকণ্ঠী স্বরের অপরূপ সুন্দরী । কিছুতেই ভুলতে পারছে না। বারবার কোন এক অজানা আকর্ষণে ছুটে চলেছে তার মন সেই রূপলাবণ্যের টানে। তবে, ভগবান ও বোধহয় এই দুটো হৃদয়কে মিলিয়ে দেয়ার জন্য আগাম পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। আর তাই, কাকতলীয় ভাবেই এক বিয়েবাড়িতে ফটোগ্রাফির কাজে গিয়ে সে আবার দেখতে পায় সেই মেয়েকে। অজান্তেই তার মন আনন্দে নেচে ওঠে। আর অন্যদিকে মেয়েটিও অবাক হয় তাকে দেখে। কথায় কথায় জানতে পারলো, ওর নাম হলো তুলিকা। টুকরো কিছু একান্ত আলাপচারিতায় আসতে আসতে ভালোলাগার জন্ম নেয় আকাশের অবুঝ হৃদয়ে। সত্যি বোধহয়,আকাশেরও হয়েছে “love at frst sight”. বিয়েবাড়িতে তখন মাইকের মাধ্যমে ভেসে আসছে এক গান :-

 

“” ভালোবাসা হাত বাড়াল, লাগলো চোখে প্রেমের নেশা।””

আকাশ ও তুলির মধ্যে আজ যোগাযোগ ৫ মাস সম্পূর্ণ হলো। কথাবার্তা, পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-খারাপলাগা, সব কিছুর মধ্যেই যেন তাদের দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল। আসতে আসতে আকাশের মনে তুলিকার জন্য গড়ে ওঠে এক নিবিড় ভালোবাসা। মনের মধ্যে যেন শুধু একটা নাম; আর সে হলো তুলিকা। অজান্তেই তার মনে হয়েছে, তুলিযেন শুধু আকাশের জন্যই। আকাশের ভালোবাসা তুলিকেই পেতে চায়, দুচোখে কেবল তুলিরই ছবি।

 

মজার ছলে একদিন আকাশ তুলিকে জানায়, তার প্রতি আকাশের হৃদয়ে গড়ে ওঠা উষ্ণ অনুভূতি। ভেবেছিলো, হয়তো তুলিও এই প্রতিক্রিয়াই জানাবে। কিন্তু , তুলি শুধু একটাই কথা বললো, “মজা করছো করো, কিন্তু , আর কোনোদিন এমন করবে না!”

আকাশ বুঝে উঠতে পারে নি, সে কী করে তুলিকা কে তার মনের সত্যিকারের অনুভূতির কথাটা বোঝাবে।কি করে বলবে, সে যে তুলিকে মন থেকেই ভালোবাসে।

আকাশ আর জোর করলো না। ভাবলো, সময়ের হাতেই ছেড়ে দেয়া ভালো। সময় বরং ওকে ঠিকই বোঝাবে। কিন্তু, সময় যে বড়ই রূঢ়। দুটি হৃদয়ে ভালোবাসার কুসুম প্রস্ফুটিত হলেও সেটা যে অকালেই ঝরে যাবে, সেটা বুঝতে পারেনি আকাশের অবুঝ মন। হঠাৎই একদিন অত্যন্ত খুশির আনন্দে তুলি তাকে একটা খবর দিলো। আর এই ব্যাপারটা আজ অবধি আকাশ জনতেই পারেনি। কারণ, তাকে যে জানানো হয়নি। সে তার অতীত জানালেও তুলি যে আকাশকে তার বর্তমান জানায়নি। তুলি যে অন্য কারোর, অন্য কারোর সাথে দীর্ঘ ৪বছরের সম্পর্কে আবদ্ধ। ফোনের ওপ্রান্তে থাকা তুলির মন তখন আনন্দে নৃত্যরত, আর আকাশের মনের পিয়ানোয় বাজছে বিষাদের সুরমূর্ছনা।

 

আকাশ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আগামী মাসেই তুলির বিয়ে, ওর প্রেমিক শুভর সাথে। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলো, অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে আজ তাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পেতে চলেছে। তুলি আর শুভর সম্পর্ক সত্যি হতে চলেছে। তুলি পেতে চলেছে , তার জীবনসঙ্গী। আর তাই তুলি চায়, তাদের বিয়ের pre-wedding ফটোশ্যুট থেকে বিয়ের সমস্ত কাজটাই আকাশ দায়িত্ব নিক। হতভম্ব আকাশ এক মুহূর্তের মধ্যেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। পায়ের তলায় মাটিটা যেন সরে যাচ্ছে। ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে তুলি বারবার ডেকে চলেছে, আকাশ! আকাশ!
আকাশের কানে তখন বাজছে রেডিও থেকে ভেসে আসা সেই গান:-

“”ওগো আবার নতুন করে , ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না…
হারানো স্বপন চোখে এঁকো না।””

 

আজ কদিন ধরেই আকাশ খুব ব্যস্ত তুলিকা আর শুভর pre wedding ফটোশ্যুট এর জন্য। এই ফটোশ্যুট এর বিভিন্ন রকম ভঙ্গীতে তুলি আর শুভকে দেখে কষ্ট হলেও সেটা বুকে চেপে মুখে হাসি বজায় রাখতে হয়েছে।কোনোভাবেই সে প্রকাশ করতে চায় না , তার সুপ্ত ভালোবাসা। বিয়ের দিনে বেনারসি পড়ে কনের সাজে অপূর্ব লাগছে আকাশের। বারবার , তার মনে কল্পনাতে ভেসে আসছে , আজ যদি শুভর জায়গায় সে থাকতো, সে কতটা সৌভাগ্যবান হতো। কিন্তু, যার জায়গা কেবল ফটোগ্রাফার হিসাবে, সে কি কোনোদিন তুলির জীবনে সেলেব্রিটি হতে পারে!!! পারে না। সে ছিল সুন্দরের পূজারী।যে কোনো সৌন্দর্যকে সে ক্যামেরাতে বন্দি করতে পছন্দ করতো। কিন্তু , বুঝতে পারেনি, তার ভালোবাসার মানুষের সমগ্র বিবাহের ফটোগ্রাফির দায়িত্বটা তাকেই নিতে হবে। বিবাহের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ তুলিকা আর শুভকে হার্দিক শুভেচ্ছা জানিয়ে সে তার শেষ ফটোগ্রাফি শেষ করলো। বিবাহের শেষে শুভ আর তুলির জন্য মাইকের সুরে ভেসে আসছে:-

“”আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি মোর প্রাণ…সুরেরও বাঁধনে।
তুমি জানোনা, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে।””

আর বাড়ি ফেরার পথে আকাশের আরও একটি বিয়ে বাড়ির কাজের অর্ডার নিয়ে ফোনে রিংটোন টা বেজে উঠলো:-

“”তুমি রবে নীরবে…হৃদয়ে মম….।।””

* সমাপ্ত *

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত