মৃত্যুভয়

মৃত্যুভয়

-ওহ! থ্যাংক গড লায়না তুমি চলে এসেছো! আমি কী যে ভয় পাচ্ছিলাম!
আমি একটু মুচকি হাসলাম। বিছানার পাশে জড়ো করে রাখা শুকনো পাতাগুলো ছড়িয়ে দিলাম।
– তুমি ইদানিং একটু বেশিই ভয় পাচ্ছো ইহান। এখানে কেউ কখনো আসবে না।

ইহান জানালার কপাটগুলো ধাক্কা দিয়ে দেখছিলো ভালো করে লাগানো হয়েছে কি না। যদিও ডালপালা দিয়ে তৈরি করা জানালা তবে খুব বেশি ঝড় বৃষ্টি না হলে ভেঙে পড়বে না। ইহান জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বললো,
– কেউ আসবে না বলেই তো আরো বেশি ভয় হয় লায়না। চারদিকে কত ভয়ংকর সব প্রাণী। কোনো একটা বুনো প্রাণী হুট করে ঢুকে এসে আমাদের মেরে ফেললেও কেউ কিছুই টের পাবে না। আমি যেদিকেই তাকাই শুধু মৃত্যুই দেখি লায়না। জানালার দিকে তাকালে মনে হয় এখুনি মৃত্যু আমায় গ্রাস করবে৷ দরজার দিকে চোখ পড়লে মনে হয় মৃত্যু হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য। ঘরের সর্বত্র যেন মৃত্যু উৎ পেতে আছে আমাকে ছোঁবল দিবে বলে। আমার চারদিকে আমি কেবল মৃত্যুই দেখি লায়না।

– তোমাকে দেখছি মৃত্যুভয় একেবারে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
– হ্যাঁ লায়না আমু মৃত্যুর ভয়ে মৃত্যুর আগেই বারবার মারা যাচ্ছি। আমাকে প্লিজ এই মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পাইয়ে দাও।

ইহানের কথা শুনে এবার আমি শব্দ করেই হেসে উঠলাম। আজকাল ওর কথা শোনে কেন যেন শুধু হাসিই পায় আমার। ও কি জানেনা আমি ওকে কতটা ভালোবাসি?

আমরা যে রাজ্যের বাসিন্দা সেখানে খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিলো অনেকেই। শেষপর্যন্ত রাজ্য থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নিজ নিজ বাড়ির সবচেয়ে দুর্বল সদস্যকে প্রভুর তরে উৎসর্গ করে তারপর সেই মাংস কেটে বাজারে চড়ামূল্যে বিক্রি করা হবে বা নিজেরা খাবে।

ইহান ও আমি একই এলাকার বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পারতাম ইহান আমাকে ভালোবাসে। দুর্বল চিত্তের অধিকারী হওয়ায় ইহান কখনো সেটা প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু সেদিন রাতে ইহান সত্যিই একটা সাহসী কাজ করেছিলো যেদিন বাড়ি থেকে লুকিয়ে এসে আমায় বলেছিলো, “লায়না আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলো। ওরা কাল আমায় মেরে ফেলবে। ”

আমি নিজের অবাক ও খুশি হওয়ার ভাব চাপা রেখে তখনই ইহানকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি এই জঙ্গলে। গুহার মত বেশ বড়সড় এই গর্তটায় আমার ও ইহানের দিন বেশ চলে যাচ্ছে।

প্রতিদিনের মত আজও খাবার নিয়ে গুহায় ফিরে আসার পর ইহান সেই একই কথা বললো যা গত একমাস যাবত বলে চলছে। মৃত্যুভয়টা ইহানের মাথায় একেবারে বাসা বেঁধে গেছে। আমি ইহানের কাছে গেলাম। ও ভয়ে ভয়ে খাচ্ছিলো আর ভীত চোখে এদিকওদিক তাকাচ্ছিলো। আমি একদম ইহানে গা ঘেঁষে বসলাম। ইহান শিউরে উঠে আমার দিকে তাকালো। একটু দূরে সরে বসলো। আমি আর কিছু না বলে নিজের বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।

রাত কতটা হয়েছে জানিনা। খচখচ শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। হয়তো গর্তের সামনে দিয়ে কোনো বুনোপ্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। শুকনো পাতার খচখচ শব্দ হচ্ছে তাই। আমার থেকে বেশ কিছুটা দূরে ইহান ঘুমোচ্ছে। ঘুমের মাঝেও ওর ভয়টা যায় নি৷ একটু পর পর ওর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমি বিছানা ছেড়ে ইহানের কাছে গেলাম। ওর ঠোঁটে আমার ঠোঁট দুটো ছোঁয়ালাম। অনাকাঙ্খিত ভালোবাসার স্পর্শে ওর ঠোঁট ও চোখ দুটোই সিক্ত হয়ে উঠলো। ও চোখ মেলে তাকালো। আমি মিষ্টি করে হাসলাম। এরপর পরই বহুদিনের প্রত্যাশিত কাজটি একনিমিষেই সম্পন্ন করে উঠে দাঁড়ালাম। ইহানের গলার ফিনকি বেয়ে রক্তের বন্যা ছুটছে। আমি ইহানের কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম,

“মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মৃত্যুই সবচাইতে সহজ উপায় ইহান। তোমাকে আর কখনো মৃত্যু নিয়ে ভয় পেতে হবে না। তোমাকে আমি মৃত্যুভয় থেকে চিরতরে মুক্ত করে দিলাম।”

ইহান কোনো কথা বললো না। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেলে থাকা পাপড়ি দুটো আস্তে আস্তে নিচে নেমে এলো। সেই চোখে অবিশ্বাস নাকি ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছিলো আমি ঠিক বুঝিনি। তবে ভয় দেখতে পাই নি।

ছুরি থেকে বেয়ে বেয়ে রক্ত আমার হাতে গড়িয়ে নামছে। গর্তের এক কোণে ছুড়ে ফেলে দিলাম ছুরিটা। ওটার আর এখন দরকার নেই আমার। ইহানের কপালে শেষবারের মত একটা চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম গর্ত থেকে। আজ রাতেই বাড়ি ফিরতে হবে। ইহানের ফ্যামিলিকে জানাতে হবে কাজটা আমি করে ফেলেছি। উপযুক্ত পাওনা যেন দিয়ে দেয় আমাকে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত