ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে

ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে

নন্দিনীর সাথে আমার আলাপ ট্রেনে…রোজই এক সাথে লেডিস কম্পার্টমেন্টে ওঠার সুবাদে পরিচয় আমাদের,যদিও শুধু ওই শক্তিগড় থেকে হুগলী অবধিই আমাদের সঙ্গ।নন্দিনী শক্তিগড় থেকে ট্রেনে ওঠে,ওর গন্তব্য

শ্যাওড়াফুলি,আর আমার গন্তব্য হুগলী।আমাদের বন্ধুত্ব এর এক বছর হতে চলল,সেদিন হঠাতই নন্দিনী আমার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিল,বিয়ের নিমন্ত্রণ!আমি একটু কপট রাগ দেখিয়ে বললাম-‘ এতদিন ধরে তো বলিসনি কিছু…আজ একেবারে কার্ড?’

-‘কী বলব?’
-‘আপাতত বল লাভ না অ্যারেঞ্জড?’
-‘লাভ,কিন্তু…’
-‘ছেলের ছবি দেখা!’
-‘ছেলে না,মেয়ে!’
আমি অবাক হয়ে বললাম-‘মানে?’

-‘মানে,আমার জ্যাঠতুতো ভাই এর বিয়ে,মেয়ের ছবি দেখাতে পারি।’
ইস…আমারই ভুল!বিয়ের কার্ড দেখেই হুট করে ভেবে নিয়েছি নন্দিনীর বিয়ে।আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম -‘আমি ভেবেছিলাম তোর বিয়ের কার্ড… তাই তো ভাবি,তোর বিয়ে ঠিক হলে তুই কি আমায় আগে থেকে বলবিনা?’
নন্দিনী একটু হেসে ট্রেনের জানালার দিকে তাকাল,আমার কেন জানিনা মনে হল ও কিছু একটা লুকাতে চাইছে!কিন্তু সেদিন ওকে জিজ্ঞাসা করেও কিছু জানতে পারিনি,ও মুখে কিছু না বললেও আমার মনে হচ্ছিল ও কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে।

নন্দিনীর ভাইএর বিয়েতে গেলাম ওদের শক্তিগড়ের বাড়িতে, ওর ভাইএর বিয়ে কাছাকাছিই হয়েছে,বিয়ের লগ্ন ছিল সন্ধ্যায়… তাড়াতাড়ি বিয়ে মিটে গেলেও সে রাতে আর বাড়ি ফিরলাম না,নন্দিনীর জোরাজুরিতে থেকে গেলাম ওদের বাড়িতেই।নন্দিনীর মা,জ্যেঠিমা আমায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আপন করে নিয়েছিলেন,বাড়ি ফিরে নন্দিনী ওর মা,জ্যেঠিমাকে ভাইএর বিয়ের ছবি দেখাচ্ছিল মোবাইল থেকে,আমিও পাশে বসেছিলাম,ছবি দেখতে দেখতে গল্প করছিলাম আমরা,নন্দিনীর জ্যেঠিমা হঠাত বললেন -‘এবার নদীর বিয়েটা দিতে পারলেই আমাদের শান্তি!’ (বাড়িতে নন্দিনীর ডাকনাম ‘নদী’)

আমি হেসে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম,থমকে গেলাম নন্দিনীর থমথমে মুখ দেখে,নন্দিনীর মা বললেন-‘দিদি,ওকথা পরে হবে,আজ আবার কেন..!’

জ্যেঠিমা অপ্রস্তুত হয়ে অস্পষ্ট ভাবে কিছু একটা বললেন,আমি বুঝলাম কিছু একটা সমস্যা আছে,কথা ঘোরাতে বললাম -‘জ্যেঠিমা,তোমার বৌমা কিন্তু খুব মিষ্টি হয়েছে…’

রাত বারোটা নাগাদ ঘুমাতে গেলাম নন্দিনীর ঘরে,সেখানেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম-‘কী ব্যাপার বলতো..’

-‘কী আবার,কী ব্যাপার?’
-‘এই যে তুই আমার কাছে কিছু একটা ব্যাপার গোপন রাখছিস,তবে হ্যাঁ,যদি খুব ব্যাক্তিগত হয় তবে জোর করব না…’
এরপর সেদিন রাতে নন্দিনী আমায় ব্যাপার টা খুলে বলেছিল…

নন্দিনীর বয়স তখন বারো-তেরো,তখন ওরা থাকত দিল্লীতে,সেখানেই ওর পরিচয় হয় রাজ এর সাথে,রাজ ওর বাবার বন্ধুর ছেলে,দু পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাজ-নন্দিনীর মধ্যে সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল যা ধীরে ধীরে সবার অজান্তে ভালোবাসায় পরিণত হয়!রাজ নন্দিনীকে একটা করে গোলাপ দিত ওর প্রতি জন্মদিনে,নন্দিনীর মাস্টার্স ডিগ্রী কমপ্লিট হওয়ার পর ওর তেইশ বছরের জন্মদিনের পার্টিতে ওদের সম্পর্কের কথাটা ওরা সবাইকে জানাবে ঠিক করে।নন্দিনী সেদিন অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছিল রাজের আসার জন্য,নিমন্ত্রিতরা সবাই এসে গিয়েছিল,এমনকি রাজের মা-বাবা ও!রাজ আসেনি সেদিন,একটা পথ-দূর্ঘটনা সেদিন ভেঙে দিয়েছিল নন্দিনীর সব স্বপ্ন!হসপিটালে গিয়ে নন্দিনী দেখেছিল রাজের কাছে পাওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে রক্তরাঙা গোলাপটা কে!
সেদিনের দুর্ঘটনায় রাজ স্মৃতি হারায়…সেই সাথেই ভুলে যায় নন্দিনীকে ও তার ভালোবাসাকে!এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর!রাজের চিকিৎসার জন্য রাজের বাবা-মা তাকে নিয়ে গেছে বিদেশে,নন্দিনীরাও চলে

এসেছে তাদের গ্রামের বাড়িতে।যদিও দুই পরিবারের মধ্যে এখনও যোগাযোগ আছে,মাঝেমধ্যেই ফোনে কুশল-বিনিময় হয়…তবে রাজের পরিবার রাজ আর নন্দিনীর সম্পর্কের কথা এখনও জানেনা!প্রথমে নন্দিনী বাড়িতে কাওকে কিছু বলেনি,কিন্তু যখন একবছর আগে তার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু হয় তখনই সে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে তার আর রাজের সম্পর্কের কথা।নন্দিনী আজও রাজকেই ভালবাসে,ওর বিশ্বাস রাজের একদিন সব মনে পড়ে যাবে আর সেদিন রাজ ফিরে আসবে ওর কাছে!যতদিন না রাজ এর স্মৃতি ফিরছে ততদিন রাজের সাথে কাটানো সময়ের স্মৃতি কে সম্বল করেই কাটাতে চায় ও!

নন্দিনী আমায় রাজের ছবি দেখিয়েছিল সে রাতে,একটা ডায়েরীর ভিতর সযত্নে রাখা ছবিটা,আর ডায়েরীটার পাতার ভাঁজে ভাঁজে রাখা কয়েকটা শুকনো গোলাপ… রাজের কাছ থেকে পাওয়া নন্দিনীর জন্মদিনের উপহার!

এখনও আমি আর নন্দিনী একসাথেই যাতায়াত করি ট্রেনে,এখনও রাজের স্মৃতি ফেরেনি,আজও নন্দিনী তার রাজের অপেক্ষায় দিন গুনছে!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত