অন্যরকম প্রাপ্তির দিন

অন্যরকম প্রাপ্তির দিন

লোকে দিন খারাপ গেলে বলে কার মুখ দেখে যে ঘুম থেকে উঠেছি? আমার আবার সেই বালাই নেই। ব্যাচেলর মানুষ আমি, তাই বাথরুমের আয়নায় রোজ নিজের মুখই আগে দেখতে হয়। কোন কোন দিন কেন যেন শুরু হয় যাবতীয় ঝামেলা দিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন কলে পানি নেই নয়তো টয়লেটের ফ্ল্যাশ কাজ করছে না।

কোনরকমে প্রাতঃকাজ সেরে বের হয়ে দেখবেন হয় বুয়া আজ আসবে না নয়তো চুলায় গ্যাস নেই। পাশের হোটেলে কোনরকমে খেয়ে পেটের উপরিভাগের জ্বলুনি উপেক্ষা করে বাসের লাইনে দাঁড়াতে আসতে আসতেই দেখা যাবে সেই বাস মাত্রই গেলো। পরেরটা যে কখন আসবে আল্লাহ মালুম। আমার আজ ছিল ঠিক সেরকম একটা দিন। প্রতিকাজে ঝামেলা দিয়ে সকাল শুরু হয়েছে। সারাদিন যে কেমন যাবে আল্লাহ জানে।

জ্যাম ঠেলে দৌড়ে হাঁচড়ে পাঁচড়ে যখন অফিসে পৌঁছালাম তখন দেখি সদর দরজায় বস দাঁড়ানো। পাঁচ মিনিটের দেরীর জন্য যা না তা শুনে ফেললাম। অফিসে একজন আগুন সুন্দরী আছে যাকে দেখলে কেমন যেন বুকের ভেতর হঠাৎ করে একটা বিট মিস হয়। পুরোপুরি সেই কিশোরবেলার মতো। সে আমার টেবিলে কোন কাজ নিয়ে এলে যেই আমতা আমতা শুরু হয়ে যায় আমার সে বুঝি নির্দ্ধিধায় সেসময় আমার মনের ভেতর পড়ে ফেলে হাসতে থাকে। বকা খেয়ে প্রথম চোখটা তাই তার ডেস্কেই যায়। আমার এহেন দূর্ভাগ্যে তার মুখে মিটিমিটি হাসিতে আরো একবার মনে হলো নারী জাতি আসলেই বড় নিষ্ঠুর।

আমার অফিসের বস লোকটা একেকদিন একেকজনের ওপর চড়াও হন। বোধকরি সব বসরাই এমন হন। সে যাই হোক আজ যেহেতু আমি ধরা খেয়েছি সারাদিনভর যত ভুলভাল ফাইল একের পর এক আমার ঘাড়ে পরলো। নিয়মমাফিক এক ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেক থাকলেও দশ মিনিটে কোনরকমে নাকে মুখে খাবার গুঁজে আবার কাজ শুরু করেছি, তাও যদি বস খুশী হন খানিকটা। তার ওপর আজকে আবার বেতন পাওয়ার দিন। সারাদিন শেষে একাউন্টসে বেতনের সাইন করতে গিয়ে শুনি কি যেন ঝামেলা হয়েছে তিনদিনের আগে কোন বেতন হবেনা। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। একটা ভালো খবর নেই সারাদিনে।

সারাদিনভর ক্লান্তিশেষে বাসে বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পরেছিলাম। হঠাৎ করে ‘এই মুগদা সামনে’ শুনে পড়িমড়ি করে বাস থেকে নামার চেষ্টা করলাম। বাড়ি ফিরতি এ সময়ে বাস থেকে নামার চেষ্টা আর কুস্তিতে জিতে আসা যেন সমান ব্যাপার। একটু কি আনমনা ছিলাম? বাসের ব্রেকের সাথে বুঝি শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারিনি। হুড়মুড়িয়ে পরে গেলাম রাস্তায়। কারো জোর একখানা ধাক্কায় গড়িয়ে চলে এলাম ফুটপাতের কাছাকাছি। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটা ট্রাক চলে গেল প্রায় আমার গা ঘেঁষে।

থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কোনরকমে ফুটপাতে উঠে বসতেই দেখি আমার পাশে একটা দশ বারো বছরের টোকাই ছেলে বসে আছে। আমি তাকাতেই কথা বলে উঠলো।

– হুঁশ জ্ঞান কি বাসায় রাইখা আসছেন ওস্তাদ? আজকে আমি না থাকলে এতোক্ষনে আসমানে থাকতেন। খাড়াইতে পারবেন না ধরতে হইবো? মোড়ের ফার্মাসীতে চলেন, আপনের পা কাটছে লাগে।

দেখলাম নিজে নিজে দাঁড়াতে পারছি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল আমি কোন কথা না বলে ছেলেটার পিছু হাঁটা শুরু করলাম। ভেবেছিলাম ফার্মেসীতে পৌঁছে দিয়ে চলে যাবে হয়তো। কিন্তু দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে তখনো। ততক্ষণে আমি অনেকটাই ধাতস্থ হয়েছি। ফার্মেসী থেকে বেরিয়ে এলাম ছেলেটার সাথেই। কি নাম রে তোর?

– জসিম। বাসা পর্যন্ত যাইতে পারবেন, না দিয়া আসুম? তুই আমার বাসা চিনিস?

– হ চিনি? মসজিদের পাশের পাঁচতলা সাদা বাড়িডা। কিভাবে চিনিস রে? আমিতো তোকে চিনিনা।

– সে ম্যালা কতা। আজকা আপনের শরীর ভালানা। পরে দেহা হইলে কমুনে। আমি রাতে কিছু খাইনি। চল একসাথে খাই। খেতে খেতে তোর কথা শুনবো। নয়তো আজ আমার ঘুম আসবেনা।

মোহাম্মদিয়া বিরিয়ানি ঘরে বসে জসিম আমাকে তার চেনার কাহিনী বলতে শুরু করে।‘ বছর খানেক আগে আমি তহন এই এলাকায় নতুন। মা আর ছোড ভাইডারে লইয়া ঢাকা শহরে আইসি বাপেরে খুঁজতে। মায়ে সারাদিন টুকটাক কাম কইরা যা আনতো তা দিয়া কোনরকমে তিনজনের খানা জুটাইতে কষ্ট হইয়া যাইতো। একদিন মার খুব জ্বর আছিল। সারাদিন কেউ কিছু না খাইয়া শেষমেষ আমি রাস্তায় বাইর হইয়া আসি। কেমনে ভিক্ষা করে জানতামনা তহন। কয়েকজনের কইসি একটু কাম দেন নয়তো একটু সাহায্য করেন।

কেউ ফিরাও চায় নাই। আপনে তহন এই রাস্তা দিয়াই যাইতাসিলেন। আমি আপনের কাছে চাওনের লগে লগে আপনে আপনের হাতের প্যাকেটটা আমারে দিয়া দিসেন। প্যাকেটের মইধ্যে একটা পাউরুটি, দুই প্যাকেট কিরিম বিস্কুট আর এক ডজন কলা আছিল। আমরা হেই রাতে সবাই আপনের লাইগা দোয়া করসি জানেন স্যার। আপনে জানেন না স্যার তারপর থেইকা রোজ সক্কালবেলা আপনে যহন অফিসে যান আবার ফিরা আসেন আমি আপনের পিছনে পিছনে হাঁইটা আসি আপনের বাসা পর্যন্ত যদি আপনের কোন দরকার লাগে?’

খাওয়া শেষে শক্ত করে জসিমকে একবার জড়িয়ে ধরে বলি, ‘ পৃথিবীতে সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার কি জানিস? প্রতিটা দিন মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকা। আমি দোয়া করি তোর জীবন আলোকিত হোক। কোন সাহায্য লাগলে নির্দ্ধিধায় আমাকে জানাস।’

বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে মনে হলো, আজ সারাদিনের সমস্ত ঘটে যাওয়া অঘটন শেষে আরো একটা দিন বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়ে বিধাতা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন সব কিছু ভুলে আরো একটা নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে পারার নামই জীবন।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত