শেষ ইচ্ছা

শেষ ইচ্ছা

আজ আমি খুব ভোরে ওঠেছি,ভোর সাতটা… চোখ গোল্লা করে কি তাকাচ্ছেন মশাই? ওটা আমার কাছে ভোরই,আমি মূলত আটটাই উঠি, আমার শাশুড়ি মাও আটটাই ওঠে… উঠে প্রাপ্তি বলতে শ্বশুরের হাতে চা | ওহ! জাস্ট অমৃত তারপর আমি মামনির সাথে কাজে হেল্প করি ,যদিও মামনি কিছু করতে দেয় না | এই আমার চার আঙ্গুল কপাল দেখে ঈর্ষান্বিত হবেন না যেন,নাহলে নজর লেগে যাবে…

সত্যি ভাগ্য করে এমন কপাল হয় তারপর আমার শিবের মতো বর ,ওর কথা কি আর বলবো দেখছেন আমার নামই বলা হয়নি ,আমি সৃজা ,আর আজ আমার ভোরে ওঠার কারণ হলো আজ ভাইফোঁটা | বিয়ের পর প্রথম ভাইফোঁটা আমার |মূলত আমি একা,তা হলে কি হবে আমার কাকার ছেলে আছে ,আমার ভাই,পিসির ছেলে আছে ,তাছাড়া আমার পাড়ার পাঁচজন দাদা-ভাই ওরাও আমার নিজের চেয়ে কোনো অংশে কম না | আজ সবাই কে এক জায়গায় ফোঁটা দেব ,আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে ,আমার নতুন স্ক্যুটি নিয়ে আজ বাড়ি যাবো,ওটাই আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে ….

এখন সকাল দশটা,আমি স্নান সেরে রেডি হয়ে আমার বাহনে স্টার্ট দিলাম ,অনি (আমার স্বামী ) জিগ্যেস করলো
” তুমি যেতে পারবে তো ? না আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো?”

” না,না আমি একাই যাবো ” বলে বেশ হামবড়া দেখলাম |
শাশুড়ি মা কপালে হাত ঠেকিয়ে বললো
“দুগ্গা দুগ্গা,সাবধানে গাড়ি চালাস ”

” জো আজ্ঞা সাসুমা ” বলে উঠে পড়লাম আমার বাহনে | আবার দাঁড়ালাম ,চিৎকার করে মামনি কে ডাকলাম ..
” কি হলো রে?”

“মামনি আমি খাবারের ব্যাগটা নিতে ভুলে গেছি ” ঠোঁট কামড়ে বললাম আমি |

” তোর যে বুদ্ধি শুদ্ধি কবে হবে কি জানি , নে ধর” বলে ব্যাগটা দিলো |
আসলে আমার মাতৃ দেবী ,ওনার ভাই -দাদাদের ফোঁটা দিতে মামারবাড়ি গেছেন , তাই সমস্ত খাবার আমি করে নিয়ে যাচ্ছি ,আর চাবি তো আমার কাছেই থাকে,সো নো প্রব্লেম | আবার চলতে শুরু করলাম ,হওয়াই আমার চুল উড়ছে , নিজেকে তো হিরোইন হিরোইন ফিল হচ্ছে | আজ বন্ধুদের ও গাড়িটা দেখতে হবে ,উফফ কি যে মজা হচ্ছে |

বাপারে এখানে আবার বা দিকে টার্ন নিতে হবে,টার্ন নিতে গেলেই আমার হাত কাঁপে,তারপর
বড় রাস্তায় উঠবো | আমার চালানো দেখে যে কেও বলে দেবে আমি শিক্ষানবীশ,আর ভাবখানা এমন দেখাচ্ছি যে কত্ত ভালো জানি ,ভাবতেই নিজেরই হাসি পেল..

উল্টোদিক থেকে একটা ট্র্যাক আসছে ,দেখেই তো হাত পা কাঁপছে ,বাবা! আমি একটু স্পিড কমায়….

উফফ! ফাইনালি আমি ঘরে এসে পৌছালাম | ￰পাশেরবাড়ি বড়দা কুয়োতে স্নান করছে ,আমি ডাকলাম আমার দিকে ফিরেও তাকালো না,শুনতেই পাই নি মনে হয় |￶যাকগে আমিও তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে ভাইফোঁটার থালা সাজাতে উদ্যত হলাম ,চন্দন বাটলাম ,দূর্বা তুলতে বাইরে যেতে হল | দেখি বাইরে কাকিমাদের জটলা,কি সব বলাবলি করছে …আমি জিগ্যেস করলাম ,আমাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না | পাড়াতুতো আরেক কাকিমা বলে উঠলো “কি ভালো ছিল ,অকালে চলে যাবে কে জানতো?”

কি হয়েছে,কেও মারা গেছে নাকি ,কৈ আমি তো দেখলাম না | ￶মেজদা বলে উঠলো ” কি হয়ে গেলো কাকিমা, বডিটা এখনো রাস্তায়..পুলিশ এলে তারপর তুলবে ” বলে গাড়ি স্টার্ট দিলো |

ইসস! আজকের দিনে কোনো ছেলে হয়তো ফোঁটা নিতে যাচ্ছিলো ,তার আগেই সব শেষ ..আহা! একজন মায়ের কোল ফাঁকা হলো | আমি এই সব ভাবতে ভাবতে দেখি মেজদা চলে গেলো ..
” ওরে দাঁড়া আমিও যাবো” বলে আমিও ছুটলাম |

বাপরে কত ভীড়,লোকে লোকারণ্য ..আমিও ভীড় সরিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলাম ..লুচি,ঘুগনি ,মালপোয়া ,মিষ্টি খাবার গুলো রাস্তার ￶চারিদিকে ছেটানো |

ও মা! অনিও এসেছে ? দেখেছো আমি ঠিক এসেছি কিনা তাই দেখতে চলে এসেছে,আর এখন আমার কাছে না গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে ? দেখাচ্ছি মজা ..ডাকলাম ওকে,এত চিৎকারে শুনতেই পেলো না | আমি যায় ওর কাছে ,সামনের
দৃশ্য দেখে তো আমার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ,কে পড়ে আছে রাস্তায়??

ওটা আমি তো…এই তো আমার ব্যাগ.. বিশ্বাস করুন ওটা আমিই | এই তো আমার স্ক্যুটি,আমার মুখের কি বিভৎস্য অবস্থা? যেই পায়ের আঙ্গুল গুলোকে আমি সন্তানসম পালন করতাম ,সেগুলোর দেহ থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে দূরে পড়ে আছে | এবার সব মনে পড়লো আমার,ওই ট্র্যাকটা আমাকে পিষে চলে গেছে ,আমার আত্মা গিয়েছিলো বাড়ি ..
ওই যে আমার সুন্দর দেহ,আর আমি এখন শুধুই আত্মা… আমার মায়ের কি হবে, আমি ছাড়া তো মায়ের আর কেও নেই..আমার অনি কি নিয়ে বাঁচবে ? ?

সারাদিন আমার দেহটাকে নিয়ে টানা হিঁচড়া হল,পোস্ট মোর্টেন্ট হবে শুনে তো শিউরে উঠলাম,যে মেয়েটা ইঞ্জেকশন কে ভয় পেতো,সে আজ হাতুড়ির আঘাত সহ্য করে নিলো …মায়ের অবস্থা সহ্য করতে পারছিনা,বারবার সেন্স লেস হচ্ছে আর কাঁদছে …

” মা গো ” বলে শেষ বারের মতো জড়িয়ে ধরলাম | মায়ের কান্না থেমে গেল,তবে কি আমার আমাকে অনুভব করতে পারলো ?

“আছে আছে আমার শ্রীজু আছে” বলে চিৎকার করে উঠলো | আমার লাশটাকে নিয়ে চললো স্মশানে, শববাহী গাড়িতে উঠলো অনি আর আমার সব ভাই-দাদারা | আমার ছিন্নবিছিন্ন লাশটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে চোখের জল ￶ফেলছে অনি,আমি যে ওর পাশে সেদিকে ভুক্ষেপ নেই..আর একটু পর আমাকে মানে আমার মৃত দেহটাকে চুল্লিতে ঢোকাবে ,মুখে আগুন দেবে অনিই,একটু পর আমার সাধের শরীর জ্বলে খাক হবে | অনিকে শেষবারের মত জড়িয়ে ধরলাম ,অনি ও এদিক ওদিক তাকালো ,কি জানি আমার অস্তিত্ব বুঝতে পারলো কি ? একটুপরে আমি পরলোকের আভিমুখে যাত্রা করবো ,আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ হবে কি ?? আমার শরীর ঢুকে গেলো চুল্লির মধ্যে,একি এবার আমারো খুব কষ্ট হচ্ছে ,আর থাকতে পারছিনা এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতেই হলো |

 

সবাই সৎকার করে ঘরে ফিরলো ,দাদা-ভাইরা একে ওপরের দিকে তাকিয়ে আটকে উঠলো ,কপালে চন্দনের সবার ফোঁটা | সবাই বলাবলি করতে লাগলো কি করে ওটা এলো,তবে কি ￶সৃজা?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত