আমি সফল

আমি সফল

বাবা রায়হান তুই আরেকটা বিয়ে করে নে। এই মেয়েটাকে ঘরে রাখিস না। ডিভোর্স দিয়ে দে।

-কিন্তু কেনো মা?
>কারন মেয়েটা বোবা। আবার মাও হতে পারবেনা।
-বোবা এবং মা না হতে পারলেইকি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে হবে?
>রায়হান তুইকি চাইছিস না তোর একটা পরিবার হোক?
-কেনো মা? এখন আমরা কি? তুমি আমি বাবা এবং রিনা(আমার বউ) আছে। আমার আর কারো দরকার নেই।
>তুই কি সন্তান চাইছিস না?
-কেনো চাইবোনা। কিন্তু যাকে ভালবাসি তাকে ছেড়ে না।
>ছেলে-মেয়ে না থাকলেকি জীবন চলে?
-হ্যা মা চলে। এইসব আর বলবেনা মা। আমি চললাম।

মায়ের সাথে কথা বলেই রুমে চলে আসি। এসে দেখি রিনা সেই আগের মত একটা কোনায় বসে আছে। চোখ দিয়ে পানি পরছে।

-কি তুমি এখানে এখনো? রিনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এর পর ও নিজের ফোনে কি যেনো লিখে আমাকে পাঠালো। আমি মেসেজটা ওপেন করলাম- আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।

-আবার শুরু করলা এই কথা। আচ্ছা এখন চল খেয়ে আসি। আবার লিখলো-আমি যা বলছি একটু শোন। তুমি তোমার জীবনটা নষ্ট কইরোনা।

-ওই বেশি কথা না ভেবে চল এখন।

এর পর টেনে নিয়ে গেলাম খাওয়ার টেবিলে। নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে রুমে নিয়ে আসলাম। রুমে শুয়েছি। এমন সময় আমাকে আবার মেসেজ

-তোমার কি ইচ্ছে হয়না তোমার নিজের সন্তানের সাথে খেলতে?

আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা মায়া মায়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় আমি উত্তর না দিয়েই ওর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে করছি—-

রিনার সাথে পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হয়। কিন্তু ওকে সেই প্রথম রাত থেকেই ভালবেসে ফেলি। অনেক আনন্দে দিন কাটছিলো আমাদের। রিনার বেশি কিছু চাওয়া ছিল না। শুধু ওকে ভালবাসতে হবে। রাতে আমার বুকে ঘুম পারাতে হবে। মেয়েটা একদম বাচ্চাদের মত করবে। একটু রাগ করলে আমি মানাতে চাইলেই হেসে দিয়ে আমাকে জরিয়ে ধরে থাকতো। কোনো কথায় কষ্ট পেলে আমাকেই জরিয়ে ধরে শুয়ে থাকতো।

এভাবেই চলছিলো আমাদের জীবন। একদিন রিনা আমাকে বলে ও নাকি প্রেগনেন্ট। আমি কথাটা শুনে অনেক খুশি হয়েছিলাম। সম্পুর্ন বাড়ি ওকে কোলে নিয়ে আমার আনন্দ প্রকাশ করেছিলাম৷  কিন্তু আমি জানতাম না এই সুখটা আমার কপালে নেই৷ কয়েকমাস পর রিনার চেকাপের জন্য ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলাম। এমন সময় আমাদের গাড়িটা একটা অন্য গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে বসে। আমি অজ্ঞান হই কিন্তু বেশি ব্যাথা পাইনি। এর পর যখন আমি রিনাকে খুযে বের করি দেখি ওর অবস্থা অনেক খারাপ।

ডাক্তার আমাকে জানালেন আমাদের বাচ্চাটা নাকি আগেই মারা গেছে। কিন্তু রিনাকে বানানো যেতে পারে৷ যার জন্য তারা অনেক চেষ্টা করছে।রিনার গলায় একটা কাচ ঢুকে পড়েছে। হাসপাতালে আনতেক লেট হয়েছে।তাই বাচানো যাবে কিনা তারা জানেন না।

আমি ডাক্তারের কাছে পা ধরে আকুতি মিনোতি করেছি যেনো রিকানে বাচিয়ে দেন। এর পর আল্লাহর রহমতে রিনা বেচে যায়। কিন্তু ও আর কথা বলতে পারবেনা। আর ও আর মা হতেও পারবেনা ডাক্তার জানালেন।আমি নিজের চোখের পানি মুছে যাই রিনার কাছে।

আমি রিনাকে যখন দেখতে যাই। রিনা অনেক চেষ্টা করছিলো কথা বলার কিন্তু পারছিল। যার জন্য ও অনেক হাইপার হয়ে যাচ্ছিলো। আমি ওকে বুকে নিয়ে চুপ করিয়ে বলেছিলাম এখন থেকে আমি ওর শব্দ। ওর সব কিছু আমি দেখবো।

এর পর যখন ও জানতে চায় ওর বাচ্চার কি হয়েছে। আমি চুপ করে ছিলাম। ও বুঝতে পেরে কাদতে থাকে।
অনেক কষ্টে ওকে সামলে রেখেছি। কিন্তু মেয়েটা মাঝে মাঝেই কাদে। ওর বাচ্চাটার জন্য মাঝে মাঝেই রাতে চিৎকার করার চেষ্টা করে। পেটের উপর হাত রেখে কাদে। আমাকে বার বার বলে যেনো আরেকটা বিয়ে করে ফেলি৷ এতে নাকি ও অনেক খুশি হবে।

আমি এইসব ভাবছি। এমন সময় রিনা আমাকে ডাক দিলো।আর আবার মেসেজ দিলো-

-কি দেখ এইভাবে? আর উত্তর দিচ্ছোনাযে?
>তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। আদর করতে ইচ্ছে করছে।

রিনা আর থাকতে না পেরে আমার বুকেই কাদতে কাদতে শুয়ে পরে৷ কি যেনো বলতে চাইছে। আমি চুপ করিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। মেয়েটা জেদেই যাচ্ছে। একড়ু পরেই ও ঘুমিয়ে পরে। আমি ওকে বুকের উপর নিয়েই ঘুমিয়ে পরি। সকালে উঠে দেখি মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

-কি হলো? কখন উঠলে?

রিনা ফোনে।মেসেজ দিলো— অনেক আগেই তোমাকে দেখছি। আচ্ছা কেনো এত ভালবাস?

-তোমাকে ভাল না বাসলে কাকে বাসবো? আমারতো একটাই বউ।

এর পর দুজন উঠে যাই খেয়ে নিতে। মা কেমন ভাবে যেনো রিনার দিকে তাকিয়ে আছে। রিনা বুঝতে পেরে মন খারাপ করে। আমি খেয়ে অফিসে চলে যাই। এসে দেখি রিনা বাসায় নেই। আমি আম্মুকে জিজ্ঞেস করি-

-মেয়েটাকে যায়গা মতো দিয়ে এসেছি। মানে ওর বাসায়।
>কিন্তু কেনো?

আম্মু আমার কথার উত্তর না দিয়ে একটা কাগজ আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি খুলে দেখলা ডিভোর্স পেপার।আর রিনা সই করে দিয়েছে।

-আম্মু এইসব কি?
>দেখ তোর ভাল চাই। তাই তুইও সই কর।

আমি কিছুই বলিনি। চুপ চাপ পেপার গুলা নিয়ে রিনার বাড়ি চলে যাই। গিয়ে দেখি রিনা নিজের রুমে শুয়ে কাদছে।  আমাকে দেখেই চোখের পানি মুছে ইশারায় জিজ্ঞেস করছে এখানে কি? আমি উত্তরে ওর সামনেই সেই পেপার গুলা ছিড়ে দিলাম।। রিনা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। আমি ওর সামনে গিয়েই ওর গালে ২ টা চর মারলাম।

-এর পর থেকে যদি এইসব কর। তাহলে তোমাকে আমি রিনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।  আমি সাথে সাথে রিনাকে বুকে জরিয়ে নেই।  রিনা কাদছে।

-এই পাগলি তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো? আমাকে ছেড়ে গেলে আমি মরেই যাবো।

এর পর রিনাকে আমি বাড়ি নিয়ে আসি। মা আমাকে বুঝাতে আবার চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বলে দিয়েছিলাম এইসব যেনো আর না হয়। রিনা আমার স্ত্রী ওকেই আমি সারাজীবন পাশে চাই।

এর পর কয়েকদিন চলে যায়। প্রায় সব ঠিক। রিনাও নিজেকে সামলে নিয়েছে কিছুটা৷  আজকে অফিসে যাইনি। অন্য একটা কাজ আছে।  বাড়িতে বিকালে ফিরেই রিনার রুমে রিনা আমার থেকে বেশি আমার কোলে যে ছিল তাকে দেখে অবাক। হ্যা আমার কোলে একটা বাচ্চা। অনাথালয়ের অনেক বাচ্চা থাকে যাদের মা বাবা নেই।তাই আমি ভাবলাম ওদের একজনের যদি একটা পরিবার আর আমি যদি একটা মাকে সন্তান।একজন বাবাকে সন্তান দিতে পারি তাহলে ভুল কোথায়।

রিনা কিছু না বলেই কোলে নিয়ে নিলো। রিনা আমাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো এইটা কে? আমি বললাম আমাদের সন্তান।

রিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।আমি এর পর সব বলে দেই। রিনা আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে দেয়। ওর মুখে যে খুশিটা দেখছিলাম সেটা ভাবার মত না। অনেকটা সময় পর ওর মুখে এত সুন্দর হাসি দেখলাম।

আমি বাবা মাকেও নিয়ে আসি। তারাও মেনে নেন। এখন বাড়িতে অন্য রকম একটা পরিবেশ। সবাই এখন আমার বাবুকে নিয়েই ব্যস্ত। যেনো এই পরিবারের সদস্য অনেক আগে থেকেই।সবার মুখে এখন অন্য রকম একটা হাসি। যে হাসিটাই আমি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম।আমি সফল।

The End

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত