আমি বাংলায় গান গাই

আমি বাংলায় গান গাই

– কিগো, এখোনো বসে আছে কেন? বাজারে যাও। বেশ ভালো দেখে ইলিশ নিয়ে আসবে আর সাথে ভালো বাটা মাছ। ছেলেটা আমার বাটা মাছ খেতে খুব ভালোবাসে। কে জানে ইংল্যান্ডে ওসব পাওয়া যায় কিনা। কতদিন হয়তো খায় নি।

– আমি পারবো না, ভোলাকে পাঠাও। ছেলে আসবে শুনে একেবারে বাড়িটাকে মাথায় করে রেখেছো, ভালো কথা। কিন্তু মনে রেখ আমি এখোনো ওকে ক্ষমা করিনি।

– পুরোনো কথা মনে রেখে কি হবে? ভুলে যাওনা।
– না। আমি কোনদিন ওর ওই মেম বৌকে মেনে নিতে পারবো না। এই জন্যই আমার কোনোদিন ওই ইংরেজদের দেশে ওকে চাকরী করতে পাঠানোর ইচ্ছে ছিল না। ওই মেমের কথা যখনই বলেছিল, তখন থেকেই আমি বিরোধীতা করেছিলাম। ও যদি আমাদের ভালোবাসতো তবে কি বিয়েটা করতো? বিয়ে করে দশ বছর আমাদের থেকে দূরে কি পেল? তুমি তোমার শরীর খারাপের সময় যদি ওভাবে আকুতি মিনতি না করতে তবে আমি আজও ওদের এ বাড়িতে আসার অনুমতি দিতাম না।

– বেশ তোমাকে মানতে হবে না। কিন্তু দয়া করে ওদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করবে না। ওরা আমার জন্য আসছে।
– ওদের বলে দিও তোমায় দেখা হয়ে গেলেই যেন চলে যায়। এখানে যেন আবার অনেকদিন থেকে না যায়।
– ও তোমার ছেলে আর তোমার মতই জেদী। আজ আসছে আর হয়তো কাল চলে যাবে। দেখে নিও।
– তারমানে আজ আর কাল বাড়িতে কান পাতা যাবে না, এ বাড়িতে ইংলিশের কথা চলবে। আমার দাদু যুদ্ধ করে ইংরেজদের তাড়িয়ে ছিল দেশ থেকে আর সেই বংশের ছেলে হয়ে তোমার ছেলে ইংরেজকে বিয়ে করেছে, আমি মানতে পারবো না।

বলেই হনহন করে বেড়িয়ে যায় বংশ গৌরবী প্রিয়নাথ চক্রবর্তী। এতক্ষন কথাগুলো হচ্ছিল তার স্ত্রী সীমা দেবীর সাথে। প্রিয়নাথ বেড়িয়ে সকালের টিফিনটা পাড়ার রতনের কচুরীর দোকান থেকে সেরে নিল। তারপর আস্তে আস্তে গিয়ে বসল গঙ্গার পাড়ের পার্কটায়। মনে পড়ে যায় এই পার্কেই ছোটবেলায় ছেলে সায়ন্তন কে খেলা করাতে নিয়ে আসতো। হঠাৎ মনে হল সেই ছোট্ট সায়ন্তন আগের মতই পার্কে খেলে বেড়াচ্ছে, ছুটে বেরাচ্ছে আর বাবাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। মনটা একটা অদ্ভুত ভালোলাগায় ভোরে ওঠে প্রিয়নাথ বাবুর। স্ত্রীর মুখে শুনেছে তার ছেলের নাকি ছেলে আছে, ছয় বছর বয়েস। কে জানে কেমন দেখতে হয়েছে। আলমারির লকারে তার সেই মোটা চেনটা পড়ে রয়েছে, ঠিক করেছিল তার নাতি বা নাতনির মুখ দেখবে ওই চেনটা দিয়ে। কিন্তু সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হল তার নাতিকে কেমন দেখতে হয়েছে একবার দেখবে। তাই শত অভিমান থাকা সত্ত্বেও রওনা হল বাড়ির পথে।

বাড়ির বারান্দায় ঢুকতেই শুনতে পেল কিছু অচেনা কন্ঠস্বর। তারপর নিজে নিজেই মনে মনে বললেন, “এসে গেছে ইংরেজের ছা গুলো, এবার আমার বাঙালি বাড়িতে ইংলিশ চলবে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। রাগে গজগজ করতে করতে বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে এসে দাঁড়ালেন তিনি। দেখলেন তাঁতের শাড়ি পড়া একজন বিদেশিনী তার স্ত্রীর সাথে কথা বলছে। বিদেশিনী তাকে দেখেই মাথায় শাড়ির আঁচলে ঘোমটা দিয়ে প্রনাম করল তাকে আর স্পষ্ট বাংলায় বলল, ” কেমন আছো বাবা? আমি তোমার পুত্রবধূ লিন্ডা।” বিদেশিনীর মুখে বাংলা শুনে চমকে গেলেন প্রিয়নাথ। ছেলে প্রিয়ব্রতকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সায়ন্তন, প্রিয়ব্রত দাদুকে দেখেই বাবার কোল থেকে নেমে দৌরে এসে দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “দাদাই দাদাই তুমি আমার সাথে খেলবে? বাবা বলে তুমি নাকি খুব ভালো ক্যারাম খেলতে পারো?

খেলবে আমার সাথে?” বিদেশে বড় হওয়া ছেলের মুখে বাংলা শুনে আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। সীমা দেবী এগিয়ে এসে বলল, “জানো, বৌমা দাদুভাই বিদেশে থেকেও আমাদের সবাইকে চেনে। ওরা নেতাজীকে চেনে কবিগুরুকে চেনে। এমনকি মাতৃভাষা বাংলাও বলতে পারে।” লিন্ডা শাশুরীর দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?”

সায়ন্তন এবার বাবার পা ছুয়ে প্রনাম করে আর বলে, “বাবা লিন্ডা প্রিয়ব্রত ওরা বিদেশে থাকলেও ওরা কিন্তু বাঙালি আদব কায়দায় জীবনযাপন করে। লিন্ডা জন্মগত ইতালিয়ান হলেও বিয়ের পর একটু একটু করে নিজেকে বাঙালি বাড়ির বৌ হিসেবে তৈরী করেছে। দেখ তোমার নাতি নিজের মাতৃভাষায় কথা বলছে, এর সম্পুর্নটাই লিন্ডার জন্য।” নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় চোখ থেকে অঝোরে জল বেরোতে থাকে প্রিয়নাথের। কাঁদতে কাঁদতে সস্নেহে পুত্র পুত্রবধূ আর নাতিকে জড়িয়ে ধরে। তিনি লিন্ডা আর সায়ন্তনের হাত ধরে বলে, “পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস রে তোরা। অনেক অন্যায় করেছি তোদের উপর। লিন্ডা আমাদের আদব কায়দা ভাষা মেনে নিতে পারবেনা ভেবে আমি তোদের মেনে নিই নি” আর কিছু বলতে পারেন না, গলাটা ধরে আসে। লিন্ডা শশুরের চোখের জল মুছিয়ে দেয়। আর গান ধরে, “আমি বাংলায় গান গাই আমি বাংলার গান গাই, আমি আবার আমি কে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।”

।। সমাপ্ত।।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত