রূপার সাতকাহন

রূপার সাতকাহন

কদিন শরীর মন কিছুই ভালো নেই, বুঝলেন।কেমন যেন পেটের ভিতরটা খুসখুস করছে। আসলে অনেকদিন কারো সাথে না, জমিয়ে নিন্দে করা হয়নি।এখন তো আর বেশী বেরানো হয়না বাড়ি থেকে,বয়স হয়েছে।আগে এপাড়া ওপাড়া নিন্দা করে বেড়াতাম লোকের নামে।এখনও অবশ্য অসুবিধা নেই, আপনারা তো আছেন, আমার ফেসবুক বন্ধুরা।সামনাসামনি পরনিন্দা পরচর্চা করতে না পারলেও দুধের সাধ ঘোলেই মিটিয়ে নিই। আপনাদের সাথে আজ রূপার নামে একটু নিন্দে করে নিই, কেমন?

রূপাকে চিনলেন না?আমার খুব প্রিয় বন্ধু।আরে বন্ধু তো নামেই,আসলে ও আমাকে দুচক্ষে দেখতে পারেনা,আমিও ওকে একদম পছন্দ করিনা।আর পছন্দ করবই বা কেন বলুন? হাড় বজ্জাত মেয়ে। অবশ্য মেয়ে বলা ভুল,ও তো এখন প্রায় পঞ্চাশ বছরের বুড়ি।

রক্ষণশীল হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে তুই। তুই কিনা কোন সংস্কারই মানবি না?কলেজের বন্ধুর সাথে প্রেম করে বসল।কবেকার কথা,তখন তো আর প্রেম এমন জলভাতের মতো ছিল না।যথেষ্ট সাবধানে লুকিয়ে চুড়িয়ে প্রেম করতে হত।ঠিক আছে বাবা,প্রেম করেছিস কর,তাও কিনা এক অব্রাহ্মণ ছেলের সাথে।ওদের পরিবারে তো কোন মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি,তাও কিনা বেজাতে,সাহস বলিহারি! আর হবে নাই বা কেন?বেচারির কি দোষ বলুন? ওর বাবা মায়ের যেমন শিক্ষা —

ওর মায়ের মুখে তো ছোটবেলায় কয়েকবার শুনেছে, “যার সাথে যার মজে মন, কি বা হাড়ি, কিবা ডোম।” এবার রূপার বাবার কথা একটু বলি।বনেদী ব্রাহ্মণ পরিবার।রূপার প্রপিতামহ স্বপ্নাদেশে শিবঠাকুর পেয়েছিলেন।বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দির ওনাদের।কিন্তু সেই শিবমন্দিরে কোন অব্রাহ্মণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিলনা।শিবরাত্রি, নীলষষ্ঠী এই সব বিশেষ দিনগুলিতে অব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে বউরা লাইন দিয়ে এসে দাঁড়াতেন, তাঁদের হাত থেকে জল নিয়ে রূপাদের পরিবারের কেউ তাঁদের হয়ে ঠাকুরের মাথায় জল ঢেলে দিতেন।এই ছিল রীতি।রূপার বাবা ও মেজো পিসি এই নিয়ে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এত বয়স্ক মানুষেরা ঠাকুরের মাথায় জল ঢালতে পারবেনা?তাঁদের হয়ে ছোটছোট ছেলেমেয়েগুলো ঠাকুরের মাথায় জল ঢালবে?

ঠাকুর তো সবার।দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল রূপার বাবা আর পিসির মাথায়।হাত ধরে সোজা মন্দিরের ভিতর টেনে নিয়ে আসেন ওঁরা শীলবাড়ির ঠাকুমাকে।বলেন ওনাকে ঠাকুরের মাথায় জল ঢালতে। “অ্যাঁ, বল কি বাছারা?আমি জল ঢালব?” ” হ্যাঁ, আপনিই ঢালবেন। “সমস্বরে বলেন ওঁরা।রূপার ঠাকুমা একেবারে চুপ থাকেন এসব ব্যাপারস্যাপার দেখে।কিন্তু রূপার জ্যেঠিমার সে কি হম্বিতম্বি! এত বড় পাপ?ঠাকুর এই বংশ স্বমূলে বিনষ্ট করবেন,ওমুকতুসুক কতো শাপশাপান্ত করলেন তিনি দেওর ননদকে।কে কার কথা শোনে?একের পর এক অব্রাহ্মণদের মন্দিরে ঢুকিয়ে নিয়ে আসেন রূপার বাবা ও পিসি।তবে রূপার বাবা তো তখন বেশ ছোট, চোদ্দ কি পনেরো বছর বয়স।তাই একটু তো ভয় পাচ্ছিলেন মনেমনে।বড়োবৌদির কাছে বাবা তো সব শুনতে পাবেন, বাবা অফিস থেকে ফিরলে আর বোধহয় রক্ষা নেই। কিন্তু অবাক কান্ড, রূপার দাদু অফিস থেকে ফিরে ছেলেমেয়ের কুকীর্তির কথা শুনে হাসলেন,রাশভারী মানুষটি একটিও তিরস্কারসূচক কথা বলেননি ছেলেমেয়েকে।সেই থেকে মন্দিরে সবরকম বিধিনিষেধ উঠে গেল।

তবে রূপার জ্যেঠিমা কিন্তু সাংঘাতিক কড়াধাঁচের মানুষ। ওনার এক ছেলে যখন নমঃশূদ্র একটি মেয়েকে ঘরের বউ করে নিয়ে আসেন, তাঁকে কিন্তু মন্দিরে প্রবেশাধিকার দেননি রূপার জ্যেঠিমা।এখানেই থেমে থাকেননি তিনি।সেই জ্যাঠতুতো বৌদির গর্ভস্থ সন্তানকে নষ্ট করতেও মহিলার হাত এতটুকু কাঁপেনি।অবশেষে চোখে জল নিয়ে আজীবন নিঃসন্তান হয়ে বেঁচে রইলেন শান্তশিষ্ট, কর্মপটীয়সী, লক্ষ্মীমন্ত বৌদিটি।

যাকগে, ওরা যা পারে করুক। আমার কি দরকার পরের ব্যপারে নাক গলিয়ে?

হ্যাঁ,রূপার কথায় ফিরে আসি। কলেজে যাওয়া শুরু করল।গাঁয়ের মেয়ে, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে আরম্ভ করে।মনে মনে ভাবল না জানি কি হনু কলেজে এসে।তাই প্রেম তো একটা করতেই হবে। বেশ রোমান্টিক রোমান্টিক একটা হাবভাব।দেখতে শুনতে মন্দ না।বেশ পটিয়ে ফেলল একটা ছেলেকে।কিন্তু প্রেম কি আর স্থান কাল পাত্র মেনে হয় রে বাবা?ঝুলে পড়ল একটা অব্রাহ্মণ ছেলের গলায়।

রূপার দিদিমা আবার রূপার খুব বন্ধুর মত ছিলেন।রূপা তাঁকে তার পছন্দের কথা বলে,জিজ্ঞাসা করে,”আচ্ছা দিদিমা,ব্রাহ্মণ কাকে বলে?” দিদিমা বলেন,” যিনি ব্রহ্মকে লাভ করেছেন,তিনিই ব্রাহ্মণ “।
রূপা:– তাহলে কি তোমার মতে বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ?
দিদিমা:–অবশ্যই।

চিন্তা করুন আপনারা, কি সাংঘাতিক কথা একজন অতদিন আগের প্রায় নিরক্ষর হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা মানুষের মুখে।

এমনিতেই জাতপাতের জটিলতা বরাবরই রূপার মাথার ঠিক ছয় ইঞ্চি ওপর দিয়ে চলে যায়।তার ওপর আবার দিদিমার এমন যুক্তিপূর্ণ কথা তার মনের গহনে ঢুকে যায়।বিশ্বাস করে রূপা মনেপ্রাণে, “সবার উপরে মানুষ সত্য,তাহার উপরে নাই।

তবে রূপার বরটা কিন্তু হেব্বি ভালোমানুষ। রূপা তো ঠকেনি,দিব্য গুছিয়ে ঘর সংসার করছে দেখছি।গা জ্বলে যায় বাবা আমার, ওদের সুখের সংসার দেখে।

না বাবা,আজ আর সময় নেই। বিয়েবাড়ি যেতে হবে এখনি। রূপার দেওরের বিয়ে।ওর দেওর আবার খ্রিস্টান মেয়ে জুটিয়ে এনেছে, একেবারে খিচুড়ি সংসার ওদের, বুঝলেন তো?তবে ওর জা টি কিন্তু দারুণ মিষ্টি স্বভাবের ভালো মেয়ে।আমার খুব পছন্দ হয়েছে ওর নতুন জা কে।আপনারা আবার রূপাকে যেন সেটা বলে দেবেন না।আজ আসি তাহলে,আবার একদিন অন্য কারো নিন্দা করতে আপনাদের কাছে আসব।টা টা।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত