ভাই বোন

ভাই বোন

বাইরে রফিক দাঁড়িয়ে আছে। আবিরকে কলেজে যেতে হবে। কিন্তু পকেট পুরো ফাঁকা। কয়েকদিন আগেই আবিরের বাবা আবিরকে পকেট খরচের টাকা দিয়েছে। এখন যদি আবির তার বাবার কাছে আবার টাকা চায় তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাবে কে?
কিন্তু আবির ফাঁকা পকেটে ঘর হতে কিছুতেই বের হবে না। এখন তার টাকার শেষ উপায় হচ্ছে রামিসা। রামিসা আবিরের বড় বোন। আবির টাকা চাওয়ার উদ্দেশ্যে রামিসার ঘরের দরজায় নক করলো।

— আপু আসবো?
— আবির সাহেব নাকি? আসেন আসেন। আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে আমার কাছে টাকা নেই। টাকা লাগলে আব্বুর কাছে চলে যান। আমি অফিসের জন্য রেডি হচ্ছি। ডিস্টার্ব করবি না।
— আপু তুই বেশি বুঝিস কেন? আমি তোর কাছে টাকা চেয়েছি এখন?
— তাহলে আমার কাছে কি চাস?
— ওমা ভাই বোনের কাছে শুধু টাকা চাইতেই আসে? এমনি আসতে পারে না?
— পারে তবে আমার জানামতে তুই পারিস না। যাহ ভাগ।

রামিসা পার্স নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। রামিসার পেছন পেছন আবিরও বের হলো।

— কিরে পেছন পেছন আসছিস কেন?
— আপু এক হাজার টাকা দে। দেখ পকেট একেবারে ফাঁকা।
— আমার কাছে টাকা নেই। আব্বুর কাছে যা।
— আব্বু যদি জানে পাঁচদিনে দুইহাজার শেষ করে ফেলছি তাহলে আমার পিঠের ছাল উঠিয়ে আমসত্ব বানাবে।
— আই লাভ আমসত্ব। কানের কাছে প্যানপ্যান করবি না। টাকা দিতে পারবো না।

আবির যখন দেখলো সোজা আঙ্গু্লে ঘি উঠছে না তখন আবির অন্য পন্থা অবলম্বন করলো।

— আপু কালকে তোকে দেখলাম রাফসান ভাইয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে বসে আইসক্রীম খেতে। তোদের দুজনকে কিন্তু ভালই মানিয়েছে। এই দেখ তোদের একটা ছবিও তুলে এনেছি।

আবির তার বিখ্যাত শয়তানি হাসি দিয়ে রামিসার দিকে তার মোবাইল বাড়িয়ে দিল। রামিসা বেশ অবাক হয়ে আবিরের কাছ থেকে মোবাইল নিল। হ্যা রাফসান আর রামিসার ছবিই বটে। তারা একে অপরের হাত ধরে একে অপরের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

— তুই এই ছবি কখন তুললি? তুই ওই রেস্টুরেন্টে কি করছিলি?
— আর বলিস না আপু। আদ্দিনাকে চিনিস না? ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম আরকি। শালী আমার পুরো একহাজার টাকা খসিয়ে ছেড়েছে। এখন কথা কম বলে দুই হাজার টাকা ছাড়। রফিক বারবার মিসডকল দিচ্ছে।
— কিহ দুইহাজার টাকা? একটু আগে না একহাজার বললি?
— আরে বুঝিস না কেন? তখন তো অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে নেমেছিলাম। ভেবেছিলাম অস্ত্র ছাড়াই কেল্লা ফতে করতে পারবো। কিন্তু এখন তো অস্ত্র বের করতে হলো। তাই খরচ বেশি, দাবিও বেশি। তাড়াতাড়ি টাকা ছাড়।

রামিসা অগ্নিদৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে পার্স থেকে একহাজার টাকা বের করে আবিরকে বললো,

— দেখ ভাই আমার কাছে একহাজার টাকাই আছে। এর বেশি দিতে পারবো না।

আবির রামিসার হাত থেকে টাকাটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। তারপর হাসতে হাসতে বললো,

— বড় বোন হয়েছিস বলে একহাজার টাকা সেক্রিফাইস করলাম। বেতন পাওয়ার সাথে সাথে একহাজার টাকা দিবি। নয়তো এই ছবি আব্বুর ইনবক্সে চলে যাবে ।

আবির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। রামিসা আবিরের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অফিসে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
রাত নয়টায় আবির বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া শেষে বাসায় এসে কলিংবেল বাজাতে লাগলো। একটু পর রামিসা দরজা খুলে দিল।
আবির ঘরে ঢুকতেই যাচ্ছিল এমন সময় রামিসা বলে উঠলো,

— দাঁড়া আবির ঘরে ঢুকবি না।
— কেন ঘরে ঢুকবো না কেন?

রামিসা কোন কথা না বলে আবিরের শরীর শুঁকতে শুরু করলো। আবির লাফিয়ে দুই হাত পিছিয়ে গেল।

— কিরে এমনভাবে কি শুঁকছিস?
— আবির তুই আজকে সিগারেট খেয়ে এসেছিস?
— সসসসসস আপু আস্তে বল। আব্বু শুনবে তো।
— আব্বু শুনবে মানে কি? তোকে তো এখন কান ধরে আব্বুর কাছে নিয়ে যাবো।

এই কথা বলেই রামিসা আবিরের শার্টের কলার চেপে ধরলো। আবির আৎকে উঠলো।

— আপু তোর পায়ে পড়ি। আব্বু জানতে পারলে একেবারে লবন মরিচ ছাড়া কাঁচা খেয়ে ফেলবে।
— তোকে খেয়ে ফেললে তো আমারই ভাল। চল চল আব্বুর কাছে চল।
— আপু ছেড়ে দে প্লীজ। আমি না তোর ছোট ভাই?
— এহ আসছে ছোট ভাই। সকালবেলা ব্ল্যাকমেইল করে যেই টাকাটা নিলি সেটা ফেরত দে। তাহলে আজকে বেঁচে যেতে পারিস।
— আপু টাকা তো খরচ করে ফেলছি।
— কি বললি একহাজার টাকা একদিনে শেষ? এখন তো তোকে আব্বুর কাছে নিয়ে যাওয়া ফরজ। চল চল তাড়াতাড়ি চল।
— আপু দাঁড়া, এই নে পাঁচশ টাকা আছে। প্লীজ এবারের মত ছেড়ে দে।

আবিরের হাত থেকে ছোঁ মেরে রামিসা টাকাটা নিয়ে নিল। তারপর বাংলা ছবির ভিলেনদের মত হাসি দিয়ে বললো,

— হা হা হা, আমার সাথে বিটলামি করবি আর? আর টাকা চাইবি আমার কাছে?
— নাহ আপু।
— তাহলে যা। সোজা গোসলখানায় ঢুকবি। তারপর সোজা খাবার টেবিলে আসবি। যদি দেখি মোবাইল হাতে নিয়েছিস তাহলে….!

রামিসার কথামত আবির গোসল করে খাবার টেবিলে বসলো। রামিসা আবিরকে খাবার দিতে দিতে বললো,

— কিরে পড়ালেখা কেমন চলে?
— এইতো ভালই চলে। মাঝে মাঝে উসাইন বোল্টের মত দৌড়ায়। তখন আর ধরতে পারি না।
— আবার বিটলামি করিস? আব্বুকে ডাক দেই? আব্বু একটু এদিকে আসবা?
— আপু কি করছিস? এভাবে নিজের ছোটভাইয়ের সাথে কেউ এমন করে?
— আমি করি। হা হা হা….!

রামিসার ডাকে আব্বু চলে আসলো। তিনি এসেই আবিরের কান টেনে ধরলেন।

— কিরে হারামজাদা বড় বোনটারে একটু শান্তি দিবিনা?
— অ্যা আমি আবার কি করলাম? উফ ব্যাথা লাগে তো।
— কি করেছিস মানে? তোরে বিকেলে এতগুলো ফোন দিলাম তুই ফোন ধরলি না কেন?
— মা.মা.মানে আব্বু খেলছিলাম তো তাই।

আবিরের আব্বু আবিরের কান ছেড়ে রামিসার দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় বললো,

— ডেকেছিস কেন মা?
— আব্বু তুমি ঔষধ খাইছো? প্রত্যেকদিন মনে করিয়ে দিতে হয়? এইখানে বসো। আমি ঔষধ নিয়ে আসছি।

রামিসার কথায় আবির হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে ভেবেছিল হয়তো রামিসা আব্বুকে সিগারেট খাওয়ার কথা বলে দিবে। আবির আর কোন কথা না বাড়িয়ে খেয়ে উঠে গেল। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে মোবাইলে গেমস খেলতে শুরু করলো।
হঠাৎ রামিসা বিদ্যুৎবেগে ঘরে ঢুকলো। তারপর আবিরের কাছে গিয়ে বললো,

— আবির একটু বাইরে যাবি?
— কেন বাইরে যাবো কেন?
— আমার মোবাইলে একশো টাকা ফ্ল্যাক্সি করা লাগবে। একটু যা ভাই।
— এহ পারবো না। আমার ঘুম আসছে।
— কাজের কথা বললাম আর ওমনি ঘুম আসছে? ভাই আমার ভালো যা প্লীজ।
— এতরাতে মোবাইলে কার সাথে কথা বলবি তুই?
— অফিসের একটা কাজে কথা বলতে হবে।
— হুম অফিসের কাজ নাকি অন্যকিছু তা বুঝি। দে টাকা দে। একটু শান্তিতে থাকতে পারি না।

আবির বেরিয়ে গেল। রামিসা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আবিরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো। মা মরা এই ভাইটাকে সে কতটা ভালবাসে তা শুধু আল্লাহ জানে। তার ভাইটা যেন সবসময় এমন দুষ্টুমি করে তার সাথে। এই দুষ্টুমির মাঝেও লুকিয়ে থাকে আনন্দ।
কিছুক্ষন পর আবির ফিরলো। তার হাতে একবাটি ভ্যানিলা আইসক্রিম। রামিসার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস এই আইসক্রিম।

— কিরে আবির এই আইসক্রিম কার জন্য এনেছিস?
— তোর জন্য এনেছি আপু।
— কি সত্যিই আমার জন্য এনেছিস? তুই কত্তো ভালো।
— এতো লাফানো লাগবে না। এখান থেকে একটুখানি খাবি তুই আর বাকিটা আমার। দাঁড়া আমি ভাগ করে দেবো। তুই হাত দিবি না।

এই কথা বলে আবির একটা বাটি নিয়ে এলো। যদিও রামিসাকে একটু দেওয়ার কথা ছিল তারপরেও ঠিকই অর্ধেক রামিসাকে দিল আবির। তারপর দুই ভাই বোন মিলে মজা করে আইসক্রীম খেতে লাগলো।

— আপু আব্বুকে দিবি একটু?
— খবরদার এই কথা বলবি না। এই শীতে আইসক্রীম খেলে নির্ঘাত শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাবে আব্বুর।
— শ্বাসকষ্ট না ছাই, নিজের ভাগে কম পড়বে তাই আব্বুকে দিতে চাচ্ছিস না। রাক্ষুসী কোথাকার।
— কি বললি? তবে রে বাঁদর দাঁড়া।

একথা বলেই রামিসা আবিরকে ধরতে এগিয়ে এলো। আর আবির এক দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিল। কিছুক্ষন পর রামিসা আবিরের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ঘরের দরজা খোলা। রামিসা ভেতরে ঢুকে দেখলো আবির হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। কি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে আবিরকে।
রামিসা মশারি টানিয়ে দিল। তারপর যখন চলে আসার জন্য পা বাড়ালো তখন ঘুম জড়ানো কন্ঠে আবির রামিসাকে ডেকে উঠলো।

— আপু!
— কিছু বলবি আবির?
— আই লাভ ইউ আপু।

রামিসা কিছু না বলে মুচকি হেসে আবার আবিরের কাছে গেল। তারপর আবিরের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

— আপুকে কত ভালবাসিস জানি। এখন ঘুমিয়ে পড়।

রাতে ঘুমানোর আগে রামিসা অনেক্ষন কাঁদলো। রাফসানের সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কিভাবে রামিসা এই পাগল ভাইটাকে ফেলে অন্যের বাড়ি যাবে? আবির কি থাকতে পারবে রামিসাকে ছাড়া? কে এই পাগলটার দেখাশোনা করবে?

সকালে একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙ্গলো আবিরের। রামিসা এবং তার আব্বু কেউ বাসায় নেই। তাই হাতমুখ ধুয়ে আবির খাবার টেবিলে গেল। নাস্তা রাখা আছে টেবিলে, তাই খেতে লাগলো আবির। হঠাৎ টেবিলের উপর একটা ছোট খামের মত কি যেন দেখতে পেল আবির। আবির খাম হাতে নিয়ে খুলে দেখলো।
ভেতরে দুইহাজার টাকা আর একটা ছোট্ট চিরকুট রাখা আছে। নিশ্চয়ই এটা রামিসার কাজ। আবির চিরকুট পড়তে লাগলো,

— আই লাভ ইউ টু আমার ভাইটা। এই দুইহাজার টাকা দিলাম পকেট খরচের জন্য। আগামী দশদিন টাকা চাইবি না। নাস্তা খেয়ে প্ল্যাট ধুয়ে রাখবি। এসে যদি দেখি ঘরের সব উল্টাপাল্টা তাহলে পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে দেব।

আবির চিরকুট পড়ে মৃদু হাসলো। তারপর টাকাটা পকেটে রেখে নাস্তা খাওয়ার মনযোগ দিল।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত