কপালের লিখন

কপালের লিখন

“অভাব আর অভাব, ধুর্ এমন জীবন থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো। “- মনে মনে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো রতন।

বারো বছর বয়সে অনেক বেশী বড় হয়ে গেছে অভাবের তাড়নায়। ভেবেছিলো পড়াশোনা করে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে মানুষের মত মানুষ হবে।
রোজ রোজ এতো অভাব ভালো লাগে নাকি? পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয়ে প্রাইমারীর গণ্ডি পেরিয়েছে বিনে পয়সায়। হাই স্কুলে ভর্তি হতে পারে নি টাকার অভাবে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে জমিদার বাড়ির বাগানে এসে ঢোকে। কাল দুপুরের পর আর খাওয়া জোটেনি তার, শুধু তার নয় কারোই পেটে কিছু পড়েনি।
সকালেই পেয়ারা গাছে উঠে পড়লো পেয়ারার লোভে।সকালে এদিকটায় ও বাড়ির কেউ থাকেনা। দেখতে পেলে হারু কাকা চেল্লাবে যে।
গাছে উঠে একটা পেয়ারা নিয়ে এক কামড় দিয়ে গুছিয়ে বসলো ডালে। চোখ পড়লো ওবাড়ির রান্নাঘরের দিকে। সকাল সকাল এতো রান্না, কোনো অনুষ্ঠান আছে হয়তো। দু চার জন কাজের লোকের সাথে গিন্নিমা ও সেখানে। ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে রান্নাঘরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দেয় সে। ইসসস্ কত কিছু রান্না হচ্ছে সেখানে। ক্ষিদেটা চাগিয়ে উঠলো গন্ধে। আর একবার মাথা তুলে সেদিকে নজর দিতেই চোখাচোখি হয়ে গেল তনু দিদির সাথে।
তাকে দেখে সে বললো–” রতন না? ওখানে কি করছিস? ”

উঠে দাঁড়ালো সে বাধ্য হয়ে। বললো –”না এমনি… ”

গিন্নিমা এগিয়ে এলেন জানলার পাশে ,বললেন – “কাল কোথায় ছিলি তোরা, হারুকে পাঠিয়ে ছিলাম তোদের বাড়ি, তোদের কাউকে পায়নি তাই ফিরে এসেছে ।”

“কেন গিন্নিমা, কেন পাঠিয়ে ছিলেন গিন্নিমা?? ”

“আজ আমার একটা মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে তাই কয়েকজনকে খাওয়াবো তাই বলতে পাঠিয়েছিলাম তোদের বাড়ি। তা শোন বেলা বারোটা একটার দিকে চলে আসিস। ”

রতন বলে – “আমার ভাই বোনদের নিয়ে আসবো গিন্নিমা, ওরা ও কাল থেকে না খেয়ে আছে!”

“ঠিক আছে নিয়ে আসিস ওদের ।”

সে আচ্ছা বলে চলে যেতে যেতে শুনলো, গিন্নিমা বলছেন, “আহারে কতদিন খায়নি ছেলে মেয়ে গুলো ।পাশ থেকে কেউ একজন বললো গরীবের ঘরে এমন ভাতের অভাব চিরদিন লেগেই থাকে। ”

বাড়ি ফিরে দেখে তখনো তিনটে পেয়ারা তার কাছে রয়েছে। মায়ের হাতে সেগুলো দিতে দিতে বলে-” তাড়াতাড়ি ওদের স্নান করিয়ে দাও, জমিদার বাড়ির গিন্নিমা দুপুরে সবাই কে নিয়ে খেতে যেতে বলেছেন।”

মা পেয়ারা গুলো কাটতে কাটতে বলে-” যাক আজ একটু ভালোমন্দ পেট ভরে খেতে পারবি, কাল আবার কি হবে কি জানি?” রতন মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মা চোখের জল লুকোতে ব্যাস্ত।

ভাই বোনকে নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখে অনেকেই সেখানে চলে এসেছে। গিন্নিমা ওদের দেখে বললো-” যা ওধারটায় গিয়ে ওদের নিয়ে খেতে বস।” খেতে বসে রতনের মা বাবার মুখ টা মনে পড়ে। তারা ও না খেয়ে আছে, পেটে এতো ক্ষিদে নিয়ে কি করে খাটবে? কি কাজ করবে তারা।
তাদের সংসারে অভাব থাকলে ও এমন পরিস্থিতি ছিলেনা, জুট মিলে লেবারের কাজ করতো তার বাবা, হঠাৎ করেই সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ এতো অভাব তাদের সংসারে। পূজো আর কটা করায় গ্রামের লোক,কয় পয়সাই বা দক্ষিনা জোটে!

“কিরে কি হলো তোর? খাচ্ছিস না কেন? ”
সে তাকিয়ে দেখে গিন্নিমার সাথে আরো অনেকেই তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
সে কি করে বলবে এভাবে সে কতদিন খাবে? কাল আবার কি হবে? ভাই বোনের ভবিষ্যত কি হবে? হাজারো প্রশ্ন তার মনে ।
গিন্নিমাকে বলে-” আমাকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন গিন্নিমা, আজ না হয় আপনার এখানে খেয়ে যাবো, কাল কী করে খাবো কি করে ওদের খাওয়াবো? আর আমার মা বাবা তারাও যে না খেয়ে আছে।” কথাগুলো বলতে বলতে ওর চোখ ছলছল করে ওঠে।

কখন যে ওর সামনে জমিদার বাবু এসে দাঁড়িয়েছে সে খেয়ালই করেনি। উনি বললেন-” আরে খেয়ে নে আগে, নইলে যে গিন্নীর পরিশ্রম বিফলে যাবে যে! খেয়ে নে খেয়ে নে।
আরে তোর বাড়ির জন্য খাবার পরে নিয়ে যাস, আর কাল তোর বাবা কে আমার কাছে নিয়ে আসিস, দেখি কোনো একটা ব্যাবস্থা যদি করতে পারি ! খেয়ে নে তুই।”

রতন চোখ মুছে তার দিকে বললো – “আমায় একটা স্কুলে ভর্তি করে দেবেন কর্তা বাবু, আমি পড়াশোনা করে মানুষ হতে চাই,ঠিক আমি কোনো কাজ করে সব টাকা শোধ করে দেবো। ”

“ঠিক আছে ও নিয়ে ভাবিস না, খেয়ে নিয়ে বাড়ি যা, কাল আসিস।”

খেয়ে গিন্নিমার সাথে সব গুছিয়ে বাড়ি এসে দেখে বাবা মা বসে আছে আর তাদের সামলে কিছু খাবার শালপাতায় মোড়া।

রতন কে দেখে তার মা বললো, গিন্নিমা খাবার গুলো পাঠিয়ে দিয়েছেন ।
“খাও তোমরা! বাবা কাল একবার ওবাড়ি যেতে হবে, কর্তা মশাই তোমাকে ও নিয়ে যেতে বলেছেন। ”
পেট ভোরে খাবার ও সুখ স্বপ্নে ঘুম আসে না চোখে। মনের ভেতরে সংশয়, হবে তো তার পড়াশোনা?

সকাল হতেই তৈরী হয়ে বাবার সাথে ঐ বাড়ি এসে পৌঁছায় ।তাদের দেখে কর্তা মশাই বলেন – “তোমার ছেলেটি তো রত্ন মুখুর্জে, একেবারে খাঁটি হীরে, ও কে দেবে আমায়? আমার তো ঐ একটি সন্তান, তাও আবার মেয়ে। দুদিন পর পরের ঘরে দিতে হবে, আমার এতো সম্পত্তি কে সামলাবে বল দেখিনি। আবার গিন্নি স্বপ্ন দেখেছেন আমার বাবার নামে স্কুল হবে, সেখানে বিনে পয়সায় পড়াশোনা করানো হবে,এতো সব করবো কবে বল তো?
দাওনা তোমার ছেলেটাকে, উপযুক্ত করে সব কিছুর জন্য তৈরী করি। ”

সতেরো বছর পর আজ আবার অনুষ্ঠান জমিদার বাড়িতে। জমিদার মশাইয়ের পালিত পুত্র রতনের বিয়ে। জমিদার মশাই গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে, তার বাবাও নেই, রতনের দুই মা এক বাড়িতেই থাকে। গ্রামে স্কুল হয়েছে কর্তা মশাইয়ের বাবার নামে,বোনটার বিয়ে দিয়েছে নিজে হাতেই। ছোট ভাই পড়ে কলেজে, রতন পড়াশোনা শেষ করে কলেজের চাকরীর সাথে সাথে এই স্কুলের সব কিছু সামলায়। তনু দিদি বিদেশে থাকে, সে আর তার স্বামী দুজনেই ডাক্তার। সব কিছু স্বপ্নের মতো মনে হয় রতনের। ভগবানের অশেষ দয়া খড়কুটো র মতো ভেসে যেতে যেতে কর্তা মশাই সামলে নিয়েছিলেন তাকে আর তার পরিবারকে। কে বলতে পারে কার কপালে কি লেখা!
তার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানায় সে।

“কিরে কি করছিস তুই এখানে? আর ওদিকে সবাই তোকে খুঁজছে, চল চল তোর গায়ের হলুদ নিয়ে আমায় আবার মেয়ের বাড়ি যেতে হবে তো! ”

চমক ভেঙে দেখে কোমরে আঁচল বেঁধে তনু দিদি আজ গিন্নিমার ভূমিকায়।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত