সন্ধ্যা নামার পর

সন্ধ্যা নামার পর

আমরা দুই ভাই এক বোন। আমি হলাম সবার ছোট। আমার বড় দুই ভাই। বাড়িভাড়া, ভাইয়াদের পড়ার খরচ, আমার পড়ার খরচ চালাতেই বাবার বেতনের অনেকটা খরচ হয়ে যায়।পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমার বাবা। তার উপর দিয়ে যে কি পরিমাণ ধকল যায় সেটা আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারি। আমার মা অতীব ধৈর্যশীল একজন মহিলা। যে শত ঝামেলা আর দুঃসময়েও বাবাকে সাহস যুগিয়ে গেছে।

আমার বাবার স্বপ্ন অবসর গ্রহণ করার পর আমাদের জেলা শহরে ছোট একটা বাসা করবে। বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। কোথায় কবে কী ঘটেছে, তার মনে কী কী পরিকল্পনা আছে, সব শেয়ার করে আমার সাথে। বাবা আমাকে ছোট মা বলে ডাকে। ভবিষ্যতে জায়গা কিনে একটা ছোট বাসা করার আশায় বাবা একটা ছোট দোকান ভাড়া করে সেখানে কিছু ওষুধ নিয়ে বসেছে। যাকে ফার্মেসী বলা যায়। বাবা ফার্মেসী চালানোর জন্য একটা প্রশিক্ষণও নিয়েছে কোথায় যেন নাইট শিফটে। সারাদিন ডিউটি করে রাতে প্রশিক্ষণ করেছে। আর এখনও সারাদিন অফিস করে রাতে এসে ফার্মেসীতে বসে। আমার বাবার কোনো বিরাম নেই যেন। বাবা একটা এ্যাকাউন্ট খুলেছে ব্যাংকে।

সেখানে প্রতিদিন রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে পায়ে হেঁটে যে টাকাটা বাঁচায় আর ফার্মেসী থেকে যে মুনাফা পায়, সেটা গচ্ছিত রাখে। সারা মাস আমার বাবা অনেক হিসেব করে চলে। একটা প্যান্ট আর দু’টো শার্ট দিয়ে দুই বছর চালিয়ে দিচ্ছে। পায়ের জুতা জোড়া কয়বার সেলাই করেছে, সে হিসাব নিজেও জানে না সম্ভবত। এসব নিয়ে অবশ্য বাবার কোনো আফসোস নেই। মাস শেষে যদি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে আগের মাসের চেয়ে একশো টাকাও বেশি রাখতে পারে, তাহলে বাবার আনন্দের সীমা থাকে না। ভারী বাজারের ব্যাগটা বাবা হাতে করে নিয়ে বাড়ি ফিরে। ব্যাগটা বাবা মেঝেতে এনে রেখেই হাত টানা দিতে থাকে। স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ব্যাগটা বহন করে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

আমার দুই ভাই ই ঢাকাতে থেকে পড়াশুনা করে। বাবা তাদের কোনো কষ্ট করতে দেয় না। তবুও বাবার বিরুদ্ধে আমার ভাইদের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের ডি এস এল আর লাগবে,আইফোন লাগবে, পিসি লাগবে। আরও কত কী আবদার! বাবা তাদের সেই আবদারগুলোও যথাসম্ভব পূরণের চেষ্টা করে। আমার ভাই দু’টো যদি একটু কম বিলাসী হতো, তবে বাবার ব্যাংক এ্যাকাউন্ট আরেকটু ভাড়ী হত হয়তো। বাবার স্বপ্নপূরণ আরও এক ধাপ এগিয়ে থাকত হয়তো। আমার বাবা তার স্বপ্নটা নিয়ে কচ্ছপের গতিতে এগুচ্ছে লক্ষ্যের দিকে।

একদিন বাবা অফিস থেকে ফিরেই গলা ফাঁটিয়ে আমাকে ডাকতে শুরু করলো। আমি কাছে আসতেই আমাকে বসতে বললো। বাবার চোখেমুখে আনন্দের ঝলক। যখন বাসা করা নিয়ে বাবার মাথায় নতুন কোনো পরিকল্পনা আসে, তখনই বাবা এমন প্রফুল্ল হয়ে উঠে। আমি বললাম,

-বাবা, নতুন কোনো ধারণা পেয়েছ নিশ্চয়ই?

-হ্যাঁ রে ছোট মা। আচ্ছা, বল তো দেখি বাড়ির সামনে একটা সুইমিংপুল টাইপ পুকুর থাকলে কেমন হয়? যেখানে লাল শাপলা ফুঁটে থাকবে। শহরে তো পুকুর খোঁজে পাওয়া কঠিন ব্যাপার। লোকে বলবে, আরমান সাহেবের বাসার সামনে একটা পদ্মপুকুর আছে। কী, দারুণ না ব্যাপারটা?
আমি বললাম,

-হ্যাঁ বাবা। দারুণ হবে। কিন্তু, একটা পুকুর তো অনেকখানি জায়গা দখল করে নিবে। এতে করে তোমার বেশি জায়গা কিনতে হবে।

বাবা কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বললো,

-হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছিস। আচ্ছা দেখি কী করা যায়।

আমি জানি, বাবা এখন ভাববে কী করে নিজেকে আরও একটু কষ্ট দিয়ে আর কিছু টাকা কামানো যায় বা আর কিছু টাকা মাসের খরচ থেকে বাঁচানো যায়।

বাবা কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে মুখে অল্প হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললো,

-ছোট মা শুন, তোকে নিয়ে কাল সকালে আমার এক কলিগের বাসায় যাবো। তার বড় ছেলে সিঙ্গাপুর থাকে। সে নতুন একটা বাসা করেছে। চার শতাংশ জায়গার উপর। বাসাটা কেমন তোকে নিয়ে একবার দেখে আসবো। যদি তোর পছন্দ হয় তবে পুকুরের হিসেব বাদ। আমি ওরকম একটা বাসাই বানাবো। আমি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বাবাকে আলতো করে একটু জড়িয়ে ধরে ‘ঠিক আছে’ বলে আমার রুমে চলে আসলাম।

সেই রাতেই বড় ভাইয়া বাসায় আসলো। ভাইয়ারা আসলে বাসার সবাই খু্ব খুশি হয়। কাছে থাকে না তো তাই। বাবা আমার কানে কানে বললো,

-ছোট মা, তোর ভাইয়া আসাতে ভালোই হয়েছে। ওই যে কাল সকালে বাসাটা দেখতে যাবো বলেছিলাম না? তোর ভাইয়াকেও সাথে নিয়ে যাব।

বাবার চোখে মুখে বেশ আনন্দের আভা। আমি হাসতে হাসতে বাবাকে বললাম,

-বাবা, তোমার মাথায় সারাক্ষণ বাসা ছাড়া আর কিছু ঘুরে না?
বাবা হা হা করে হাসলো আমার কথা শুনে।

পরদিন সকালে ভাইয়ার চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে উঠে ভাইয়ার রুমে গিয়ে দেখি বাবা মাথা নিচের দিকে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাইয়া বাবাকে যা তা বলে অপমান করছে। ভাইয়ার কথাগুলো হচ্ছে এরকম,
-এত সকাল সকাল আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছ ফালতু একটা কাজের জন্য? কবে না কবে বাসা করবে তার জন্য এখন আমাকে তৃপ্তিমতো না ঘুমিয়েই আরেকজনের বাসা দেখতে যেতে হবে? যত্তসব ফালতু। তোমার না মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বাবা। তুমি মানসিক ডাক্তার দেখাও। আমার অবাক হওয়ার সীমা রইলো না। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বাবার চোখ ছলছল করছে। বাবার মোটা ফ্রেমের চশমা’র কাঁচ ঝাপসা হয়ে আসছে। আমার মাথায় কী যেন উঠে গেল! ভাইয়ার দিকে তেড়ে গিয়ে বললাম,

-বড় ভাইয়া, তুমি ভাবো কি নিজেকে, হুম? পড়াশুনা করে কী শিখছো দিন দিন? এইসব বেয়াদবি শিখছো? বাবার সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত সেটা শেখনি আজও?
বাবা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

-আহারে থাম তো। বড় ভাই তোর। বড় ভাইয়ের সামনে এভাবে কথা বলা ঠিক না। আমারই ভুল হয়েছে। ও কাল জার্নি করে এসে রাতে ঘুমিয়েছে। ওকে ডাকা উচিত হয়নি আমার।

আমি বাবার কথায় অবাক হলাম না। কারণ আমি জানি আমার বাবা এমনই। ছেলেরা শত খারাপ ব্যবহার করলেও ছেলেদের সম্পর্কে প্রশংসা ছাড়া অন্য কোনো উক্তি করে না বাবা। এইতো সেদিন, ছোট ভাইয়া পিকনিকে যাবে। পিকনিকের চাঁদা তিন হাজার, কিন্তু ছোট ভাইয়া বাবার কাছে ছয় হাজার টাকা চেয়ে বসলো। বাবা কোনোকিছু জিজ্ঞাসা না করেই সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিলো। পাঁচ শো টাকা কম দেওয়াতে, ছোট ভাইয়া বাবাকে যা না তা বলে ফেললো। সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে পারে না, তবে জন্ম কেন দিলো এমন প্রশ্নও তুললো সে। ছোট ভাইয়ার চেঁচানো শুনে খুলে রাখা দরজা দিয়ে পাশের বাসার আন্টি এসে বললো,

-কী হয়েছে ভাইসাহেব? ছেলে কী চাইছে? দিচ্ছেন না কেন?
বাবা মুখে হাসির রেখা ফুঁটিয়ে তুলে বললো,

-ছেলে অল্প টাকা চেয়েছিল পিকনিকের জন্য। দিতে পারছি না তো তাই ছেলে রাগারাগি করেছে।
আমি সেদিন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাবারা বুঝি এমনই হয়? সন্তানের কলঙ্ক নিজের কাঁধে নিয়ে সন্তানকে নির্দোষ প্রমাণ করতে মরিয়া থাকে বুঝি বাবারা? আচ্ছা, বাবাদের মনটাতে আল্লাহ কী দিয়ে

দিয়েছেন? তারা এত ধৈর্য, মায়া, স্নেহ, সংযম কোথায় মজুদ রাখে? কোথায়? আচ্ছা, পৃথিবীতে কী বাবাদের থেকে ত্যাগী আরও কোনো মানুষ আছে? এই প্রশ্নটার উত্তর জানতে খুব ইচ্ছা করে আমার।

আমি আর বাবা রহমত আংকেলের সদ্য করা বাসাটার ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছি। বাবা আমাকে কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলছে,

-দেখ ছোট মা, ড্রয়িং রুমটা সুন্দর না খুব? আমি ভেবেছি, আমার বাসাতেও এমন একটা ড্রয়িং রুম থাকবে আর রুমে দামী দামী সব পেইন্টিং টানিয়ে রাখবো। এই বাসার বুয়া আমাদের ট্রে তে করে চা আর বিস্কুট দিয়ে গেল। বাবা চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে আমার সাথে গল্প করছিলো। বিস্কুট চা থেকে তুলতে গিয়ে বাবা দেখলো পুরো বিস্কুট গলে গেছে। আমি হুট করে বলে উঠলাম,

-তোমার ছেলেদের অবস্থাও না অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে এই চায়ে গলা বিস্কুটের মতো হয়।
সেইদিন বাসায় ফিরে রাতে বাবা হঠাৎ আমাকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
-ছোট মা, এই মুহুর্তে আমি কেন কাঁদলাম জানিস?
-কেন?
-সুখে। এটা সুখের কান্না কাঁদলাম। কিসের সুখ জানিস?
-কিসের সুখ বাবা?

-একটা মেয়ের বাবা হওয়ার যে প্রাপ্তি, সেই সুখ। আমি সব সময় চাইতাম আমার ছেলে সন্তান হোক। ছেলে হলে আমার বংশ রক্ষা হবে, আমাকে উপার্জন করে খাওয়াবে। কিন্তু একটা লক্ষ্মী মেয়ে যে আমার ঘরটাকে এইভাবে আলোকিত করে রাখতে পারবে সেটা ভাবিনি কখনও।

বাবার কথাগুলো শুনে আমার ভীষণ ভালো লাগলো।

হঠাৎ করেই উপরওয়ালা আমার বাবার সহায় হলেন। বাবা সুলভ মূল্যে শহরের ভিতর সাড়ে চার শতাংশ জায়গা কিনে ফেললো। এরপর বাবার স্বপ্নের গাছ যেন ডালপালা মেলতে শুরু করলো। বাবা আমাকে বলে,

-ছোট মা,আমাদের বাসাটা তো একতলা হবে। তবুও আমি দক্ষিণ দিকে বেলকনি করবো একটা। সেখানে একটা ইজি চেয়ার রাখবো। রোজ ফজরের নামাজ পড়ে আমি চেয়ারটাতে গিয়ে বসবো। তোর মা আমাকে বেশি করে দুধ চিনি দিয়ে এক কাপ চা দিয়ে যাবে। সকালের মৃদু দখিনা ঠান্ডা বাতাস আসবে বেলকনির গ্রিল দিয়ে। আমি মিষ্টিতে ভরপুর গরুর দুধের চায়ে চুমুক দিবো। ভাব তো মা কী দারুণ অনুভূতি হবে আমার? নিজের বাসা বলে কথা!
আমি বাবার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলি,

-তোমার স্বপ্ন অচিরেই পূরণ হবে বাবা।

আমার শান্ত্বনা বাণী শুনে বাবার মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুঁটে।

সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবন মন সবকিছু বদলে যায়। আমাদের জীবনের মোরটাও কেমন যেন ঘুরে যায়। স্বপ্ন ছুঁতে ছুঁতেই যেন স্বপ্নগুলো আরও একটু দূরে সরে গেল।

বাবা চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করলো। পেনশনের টাকা আর ব্যাংকের টাকা মিলে কোনোরকমে একটা বাসা হয়ে যাবে ভেবেই বাবার মুখটা হাসিখুশিতে ভরে উঠলো। ভাইয়া মাস্টার্স পাশ করে বেকার বসে আছে। সে সিদ্ধান্ত নিলো ব্যবসা করবে। টানা কয়েকদিন বাবার হাত পা ধরে কাকুতি মিনতি করে বললো, ব্যাংকের টাকাটা যেন ভাইয়াকে ব্যবসার জন্য দিয়ে দেয়। বড় ভাইয়ার এক বন্ধু এই ব্যবসাটা করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছে। বড় ভাইয়া বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিলো, সে উপার্জন করে বাবাকে ফাউন্ডেশন করে বিশাল বাসা করে দিবে।

বাবা বড় ভাইয়ার ব্যাপারটা ভাবার জন্য সময় নিল। দুই তিন দিন কি যেন ভাবলো, তারপর ভাইয়ার হাতে ব্যাংকে জমা পুরো টাকাটা তুলে দিয়ে বাবা প্রায় দুই সপ্তাহ আধমরা মানুষের মতো রইলো। কারও সাথে কোনো কথা বললো না। আমি আর মা গলাগলি করে কান্নাকাটি করি। বাবা জীবনে প্রথমবার হার্ট অ্যাটাক করলো। বড় ভাইয়া চট্রগ্রাম। ব্যবসার ব্যস্ততার জন্য আসতে পারেনি। একবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল কেবল। ছোট ভাইয়াকে একবার ফোন দিয়ে জানানো হলো। সে আর ফিরতি ফোন দেয়নি। বাবাকে বাসায় নিয়ে আসার পাঁচ-ছয় দিন পর ছোট ভাইয়া আসলো। এসেই আরেক দুর্ঘটনা ঘটালো। অনেকগুলো ঘুমের ট্যবলেট খেয়ে ফেললো।

সম্ভবত সুইসাইড করতে চেয়েছিলো। চিকিৎসা করে ভাইয়ার সেন্স ফিরানোর পরও ছোট ভাইয়া মুখ খুলছিলো না। ছোট ভাইয়ার এক বন্ধু মারফত জানতে পারলাম যে, ভাইয়া একটা মেয়েকে ভালোবাসে। বড়লোকের মেয়ে। মেয়ের বাবা ভাইয়ার কাছে বিয়ে দিবেন কেবল একটা শর্তে। ছোট ভাইয়া যদি আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া গিয়ে সেটেল হতে পারে তবেই ভদ্রলোক বিয়ে দিবেন। বাবা অসুস্থ বিধায় ছোট ভাইয়া আমাদের কাউকে কিছু জানায়নি। ভাইয়া বিদেশে যেতে পারবে না জানিয়ে দেওয়াতে ভদ্রলোক মেয়ের জন্য পাত্র দেখছেন।

আর এটা শুনেই ভাইয়া সুইসাইড করার চেষ্টা করলো। আমার প্রচুর রাগ হলো ছোট ভাইয়ার উপর। বাবা যে এত কষ্ট করে তাকে পড়াশুনা করালো, সেটার কোনো মূল্য না দিয়ে সে একটা মেয়ের জন্য সুইসাইড করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো! বাবা অসুস্থ, একটা হাত প্রায় অবশ হয়ে গেছে। সেটাও কোনো বিষয় হলো না বাবার ছোট ছেলের কাছে! একটা মেয়ে, যার সাথে হয়তো কিছু বছর ধরে পরিচয়, সেই মেয়েটাই আমার ভাইয়ের সব হয়ে গেল! ছোট ভাইয়ার সাথে রাগে কথা বন্ধ করে দিলাম আমি। কিন্তু আমার বাবা? বাবা ছোট ভাইয়ার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো অনেক্ষণ। ভাইয়ার কপালে গালে চুমু দিলো। তারপর খুব সহজভাবে বলে দিলো,

-তুই এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন ব্যাটা? তোর বাপ কি ফকিন্নি? কোন বড়লোকের কাছে আমার ছেলেকে আমি হারতে দিব না। আমি জমিটা বিক্রির চেষ্টা করছি। তুই তোর হবু শ্বশুড়ের সাথে কথা বল আর আমেরিকাতে যাবি নাকি

অস্ট্রেলিয়াতে যাবি ঠিক কর। আর শুন, জমি বিক্রির উদ্দেশ্য যদি তোকে কেউ জিজ্ঞাসা করে, তবে বলবি বাবার চিকিৎসার জন্য বিক্রি করছি। পরিবারের সবার কাছেও তাই বলবি। আমিও সবাইকে এটাই বলবো। দরজার আড়াল থেকে বাবার কথাগুলো শুনে আমার কলিজাটা ফেঁটে গেল যেন!

এরপর আমার দুই ভাইয়েরই মনের আশা পূরণ হলো। তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করে না বললেই চলে। আমাকেও বাবা শ্বশুড়বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। বাবার নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। অনেক খরচ। বাবা আর মা দুজনেই একটা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে উঠলো। আমি ফোন দিলে বারবার বাবা বলে,

-ছোট মা, আমি খু্ব ভালো আছি। তুই কিন্তু একদম চিন্তা করবি না আমাদের জন্য। আমার স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে। এই বৃদ্ধাশ্রমটা আমার স্বপ্নের বাসাটার থেকেও সুন্দর। দুই তলা একটা বাসা। বেলকনিটা ঠিক দখিনমুখো। রোজ ভোরে ফজরের নামজ পড়ে আমি একটা চেয়ারে বসি। চা খেতে পারি না অবশ্য। তাতে কি? চা আসলে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী না।

আমি শাড়ীর আঁচলে মুখ চেপে আমার কান্না আটকাতে পারি না। কাঁদতে কাঁদতেই বলি,

-চুপ করো বাবা। চুপ করো। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
বাবা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া গলায় বলে,

-তুই কাঁদছিস কেন ছোট মা? আমার সব স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তো।

আমি যেভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম, সেভাবেই তো আছি। দেখলি আল্লাহ কীভাবে আমার মনের ইচ্ছাগুলো পূরণ করে দিলো?

হয়তোবা বাসাটা নিজের না, এটা একটা বৃদ্ধাশ্রম। তাতে কী? বৃদ্ধাশ্রমের মালিক আমার বড় ছেলের মতোই দেখতে অনেকটা। সে বলেছে এ বাড়িটা আমাদেরই সবার। বল তো ছোট মা, আমার স্বপ্ন কী পূরণ হয়নি?

আমি বাবার কথাগুলো শুনি। শেষ পর্যায়ে এসে বাবার গলাটা ধরে আসে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, বাবার চোখের মোটা ফ্রেমের চশমার কাঁচগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে। জীবনের সন্ধ্যা নামার পর কিছু কিছু বাবা এত অসহায় হয়ে যায় কেন?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত