উড়ান

উড়ান

সকাল থেকে মেজাজটা খিঁচড়ে আছে হিয়ার। যত রাজ‍্যের ন‍্যাকামি! উফ্ এর থেকে নিজে কাউকে জোটালেই ভালো হত! অন্তত এসব ধাষ্টামো তো সহ‍্য করতে হত না! আজকালকার দিনে এসব আদ‍্যিকালের ঢঙ দেখলে এমনিতেই গা জ্বালা করে। তারপর আবার হিয়ার মত মেয়ে!যে কিনা কলেজে কত রাঘব-বোয়ালকে দেখেও না দেখা করে শুধুমাত্র স্টাডি আর কেরিয়ারে কন্সেন্ট্রেট করেছে!শেষে তাকে কিনা সঙ সেজে বসতে হবে কোন এক হরিদাস পালের কাছে। জাস্ট অসহ‍্য! মায়ের অনেক ব্ল‍্যাকমেল করার পর রাজি হয়েছে ও। কি করবে, দিব‍্যি-টিব‍্যি দিয়ে কেঁদে-কেটে একসা অবস্থা! বলে কিনা পাড়াতে ওর বয়সী রিম্পা, মিতা এমনকি ওর চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট তিতলির বিয়ে হয়ে গেল, এরপর যদি ওকে পাত্রস্থ না করা যায় তাহলে লোকে কি বলবে! আশ্চর্য! লোকের মুখ আছে যা ইচ্ছে বলবে, তুমি কানে না শুনলেই হল!

এ জন‍্যই হেডফোনের ইউজ করতে শেখা উচিত! আর বললেই কি সবার সব কথা গায়ে মেখে নিতে হবে নাকি! রিম্পা মুসলমান ছেলের সাথে ঘুরছিল, মিতা উচ্চমাধ‍্যমিকে ফেল করল বলে বাড়ির লোক বিয়ে দিল। আর তিতলি তো পালিয়ে বিয়ে করেছে, বয়স অনুযায়ী একটু বেশীই পাকা; অকালপক্ক যাকে বলে আর কি! এতে ওর দোষটা কোথায়! এগুলো যদি ও করত তাহলে মায়ের ভাল লাগতো?! কিন্তু ঐ যে, মাথার পোকা একবার যখন নড়েছে তখন আর কা কস‍্য পরিবেদনা! নাহ্ এদের মতিগতি বোঝা দায়! ছোটবেলায় বলত পড় মন দিয়ে, না পড়লে বিয়ে দিয়ে দেব। আর এখন বলছে অনেক পড়া হল, এবার বিয়ে করে সংসার কর! আচ্ছা সেই যদি বিয়েই করবে তাহলে কষ্ট করে না পড়ে তখনই বিয়েটা করলে ভাল হত না! তখন কানের কাছে ভাঙা রেকর্ডের মত বলেই চলত, ভাল করে না পড়লে রিক্সাওয়ালার সাথে বিয়ে দিতে হবে; আর আজকাল বলছে কেন যে এত পড়ালাম, এখন কোয়ালিফায়েড ছেলেই পাওয়া মুশকিল হয়ে গেল।

যেন বিয়ের জন‍্যই সব! আচ্ছা লোকের ছেলে পড়াশোনায় ভালো না হলে কি তার দায় ওর! হিয়া পড়াশোনায় ঠিকঠাক, মানে ভালোর দিকেই বলা যায়। বরাবরই কেরিয়ার কনসার্নড। মাস্টার্স করার পর ছোটখাটো একটা চাকরিও পেয়ে গেছে।তারপর? তারপর আবার কি! প্রত‍্যেক বাবা-মা যা করে থাকেন, বিয়ের জন‍্য ঘ‍্যানর ঘ‍্যানর,ওর বাড়িতেও তাই চলছে! যেন বিয়ে না করলে জীবন সার্থক হচ্ছে না! আজ সেই অশুভদিন,আজ ওকে দেখতে আসবে‌। শাড়ি পরার নাম শুনেই প্রথম বিস্ফোরণটা হল। ও বুঝতে পারে না এই প্রথার কি অর্থ। বিয়ের জন‍্য দেখতে এলে শাড়ি পরে দেখতে হয় কেন! সত‍্যিই কিছু স্পেশাল দেখায় নাকি বলির আগে পাঁঠাকে যেভাবে মালা, সিঁদুর দিয়ে সাজিয়ে রেডি করা হয় সেরকম গোছের কিছু ব‍্যাপার। যত্ত আদিখ‍্যেতা!

“শোন মা, এসব বন্ধ কর এবার। আমি যেমন চুড়িদার পরি তেমনই পরব! কে না কে মহাপুরুষ যাকে চোখেও দেখিনি তার জন্য কষ্ট করে শাড়ি পরতে পারব না!”

“আবার চোপা করছিস! মুখে মুখে তর্ক করবি না একদম বলে দিলাম! ওদের সামনে চুপ করে থাকবি! তুই কি চাইছিস আমি তোর জন‍্য টেনশনে প্রেসার-সুগার বাড়িয়ে মরি নাকি?! চাকরি করছিস বলে কি মাথা কিনে নিয়েছিস!”
হিয়া ভেবে পায় না চাকরি করে ও কি পাপ করছে! মায়ের এই এক কথা। ও কি কখনও বলেছে নাকি যে চাকরির বেতনে মাথা কিনবে! কিছু বললেই ব‍্যাস, সব দোষ ওর চাকরির! কথায় কথা বাড়ে, তাই চুপ করে গেল। এমনিতেই ওর মুড ভালো নেই, সকাল থেকে যেন রণসজ্জা চলছে! যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, শুধু হাতে একটা তরোয়ালের অভাব! তবে ওটারই মনে হয় বেশী দরকার ছিল। ঘচাং ফুঃ করে মুন্ডুটা খসিয়ে দিত তাহলে মাকালটার। ঘরে আজ এত খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, মনে হচ্ছে জামাই পাওয়ার আগেই মা জামাইষষ্ঠীটা সেরে নেবে। রান্নাঘরে গিয়ে একটা কাঁচাগোল্লা যেই তুলতে গেছে অমনি মায়ের হুংকার,”খবরদার বুড়ি! সব মিষ্টি তুই খেয়ে ফেলবি না, লোকজন আসবে!”

“মা আমি তো একটা-”
“তোমাকে আমি চিনি! এক এক করেই তুমি দুপুর অব্দি সব সাবাড় করবে! আগে ওদের খাওয়া হবে তারপর এসবে হাত দেবে বলে দিলাম!”

কেন ওরা কোন দেবতা যে ওদের ভোগ লাগলে তবে প্রসাদ খেতে পাবে?! বেশ আবদার তো! ভাবটা এমন যেন আজই ওকে বিয়ের উপোসটা করিয়ে ছাড়বে! হিয়ার গা রি রি করে জ্বলতে লাগল।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর শাড়ী পরে রেডি হল। টিভির ঘরে গিয়ে যেই টিভিটা চালাতে যাবে, অমনি মায়ের চিল চিৎকার!

“এ কি, এটা সাজের ছিরি হয়েছে। মিনতি মাসি কাজ করতে আসে এর চেয়ে বেশী ফিটফাট হয়ে।চোখে কাজল পর। কপাল খালি কেন? টিপ কই?”

“কিন্তু-মা, এত সাজার কি আছে। আমি যেমন ওরা আমাকে তেমন দেখলেই তো ভালো-”
“আবার মুখে মুখে কথা-,এসবের কি বুঝিস তুই! যা বলছি কর! রাখ্ রিমোটটা-”
সত‍্যি ও এসবের কিচ্ছু বুঝছে না,আর বুঝতে চায়ও না! খালি এটা পরিস্কার বুঝতে পারল ওর রবিবারটা শুধু শুধু নষ্ট হচ্ছে; গিটারের ক্লাসটা অব্দি মিস হল আজ এসবের পাল্লায় পড়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার বেডরুমে গিয়ে রেডি হতে লাগল। মা বলেছে ধিঙ্গি মেয়ের মত এখন টিভি না দেখতে, ভিতরেই থাকতে। ওরা আসলে যখন ডাক পড়বে তখন যেন আসে। উফ্ নিজেকে সার্কাসের ভালুক মনে হচ্ছে ওর! হঠাৎ মা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল,” বুড়ি-,ওদের আসতে একটু দেরি হবে মনে হয়, ফোন করে বলল জ‍্যামের জন‍্য আটকে পড়েছে রাস্তায়। ততক্ষণে একটু ঘুমিয়ে নে, দেখতে একটু ফ্রেশ লাগবে! আমিও একটু গড়িয়ে নি, টেনশন রইলই, ঘুমোব কি!”

কিসের যে এত টেনশন! ভাবখানা এমন যেন পাত্রপক্ষ নয়, যম স্বয়ং আসছে ওদের বাড়ি। মাকে নিয়ে না পারা গেল না আর! অত ফ্রেশ লাগার দরকার নেই, ও কি বাজারের সব্জি নাকি! ভাবল হিয়া। ফেসবুকে একটা নতুন সিনেমার ভিডিও আউট হয়েছে, টাইমলাইনে শেয়ার করে রেখেছে ; সেটাই বরং দেখবে। বিছানায় গা এলিয়ে মুভিটা বুঁদ হয়ে দেখছিল, কোন কিছুর খেয়ালই ছিল না। মুভির একটা জম্পেশ গান চলছিল, মাথা দুলিয়ে সেটার সাথে সুর মেলাচ্ছিল। কানে হেডফোন ছিল তাই বুঝতে পারে নি, গলার আওয়াজটা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

হঠাৎ খেয়াল করল মা ওর পায়ে ঠেলা মারছে, “কি রে, এই-ই-; কতক্ষণ ধ‍রে ডাকছি কোনো খেয়াল আছে। কানে তার গুঁজে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছিস! এ কি ছিরিতে শুয়ে রয়েছিস, শাড়িটা যে নষ্ট হয়ে গেল! বলি আর কবে মানুষ হবি!তোর বয়সি মেয়েরা ছেলে-পিলে মানুষ করছে! তোকে কত শেখাব আর! দোষতো আমাকেই দেবে সবাই! ভালো কিছু হলে বাবার নাম, আর খারাপ হলেই সব মায়ের শিক্ষা! ওরা এল বলে, ঠিক করে নে শাড়িটা জলদি!” মা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে চলে গেল। খুব রাগ হচ্ছে হিয়ার।

সহজভাবে রেডি হতে বললেই হত, এত কথা শোনানোর কি দরকার ছিল! সব ঐ লোকের ছেলেটার জন‍্য! মুভির শেষ পার্টটাও বাকি রয়ে গেল, এরপর কখন রিমুভ করে দেবে আর দেখাও হবে না। এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ীর হর্ণের শব্দ পাওয়া গেল। তার মানে ‘ইটস্ কামিং’! বেডরুমে বসে হিয়া বেশ বুঝতে পারছে বসার ঘরে রাজকীয়ভাবে ওনাদের অভ‍্যর্থনা জানানো হচ্ছে। ছেলেদের বেশ মজা! কি সুন্দর মেয়ে দেখতে এসে গান্ডেপিন্ডে গিলবে! ভাবতেই ওর পেটের ছুঁচোগুলো ডন দিয়ে উঠল। এই রে! মুভি দেখার চক্করে খাবার কথাটা ভুলেই গেছিল। এখন তো আর রান্নাঘরের দিকে যাওয়াও যাবে না, তাহলে তো বসার ঘর হয়ে যেতে হবে! কি জ্বালা! কোন বার না করা শিবরাত্রির উপোসটা আজ করিয়ে নিচ্ছ, ভগবান এভাবে শোধ তুলছ শেষে!

“এই দিদিয়া, তোকে ডাকছে!” মিনি ডাকল। মিনি হিয়ার পিসির মেয়ে, পাশের পাড়ায় ওদের বাড়ি। আজকের এই রাজসূয় যজ্ঞ দেখতে ওরাও সপরিবারে এসে জুটেছে। হিয়ার চেয়ে বয়সে অনেকটাই ছোট, যমের মত ভয় পায় ওকে।
“ওদের গেলা কমপ্লিট?” হিয়া জিজ্ঞেস করল!
” অনেকক্ষণ! জানিস দিদিয়া, তোর শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো না রাক্ষসের মতো খায়!”
“ঠাস করে এক চড় মারব। এখনই শ্বশুরবাড়ি কি! বেশী পেকেছিস না!”

মিনির কানটা লাল করে দিয়ে বসার ঘরের দিকে পা বাড়াল হিয়া। এক্সামে ভাইভা দিতে ঢোকার আগেও কখনও এরকম অদ্ভুত ফিল্ হয়নি। হোটেলে যেমন খাবার অর্ডার দিয়ে লোকজন অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে, সবাই ওর জন‍্য তেমনি তীর্থের কাক হয়ে বসেছিল। ঘরে ঢুকে খেয়াল করল পাত্র আর পাত্রের বাবা এসেছেন। মা চোখ টিপে ইশারা করে সবাইকে প্রণাম করার কথাটা মনে করিয়ে দিল। বিয়ে করতে গেলে যত রাজ‍্যের ন‍্যাকা ন‍্যাকা জিনিস যে কেন করতে হয়, হিয়া ভেবে পায় না। এগুলো কি কাউকে বিচার করার মাপকাঠি হল নাকি! পাত্রের বাবা হিয়াকে বসতে বললেন। ও মায়ের শেখানো মত চোখ নামিয়ে স্থির হয়ে বসল; খেয়াল করল ছেলেটা আড়চোখে ওকে দেখছে, তবে নিজের বাবার নজর থেকে বাঁচিয়ে। ছেলের বাবাও ওকে আপাদমস্তক দেখছে। দুদ্দূর! গোটা ব‍্যাপারটা খুবই ইরিটেটিং লাগছে হিয়ার!

“একটু দাঁড়াও দেখি তো মা! বাবু তুইও উঠে দাঁড়া!” ছেলের বাবার কথায় উঠে দাঁড়াল হিয়া, ও বুঝল ছেলের হাইট কমের দিকে তাই পাশে দাঁড় করিয়ে দেখতে চাইছেন। আচ্ছা জ্বালা হল তো! এটা তো উচ্চতার ব‍্যাপার, উষ্মতা তো নয় যে ক‍্যালোরিমিতির মূলনীতির মত পরস্পরের সংস্পর্শে এলেই ছেলেটার হাইট বেড়ে গিয়ে, ওরটা কমে গিয়ে দুজনের উচ্চতা সমান হয়ে যাবে! আর তাছাড়া বাপী তো জানিয়েই দেয় সবাইকে ওর হাইট পাঁচ-চার, তারপর অত এক্সপেরিমেন্টের কি আছে বাপু! ছেলের হাইট মাপলেই তো জলের মত পরিস্কার হয়ে যায়। কি ঝামেলা রে বাবা! কিছুক্ষন ভেবে ছেলের বাবা বললেন,”একটু হেঁটে দেখাও তো মা!”

হাঁটবে মানে? এখানে কি ফ‍্যাশন শো চলছে, যে র‍্যাম্পে হাঁটবে! মায়ের মুখের দিকে তাকাল একবার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুমের মধ‍্যে হাঁটল এদিক-ওদিক। কি দেখতে চাইছে এরা? ও হাঁটতে শিখেছে কিনা? কে জানে! এসবের মাঝে মিনির দিকে চোখ গেল। ওর মুখে মুচকি হাসিটা দেখে গা জ্বলে উঠল হিয়ার! ওর হিটলার দিদি যে আজ বেকায়দায় পড়েছে সেটা ও ভালোই বুঝতে পেরেছে।ঐ যে কথায় আছে না হাতি গর্তে পড়লে ব‍্যাঙও লাথি মারে! হিয়ার অবস্থাটা আজ ঠিক সেইরকম! ইচ্ছে করছিল ঠাটিয়ে এক চড় মারে, কিন্তু এই মুহূর্তে সবার সামনে সিন ক্রিয়েট করে আর লাভ নেই!

“চুলটা এত ছোট কেন মা?” ছেলের বাবা জিজ্ঞেস করলেন‌।
হিয়ার বলতে ইচ্ছে করছিল, আমার চুল ছোট রাখব না বড় আপনার বাবার কি! আপনাদের বাপ-ব‍্যাটার চুলতো আমার থেকেও ছোট! আমি কিছু বলতে গেছি?! নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “মাথা ভিজিয়ে অফিস যেতে হয়, ঠান্ডা লেগে যায়। তাই-”

“রান্নাবান্না পার?”
” ইচ্ছে হলে চিকেন, পনীর, ধোসা টুকটাক বানাই মাঝে মাঝে। তবে রোজকার রান্নাগুলো কখনো ট্রাই করিনি ।” হিয়া উত্তর দিল।

“সে বিয়ের পর তো করতেই হবে, একটু-আধটু জানো যখন ওগুলোও মায়ের কাছে শিখে নেবে!”
করতেই হবে মানে কি! এরা ছেলের বৌ খুঁজছে না রাঁধুনি! কথা শুনে তো মনে হচ্ছে ও রান্না না করলে এরা ভাত পাবে না। আচ্ছা এতদিন এদের কে রান্না করে খাওয়াতো? না কি এরা না খেয়েই বেঁচে আছে!

“ওর রান্নার হাত কিন্তু দারুণ! চিকেনকষা, শাহী পনীরটা যা রাঁধে না!উলুস্!” পিসি ফুট কাটল। সবকিছু অতিরঞ্জিত করে না বললে আবার পিসির পেটের ভাত হজম হয় না।

বুড়োটা আবার বলল, “দেখুন আপনার মেয়ের চাকরি করার কোনো দরকার নেই, আমার ছেলে যা রোজগার করে তা যথেষ্ট। আসলে আমাদের বাড়ি-গাড়ি,টাকা-পয়সা কোন কিছুর অভাব নেই,খালি দেখার লোকের অভাব! তাছাড়া যতই বলুন মেয়েদেরকে ঘরেই মানায়, বাইরের কাজগুলো ছেলেদেরই সাজে!হেঁ হেঁ! আর ঐ গিটার-ফিটার ছাড়তে হবে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের একটা হুজুগ উঠেছে মশাই! ব‍্যাটাছেলে হলেও মানা যায়, মেয়েছেলেদের ক্ষেত্রে বড়ই দৃষ্টিকটু!”

বলে কি মালটা! ছুটির দিনে ভিড় বাসে ধাক্কা খেয়ে ক্লাস করতে যাওয়া, এত শখ করে শেখা গিটার; ছেড়ে দেবে?! মামদোবাজি! দেখার লোকের যখন দরকার কেয়ারটেকার রাখলেই তো পারে। তারজন‍্য ওর চাকরি ছাড়ার কি দরকার! আচ্ছা এরা কি আদিম যুগের লোক না অন‍্য গ্রহের! কিন্তু ও যে শুনেছিল এলিয়েনরা অনেক উন্নত হয়! দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল হিয়া।

” আরেকটা প্রবলেম আছে আবার! আমার ছেলের তো দেবগণ, আপনার মেয়ে আবার নর, কোষ্ঠীতে দেখলাম মঙ্গলও নিচস্থ! যাইহোক আমি এক জ‍্যোতিষের সাথে আলোচনা করেছি, উনি একটা পাথর নিতে হবে বললেন। ত্রিশ- চল্লিশ হাজারের মতো নিয়ে যাবেন তাহলেই সব দোষ কেটে যাবে।”

বাপী বলল,”ছেলে-মেয়ে যদি নিজেদের মধ্যে একটু একা কথা বলে নিত-”

“আরে মশাই ওরা আবার কি কথা বলবে! ওরা কি বোঝে এসবের! বাচ্চা ছেলেমেয়ে! ওদের কথা বলার দরকার নেই!”
আশ্চর্য তো! গুষ্টিসুদ্ধ লোক ইন্টারফেয়ার করবে আর যাদের বিয়ে তাদের মতামতের কোনও প্রয়োজন নেই!
এত কিছুর পর হিয়ার পক্ষে বসে থাকাটা সম্ভব হচ্ছিল না। এভাবে ওর ওপর সব চাপিয়ে দেওয়ার এরা কে?! মগের মুলুক নাকি! এসব ভাবনার মাঝে ছেলের বাবা ওকে অবাক করে দিয়ে বলল, ” আমাদের মেয়ে মোটামুটি পছন্দ। এবার দেনাপাওনার কথায় আসি। বেশী না, এই ধরুন লাখ সাতেক টাকা‌। এরপর আপনারা মেয়েকে যা খুশি দেবেন।”
বাবা কাঁচুমাচু মুখ নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মা বলে উঠল, “হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ সে তো দিতেই হবে, ও আমাদের একমাত্র মেয়ে বলে কথা! আপনাদের কি কি দাবি-দাওয়া আছে নিঃসঙ্কোচে বলুন-”

“দাঁড়াও মা আমার কয়েকটা কথা বলার আছে!”
“তোর আবার কি বলার আছে! যা ভেতরে যা-” মা ধমক দিল।
“বা রে! এতক্ষণ উনি প্রশ্ন করে গেলেন। এবার আমার পালা!ওনার আমাকে পছন্দ হলেই হল! আমার ওনাদেরকে পছন্দ হয়েছে কিনা সেটা দেখতে হবে না! আফ্টারঅল্ আমাকেই তো ওনাদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে হবে!”
“তোকে আমি ভেতরে যেতে বলেছি বুড়ি-”

“প্লিস মা! বিয়েটা যখন আমি করব আমাকে বুঝে নিতে দাও আগে!” ছেলের বাবার দিকে তাকিয়ে বলল হিয়া, “আমি জানতে চাই, আপনার ছেলে রান্না -বান্না পারে তো? অফিস ফেরত টায়ার্ড থাকলে ওকেই কিন্তু ম‍্যানেজ করতে হবে!”
“না মানে- আমি মানে- ,ঐ ডিমভাজা আর ম‍্যাগিটা-” ছেলেটা থতমত খেয়ে বলল। এটা তার মানে বোবা নয়! হিয়া ছেলেটার দিকে চাইল। এতক্ষণ তো বোঝাই যাচ্ছিল না যে ছেলে কথাও বলতে পারে! তবে ও বুঝল ছেলেটা হয়ত অতটাও খারাপ না। কিন্তু বাপের চাপ, কি করবে বেচারা! যাইহোক, এরকম মেরুদন্ডহীন সুপুরুষকে সহানুভূতি দেখানো যায়, কিন্তু বিয়ে করে সারাজীবনের জন‍্য গর্তে পড়া যায় না।

ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে লোকটা বলল,”ও ব‍্যাটাছেলে, ওর রান্না জানার কি দরকার! ওসব তো মেয়েদের কাজ ও করতে যাবে কেন!”

“কোন শাস্ত্রে লেখা আছে সেটা? নিজেদের অক্ষমতাকে ধামা চাপা দেওয়ার ভালো রাস্তা বের করেছেন তো! আপনি তো দেখছি মান্ধাতা আমলের লোক মশাই-”

“তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ মেয়ে-”
“দেখুন আমি চাকরি করি স্বনির্ভর হব বলে, চাকরি করার ইচ্ছে আছে বলে; শুধুমাত্র টাকা রোজগারের জন‍্য নয়! আর কেনই বা আমি নিজের সামর্থ্য থাকতে অন‍্যের কাছে হাত পাততে যাব বলতে পারেন! পড়াশোনা করেছি ঝি গিরি করব বলে তো নয়! আপনার ছেলেকে ছেড়ে দিতে রাজি কিন্তু চাকরিটা আমি কোনমতেই ছাড়ব না!”

“আপনার মেয়ে তো ভারী মুখরা! লজ্জা-শরমের মাথা খেয়েছে!”
“আর একটা কথা, গিটার ছাড়া তো দূর অস্ত; আমি তো ভাবছিলাম ব‍্যান্ড খুলব, চুল খুলে মাথা ঝাঁকিয়ে মাচায় গান করব। ভেবে দেখুন আপনার আবার আপত্তি নেই তো!”

“কি অসভ‍্য, জংলী মেয়েরে বাবা!”
“আরে সেটাই তো বলছি মশাই, আপনি কোষ্ঠীতে এত কিছু দেখেছেন আর এটা দেখেননি যে আমার সিংহ লগ্ন। স্বভাব আর মেজাজ দুটোই তাই সেরকমের। আপনার ছেলেকে রান্না-বান্না না শিখিয়ে, কোনো কিছুর প্রতিবাদ করতে না শিখিয়ে মৌনীবাবা করে রেখেছেন কিনা, তাই দেবগণ। আর আমি শিরদাঁড়াযুক্ত মানুষ তাই আমারটা নর! তবে আপনারটা মনে হচ্ছে রাক্ষস-”

“তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ!”
“সীমা তো আপনি ছাড়াচ্ছেন! পণ চাওয়ার অর্থ বোঝেন। পুলিশে কমপ্ল‍্যান করলে কি হবে জানেন সেটা! আর আপনার ছেলের বাজার দর মাত্র সাত লাখ! আপনি বরং এর চেয়ে ছেলে নিলামে তুলুন, না হলে বাজারে বসুন; বিক্রি করলে কিছু বেশী পেতে পারেন! এমনিতেও এত কম দামী ছেলে আমার অন্তত পোষাবে না!”

“বুড়ি, তুই থামবি এবার-” মায়ের চোখ কপালে।
“দাঁড়াও রমা, ওকে থামিয়ে লাভ নেই। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন; ” সম্পর্কের কোনো মূল‍্য হয় না,আর যারা এভাবে দরাদরি করে তাদের সাথে আমি কোনো সম্পর্ক তৈরী করতে চাই না। শুনুন আমি আপনাকে সাত লাখ টাকা এমনিই দিতে প্রস্তুত কিন্তু আমার মেয়েকে নয়! আমার মেয়ে শিক্ষিতা, স্বনির্ভর, দৃঢ়চেতা, স্বাধীন! এগুলো ওর গুণ। যদিও আপনার কাছে এগুলো বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, অসভ‍্যতামি মনে হতেই পারে। ও আমাদের ফেলনা নয়, বরং ওকে নিয়ে আমরা যথেষ্ট গর্বিত! বিয়ে দিতে হবে বলে দিচ্ছি, আপনি এটা ভাববেন না আপনি আমাকে উদ্ধার করছেন।শুধুমাত্র ছেলের বাবা বলে মাত্রা ছাড়ানো যে কথাগুলো বলে চলেছেন এতক্ষণ ধরে, সেগুলো আমরা ভদ্র-সম্ভ্রান্ত বাড়ির লোক বলেই শুনলাম। আপনাদের হয়ত অর্থের অভাব নেই, তবে প্রকৃত শিক্ষা-দীক্ষার বড়োই অভাব! এমন ঘরে তো আমরা মেয়ে দিতে পারি না! আপনি এবার আসতে পারেন! নমস্কার!”

কিছুক্ষণ পিন ড্রপ সাইলেন্স। হিয়া তো অবাক! ওর সো কল্ড ‘মাটির মানুষ’ বাপী এত কিছু শুনিয়ে দিতে পারে ও কোনদিন ভাবতেই পারেনি! ছেলের বাবা ছেলেকে নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল, ডোজটা একটু বেশীই হয়ে গেছে। মা সব দেখেশুনে ধপাস করে সোফার উপর বসে পড়ে বলল,

“ব‍্যাস! হয়ে গেল! যেমন বাপ তেমন বিটি। আমার হয়েছে যত্ত জ্বালা!”
“থলিটা দাও, বুড়ির ফেভারিট বিরিয়ানীটা নিয়ে আসি! রাত্রে বেশ জমিয়ে খাওয়া যাবে।”
“অ্যাঁ, বলি তোমার কি ভীমরতি হল নাকি! বিয়ে পাকা হয়নি যে সেলিব্রেট করবে, বলি বিয়েটা ভেঙেছে!”
“তার জন‍্যই তো! সেলিব্রেশন ফর ফ্রিডম্!”

“কিছু মনে কোরো না দাদা, তোমার আশকারা পেয়েই বুড়ির ডানা গজিয়েছে। দু’কলি পুঁথি আউড়ে বেশী উড়ছে! লঘু-গুরু জ্ঞান নেই কোনো!” পিসি আগুনে ঘি ঢালল।

“তা উড়ছে উড়ুক না। তোকেও তো কম চেষ্টা করিনি উড়তে শেখানোর জন্য, পারলি কই! ও যদি মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে উড়ান দেয়, দিক না!”

“আমার জন‍্য বিষ এনে দিও একটু! বাপ-বিটির রঙ্গ দেখে আর বাঁচিনে বাপু।” মা রাগে গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেল। পিসিও মুখে কুলুপ এঁটে পিছু নিল।

মা চলে যেতেই বাপী বলল, “চাপ নিস না! ভারী পছন্দ হয়েছিল মনে হয় হবু বেয়াইকে। সে অবশ‍্যি চিংড়ির চপও তোর মায়ের ভারী পছন্দের! কম দিন তো ম‍্যানেজ করিনি ওটা ঘুষ দিয়ে!”

হিয়া ফিক করে হেসে বলল, “উফ্ বাপী! তুমি না পুরো ঘ‍্যামা!”

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত