মোটিভেশন

মোটিভেশন

আমার সমবয়সী বন্ধুগণ চাকরির পাশাপাশি সংসার পেতেছে৷
আর আমার এখনো হিল্লে হলো না৷
আব্বা সকাল-বিকাল কথা শোনাচ্ছেন সমানে৷
কিন্তু বরাবরের মতোই আমি কানে নিচ্ছি না কিছুই৷

বেকার বসে থাকলে শুনতেই হবে৷ এ যেন অলিখিত নিয়ম৷
তাই আমিও নিয়ম মতো শুনে চলেছি৷
পেট চললেই হলো৷
আব্বা অবশ্য উনার মুখ দিয়ে আমাকে দিনে ১০০বার করে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন৷
আবার খাওয়ার সময় হলে ছোট বোন অথবা আম্মাকে দিয়ে ফোন করাচ্ছেন৷

ছেলে মানুষের ঘরের খাবারে পোষায়না৷ রাস্তার মোড়ের টং দোকানে বসলে চা-সিগারেট ছাড়া চলেইনা৷
আর আজকাল সিঙ্গারা না খেলে আমার কেন জানি মনে হয়”আমি মারা যাবো”৷

চায়ের দোকানে বাকির খাতায় আমার নামে টাকা উপচে পরছে৷
অথচ পকেটে ইঁদুর পরেছে বছরখানেক আগে৷
মাঝে মাঝে ছোট বোনের মাথায় তেল দিয়ে বিল নিচ্ছি৷
আবার কখনো আম্মার বাজারের টাকা মেরে চলছি৷
আব্বার বারণ এখন আর বাজারের টাকা আমার হাতে উঠেনা৷
ওদিকে ছোট বোন নিজে নিজে চুল আঁচড়াচ্ছে৷
মাঝখানে পরে অসহায় আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না৷

তখনই মনে হল, আমি মোটিভেশন দিলেই তো পারি৷
আগেই বলেছি, সমবয়সী বন্ধুগণ সংসার পেতেছে৷
সেই হিসেবে পাড়ার মাঝারি সাইজের ছোট ভাইগুলোই আমার টং দোকানের আড্ডার সঙ্গী৷
আমাকে মানেও বটে৷

সেই সুযোগে আমি শুরু করেছিলাম মোটিভেশনাল ব্যাবসা৷
আমার সেই ব্যবসাটা এখন আর টং দোকানে সীমাবদ্ধ নেই৷
ছড়িয়ে পরেছে দূর দূরান্তে৷
আমি আবার খরচ ছাড়া মোটিভেশন দিই না আজকাল৷

সেই সূত্রধরে আজ যাচ্ছি পাশের গ্রামে৷
মারাত্মক কেইস৷
প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে ছেলে মরতে বসেছিল৷
আমি যাচ্ছি উদ্ধার করতে৷
আমার সহকারী হিসেবে আছে, মাঝারি সাইজের ছোট ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে অকর্মা ছেলেটা৷
আমার সাথে তার অনেক মিল৷
তাই লটারি মেরে ওকে বাছাই করেছিলাম৷
অবশ্য সালামী নিয়েছি গোপনে৷

টুক টুক করে হেঁটে চলে এসেছি আসল পয়েন্টে৷
বাড়ি দেখে মনে হচ্ছে বড় লোকই৷
ফি টা ও হাঁকিয়েছি জব্বর ভাবে৷
অবশেষে ছ্যাকাক্রান্ত ছেলেটির রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছি৷
সাথে আছে অকর্মা সহকারি৷
বদ্ধ রুমে আমরা তিনজন৷
আমি মোটিভেশনাল ডাক্তার, সাথে এসিস্টেন্ট আর আক্রান্ত ছেলেটি৷

কন্ঠে বিজ্ঞ ভাব এনে বললাম,
-সমস্যা কি বাপু তোমার?

ছেলেটি অমনি ভ্যা করে কেঁদে দিল৷ সহকারি টিস্যু বাক্স এগিয়ে দিল৷
মোটামুটি অর্ধেক বাক্স শেষ করে ফেলেছে ছেলেটি৷
তারপর বলল,

-প্রেমিকা ছ্যাকা দিয়েছে!

-তো? মরতে বসলা কেন?

-ওকে ছাড়া থাকার চেয়ে বড় কষ্ট আর নেই দুনিয়াতে!

-কে বলেছে এইকথা?

-আমি ফিল করছি?

-ছোটবেলায় খৎনা করিয়েছে তোমাকে?

ছেলেটি ভ্যাবাছ্যাকা খেয়ে বলল,
-মানে?

-উত্তর দাও বাপু৷

-হ্যা অবশ্যই করিয়েছে৷

-ব্যান্ডেজ খোলার কষ্টটা মনে আছে?

-হ্যা ভাই৷ প্রচুর কষ্ট৷

-তাইলে কোনটার কষ্ট বেশি?

-ব্যান্ডেজ খোলার৷

-শীতের দিনে প্রচন্ড ঠান্ডা পানি দিয়ে কোমড় ধুঁয়ে ফোরকানিয়াতে গিয়েছো কখনো?

-হ্যা গিয়েছি৷

-খুব আরাম?

-না খুব কষ্ট৷

-দাঁতের ব্যাথায় কাঁতর হয়েছো কখনো?

-হ্যা৷

-আরাম?

-একদম না৷

-ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে নখ ভেঙেছো কখনো? বা কারো ভাঙতে দেখেছো?

-দেখেছিও৷ ভেঙেছিও৷

-আরাম লেগেছে?

-মোটেই না৷

-টিফিনের টাকা হারিয়ে উপোস কাটিয়েছো কোনো দুপুর?

-হ্যা ৷

-কেমন বোধ করেছো?

-ক্ষিধায় কষ্ট পেয়েছি৷

-পেটের ব্যাথায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছো কখনো?

-কাটিয়েছি ৷

-এবার ভাবো, তুমি যখন মায়ের পেটে ছিলে৷ তখন এরকম কতরাত পেটের ব্যাথার যন্ত্রণা চেপে তোমার মা বেঁচে ছিল৷ কিংবা জন্মদেয়ার সময় প্রসব বেদনায়?

-…..

-খাঁ খাঁ রৌদ্দুরে বাজার ভর্তি থলে হাতে নিয়ে হেঁটেছিলে কখনো?

-নাহ!

-কেন হাঁটোনি? আনন্দদায়ক ব্যাপার না খুব?

-কষ্টের ব্যাপার৷

– তোমার বাবা প্রতি সপ্তাহেই এমন ভাবে বাজারের থলে হাতে ঘরে ফিরছেনা কে বলতে পারে?

-……

অামার মতো অকর্মা সহকারীকে বললাম,
টিস্যুর প্যাকেট টা দিয়ে দাও৷
টাকাটা বিলের সাথে এড করে দিও৷

আর ছ্যাকাক্রান্ত ছেলেটির কানের পাশে মুখ নিয়ে মিনমিন করে বললাম,
পরেরবার মরতে ইচ্ছে হলে, মেজবানের দাওয়াত আমাকে দিয়ে তবেই মরো৷
এই নাও আমার কার্ড৷
ভালো থেকো৷

মোটিভেশন দিয়ে ঘরে ঢুকতেই আব্বার সাথে দেখা৷
বরাবরের মতো জিজ্ঞেস করলো,
-কই গেছিলি?

-খৎনা করাইতে!

-কিহ!!

-না আব্বা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে৷

হাতের ব্যাগ দেখে বলল,
-এই ব্যাগ কই পায়ছিস?

-আব্বা যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি?

-বল৷

-আপনার পান্জাবীর পকেট মেরে দিয়েছি সকালে৷ আপনি বুঝতে পেরেছেন?

-হারামজাদা বুঝতে পারার দরকার নেই৷ আমি দেখেছি তাও কিছু বলিনি৷

-আপনি এতো ভালা ক্যান?

-যাইহোক৷ তোর এই গ্যাট আপটা ঠিক আছে৷ হাতে ব্যাগটা নিয়ে ডেইলি দুইবার রাস্তায় পায়চারি দিবি!

-ক্যান আব্বা?

-বৌ আনবো!

-আম্মারে বলবো?

-বল৷

আম্মাাাা! আব্বায় নাকি নতুন বৌ আনবো ঘরে৷ আপনার কি হবে গো আম্মা!
এই বয়সে…….

শেষটা বলার আগে আমার মুখ টিপে ধরে আব্বা মিনমিন করে বলল,
-তোর জন্য বৌ আনার কথা বলছিলাম অপদার্থ৷ এখন সেটাও বাদ!

-না আব্বা না৷ এই কষ্ট আপনার ছেলে সহ্য করতে পারবেনা৷ আমি মরে যাবো আব্বা৷ নিজে নিজে মরে যাবো৷

-মরার আগে আমারে বলিস৷ আরেকবার খৎনা করিয়ে দিবো৷ তখন বুঝবি কষ্টের কথা৷”
শেষ কথা বলেই আব্বা প্রস্থান করলো৷

আর আমি ভাবছি, আমার মোটিভেশনাল প্রথম বাণীটা আব্বা জানলো কিভাবে!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত