সন্দেহ

সন্দেহ

—-বলি তোমার বাবার জ্বালায় তো লোকসমাজে কান পাততে পারছিনা।এই বয়সে মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন।ছি! ছি!…..টিভি দেখতে ব্যস্ত অনিকেত স্ত্রী মিতালির কথায় একটু বিরক্ত হয়েই….
—-কি হয়েছে একটু বলবে প্লীজ?

—–কি আর বলবো!আজ শপিং মলে মিসেস দত্ত আর মিসেস রায় এর সঙ্গে দেখা।তোমার বাবার সম্পর্কে যা নয় তাই বললেন জানো…
——সেকি! কি বললেন?আর তুমিও শুনে চলে এলে?

——তা আমি কি করতাম?ওনারা মিথ্যা তো কিছু বলেননি।এই বয়সে তোমার বাবা নাকি ওই নোংরা মেয়েটা….ওই সন্ধ্যা না কি একটা নাম, তার কাছে রোজ যায়।এর আগেও শুনেছিলাম কিন্তু পাত্তা দিই নি জানো…..কিন্তু যা রটে তা কিছুটা তো বটে।কি করে অবিশ্বাস করি বল তো?তাই তো বলি রোজ বিকাল হলেই বাইরে যাবার এত তারা কিসের ওনার।আচ্ছা বাড়ির মান-সম্মানের কথাটা উনি একবার ও ভাবলেন না আর পাপান, ওর কথাটাও তো একটু ভাবতে পারতেন।ওর বন্ধু-বান্ধবরা এসব জানতে পারলে ও আর কারোর কাছে মুখ দেখাতে পারবে?
—– নাহঃ! বাবা সত্যি খুব বাড়াবাড়ি করছেন, এবার কথা বলতেই হবে দেখছি।

অনিকেতের বাবা অঞ্জন সেন।একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়াই ছিল তাঁরএকমত ব্রত।কোনদিন কোনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি।পাঁচ বছর হল স্ত্রীকে হারিয়ে বড়ই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।

আজ থেকে তিনবছর আগের কথা।অঞ্জনবাবু গিয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধু বিজন দত্তের বাড়ি।তখন রাত আটটা হবে।বিজনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অটো ধরবেন বলে দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার মোড়ে।হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় রাস্তায় লোকজন একটু কম ই ছিল।হঠাৎ ই চোখে পড়লো একটি মেয়ে কত আর বয়স হবে সাতাশ-আঠাশ,ভিজে শাড়িতে দাঁড়িয়ে -দাঁড়িয়ে কাঁপছে।মেয়েটার মুখের দিকে চোখ পড়তেই অঞ্জনবাবুর মনে হলো মেয়েটি তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে, হয়তো কিছু বলতে চায়।কেমন যেন করুণ মুখখানা।

—– কিছু বলবে?এত বৃষ্টিতে ছাতা না নিয়ে বেরিয়েছে কেন?
—– হ্যাঁ বাবু! আসলে আমার মেয়ের কাল রাত থেকে খুব জ্বর।পয়সার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারিনি।এখন বেড়িয়েছি কোনো ওষুধের দোকান থেকে যদি একটু ওষুধ জোগাড় করা যায় তাই।না হলে যে মেয়েটা আর বাঁচবেনা বাবু…..

বলেই কেঁদে ফেলল মেয়েটি।
—– কোথায় থাকো তুমি?
—– আমার নাম সন্ধ্যা বাবু, থাকি এই সামনেই নয়া বস্তিতে।
কোনো মা নিশ্চয় তার সন্তানের নামে মিথ্যে বলতে পারেনা।এই ভেবে পকেট থেকে একটা পাঁচ শ টাকার নোট বার করে মেয়েটির হাতে দিয়ে বললেন,
—– এই নাও মেয়েকে এই টাকাটা দিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে নিও।
—– আমি চিরঋণী হয়ে থাকলাম বাবু আপনার কাছে।
এই বলে চোখের জল মুছে একরকম ছুটেই চলে গেল মেয়েটি।অঞ্জনবাবুও বাড়ি ফিরে এলেন।মনে মনে একবার বললেন, “ভগবান বাচ্চাটি যেন সুস্থ হয়ে যায়”।

দু মাস পর :

একদিন বিজনের ফোন।
—— কি হে ! অঞ্জন তুমি তো এ পথ ভুলেই গেছ! তা একদিন এসো আবার একটু জমিয়ে আড্ডা মারি।
—— আচ্ছা যাবো একদিন

—— না যাবো বললে তো হবেনা।এই রবিবার ই আসতে হবে।গিন্নিকে বলেছি জমিয়ে মাংস রাঁধতে একেবারে ডিনার করে ফিরবে।কি?আসবে তো?
—— আচ্ছা ঠিক আছে।যাবো।
বিজনের কথামত রবিবার অঞ্জনবাবু গেলেন।সারা সন্ধ্যা জমিয়ে আড্ডা দিয়ে, ডিনার সেরে ফিরতে একটু রাত ই হল।তা প্রায় সাড়ে ন টা হবে।অটো ধরবেন বলে দাঁড়িয়ে আছেন।এমন সময়….
—— বাবু! ভালো আছেন বাবু?
অঞ্জনের চিনতে অসুবিধা হলনা সন্ধ্যাকে।

——- আরে তুমি? তোমার মেয়ে ঠিক আছে তো?
——-( একগাল হেসে)হ্যাঁ বাবু! এখন ভালো আছে।আপনি না থাকলে সেদিন বাঁচাতে পারতাম না মেয়েটাকে।কি বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে….

—– আরে ঠিক আছে ,এত ধন্যবাদ জানাতে হবে না।
—– একটা অনুরোধ রাখবেন বাবু?
—— কি বল?
—— আমার বাড়ি এই কাছেই একবার যদি আসেন…..
—— আজ তো অনেক দেরি হয়ে গেছে অন্য একদিন না হয়—-
—— পাঁচ মিনিটের জন্য আসুন না বাবু, আমার মেয়েটাকে একটু আশীর্বাদ করে যাবেন……
—– আচ্ছা চল….

খুব খুশি হয়ে সন্ধ্যা অঞ্জনবাবুকে নিয়ে গেল নিজের বাড়ি।বস্তির মধ্যে এক টা টালির চালের ছোট্ট ঘর।চারিদিকে দৈন্যতার ছাপ স্পষ্ট অথচ কি পরিপাটি।বাচ্চাটির বয়স বছর সাতেক হবে।কাছে ডাকতেই এসে প্রনাম করে বলল,

“তোমার কথা মার কাছে শুনেছি দাদু”।
—– কি নাম তোমার?
—– রোশনি।
বাচ্চাটিকে দেখেই কেমন যেন মায়া পরে গেল অঞ্জনবাবুর।আর তারপর থেকেই এই নয়া বস্তিতে সন্ধ্যার ঘরে আসা-যাওয়া শুরু হয় ওনার।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় খুব ছোট বয়সেই বাবা বিয়ে দিয়েছিল সন্ধ্যার ।স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করত।কিন্তু বিয়ে সুখের হয়নি সন্ধ্যার।স্বামী আর শাশুড়ি অকথ্য অত্যাচার করতো ওর ওপর ।বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য জোর করতো।তারপর সন্ধ্যা জন্ম দেয় কন্যাসন্তানের।আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিল রোশনি।ভেবেছিল, নামের মত মেয়ের সারাজীবন ভরে থাকবে আলোয়।কিন্তু তা আর হলনা। মেয়ে হওয়ার জন্য অত্যাচারের মাত্রা বাড়লো।অনেকসময় অন্য পুরুষদের ও রাতে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হত শুধুমাত্র টাকার লোভে।একসময় অতিষ্ট হয়ে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে পরে সন্ধ্যা।এসে ওঠে এই নয়াবস্তিতে।যেখানে অনেক মহিলাই নিজেদের শরীরের বিনিময়ে অর্থ রোজগার করে।তাই হয়তো অনেকেই ভাবে সন্ধ্যা ও সেরকম ই কিছু করে।কিন্তু না পা ড়ার এক দিদির কাছে সেলাই শিখেছিল সে।একটা দর্জির দোকানে কাজ পেয়েছিল ওই থেকেই চলত মা-মেয়ের পেট কোনোক্রমে।কিন্তু বিধাতার বোধহয় তাতেও আপত্তি ছিল।মালিকের কুনজর পড়ায় সে কাজ ও গেল।এখন প্রায় অনাহারে দিন কাটে দুজনের।এরই মধ্যে মেয়ের জ্বর।আর তখনই দেবদূতের মতো ওদের জীবনে এসেছিলেন অঞ্জনবাবু।

—— কি ব্যাপার বলতো, এত রাত হয়ে গেল, বাবা তো এখনও ফিরলেন না? এবার থেকে কি সন্ধ্যার বাড়িতে রাত ও কাটাবেন উনি?ছি!ছি!

—— সত্যি আজ কথা বলতেই হবে বাবার সঙ্গে।এভাবে চলতে পারেনা…..
হঠাৎ এ কলিংবেল টা বেজে উঠল।
—– ওই বোধ হয় ফিরলেন,দাঁড়াও দেখছি।অনিকেত তারাতারি এদিকে এসো একবার, দেখো কি কান্ড!
—– কি হয়েছেটা কি?আরে বাবা, কি হয়েছে তোমার?
অঞ্জনবাবু তখন ভালো করে দাঁড়াতে পারছেন না ওনাকে ধরে আছে একটি মেয়ে আর একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক।
—— আপনারা করা?(জিগেস করলো মিতালি)
মেয়েটি বলল “বলছি, আগে ওনাকে বসান”
—— আমি সন্ধ্যা আর উনি আমার পাড়াতেই থাকেন।
—— ও তুমিই তারমানে সেই মেয়ে যার কাছে বাবা রোজ…
কি চাও তুমি? তোমার লজ্জা করলো না এখানে আসতে?
—— হ্যাঁ! আপনি ঠিকই শুনেছেন, আমিই সেই মেয়ে আর উনি আমার আর আমাদের পুরো বস্তির ভগবান।
—— মানে?

——- আমি ওনাকে বাবা বলে ডাকি আর আমার মেয়ে দাদু।উনি আমাদের দুজনকেই বড় স্নেহ করেন।রোজ সন্ধ্যায় আমাদের বস্তির বাচ্চাদের আর মহিলাদের উনি পড়ান।ওনার চেষ্টাতেই আমি একটা হোমে সেলাই শেখাবার কাজ পেয়েছি, আমার মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে।আজও গিয়েছিলেন বস্তিতে পড়াতে।ফেরার সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে যান। পায়েও চোট পেয়েছেন অল্প।তাই আমরা ওনাকে নিয়ে এসেছি।
পরদিন সকালে বাবার ঘরে এসে দাঁড়ায় অনিকেত সঙ্গে মিতালিও।

—— বাবা আমাদের ক্ষমা করে দাও প্লীজ, তোমার সম্পর্কে কত কিই না ভেবেছিলাম।তোমার যদি কখনো কোনো রকম সাহায্যের প্রয়োজন হয় বোলো প্লীজ… এই মহৎ কাজে আমিও তোমার পাশে থাকতে চাই।

—— নিশ্চই বলবো অনি।

আজ বড় আনন্দের দিন অঞ্জনবাবুর। নিজের সন্তানকে পাশে পেলে অনেক কঠিন কাজ ও সহজ মনে হয়।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত