অনন্যা

অনন্যা

“ছোটবৌমা আজ কিন্তু একটু রান্না বেশি করতে হবে শুনেছো তো,ও বেলা তোমার মাসিমা মেসোমশাই আসবেন। ভেবেছিলাম বড় বৌমাকে বলবো তোমাকে বিকেলে একটু সাহায‍্য করে দেবে কিন্তু তার আবার অফিসে আজ কি সব আছে। মানে সে নাকি ওর অফিসের সেরা নারী, মানে ঐ মেয়েমানুষের প্রাইজ পাবে শুনলাম। যত্তসব হয়েছে আজকাল,আজ এটা কাল সেটা লেগেই আছে। বাপ ঠাকুর্দার আমলে কখনো শুনিনি বাপু মেয়েদের আবার আলাদা করে কোন দিন হয়। চিরকালই তো মেয়েদেরই দিন,আরে মেয়েরা মানে ইয়ে হলো মায়ের জাত সেই ব‍্যাটাছেলেই বলো আর মেয়েমানুষই বলো সবাইকে জন্ম তো দেয় মেয়েরাই।”…একটানে কথা বলে গেলেন সাবিত্রী। কিন্তু কি হলো যাকে এতগুলো কথা বলে গেলেন তার কোন সাড়াশব্দ নেই কেন,মনটা খারাপ হয়ে যায় কনকের। মানে এই

বাড়ির বেকার ছোট বৌয়ের ভেবেছিলো আজ একটু মায়ের কাছে যাবে ওবেলা। হয়ত আর হবেনা।
চিরকাল মাকে এইভাবেই সংসার করে যেতে দেখেছে ও। বাবা ছোটবেলায় মারা যাওয়াতে ওরও পড়াশোনা মোটামুটি বি এ পাশের পর বিয়েতেই আটকে গিয়েছিলো। দত্তবাড়ির বেকার ছোটবৌ শ্বশুরবাড়িতে বেগার খাটে,মানে ওর দুই ভাশুরের মত ওর বর তেমন রোজগেরে নয়। বড় ভাশুর এই বাড়িতে থাকে মেজো ভাশুর আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। তাই বাড়ির যাবতীয় বাজার হাটের দায়িত্ত্ব সোমেনের, আর রান্নাবান্না মোটামুটি কনকের। বড় জা ইচ্ছে হলে হাত লাগায়,বেশি কিছু করার সময় পায়না খুব একটা। সোমেনের মাইনে অনেকটাই কম,বাকিটা ওরা দুজনে খেটে পুষিয়ে দেয়। শাশুড়ি হাতে করে তৈরি করেছেন কনককে তাই খুব একটা দেখতে হয়না।

কনক ততক্ষণে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে দেখে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগে সাবিত্রীর, যাক্ আর চিন্তা নেই তবে ছোটবৌমা আজ হঠাৎ চুপচাপ কেন কি হলো? কিন্তু কিন্তু করেও জিজ্ঞেস করলেন,” কি বৌমা তোমার কি আজ শরীরটা ভালো নেই, চুপ করে আছো একদম। কি হলো? চিন্তা কোরনা আমি তো আছিই সাহায‍্য করবো তোমায়। টেবিলে বসে বসেই সব গুছিয়ে দেবো।”

“না ভাবছিলাম আজ ও বেলাতে একটু মায়ের কাছে যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয়নি,তাই মাম স্কুল থেকে ফিরলে ওকে নিয়েই..” আর দিন পেলোনা এমন দিনেই যেতে হবে ওকে বাপের বাড়ি! রাগ আর দুশ্চিন্তা দুইই হলো সাবিত্রীর। বড় বৌমাও তার ফাংশান সেরে কখন আসবে কে জানে। দিদিরা আসবে চারজন,তারপর ওরা এতগুলো লোক,ঝক্কি তো কম নয়। খেতে দেওয়াটাই তো এক সমস‍্যা! তাই মুখে একটু শুকনো হাসি হেসে বলেন,” আমি বলি কি কাল যেয়ো বেশি তো দূর নয় ঐ তো বেলেঘাটা থেকে পাইকপাড়া। আচ্ছা আমি নাহয় বেয়ানের সাথে কথা বলে নেবো।”
দুঃখ রাগ হলেও মুখে মুখে তর্ক করা কনকের স্বভাব নয় আর সেইজন‍্যই হয়ত ওকে সবাই ভালোবাসে। কখনো বা একটু বেশিই নির্ভর করে। ওর বড় জা মল্লিকার সাথেও ওর সম্পর্ক বেশ ভালো।

হয়ত বা মল্লিকা এটাও বোঝে কনক আছে বলেই ও এত নিশ্চিন্তে অফিস করে। পুপু আর মাম মিলেমিশে থাকে দুই বোনের মত মানে দুজন দুজনের সঙ্গী। মাঝে মাঝে খারাপও লাগে মল্লিকার কনকের জন‍্য তাই নিজে কোন ভালো জিনিস কিনলে কনকের কথা মাথায় রাখে। ওর অফিসের কেউ ভালো বলে কেউ বা মন্দ। যেমন এই সেদিনই শুক্লা বলছিলো,” মল্লিকা,দারুণ চালাক। আর ওর জা টা তেমন ছাগল তাই এটা ওটা ঘুষ দিয়ে জাকে হাতে রাখে। মানে পরিস্কার কথা খাটিয়ে নেয়। তেমন অফিসেও সবাইকে কেমন হাতে রেখেছে মানে জাস্ট ধুরন্ধর মহিলা। আর এদের ভাগ‍্যও ভালো হয়।”..তবে শুক্লা কারো সমর্থন পায়না,” মল্লিকাদির কোন তুলনা হয়না,এই তো সেদিন কত দাম দিয়ে ঢাকাই শাড়িটা কিনলো জায়ের জন‍্য। আমারই অবাক লাগছিলো।”..” হুঁ ছাড়ো তো ওসব দেখনদারি, বিনা মাইনের লোক পেয়েছে করবেনা কেন,যত্ত মুখে মিষ্টি কথা বলে চালাকি করা। পাক্কা পলিটিশিয়ান একেবারে।”

কথাটা হয়ত নেহাত মিথ‍্যে নয়,সংসারটা বোধহয় একটা বড় রাজনীতির জায়গা। এখানে আমরা যতই আমাদের প্রতিপক্ষ করে পুরুষদের দাঁড় করাই। আসলে মেয়েরা যদি আরেকটু বেশি সুন্দর মন আর ভালোবাসা নিয়ে মেয়েদের দেখতো, অনেক সমস‍্যাই মিটে যেত। আসলে মল্লিকার প্রাইজ পাওয়াটা অনেকেরই বুকে কাঁটা হয়ে বিঁধছে। এদিকে বাড়িতে তখন কনক ব‍্যস্ত মালাইকারি,মুড়িঘন্ট,কাতলা কালিয়া আর চিকেন কষা রাঁধতে। মল্লিকা সাবিত্রীকে বলে গেছে বাড়ি এসে চটজলদি প্রেসার কুকারে পোলাওটা ও করে নেবে। চালটা যেন ধুয়ে ছড়িয়ে রাখে। কনকের যেন মনে হলো,দিদিভাইটা সবসময় সেরা প্রাইজটা পেয়ে যায়। সবাই হয়ত পোলাও খেয়ে ধন‍্য ধন‍্য করবে। কোথায় ও ভেবেছিলো আজ একটু ভালোমন্দ কিছু করে মায়ের কাছে যাবে। একা একা থাকে বেশিরভাগই ভালো করে খায়না।

কত কি রান্না হচ্ছে আজ এই বাড়িতে,আর মা হয়ত কালকের তরকারি দিয়েই খাবে। সারাজীবন মানুষটা কষ্ট করেই গেলো,আজ নিজের সংসার মেয়ে হওয়ার পর বোঝে একটা সংসার গড়ার পেছনে মেয়েদের কতটা ভূমিকা থাকে। ওর মেয়েবেলাতে মায়ের যে কথাগুলো শুনে রাগ হত খুব আজ সেগুলো সত‍্যি মনে হয় খারাপও লাগে। ওর মাও শাশুড়িমায়ের মত নারীদিবস বোঝেনা। বললেই বলে,” আরে মেয়েরা তো ঘরের লক্ষ্মী,ঢাকঢোল পিটিয়ে অত অধিকার চাইতে হবে কেন শুনি? এই সবই ঐ ফরেন থেকে এসেছে।” মায়ের কথা শুনে সত‍্যিই হাসি পায় কনকের। কত কিছুরই খবর রাখেনা এরা,বাইরের পৃথিবীতে কত কি ঘটছে তাও জানেনা।

ফেসবুক হোয়াটসআ্যপেও ওনার উৎসাহ নেই তার চেয়ে বরং মুখে পান দিয়ে শ্বশুরমশাইয়ের কাছে বসে গল্প করতেই ভালো লাগে ওনার। মল্লিকাও হাসে আর বলে,” বুঝলি এখনো কিন্তু দুজনের হেব্বি প্রেম একদম টাইট বন্ডিং। আমাদের নেই এমন রে।” কনক হাসে, ওর বাবাও খুব ভালোবাসত মাকে,নাহ্ কোন বিশেষ দিন নয়; ওর ছোটবেলায় দেখেছে বাবা অফিস ফেরত খুচখাচ খাবার এনে মায়ের হাতে দিতো। বাজারে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করতো মায়ের জন‍্য কি মাছ আনবে? পুজোর সময় প‍্যাকেট থেকে বেরোত মায়ের পছন্দমত শাড়ি,কোনদিন আবার ঘর জুঁই ফুলের সুবাসে মাততো। বাবা বলত,” খুব সস্তায় পেলাম মালাগুলো তাই আনলাম।” মা যেন একটু লজ্জা পেয়ে একটা মালা খোঁপায় জড়িয়ে নিতো,মুখে ছড়াতো আত্মতৃপ্তির হাসি।

কাজ করতে করতে কত কথাই মনে আসছে কনকের। অদ্ভুতভাবে আজই ওর মায়ের জন্মদিন। যে মানুষটা আজও সেরা নারী ওর জীবনে,কোন সম্মানই হয়ত তার যোগ‍্য নয়। এখন আর তেমন করে কিছুই করা হয়না,তবুও ভেবেছিলো আজ যাবে। যদিও মাকে কিছুই বলেনি আজ যাবে,কারণ প্রতিবছর সত‍্যিই যাওয়া হয়না। কনক চাকরি করেনা,হয়ত তেমন অভাব তার কিছু নেই। তবুও কখনও মনে হয় আজকের দিনে হয়ত স্বাবলম্বী হওয়াটা খুব দরকার। রান্নাগুলো হয়ে আসছে প্রায়,শাশুড়িমা বেশ কয়েকবার দেখে আর চেখে গেছেন। রান্নাটা সত‍্যিই ভালো করে কনক।

মেয়েদুটো স্কুল থেকে আসার পর ওদের খাবার দিয়ে নিজেও একটু পরিপাটি হয়। ভাবে এবার মাকে একটু ফোন করবে। সকালে একবার কথা বলেছে তবে জন্মদিনটা ভেবেছিলো গিয়েই জানাবে। যদিও মা একগাল হেসে বলে,’মেয়েদের আবার জন্মদিন! চারবোনের সংসারে কোনদিনই হয়নি পালন,এই বাড়িতে আসার পর ঐ তোর বাবা জানতে পেরে টুকটাক কিছু দিতেন।”

বাইরে গাড়ির আওয়াজ পায়,মাসিমারা এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন!দিদিভাইও তো আসেনি এখনো। একগাল হেসে মাসিমা বললেন,” একটু আগেই চলে এলাম,গল্প করবো বলে।আমার বৌমাও তো একদম তৈরি কখন থেকে। এত গল্প শোনে এই বাড়ির দুই বৌয়ের।”

গল্প বেশ জমে উঠেছে,কনক ব‍্যস্ত রান্নাঘরে। দিদিভাই এলে তখন ঘরে গিয়ে ফোনটা করে নেবে। শ্বশুরবাড়ির মানুষের মন পেতে গিয়ে সবসময় মনে হয় মা তো ওর একদম নিজের, তাই মায়ের মনেই তো ও আছে। মা কিছু ভাববেনা।

কিছুক্ষণ বাদেই মল্লিকা আসে,হাতে একটা মোমেন্টো আর ফুলের বোকে। শাশুড়িমায়ের হাতে মিস্টির প‍্যাকেটটা দেয়,” মা এটা অফিস থেকে দিয়েছে,আর এটা মাসিমণিদের দিয়ো। আর এই প‍্যাকেটটাতে আছে শুধু আমাদের জন‍্য খাবার। আজ নারীদিবস না।”..মাম আর পুপু হই হই করে ওঠে,” দেখি,দেখি।”..হাসে মল্লিকা,” কনক এটা রাখতো,পরে খুলবি। আমি আসছি রান্নাঘরে এক্ষুণি।”..নিজের ভরা সংসারের দিকে তাকিয়ে বড় শান্তি লাগে সাবিত্রীর। হয়ত অনেককিছু নেই তবুও বাঁধনটা তো আছে এটাই বা কম কি?” সত‍্যি দিদি আমাদের বৌমাগুলো কিন্তু খুব ভালো।” সুখের ডানা ঝাপটানো হাসি কথার মাঝেও কনকের মনটা ছটফট করে,” দিদিভাই,আমি একটু আসছি। মাকে একটু ফোন করে আসি। বেশি রাত হলে হয়ত ঘুমিয়ে পড়বে।”

” আমাকে একটু মশলাগুলো আর কাজু কিসমিশটা দিয়ে যা না।আচ্ছা সোমেনটা এলোনা কেন এখনো,তোর দাদাও তো আসবে। তোকে ফোন করেছিলো সোমেন?” মশলাগুলো এক জায়গায় করতে করতেই কনক বলে,”না তো,কোনদিন ফোন করে বলতো? জানে সারাদিনই বাড়ি থাকে। আচ্ছা সব গুছিয়ে দিয়েছি।” বাইরে পা বাড়ায় কনক একটা পরিচিত গলার আওয়াজে বসার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। বড় অবাক লাগে ওর,সোমেন এসে মুচকি হাসে,” মাকে নিয়ে এলাম অফিস ফেরত। মা আর বৌদি বারবার বলে দিয়েছে।” মনের থেকে একটা ভার নেমে যায় কনকের ছুটে গিয়ে মায়ের কাছে দাঁড়ায়। তারপর একসাথে প্রণাম করে সবাইকে। ততক্ষণে মল্লিকা এসে দাঁড়িয়েছে। হয়ত চোখের কোলে অনেক খুশির মাঝেও জমেছে দুফোঁটা জল। দুইবছর আগে হারিয়েছে মাকে,নিজের সেরা নারী হিসেবে স্বীকৃতির দিনটাতে যে বড় মনে হচ্ছে মায়ের কথা। দুপুরে কনকের সাথে কথা বলেই বুঝেছিলো ওর মনটা।

” কই বড় বৌমা,এদিকে এসো দেখি। এই দেখুন বেয়ান আমার দুই লক্ষ্মী সরস্বতী। আজকের দিনে তো এটাই সেরা পাওনা। আর মেয়েদেরকে

সেরা হওয়ার শিক্ষা তো আমরাই দিই,তাইতো আমরা সেরা মা।”..সাবিত্রীর দুইপাশে কনক আর মল্লিকাকে দেখে মন ভরলো কনকের মায়েরও হয়ত জন্মদিনে এটাই ওনার সেরা প্রাপ্তি। সন্তানের সুখ‍্যাতি শুনতে কোন মায়েরই না ভালো লাগে। এর মধ‍্যেই দুই নাতনি প‍্যাকেট খুলে মাতিয়ে দেয় সারা বাড়ি,” ও এর মধ‍্যে বার্থডে কেক!”..আশ্চর্য হয় কনক দিদিভাই এত কিছু খেয়াল রাখে কি করে,সেই জন‍্যই হয়ত দিদিভাই সত‍্যি সেরার সেরা। তবে এর পেছনে আরেকজন আছে, সোমেন।

“আচ্ছা বেয়ান সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে,কোন ছোটবেলায় দেখেছিলাম। আসলে কি জানেন সবাইকে সুখী আর ভালো আমরাই রাখতে পারি। মেয়েরা যে কখনো মা,কখনো বোন কখনো স্ত্রী কখনো বা অসুরনাশিনী দেবী দুর্গা।”

ভালোবাসায় আর ভালোলাগায় হারিয়ে যেতে যেতে কনকের মনে হলো সংসার শুধু নেয়না দেয়ও অনেক কিছু।
সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত