বোধ

বোধ

রোজকার ন্যায় আজও নাস্তার টেবিলে বসার সাথে সাথে রীতার ঘ্যানঘ্যানানি শুরু। আহা! চুপ করো তো।রোজ রোজ খেতে, বসতে, শুতে, রীতা তোমার ঘ্যানঘ্যানানি আর ভালো লাগে না। স্পষ্ট করে বলে দাওতো কি চাও তুমি। আমি চেঁচিয়ে বললাম। রীতার গলার আওয়াজ আরো বড় করে বলল,’ কী চাই তুমি বুঝনা?’ শান্তি চাই।শান্তি। ‘কোনদিক দিয়ে অশান্তি তুমি বল? তোমার কোন অভাবটা আমি পূরণ করতে পারিনি? বলো আমায়। বলো। ‘
‘রীতা বলল,’আপদ বিদায় কর।আপদ।’

‘ঠিক আছে তাই হোক আপদ বিদায় করব। এতেই যদি শান্তি হও তাহলে তাই হোক।’ আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা চলে গেলাম মা,বাবার রুমে। মা, বাবা দুজন খাটে বসে আছে। মুখ গোমরা করে। বুঝলাম, আমার আর রীতার চিৎকার চেঁচামেচি মা,বাবার কান অবধি চলে এসেছে। এরাই আপদ। বিদায় করতে হবে। সাধারণত মা, বাবার সাথে উচ্চ স্বরে কথা বলি না আমি। আজ বললাম। গলায় ঝাঁজ এনে বললাম। রীতার কান অবধি পৌঁছায় মতো আওয়াজ করে বললাম,’ শান্তি দাও আমাদের। তোমাদের বোজা আর বইতে পারছি না। না আমি। না আমার বউ।কেউ পারছি না। কেউ না। এক্ষুণি তৈরী হয়ে নাও।’

মা, বাবা চুপচাপ বসে আছে খাটে। খেয়াল করলাম তাদের চোখ দিয়ে টপটপ অশ্রু ঝরছে। আমি পেরেছি। কঠিন হতে পেরেছি। আমার চোখে অশ্রু নেই। আমি নিজেই মা, বাবার কাপড়চোপড় ব্যাগে ভরে নিলাম। মা, বাবাকে সাথে নিয়ে রীতার সামনে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।’

দুপুর বেলা ঘরে ফিরলাম। ঘরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। রীতা বুঝি এমনটাই চেয়েছিল। এটাই বুঝি শান্তি নীড়। রীতার মুখে হাসি ফোঁটেছে। রীতা একটি বারের জন্য জিজ্ঞেস করল না মা,বাবাকে কোথায় রেখে এসেছি। অবশ্য না করারি কথা। তার চাওয়া তো আপদ বিদায়। কোথায়,কিভাবে হবে সেটা না। আমিও নিজ থেকে কিছু বললাম না। আমাদের দুই ছেলেমেয়েসহ ছয় সদস্যের পরিবার ছিল। আজ থেকে সেটা চার সদস্যের।

মা, বাবা নেই আজ ছয়দিন। রীতার ঘ্যানঘ্যানানি এখন আর শোনা যায় না। সবকিছুই ঠিকটাক। আমার দুই ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি। রীতাকে বললাম,’ আমাদের ছেলেমেয়েকে কি তুমি মানুষের মতো মানুষ করতে চাও?’
রীতা আনন্দিত হয়ে উত্তর দিল অবশ্যই চাই। এটা প্রত্যেক বাবা মায়ের প্রথম চাওয়া।’ ‘ আমি বললাম, ‘ তাহলে তাদের আমি হোস্টেলে দিয়ে দিচ্ছি। বাড়িতে ওদের পড়াশোনা হবে না। শহরের নামকরা একটা হোস্টেলের সন্ধান পেয়েছি। সিট সীমিত। দিতে চাইলে কালকেই দিতে হবে। তুমি কি রাজী আছো?’

‘ হ্যাঁ’ অবশ্যই রাজী। চল আমরা কালই গিয়ে ওদের ভর্তি করে দিয়ে আসি।’ আমার ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে বের হলাম। রীতা অনেক চেয়েছিল আমাদের সাথে যেতে। নিইনি। ঘরটা এখন একদম ফাঁকা। মা, বাবা নেই। মিতু,মুহিব নেই। আছি শুধু আমরা দুজন। তাও সারাটা দিন রীতার একাই থাকা লাগে। আমি সেই সকালে বের হয়। সন্ধ্যায় ফিরি। মিতু মুহিবকে দিয়ে এসেছি আজ তিনদিন। রীতা মাঝরাতে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ে। কাঁদে। মাঝেমাঝে ঘুম ঘোরে মিতু,মুহিবকে ডাকে।বকে। আমি চুপচাপ শুনি। কিছু বলি না।’

অফিসে যাব। নাস্তার টেবিলে বসেছি। রীতা খাচ্ছে না। বললাম, খাচ্ছ না যে কী হলো?’ ‘আমি মিতু,মুহিবকে দেখতে যাব। প্লিজ নিয়ে যাও আমায়।’ ‘আমার অফিস আছে। পারব না।’ ‘ তাহলে হোস্টেলের ঠিকানা বল। আমি একাই যাব।’ ‘কিসের হোস্টেল?’ ‘মানে?’ ‘মানে বুঝনা? বলছি কোন হোস্টেলের কথা বলব?’ ‘আশ্চর্য! ওরা যে হোস্টেলে আছে সে হোস্টেল।’ ‘ওদের তো আমি হোস্টেলে দিনাই।’ ‘হোয়াট? ‘রীতা চিৎকার করে উঠে। তার মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা।

‘আমি এমন পরিস্থিতিতেও হেসে দিলাম। বললাম,’ ওদের আমি এতিমখানায় রেখে এসেছি। ওরা সেখানেই বড় হোক।’ রীতা, চেঁচিয়ে আমাকে লায়ার বলে শার্টের কলার ধরে ফেলে। ‘ আমি শান্ত গলায় বললাম,’ চিৎকার করো না রীতা।’ ‘তোমার মতো নোংরা বাবা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা নেই। কারোর মা, বাবা বেঁচে থাকতে সন্তানের স্থান এতিমখানা হয়না রুহান।’ ‘ আমি অশ্রুসিক্ত চোখে রীতার দিকে তাকিয়ে বললাম,’ কারোর ছেলে বেঁচে থাকতে মা, বাবার স্থান বৃদ্ধাশ্রম হওয়া উচিত কি?’

রীতা ক্ষণকালের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ আসছে না। এই তো কয়দিন আগেও রীতার ঘ্যানঘ্যানানিতে বাড়িতে থাকা দায় পড়ে যেত। আজ যেন মনে হচ্ছে রীতা বোবা। রীতা লুটিয়ে পড়ে আমার পায়ে। ও কোনো শব্দ করে না। আমি ওকে তুলে নিলাম বুকে। ‘চল, মিতু মুহিবকে নিয়ে আসি।’ ‘না।’ ‘কেন?’ ‘আগে আমাকে মা,বাবার কাছে নিয়ে যাও। তাদের ফিরিয়ে আনতে চাই। রুহান আমাকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগটা করে দাও।’ আমি টলমলে চোখে খুশিতে হেসে দিলাম। ‘রীতা, মা বাবা, মিতু,মুহিব সবাই একসাথে আছে?’

‘কোথায়? ‘
‘তোমাদের বাসায়?’
‘মানে?’

‘হ্যাঁ’ এর পুরো ক্রেডিট আমার শাশুড়ি অর্থাৎ তোমার মায়ের। তোমার এমন আচার আচরন দেখে আমি সবকিছু তোমার মাকে খুলে বলি। উনিই আমাকে এই বুদ্ধিটা দিলেন। ‘রুহান, আমি খুব লজ্জিত। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমি আর মা, বাবাকে নিয়ে কোনো অশান্তি করব না। ‘ক্ষমা চাইতে হবে না। তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছ এতেই খুশি।’ আজ আমাদের ছয় সদস্যের পরিবারটা সেই আগের মতোই পরিপূর্ণ। সুখ, শান্তিতে ভরা। আগে আপদ মনে করা মা, বাবাকে রীতা নিজেই এখন আগলে রাখে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত